ইউজার লগইন

ডিমান্ড অভ সিচুয়েশন

ইংলিশ রাজ্যের ফুটপাথে কেউ গ্লাভস্ না খুললে তার সঙ্গে হ্যন্ডশেক করা হয় না। আমেরিকার পথেও একজন ভদ্রলোক কখনোই গ্লাভস্ না খুলে কোনো সুন্দরীর সঙ্গে হ্যন্ডশেক করে না। তবে দু'দেশেই অপেরা কিংবা উচ্চমার্গীয় পার্টি কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোয় গ্লাভস্ না খুলেই অনেকে কাজ চালিয়ে দেয়। এটা হচ্ছে ডিমান্ড অভ সিচুয়েশন। তবে মানবসমাজে প্রচলিত এই হ্যন্ডশেকের রীতিটা বেশ স্বাস্থ্যকর। এতে মানুষে মানুষে ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ ঘটে। কেননা দু'জন মানুষের মধ্যে স্পর্শ বিনিময়ের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই রক্তে-মাংসে একটা সুক্ষ্ন দ্যোতনা সৃষ্টি হয়, যা মানুষকে সামান্য হলেও প্রভাবিত করে। আমি নিজে অনেক বড় বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি হ্যন্ডশেকের কল্যাণে। আবার নানাবিধ ঝামেলায়ও আক্রান্ত হয়েছি হ্যন্ডশেকের কল্যাণে। জীবনে কখনো-সখনো চূড়ান্ত আনপ্রেডিক্টেবল, আউট অভ বক্স প্রকৃতির মানুষের দেখা মিলে যায়। এ্যান ছিলো তেমনই একজন।
মনে আছে আমাদের বায়িং হাউসটা উত্তরা থেকে বাংলামটরে সরিয়ে আনার পর পর স্প্যনিশ একটি কোম্পানী যোগ দিয়েছিলো, আমাদের নিয়মিত খদ্দের হিসেবে। দুই কোম্পানী মিলে এক অফিস। কিন্তু মানুষ সাকুল্যে পাঁচজন। সেখানে একবার একটা মেয়ে আসলো সে দেশের। ঝকঝকে চেহারা আর কোঁকড়া সোনালী চুল। প্রথমদিন দেখা হতেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো হ্যন্ডশেকের উদ্দেশ্যে। আমি খুব ভাব নিয়ে সে হাত ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ওদের দেশে মনে হয় ছেলে-মেয়েতে হ্যন্ডশেক করাটা বিশেষ ভদ্রতা। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো খানিকটা সংকোচ কাজ করেই এক্ষেত্রে। আর মেয়েটিকে দেখেও বেশ ভালো লেগেছে। এ অবস্থায় হ্যন্ডশেক করা উচিত হবে না। হাত ধরে ফেললে ভাললাগাটা কেটে যেতে পারে। আমি দেখেছি দুরত্ব কমে আসলে সংকট বৃদ্ধি পায়। মুগ্ধতা কমে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে কেটেও যায়। হাত ফিরিয়ে দিতেই একটি রামধমক ভেসে আসলো, তবে খুব ক্ষীণ স্বরে। প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে। হয়তো নিজেই নিজেকে বলেছিলো। আমি শুনে ফেললাম, ম্যানার জানে না নাকি? আমিও রামউত্তর, জানি বলেই তো আপনার হাত ধরলাম না। ওটা যে এ দেশের প্রেক্ষাপটে বড্ড বেমানান প্রিয় বিদেশিনী। সে কিছুক্ষণ চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছিলো। এই মেয়েটার এক্সপ্রেশনগুলো এক পার্ফেক্ট আর এত দারুণ হয় যে মুগ্ধতা আরো বেড়ে গেল। সে নিঃশব্দে হাসতে হাসতে 'য়ু নটি বয়' বলে সরে গেল।
আমি ভেবেছিলাম, যাক্ আপদ গেছে। আপদ মানে হ্যন্ডশেক না করাটাকে ভিন্নভাবে নিলে আমি বিপদে পড়ে যেতাম। কারণ বিদেশিনীর কাছ থেকে আমাকে তিন লাখ টাকার কাজ বাগাতে হবে। কিন্তু পরে পড়ে গেলাম আরো মুসিবতে। সে দেখা হলেই হাত বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়দিনও হাত ধরলাম না। তৃতীয়দিনও হাত ধরলাম না। সে কিছু বলে না। ভরা মজলিসে হাত এগিয়ে দেয়, আমি মাথা ঝাকিয়ে বাউ করি। আমার মনে হয়, হাত বাড়িয়ে দেয়ার পর কেউ যদি সেটা না ধরে তাহলে যে একটা অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরী হয়; সেটি এ মেয়ে জানেই না। আমি করলাম কি, চতুর্থদিন ওর হাত ধরলাম। ধরে আর ছাড়লাম না। দশমিনিট পর সে ‌'ঘাট হয়েচে, মাপ চাইছি' বলে কেদে-কেটে অস্থির হয়ে গেলো। তাও ছাড়লাম না। পনেরো মিনিট পর শাদা মুখটা লজ্জায় না অপমানে না আর কিছুতে জানি না, কিন্তু লাল হয়ে উঠতে দেখলাম। তাও ছাড়লাম না। বিশ মিনিটে সে সিরিয়াস মুডে জানতে চাইলো, আমি কি আমার অর্ডারটা হারাতে চাই? তাও ছাড়লাম না। পঁচিশ মিনিটে সে আমাকে পুলিশে দেবার ভয় দেখালো। তাও ছাড়লাম না। আধঘন্টা পরে বললো, ঠিক আছে চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। হাত ছেড়ে ঝেড়ে দৌড় দিলাম। ওরে বাবা। এ কি কথা!
তবে সুপার গ্লুর মতো লেগে থাকা বিদেশিনী এবারে আরো ফিচেল হয়ে উঠলো। পরদিন হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি নর্মল একটা হ্যন্ডশেক করার নিয়তে হাত বাড়াচ্ছি। চট করে হাতটা গুটিয়ে নিলো। কেমন লাগে? খুব মেজাজ গরম হলো। হাত বাড়িয়ে ধরে রাখলাম। সে একটু পর 'লাগবে না' টাইপ হাত নাড়ানোর ভঙ্গি করলো। আমি কি তাতে মানার বান্দা? নচ্ছারের মতো হাত বাড়িয়ে রাখলাম। সে দীর্ঘসময় পর আমাকে নিয়ে তার নিজের রুমে গেল। দরজাটা বন্ধ করে সামনা-সামনি বসলো। বসে আমার হাত ধরলো। ধরে বললো, নাও ধরে থাকো। যতক্ষণ খুশি।
আগের দিন দৌড় দিয়েছিলাম বলে আজ সে শক্ত করে ধরে আছে। টানাটানি করাটা ভদ্রতার মধ্যে পড়ছে না দেখে কি করবো বুঝতে পারছি না। এমন সময় বাঁচিয়ে দিলেন ঠাকুর। পিওনটা কোনো এক বিচিত্র কারণে হুট করে একটা নক দিয়েই রুমে ঢুকে গেল। আর বিদেশিনী ইলেক্ট্রিক শক খেয়ে পিছিয়ে গেলেন। আমি ইচ্ছে করে তার দিকে তীক্ষ্ণ-অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
এতো মেয়ে নয়, সাক্ষাৎ ভয়ংকর। রুমে নিয়ে গিয়ে বলে হাত ধরে থাকো। মনে মনে ঠিক করলাম, এর থেকে বেঁচে চলতে হবে। তবে সে সুযোগ বেশিদিন মিললো না। এরপরে দু’দিন মেয়েটি জানি কোথায় গিয়েছিলো। হয়তো অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যেতে হয়েছিলো। সেখান থেকে ফিরে একদিন দেখলাম সারাদিন হাসিখুশি মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছা হচ্ছিলো গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কি খবর? কিন্তু করলাম না। বিকালে বের হওয়ার সময় সে’ই এগিয়ে এলো, কি খবর জানতে চেয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। আমি অভ্যাসবশে হাত এগিয়ে দিলাম সৌজন্য হ্যন্ডশেক করার জন্য। সে পুরোনোদিনের মতো করে নিজের হাতটা গুটিয়ে নিলো। ফিচেল টাইপ একটা হাসি দিয়ে সামনে থেকে সরে গেল।
এতদিন ভাবতাম বিদেশী মেয়েগুলো খুব সিরিয়াস টাইপ হয়। মুভি-টুভিগুলোতে তো তেমনই দেখেছি। কিন্তু এখানে তো দেখছি উল্টো ঘটনা। আমি চেষ্টা শুরু করলাম এড়িয়ে এড়িয়ে চলার। দেখা হলে আগাই না। আগালেও পাশ দিয়ে কাটি না। যদি কখনো পাশ কাটানো পড়েও, তো মুখ তুলে তাকাই না। চলতে থাকলো। ভাবখানা এমন যে আমি ভীষণ ভীতু আর লাজুক প্রকৃতির একটা ছেলে এবং তোমাকে খুব সমঝে চলি।
তবে সে সুযোগ বেশিদিন মিললো না। সেদিন বিকালে মনোযোগ দিয়ে একটা ওয়ার্ক-অর্ডার তৈরী করছিলাম। নাক-মাথা-কপাল মনিটরের ভেতর গুজে দিয়ে কাজ করছিলাম। এমন সময় টেবিলে নক নক পড়লো। মাথা তুলে চারিদিকে ঘুলঘুট্টি অন্ধকার দেখে খানিকটা হতচকিত হয়ে গেলাম। এরমধ্যে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে শাদা জামা। তাকাতেই একটা হাসি দিলেন। দেখে ভালো লাগলো। কিন্তু তারপর যখন হাত বাড়িয়ে দিলেন আর ভালো লাগলো না। নিশ্চই মনের ভেতরে কোনো ফন্দি আছে। আমি না দেখার ভান করে জিজ্ঞেস করলাম, কি কেমন আছেন? ক’দিন মনে হয় চিনতেই পারছেন না। মেয়েটি কোনো কথা না বলে নিজের বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে চোখ দিয়ে ইশারা করতে থাকলো।
এ অবস্থায় হাত বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই। ক্ষীণ একটা চিন্তা মাথায় ছিলো, হয়তো মেয়েটি ভালোভাবে হ্যন্ডশেক করবে। হাত টান দিয়ে ভেংচি কাটবে না। দেখলাম সৌভাগ্যবশত তেমনই ঘটলো। নিবিড়ভাবে হাত ধরে একটা মধুর হাসি দিয়েছে। আমিও প্রত্যূত্তরে হাসলাম এবং কিছুক্ষণ ধরে থাকলাম।
অনেকে হ্যন্ডশেকের ক্ষেত্রে হাত মিলিয়েই হাত ছুটিয়ে নেয়। এটা ঠিক ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না। নোটবুক মুভিটায় ছেলেটার বাবার সঙ্গে মেয়েটির হ্যন্ডশেকের দৃশ্যটা ভালো করে খেয়াল করলে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিছুক্ষণ একে অপরের হাত ধরে রাখার প্রয়োজন আছে। আমি সেই কিছুক্ষণ হাত ধরে রাখলাম। এরপরে হাত ছুটিয়ে আনতে চেষ্টা করলাম। তখন কি জানি টুক-টাক কথা হচ্ছিলো আমাদের মধ্যে।
ছুটিয়ে আনতে পারলাম না। বেশ শক্ত করে ধরে আছে। আমি ভাবলাম হয়তো আরো একটু ক্ষণ ধরে রাখতে হবে। সেটা ভেবে আরো একটু ক্ষণ ধরে রাখার চেষ্টা করে আবার হাত ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। এবং যথারীতি ছুটিয়ে আনতে পারলাম না। মেয়েটির মুখে সেই ফিচেল হাসি ফিরে এসেছে।
আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, এটা কি প্রতিশোধ কি না। তাহলে এক কাজ করি। ওর মতো আমিও বলি, ধরে থাকো যতক্ষণ খুশি। যেই ভাবা সেই কাজ। বললাম। প্রত্যূত্তরে সে কোনো কথা বললো না। কিন্তু আমার ঠিক চোখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসতে থাকলো।
একটু পর হাতে অল্প চাপ অনুভব করলাম। মনে হলো, কাছে টানছে। টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াতে অধৈর্য্য হয়ে টানাটানি শুরু করলো মেয়েটি। তাই আমিও তাড়াতাড়ি ওর সঙ্গে সঙ্গ চলতে শুরু করলাম। দেখা যাক কি হয়। শুধু বন্ধুদের সঙ্গ সাকুরা’য় যাবার একটা কথা আছে রাতে। সেটার কিছুটা দেরী আছে। ভাবতে ভাবতে মেয়েটি আমাকে নিয়ে গাড়ি বারান্দায় চলে আসলো। আগেও একদিন দেখেছি, নিজের গাড়ি সে নিজেই ড্রাইভ করে। জোর করে গাড়িতে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে তারপর হাত ছাড়লো। এ পর্যন্ত কিন্তু কোনো কথা নেই।
ওর অ্যপার্টমেন্টে ঢোকার মুখে গাড়ি থেকে নেমে চাবি দারোয়ানের হাতে দিয়ে দিলো। দিয়ে আবার আমার হাত ধরলো এবং টেনে টেনে ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। সুন্দর সাজানো ফ্ল্যাট। আমি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম। মেয়েটি শুধু উইন্ডো টেবিলের ওপর একটা স্পট লাইট জ্বালিয়ে সেখানে আমাকে নিয়ে গেল এবং হাত ধরে মুখোমুখি বসলো। বেশ একটা আনুষ্ঠানিক পরিবেশ। কিন্তু হাতের বিষয়টা বুঝতে পারছি না। আর এমন চোখের মণিতে ঠাঁয় তাকিয়ে থাকাটাও বুঝতে পারছি না।
টিক-টক টিক-টক ঘড়ির আওয়াজের সঙ্গে সময় একসময় গড়িয়ে যাওয়ার গতি বাড়িয়ে দিলো। সেটা প্রথম টের পেলাম ডান পকেটে রাখা মোবাইল ভাইব্রেট করে ওঠায়। ডান হাত তো আটকে আছে। অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে ‘এক্সকিউজ মী’ চাইলাম। যাতে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে পারি। মেয়েটি যথারীতি দুষ্টু ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে আমার অন্য হাতটির দিকে চোখের ইশারা করলো। বাম হাত দিয়ে খানিকটা কসরত করেই মোবাইল বের করতে হলো। দীপককে বললাম, তোরা শুরু কর। আমি এসে তোদের ধরবো। এছাড়া বলার কিছু ছিলোও না।
মেয়েটি হঠাৎ কথা বলে উঠলো, কিছু খাবে? বললাম, না। বললো, কেন? কিছু খাও প্লীজ। প্লীজ বলার সময় ইচ্ছে করে আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকেও আসলো। তখন আমি বুঝতে পারলাম। এ আসলে আমার সঙ্গে যা কিছুই করছে, সব হচ্ছে দুষ্টামী। সিম্পলি দুষ্টামী। আমিও মজা পেলাম। বহুদিন এমন দুষ্টের দেখা মেলে নি। তার দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে এবং মুখের প্রায় কাছাকাছি মুখ নিয়ে বললাম, না খাবো না সোনামনি। খেতে গিয়ে তোমাকে ধরে রাখার সুযোগ মিস করতে চাই না এক সেকেন্ডের জন্যও।
সাথে সাথে বিদ্যূৎগতিতে হাত ছেড়ে উঠে গেল মেয়েটি। ফ্রীজ খুলে কি জানি বের করে ঘাটাঘাটি শুরু করলো। প্রায় ঘন্টাখানেক বা তারো অনেক বেশি সময়, ধরে রাখার কারণে আমার হাত বেশ আর্দ্র হয়ে উঠেছিলো। অনেকক্ষণ পর মুক্তি মেলায় আমি তাই নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এরই মধ্যে সে একটা স্ট্রবেরী ক্রাশ নিজের জন্য আর চকলেট আমার জন্য নিয়ে এসেছে। ইয়া বিশাল গ্লাস। জানতে চাইলাম, এতে দুধ আছে কি না? সে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করার পর জিনিসটা মুখে তুললাম। রাতে যে প্রোগ্রাম আছে, সেটার কথা মাথায় রাখলে এখন দুধ পেটে ফেলা যাবে না। আমি একঢোকে ওটা খাওয়া সেরে বললাম, এখন তাহলে উঠি। ও আবার আমার হাত ধরলো। দরজা পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে আসলো। এবং বের হয়ে যাওয়ার সময় ‘যেও না সাথী’মতোন একটা লুকসহ আমার হাত ধরে দরজার কপাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। ভাবখানা এমন যে, আমি জোর করে ছাড়িয়ে না নিলে সে আমার হাত ছাড়বেই না। আমিও খুব ‘ছেড়ে দে শয়তান’ টাইপ ভঙ্গি করে শেষমেষ হাত ছাড়িয়েই নিলাম। মানুষ-জন অলরেডী গালি-গালাজ শুরু করে দিয়েছে। আরো দেরী করে গেলে সে গালিটুকুও জুটবে না। তবে ওর চোখে সত্যি মনে হলো একটা বেদনা ছায়া পড়তে দেখলাম। এটা ভেবে কি বিভ্রান্ত হবো কি না ধরতে পারলাম না। পরে সেসব ভাবা যাবে বলে ঠিক করে নিজের কাজে মনোযোগ দিলাম। আপাতত সেটা হচ্ছে জোরে জোরে সাইকেল চালানো।
তবে একদিন এভাবে বাসায় চলে যাওয়াটা আমার জন্য রুটিন বিপদ হয়ে দেখা দিলো। এরপরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে আমার জন্য অপেক্ষা করতো। এবং আমি বের হওয়ার তোড়জোড় করতেই এগিয়ে এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতো। প্রতিদিন যে হাত ধরে বসে থাকতাম তা নয়। মূলত দুইজনের একটা কমন ইন্টারেস্টের জায়গা ছিলো কিং অভ ফাইটার ৯৭। এই গেমটা খেলতে বসলে সময় যে কোনদিক দিয়ে পার হয়ে যেতো টেরই পেতাম না। প্রথম প্রথম আমার কাছে হারলে মেয়েটি ক্ষুব্ধ হতো শুধু, কিন্তু সেটির কোনো প্রকাশ ধাকতো না। পরের দিকে বালিশ দিয়ে দমাদম পিঠে মারতো। আমিও সেগুলো ঠেকাতাম এবং আরো মারলে আমিও মারবো এমন একটা ভঙ্গি করতাম। খুনসুটিতে বেলা কেটে যেতো। এবং বেশ ক’দিন পর্যন্ত সেই খুনসুটিই শেষ হচ্ছিলো না।
একদিন বস্ এটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন। তিনি আবার কিছুটা চাঁছাছোলা প্রকৃতির কিন্তু ভালোমানুষ। সরাসরি জানতে চাইলেন, মালটাকে ঝোলাচ্ছো কেন? আমি বললাম, আমি ঝোলাচ্ছি না সে আমাকে ঝোলাচ্ছে? তখন তিনি বললেন, তুমিই বা ঝুলছো কেন? এরা বেশিদিন একদিকে আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না। সিরিয়াসলি ঝুলে পড়ো না। পরে আক্ষেপ করতে হবে। আমি বস্ ইজ অলওয়েজ রাইট নীতি মেনে চলি। এবং কেউ কিছু বললে তার সঙ্গে কি বলে নি সেটাও বুঝতে পারি। অগত্যা আবারো মেয়েটিকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা শুরু করলাম।
একদিন বললাম, বাসায় জরুরি কাজ আছে। আজ তোমার সঙ্গে যেতে পারবো না। সে চোখে বেশ অনুনয়ের দৃষ্টি ফুটিয়ে বলেছিলো, জাস্ট ফর আ কাপল অভ ম্যচেস্। ধরো পাঁচ ম্যচের একটা সিরিজ হলো। তারপর চলে যেও, প্লী-জ। আমি নিষ্ঠুরের মতো বলেছিলাম, নো। এরপরের দিন বললাম, একজন ডিলারকে কনভিন্স করতে ছুটতে হবে। আজ পারবো না। সেদিন সে কিছু না বলে মাথা নিচু করে বালিকাদের মতো এলোমেলো পাএ সামনে থেকে সরে গিয়েছিলো। ওর চলে যাওয়ার ভঙ্গিতেই বুঝতে পেরেছিলাম, হয়ে গেছে যা হওয়ার।
পরিবর্তন দেখে বস্ খুশি হলেন। একদিন আমাকে ডেকে বেশ লেকচার দিয়ে দিলেন, হƒদয় লেন-দেনের সেরা স্থান সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাস। তাছাড়া কলেজ প্রাঙ্গনও নেহায়েৎ মন্দ না। কিন্তু অফিস ভাই কাজের জায়গা। যদিও আমি জানতাম, আমরা যা করতাম সেগুলো হƒদয় লেন-দেনের বিষয় নয়। কেবলি দুষ্টামী। কিন্তু সেসব বললাম না। কি হবে কথা বাড়িয়ে। বেশ ক’দিন বিকালে কেউ ডাকতে আসে না দেখে খুশি হলাম।
কিন্তু এক সময় সেই খুশিটা মলিন হয়ে গেল। মেয়েটির সঙ্গে করা মারপিট, খুনসুটিগুলো আসলে কয়দিনের নিস্তরঙ্গ জীবনে বেশ ভিন্নতা এনে দিয়েছিলো। এখন সেটা মিস্ করছি। ভালোমতোই। ভাবলাম একদিন দুপুরে একসঙ্গে খাই। বাইরে কোথাও। এতে নিশ্চই অফিসের কারো সমস্যা হবে না। সেই ভেবে বেলা থাকতে থাকতে তার কাছে গিয়ে কথাটা পাড়লাম। মুখের ওপর না করে দিলো। শুধু তাই নয়, জানিয়ে দিলো হ্যংলা ইন্ডিয়ান জহির আব্বাস ভোলপুরি’টার সঙ্গে নাকি আগে থেকে লাঞ্চের ফন্দি আঁটা আছে। নাহলে হয়তো যেতো।
আমার খানিকটা নিজের ওপর মেজাজ গরম হলো। এই কারণেই আসলে বাঙালির কিছু হলো না। পাতলা মন। দু’দিন পর ঠিকই গলে যায়। এখন ভালো হলো না? খুব মানুষের কাছে যেচে যেচে অপমান হয়ে আসলাম গিয়ে। মনটা খারাপও হলো। স্মোকি জোনে গিয়ে পর দু’টো অগ্নিকা- ঘটিয়ে আসলাম। অফিসের চা-কফি দু’টোই ভালো। আমি দু’টো একসঙ্গে নিলাম। পরপর খেলাম। শেষ করে সিগারেটের ফিল্টার পাএ পিষে ওয়ার্করুমে ঢুকলাম। মনিটরের মাথা ঢুকিয়ে ডেটাশীট তৈরীতে মনোযোগ দিলাম। কে যেন বলেছিলো, আপনি অওকাত কাভি ভুল না মাত্। অমরেশ পুরি হতে পারে। মনে করতে পারছি না।
কাজ করতে করতে কতক্ষণ সময় পার হয়েছে খেয়াল করি নি। হঠাৎ টেবিলে পেলাম নক নক। এটা আমার পরিচিত নক। তাই মাথা না তুলেই জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে?
-দুপুরে খেয়েছেন?
না।
-কেন খান নি? আমি রাজি হই নি তাই?
না।
-এখন খাবেন?
না।
-আমার সঙ্গে বের হবেন?
না।
-আজ কি কোনো কাজ আছে?
না।
-তাহলে চলেন যাই।

কনসিকোয়েন্টলি না বলে যাচ্ছিলাম বলে শেষ না-টা নিজে নিজেই বের হয়ে গেছে। যদি খেয়াল করে বলতাম, তাহলে বলতাম- হ্যাঁ জরুরি কাজ আছে। কিন্তু এখন একটা কথা বলে ফেলেছি এবং আমি জানি মেয়েটি খুবই সেনসেটিভ। মাথা নিচু করে এলোমেলো একটা বিশেষরকম হাঁটা জানে। পেছন থেকে একবার দেখলে খবর হয়ে যায়। বেশ ক’দিন পর তার ইফেক্ট দেখা দেয়। তার আগ পর্যন্ত হালকা খচখচ করে শুধু।
মাথা তুলে তাকালাম। ওর সঙ্গে যাওয়া যাবে না কোথাও, এ ব্যপারে ডিটারমাইন্ড হয়ে গেছি। বিষয়টাকে হালকাভাবে কাটাতে হবে। আমি তাকাতেই হাত বাড়িয়ে দিলো। মুখভর্তি দুষ্টামী। ইচ্ছে হলো আমিও আজ খানিকটা দুষ্টামী করি। বললাম, আসলে যাওয়ার ইচ্ছা তো ছিলোই। কিন্তু সোনিয়া সেই দুপুর থেকে ফোন করে যাচ্ছে। ও নাকি আজ বিকেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। পুরোনো বন্ধু। কেন যে দেখা করতে চায়, জানি না। কিন্তু কথা দিয়ে ফেলেছি বস্। পারবো না। যা একটু ভাবছিলাম, তাই ঘটলো। এবং তাতে আমি কি দুঃখিত হলাম, না সুখী হলাম; বুঝতে পারলাম না। এও বুঝতে পারলাম না, আমার মনের মধ্যে এত কেন সিদ্ধান্তহীনতা? আমি তো চাইছিলামই ওর সঙ্গে বাইরে না যেতে।
সেদিন বিকেলে কোনো কাজ ছিলো না। গুলশান -২ এ একটা দোকান আছে। দারুণ শর্মা পাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই সেখানে যাই এবং শর্মা খাই। দুইটা বিফ শর্মা, একটা ফ্রেঞ্চ ডাবল ডিমের ওমলেট, সসেজ, ফ্রেঞ্চ ওনিয়ন স্যূপ আর একপ্লেট সালাদ নিয়ে খেতে বসেছি। ক্ষিদেটা লেগেছে ভীষণ। যে ছেলেটা খাবার দিচ্ছিলো তাকে বললাম, একটা লার্জ কোক দিতে। দুপুরে কিছু খাই নি।
একমনে খাচ্ছিলাম, আশপাশে কি হচ্ছে দেখি নি। হঠাৎ টেবিলে পুরোনো নক নক পেলাম। মাথা তুলে দেখি ঘটনা সত্যি। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে চোর ধরার হাসি। আমি অবশ্য কোনো কৈফিয়তের ধার ধরলাম না। বললাম, বসেন। সে বললো, তোমরা আসলে যেন কেমন। দুপুরে যখন বাইরে খেতে যাওয়ার জন্য বললে, তখন ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গিয়েছিলাম। দেখতে চাইছিলাম, রিফিউজ করলে কি করো? তুমিও আমাকে গত ক’দিনে কম রিফিউজ করো নি। ইভন আজ বিকেলেও। আর তোমাদের মধ্যে আগ্রহ বিষয়টাও কেমন জানি কম কম। আমি মিথ্যে বলছি না সত্যি বলছি, সেটা ক্রস্চেকও করলে না! দু’টো সিগারেট ফুঁকে এসে কাজ করতে বসে গেলে। এমনকি আমিও যে সারা দুপুর নিজের চেয়ারেই বসে ছিলাম সেটাও একবার মাথা তুলে দেখলে না। আমার অবশ্য এটা খুবই ভালো লেগেছে, ফ্রাঙ্কলি বললাম। সেজন্য কিন্তু বিকালে আমিই গেলাম তোমার কাছে। আর তুমি যে ত্যঁদোড় কম নও, সেটা কি আমি জানি না ভেবেছ? জানি বলেই ক্রসচেকটা করতে হয়েছে। ধরে ফেলেছি ড. ওয়াটসন। আমাকে এড়িয়ে যায়? কি সাহস!
আমি বললাম, দাঁড়ায় দাঁড়ায়েই এতগুলো কথা বলে ফেললেন? বাবাহ্। এইবার একটু মাথাটা ঠান্ডা করে বসেন। দিনভর না খেয়ে আছি। দুইভাই একটু একসঙ্গে খাই।
সে বসলো। এবং আমাকে খেতে না দেয়ার জন্য হাত ধরে থাকলো। আমি অবশ্য আরো এক দফা খাবারের অর্ডার করে অন্য হাতে কাজ চালাতে থাকলাম। এই মেয়েটি উš§াদ নয়, বদ্ধ উš§াদ। বেশি ঘাঁটাঘাটি না করে, যা চায় তা দিয়ে দেয়া ভালো।

---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!