ইউজার লগইন

মোজাইকের সাদা, কালো আর লাল পাথরগুলো

সেবার কোট ডি’ ভোয়ায় জঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময়, এক যৎসামান্য ফাঁকা জায়গায় কোনো বলা-কওয়া ছাড়াই যখন আমাদের হেলিকপ্টার থামানো হলো, তখন বেশ খানিকটা অবাক হয়েছিলাম। অবশ্য আমাদের ক্যপ্টেন কারণটা সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাখ্যা করলেন। অনাকাঙ্খিত এ বিরতির জন্য দুঃখ-টুঃখ প্রকাশ শেষে তিনি যে কৈফিয়ত দাখিল করলেন, তা মূলতঃ কারিগরী ত্রুটি সারানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার মতো অজপাড়াগেঁয়ে মূর্খের সে কারণ বোধগম্য হলো না। শুধু বিলম্বটুকু মেনে নিলাম খুশিমনে। আফ্রিকার জঙ্গলেও কোনোদিন পর্দাপণের সুযোগ পাবো, এত অচিন্ত্যনীয়।
বেশ কয়েক রকমের টাইট টাইট বেল্টে শরীর এমনভাবে বেঁধে রেখেছিলাম যে খুলতে গিয়ে ঘাম ছুটলো। সঙ্গের দু’জন পোলিশ এ্যটেনডেন্ট ছাড়া বাকী ন’জনই পুরুষ। অল্পসময়ের মধ্যে ওদের দু’জনের সহৃদয়তার পরিচয় পেয়েছি একাধিকবার। এবারও যখনই দেখলো আমি নিজের বাঁধন খুলতে গলদঘর্ম হচ্ছি, তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো। তবে ওরা হাত ছোঁয়ানোর আগেই ক্লিক শব্দে মুক্ত হয়ে গেলাম।
কপ্টারের ব্লেডের শব্দ ততক্ষণে বন্ধ হয়ে এসেছে। কানে প্রবেশ করলো দুইজনের রিনঝিন হাসির শব্দ। সুন্দর, সুন্দর ও টাচি। আনমনে তারিফ করতে করতে বেরোচ্ছিলাম যন্ত্রটার ভেতর থেকে, ওদের একজন বললো, দেখো একটু সাবধানে। কিন্তু পা নামিয়েও বের হওয়া হলো না। আতংকসহকারে গুটিয়ে আসতে হলো।
জঙ্গলের ভেতর থেকে পিল পিল করে জংলী বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। ওদের মুখে উলুধ্বনির মতো এক ধরনের শব্দ। যদিও সঙ্গে থেমে থেমে শাঁখের নিনাদ নেই। কিন্তু সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর পর দেয়া সেই পরিচিত আওয়াজ আছে। একটানা মিনিট দশেক চললো সেই শব্দ। ব্যাটাদের গলায় বোধহয় মোষের মতো জোর। উলু দিয়েই কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে চায়।
অবশ্য আমারও বাঙালি কান। প্রথমে একটু চমকেছিলাম ঠিকই। দ্রুতই সামলে নিলাম। ভাবছিলাম জংলীগুলোর সমস্যাটা কি? কিছু বলার থাকলে বলে ফেললেই পারে। এত চিল্লা-পাল্লা করার কি আছে? আর একটানা এতক্ষণ চেঁচিয়ে যাচ্ছে কিভাবে? ভাবনার সুর কেটে গেল হঠাৎ চারিদিক শুনশান হয়ে যেতে শুনে।
জটলার ভেতর থেকে আরগুলোর চেয়ে বেশি অসভ্য দেখতে একটা ভুত বেরিয়ে আসলো। কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে আমাদের প্রটোকল অফিসারের সঙ্গে হাত-পা নেড়ে নেড়ে বচসায় লিপ্ত হলো। লিকলিকে শরীরের জংলীটার সাহস আছে। আমাদের দুই মানুষ সমান উঁচু আর তিন মানুষ সমান মোটা অফিসারের সামনে ভড়কালো না মোটেও।
আমি দূর থেকে দেখলাম ওদের নন-ভার্বাল কমিউনিকেশনের জায়গাটা বেশ শক্তিশালী। কথা একবিন্দুও বুঝলাম না, কিন্তু হাত-পা নাড়ানো থেকে বিলকুল আন্দাজ করে ফেললাম কি বলতে চায়।
ওদের হোগলা কিংবা গোলপাতা কিংবা শনের তৈরী ঘরের চাল আমাদের আতিকায় পাখির ডানা ঝটপটানির মুখে তিষ্ঠাতে না পেরে উড়ে গেছে। এখন পুরো গ্রাম চালাশূন্য। ঘরের পোয়াতী মেয়েরা শুয়ে শুয়ে বিনা পরিশ্রমেই আকাশ দেখতে পাচ্ছে, চোখ মেললেই। এ ঘটনায় আকাশের দেবী নানকি’ যদি রুষ্ট হয়ে শাপ বর্ষণ শুরু করে ওদের ওপর, তখন কি হবে? এ মহাঅন্যায়ের প্রতিকার চায় ওরা।
প্রটোকল অফিসার বেরসিক প্রকৃতির লোক। ভয়ংকর একটা কিছু যে ঘটে যেতে পারে, এটা যেন তাকে স্পর্শই করলো না। নিজের বন্দুক দিয়ে শূন্যে একটা গুলি ছুঁড়ে চেঁচিয়ে উঠলো, না বাপু, ওসব ফিকির ছাড়ো। চট করে কেটে পড়ো, নইলে দেবো বুলেট সেঁধিয়ে।
চিৎকার আর গুলির আওয়াজ শুনে ভাবলাম, এবার বোধহয় জংলীগুলো পড়িমরি দৌড় লাগাবে। কিসের কি? কিছুক্ষণ অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আবার উলু দেয়া শুরু করলো সবগুলো মিলে। মুখের এক বিঘৎ সামনে মুখ এনে এভাবে উলু দেয়া হলে সুনিশ্চিতভাবেই ব্রহ্মতালু জ্বলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের অফিসারকে দেখলাম এবার খানিকটা ভড়কে যেতে।
কারণ হতে পারে, এই উলু শুনে যদি আরো জংলী বের হয়ে আসে সেই মহাঅন্যায়ের প্রতিকার চাইতে, তাহলে আমাদের সবার দফা-রফা। অফিসার সন্ধির ভঙ্গিতে হাত তুলে সবাইকে থামতে ইশারা করলেন। তাতে উল্টো শব্দের তীক্ষ্নতা বেড়ে গেলো আরো কয়েকগুণ।
হঠাৎ দারুণ একটি ঘটনা ঘটলো। কারিগরী ত্রুটি সারানোর জন্য যে রেসকিউ ভেহিকল্'টার আসার কথা সেটা পৌছে গেল। আমাদের পুঁটিমাছ কপ্টারটির কাছে ওটা রীতিমতো বর্ষীয়ান সিলভার কার্প। মাটিতে নামার সময় ওর ব্লেডের বাতাসে আমি সিট থেকে উড়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। তাড়াতাড়ি স্লাইডিং দরজাটা টেনে দিলাম। জানালা দিয়ে যা দেখলাম, সে দৃশ্য ভোলার নয়। জংলীগুলো কোনোটা বানরের মতো গড়ান দিয়ে, কোনোটা লাফ দিয়ে আবার কোনোটা আরেক বন্ধুকে পিঠে ফেলে ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। আসলে হাওয়ায় না, আমরা তো নেমেছিলাম ক্ষুদ্র একটি ফাঁকা জায়গায়। চারিদিকেই গভীর বন। ওগুলো মিলিয়েছে এর ভেতর। কিংবা হয়তো মিলায় নি, কিছুটা ভেতরে ঢুকে নজরদারি চালাচ্ছে ঠিকই। তবে এইবারের ঝাপটায় যে ওদের ঘর-বাড়িগুলোও উড়ে গেছে, সেটা বুঝতে বেশি বুদ্ধি খরচ করতে হলো না।
মাঝে মাঝে আড়ষ্টমনে এরকম আবোল-তাবোল ভাবতে ভালো লাগে। এরকম ভাবতে ভাবতে একবার নায়াগ্রা ফলস্-এর ওপরে চলে গিয়েছিলাম। আসলে মন বলে যে জিনিসটা আমাদের আছে, সেটাকে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেললে সমস্যা। নানাবিধ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে হয়।
সেদিন রাতে কোনো কারণ ছাড়াই খুব ঠান্ডা লাগা শুরু হলো। ফ্যান বন্ধ করে দিলাম। বসে বসেই কম্বলটা টেনে নিলাম পাএর ওপর। কোনোকিছুতেই কাজ হলো না। উত্তরোত্তর তাপমাত্রা কমতে থাকলো। প্রথম প্রথম শিহরণ জাগছিলো, অল্পসময়ে সেটা কামড়ের অনুভূতিতে রূপান্তরিত হলো। ঠান্ডা দাঁত ফুটাচ্ছে চামড়ায়। হঠাৎ মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেলো। সব পরিধেয় পরিত্যাগ করে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম। বরফশীতল পানি যখন আমাকে নিষিক্ত করে ছেড়ে দিলো তখন ভালো লাগছিলো ভীষণ। এরপরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘরের টকটকে মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলাম। আনন্দে চোখ বুজে আসছিলো বারবার।
চড়ুই পাখিগুলোর রক্তের গ্রুপ কি কে জানে। প্রতিদিন নিজের শরীর থেকে এক চড়ুই সমান রক্ত দিয়ে আসতে ইচ্ছে করে প্রিয় নিয়তিদেবীকে। যখন আমি ঝড়ো হাওয়ার ভেতর, শোঁ শোঁ শব্দ আর মূহুর্মূহু বর্জ্রপাতের ভেতর, নভেম্বর রেইনের ঝংকার তোলা পিয়ানোর সুরের ভেতর, উদভ্রান্তির আকাশছোঁয়া ঢেউএর উল্লাসের ভেতর আর থরের হাতুড়ির আঘাত পড়া এক বিক্ষুব্ধ সময়ের ভেতর ঠান্ডা মেঝেতে চোখ বুজে শুয়ে থাকি; তখন সেই প্রেয়সীর পাঠানো গেকো’টা মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়, সব ঠিক আছে তো?
---

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


আমিও জানতে চাই

মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়, সব ঠিক আছে তো?

একটু যেনো মেজাজ বিক্ষিপ্ত মনে হচ্ছে, মীর?

বাতিঘর's picture


আপনার কল্পনা শক্তির তরিফ করি রে ভাই! গেকো জানতে চাইলে দুষ হয়না যতো দুষ আম্রার মাইর মাইর

তানবীরা's picture


এটা ভালো, ঝগড়া হলে অভিমান হলে ম্যাসেঞ্জার বন্ধ করে রোজ দুটো করে পোষ্ট দিবা। ওনি পোষ্টে তোমার মেজাজ বুঝে নিবে

লীনা দিলরুবা's picture


কি শক্তিশালী লেখনি! বাহ বাহ!

লিজা's picture


হ মীরের ইদানিং কি হইছে ? নাকি সে এইরকমই বরাবর । লেখা অন্যদিনের মত ভালো হইছে । তবে একটা কথা, আপনার এইধরণের লেখাতে আপনার প্রায় একই রকম অনুভূতি উঠে আসছে । বৈচিত্র কম ।
জংলীদের নিয়ে যেটা লিখছিলেন সেটা গল্প হিসেবে শেষ করে ফেলুন । দারুণ মজার হচ্ছিল কিন্তু ।

নীড় সন্ধানী's picture


আপনি কি জাতিসংঘ বাহিনীতে আছেন নাকি? পুরা ভিন্ন ধাঁচের একটা গল্প। কিন্তু গল্পটা হঠাৎ শেষ হয়ে গেল যেন Sad

শওকত মাসুম's picture


হঠাৎ কী হইল?

নাজমুল হুদা's picture


ভালোই তো হচ্ছিল, হঠাত প্যাঁচ দিয়ে অন্যদিকে নিলেন কেন? মনে কী হয়েছে? কোন সমস্যা?

সাহাদাত উদরাজী's picture


নীড় সন্ধানী | ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০১১ - ৩:৫২ অপরাহ্ন
আপনি কি জাতিসংঘ বাহিনীতে আছেন নাকি? পুরা ভিন্ন ধাঁচের একটা গল্প। কিন্তু গল্পটা হঠাৎ শেষ হয়ে গেল যেন Sad

নীড় ভাইয়ের মত আমারো মনে হল!

১০

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


শেষটা অদ্ভুত..

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!