ইউজার লগইন

ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা

মেট্টিকুলেশন পাশ করেছি সেই ১৯৪৭ সালে। সে সময় মেয়েদের জন্য কাজটা খুব সহজ ছিলো না। পড়া-শোনার অভ্যাসটা তৈরী হয়েছিলো তখনই। অনেক ধরনের বই পড়তাম। বিপ্লবী বই, সে আমলের লেখকদের বই; আরো অনেক কিছু। আজ তোমরা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা পড়ছো তার মৃত্যূর সত্তুর বছর পর। আমরা সুযোগ পেয়েছিলাম তার লেখা প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই পড়ে ফেলার।

আরো আছে। সে আমলে পঞ্চপান্ডবের নাম শুনলে ঘাবড়ে যেতেন অনেক বাঘা বাঘা সাহিত্যিক। আমার কাছে প্রথাবিরোধী এই লেখক গোষ্ঠীকেও অনেক আকর্ষণীয় মনে হতো। আসলে সাহিত্যচর্চার কাজটি খুব সহজ নয়। আমি এখন পর্যন্ত শিশুদের জন্য ৫০টি বই লিখেছি। কিন্তু আজো নিজেকে লিখিয়ে বলে দাবী করার মতো স্পর্ধা আমার হয় নি। খুব গুরুত্বসহ নিজের লেখার যত্ন না নেয়া হলে সাহিত্যিক হওয়া সম্ভব নয়। আজ-কাল অনেকেই এ কাজকে পেশা হিসেবে নেবার সাহস দেখাচ্ছে। আমাদের সময়ে তেমনটি হবার জো ছিলো না।

কথা প্রতিনিয়ত এক লাইন থেকে অন্য লাইনে সরে যাচ্ছে। কারণ আজ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি ভীষণ। বলছিলাম নিজের সেই ছেলেবেলার কথা। পড়াশোনার একটা চমৎকার অভ্যাস গড়ে ওঠার পেছনে আমাদের বাড়ির পরিবেশ একটা বড় ভূমিকা রেখেছিলো। সে সময় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী উপন্যাসটি ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েছিলো। যে কারণে সেটি সহজলভ্য ছিলো না। একদিন আমার বড় ভাইকে দেখি বইটি পড়তে। দেখে আমার এত লোভ হলো যে, আমি আর তার পড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম না। তার সঙ্গে বসেই পড়ে ফেললাম। বইটি পড়ে কংগ্রেসে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম।

আস্তে আস্তে পড়াশোনার পরিসর বেড়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, সত্যেন্দ্রনাথ, অমিয় চক্রবর্তী, মানিক, তারাশঙ্করদের পাশাপাশি পড়তে লাগলাম ম্যাক্সিম গোর্কি, ইস্পাতসহ প্রগতি প্রকাশনীর বিভিন্ন বই। মনে আছে, মাও সে তুঙএর লং মার্চের ওপর নানান লেখা পড়তে পড়তে আমিও সে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলাম মনে মনে। আমার ভেতরে বিপ্লবের আগুন জ্বেলে দিয়েছিলো মূলত বই। আজ বুঝতে পারি, যেকোন আগুনই উৎসাহ ছাড়া জ্বলে না।

আমি মনে মনে কমিউনিস্ট, সেটা কংগ্রেস টের পেয়ে যায়। যেদিন তারা আমার দেয়া চার আনা চাঁদা ফিরিয়ে দেয়, সেদিন থেকে তাদের সঙ্গে আমার মনের বাঁধন আলগা হয়ে যায় অনেকখানি। এরমধ্যে দেশ বিভাগের ঘটনা চারিদিকে সব উলট-পালট করে ফেলেছে। তবে '৪৭-এর স্বাধীনতা ছিলো আইসক্রীমের মতো, অল্প দিনেই গলে গেল। '৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লাম।

সে সময় আমরা কমরেড মনি সিংহকে 'বড় ভাই' কোডনেম-এ ডাকতাম। কারণ তখন কমিউনিস্ট নেতাদেরকে প্রাদেশিক সরকার ভালো চোখে দেখতো না। ঝামেলা এড়ানোর জন্য দলের মেয়ে সদস্যদের বাসায় আমাদের বৈঠক হতো। মতিন ভাইরা (ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন) আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন এবং হাল ছিলো তাদের হাতেই। ২০ তারিখ মধ্যরাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, পরদিন কার্ফূ ভেঙ্গে মিছিল বের করা হবে। আমাদের সঙ্গে থাকা স্কুলের মেয়েদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা কি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে রাজি? এতে কিন্তু জীবনের ঝুঁকি আছে। তারা দৃপ্ত কন্ঠে বলে ওঠে, একশ' বার।

ছেলেরা দশজন করে আর মেয়েরা চারজন করে রাস্তায় নেমে পড়লাম। প্রথম দলটি ছিলো ছেলেদের, এরপরের দলটি ছিলো মেয়েদের। সে দলে আমি নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। এরপর ছোট ছোট দলে ছেলে-মেয়েরা আস্তে আস্তে বের হচ্ছিলো। তবে সংখ্যায় খুব বেশি ছিলো না। ধীরে ধীরে পুলিশী বাঁধা জোরালো হচ্ছিলো। আমরা তাদের গুলি-বন্দুক ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলাম।

তখনও অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয় নি। তবে পুলিশী বাঁধা দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর শিক্ষার্থীদল স্ফূলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠলো। বিকাল তিনটার দিকে সবাই ক্যম্পাসের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসা শুরু করলো। আর তখনই, প্রথমে শুরু হলো পুলিশের টিয়ার শেল নিক্ষেপ এরপর গুলিবর্ষণ।

চোখের সামনে দেখতে পেলাম, আমাদের রফিকের খুলি উড়ে গিয়ে মগজগুলো শিউলী ফুলের মতো ছড়িয়ে পড়লো রাস্তায়। সালাম, জব্বার, বরকতদের রক্তে সেদিন মধ্যাহ্নে একটি লাল সূর্য অংকিত হলো, এখন যেখানে শহীদ মিনার অবস্থিত; ঠিক সে জায়গাটায়। ওটাই ছিলো বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন সূর্য। দেখতে পেয়েছিলাম, কয়েকটি রক্তমাখা শার্ট ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে গাছের ডালে। সেগুলো থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছিলো তাজা রক্ত।

(ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত। ১৮ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে তিনি এ বক্তৃতা দেন।)

শিরোনাম কৃতজ্ঞতা: লীনা আপু।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।

মেট্টিক পাশ করেছি সেই ১৯৪৭ সালে।

মেট্টিকুলেশন হবে না মীর? তখন সম্ভবত মেট্টিক পরীক্ষাকে মেট্টিকুলেশন পরীক্ষা বলা হত।।

মীর's picture


ঠিক করে দিয়েছি। নোটপ্যাডে যা টুকেছিলুম, তাই তুলে দিয়েছিলুম প্রথমে।

নাজ's picture


ইয়াল্লাহ! আমি তো প্রথমে পড়তেছিলাম আর ভাবতেছিলাম "এই ব্যাটা এত্ত বুড়া?" Crazy

ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।

মীর's picture


অল্পের জন্য আপ্নারে চমকায় দিতে না পেরে ঈষৎ দুঃখিত।Tongue out

নুশেরা's picture


আমি মনে মনে কমিউনিস্ট, সেটা কংগ্রেস টের পেয়ে যায়। যেদিন তারা আমার দেয়া চার আনা চাঁদা ফিরিয়ে দেয়

এই অংশটা খুব ইন্টারেস্টিং। এখনকার দিনে আদর্শ ব্যাপার না, চাঁদাটাই সব

মীর's picture


আসলেই আদর্শের জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে এখন। কেমন আছেন আপু?

জ্যোতি's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।

মীর's picture


এর উত্তরে কি লিখবা?
-কিছু না, শুধুই একটা ধন্যবাদ।

শওকত মাসুম's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।

১০

মীর's picture


অসীম শ্রদ্ধা আজ আরো একবার।

১১

ঈশান মাহমুদ's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুন

এই প্রথম কোন নারী ভাষা সৈনিকের আত্ম বিবৃতি শুনলাম। ধন্যবাদ মীর।

১২

ঈশান মাহমুদ's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুন

এই প্রথম কোন নারী ভাষা সৈনিকের আত্ম বিবৃতি পড়লাম। ধন্যবাদ মীর।

১৩

মীর's picture


ধন্যবাদ।
ভুলি নাই Stare

১৪

বাতিঘর's picture


৫০টা বই লিখেও নিজেকে সাহিত্যিক বলতে নারাজ, বিনয়ের এরচে' বড় উদাহরণ আমি অন্ততঃ দেখিনি। আর শব্দ চয়নে কি অসাধারণ পরিশীলিতভাব-চমৎকার!!! এরকম আলোকময় মানুষগুলো কেনো জানি মুখ খুলতে নারাজ...হয়ত আমাদের অবহেলাই তাদের ভেতরে অভিমানের প্রাচীর তুলতে সাহায্য করে...নইলে এঁদের মতো মানুষের কথা এতো কম জানি কেন আমি-আমরা? এটা কী ব্যক্তিগতভাবে শুধু আমারই ব্যর্থতা? নাকি জাতিগত ভাবে তার দায়ভার আমাদের সবার? প্রথমটা হলেই স্বস্তির....কতো কিছুই জানি না রে মীর! এ রকম একজন অসাধারণ মানুষের কথা জানানোর জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আর ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুনের জন্য এক পৃথিবী ভালোবাসাসহ শ্রদ্ধা!

====================
অ:ট: আজ কী আপনার মন খারাপ ভাইটি? মন ভালো হয়ে যাক...আপনাকে গুমড়ামুখে কি যে হতচ্ছাড়া লাগছে Angry ....জলদি মুড ভালো করেন নইলে মাইর মাইর আর মাইর মাইর

১৫

মীর's picture


ধইন্যবাদ।
আমার মন খারাপ না/রাতে আছিলোও না। আন্তাইজ্যা মন্তব্য করার লিগা আরেকটা বাড়ি দিতে চাইসিলাম। দিলাম নাহ্

১৬

তানবীরা's picture


মীর প্রবন্ধ পড়তে কিন্তু খুব কমই আনন্দ লাগে। আপনার লেখার গুনে একটানে পড়ে ফেললাম। অসাধারণ।

ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।

১৭

মীর's picture


ধন্যবাদ। ঈষৎ লজ্জিত হয়ে পড়েছি। কমেন্ট পড়ে।

১৮

তানবীরা's picture


ঈষৎ লজ্জিত হওয়া ফটুক দেখতে চাই Tongue

১৯

উলটচন্ডাল's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।

লেখা পড়ে অভিভূত। সময়-সুযোগ করে বাংলা উইকিতে যোগ করে দিতে পারেন। অনুরোধ জানিয়ে গেলাম।

২০

মীর's picture


অনুরোধ রাখা হবে, জানিয়ে গেলাম।

২১

নাহীদ Hossain's picture


লেখাটা পড়ে বুকের ভিতর কেমন খালি খালি লাগতেছে ... আসলেই এ রকম মৃত্যুর হাতছানি কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য কয়জনের হয় ...
শেয়ার করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ...

২২

মীর's picture


নাহীদ ভাইকে দেখলে মনটাই ভালো হয়ে যায়। Smile
আপ্নে আছেন কিরাম?

২৩

সাহাদাত উদরাজী's picture


বাংলাদেশ

২৪

রুমিয়া's picture


ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক হালিমা খাতুনের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা.....।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!