না হলে তিনি হয়তো কান্না চাপতে চাপতে বলার চেষ্টা করতেন
যদি বলি বিষয়টা সাপোর্ট করতে পারলাম না, তাহলে হয়তো কেউ কেউ আপত্তি করবেন। গরীব মানুষ- এই জিনিসটা আমাদের সেন্টিমেন্টকে ভালোই নাড়া দেয়। একবার কোনোভাবে গরীব হয়ে পড়তে পারলেই তার জন্য সাত খুন মাপ। মাপ না হলেও সাজা কমবে অন্তত সত্তুর ভাগ। আমি গরীবিয়ানা সম্পর্কে বিষোদ্গার করতে চাই না। নিজেও সারাজীবন নিচু মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করেছি। আজো অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয় নি। তাই গরীব হলে কেমন লাগে সে সম্পর্কে একেবারে ধারণা নেই, তা বলবো না।
একটা ঘটনা মনে আছে। আমি মাঝে মাঝে ছোটবেলায় একটাকার জন্য আব্দার ধরতাম। একটাকায় এক ধরনের দুধ আইসক্রীম পাওয়া যেতো। যেটা জ্বাল দেয়া দুধ দিয়ে তৈরি করা হতো। খেতে অসাধারণ ছিলো। আব্দার করতাম আব্বু বা আম্মুর কাছে। অনেক সময়েই তারা উভয়ে ব্যর্থ হতেন। নিজের ছেলের এক টাকার আব্দার মেটাতে ব্যর্থ হলে কেমন লাগে, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। হয়তো মুল্যস্ফীতির খপ্পড়ে পড়ে সেই এক টাকার মূল্য এখন বেড়েছে। কিন্তু তাও আমি ভুলতে পারি না, একসময় এতই অবুঝ ছিলাম যে; বাবা-মা’র যে সামর্থ নেই এ সামান্য বিষয়টা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। একদিন-দুইদিন না, অনেকদিন পর্যন্ত। এজন্য হয়তো মন খারাপও করেছি। কিন্তু বাবা-মাএর দুঃখটা বুঝতে চাই নি। তাদের কেমন লাগতো, যখন ছেলে একটাকা দামি একটা আইসক্রীম খেতে চেয়েছে, কিন্তু সেটা দিতে পারতো না, তখন?
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সারাদেশেই চলছে। একটি বিশেষ সরকারী বাহিনী আছে এ কাজের জন্য। এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৪৪টি। ঐ বাহিনীর ক্রসফায়ারে ৩২ টি। এছাড়া পুলিশ-কোস্টগার্ড বিনাবিচারে মানুষ মেরেছে। পুলিশী হেফাজতে আসামী মরেছে। ঘটনা ঘটেছে অনেক রকম। এসব হয়তো সমাজ ভাঙা-গড়ার খেলা। আমাদের দেশে সিরিয়াল কিলারের উদ্ভব কিন্তু এখনো সেভাবে ঘটে নি। নেটে খুঁজলে টপ টেন ইভিল সিরিয়াল কিলার্স বা সেক্সুয়াল প্রিডেটর্স ইত্যাদি শিরোনামে ব্যপক সব লেখা/ দলিল চোখে পড়বে। সেগুলো ঘাঁটলে আমাদের রসু খাঁ’কে নেহায়েতই শিশু মনে হয়। তবে সিরিয়াল ক্রাইম কিন্তু বাড়বেই। এ ধরনের ক্রিমিনাল ধীরে ধীরে আরো উঠে আসবে। সমাজে অসহিষ্ণুতা যত বাড়বে, তত এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।
দুইটা ঘটনা ছিলো ভয়াবহতার শীর্ষে। রুমানা মঞ্জুর আর ভিকারুন্নিসার ঘটনা দু’টির কথা বলছি। দুইটাই বিকৃত মানসিকতা আর সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। শহরের পোলাপান ছোট থেকে বড় হচ্ছে বদ্ধ পরিবেশে। কৈশোরকালের শুরুতে তাদের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য যে জিনিসটি রয়েছে, তা হলো ইনসেস্ট কাহিনীতে ভরা পর্ণ বই। আজকাল এসবের কমিক খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। পর্ণ সিডি, পর্ণ চিন্তা, পর্ণ প্রভাবিত শরীরবৃত্তিয় জ্ঞান- এসব দিচ্ছি আমরা কিশোরদেরকে জীবনের প্রথম উপহার হিসেবে।
অসহিষ্ণুতা জন্ম নিতে এমন একটা রোগই যথেষ্ট। এ থেকে মানুষের ভেতর আত্মকেন্দ্রিক ফ্যান্টাসী গড়ে ওঠে। নিজে নিজে যৌনতার নামে নিজের ওপর চালানো অত্যাচার নানাভাবে কাজ করতে থাকে মাথায়। হলো একটা ক্ষতি। এরপরে আছে মাদক। অসুস্থ যৌনাচারে অভ্যস্ত সেই কিশোরটিকে কৈশোরকাল উত্তীর্ণ হবার আগে বা পরে- যেকোন একটা সময় আমরা দিচ্ছি আরেকটা গিফট্। মাদক। গাঁজাই সম্ভবত কিশোরদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। কেননা নিয়মিত ফেন্সিডিল কেনার সামর্থ্য আমাদের পুরো কিশোর সমাজের গড়ে ওঠে নি এখনো। হেরোইন তো সামলানো সম্ভব না। সেক্ষেত্রে গাঁজা, বাংলা মদ এগুলো হচ্ছে কিশোরদের ব্যবহারের জিনিস। আর এসব নিয়েই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে তারা।
এদের কাউন্টার পার্ট অর্থাৎ মেয়েরা, তারাও স্বাভাবিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না কখনো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলে সামাজিক অবক্ষয়ের দায়ভার তাদের খুব একটা নিতে হয় না সত্য। যে কারণে খুঁজলে নারী ক্রমিক খুনী পাওয়া যায় অনেক কম। কিন্তু ওদেরকে ভূমিকা খুব একটা রাখতে হয় না, এ কথা ঠিক নয়। ছেলে-মেয়ের স্বাভাবিক মেলামেশার পথ অবরুদ্ধ নানাবিধ ভ্রান্ত সামাজিক ‘স্টিগমা’র কারণে। মানুষ অচেতন থেকে যাচ্ছে। সেভাবেই বেড়ে উঠছে। প্রজন্ম ধরে ধরে ক্ষতি হচ্ছে জাতির।
যে কারণে পরিমলদের পক্ষ নেয়ার মতো মানুষ সমাজ হাতড়ালে পাওয়া যায়। পরিমল সমাজের একটা বিচ্ছিন্ন অংশ। এমন পরিমল পৃথিবীর সবচে উন্নত সমাজেও পাওয়া যাবে। কিন্তু পরিমলের পক্ষ নেয়ার লোকের সংখ্যার তারতম্য, আপনাকে নিজের জাতিগত উন্নতির ইনডেক্সটি দেখাবে। নিজের আশপাশে তাকান, ইনডেক্সে কি দেখা যায়?
আর সাঈদ আসলে নরপশু ছিলো ভীষনরকম। এমন মানুষ হয়। আমাদের চারপাশে দুর্লভও নয়। খালি ঘটনাটা ঘটায় না। আর সবই করে। মধ্যরাতে বউ পিটিয়ে কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে, চিৎকার শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখি ‘বাথরুমে পড়ে গেছে’ এই দাবি জানাচ্ছে তার পরিবারের লোকজন। আমি 'দুর্ভাগ্যবশত' নামে একটা কিছু লিখেছিলাম একবার। এছাড়া ব্যাড প্রিসলি আর অ্যালিসন ক্রস্-এর হুইস্কি লুলাবাঈ নামে গানও আছে। সেটা ভালোমতো শুনলেও কিন্তু এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ব্যটাকে আজ এ পরিণতি মেনে নিতে হয় না।
তবে রুমানা মঞ্জুর বা ভিকারুন্নিসার ঘটনায়ও এতটুকু শান্তি হয়তো আপনি চাইলে খুঁজতে পারেন যে, আসামী ধরা পড়েছে। বিচার হবে। বিচারে তাদের সাজা হবে। যদি সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে সাজা ঠিকমতো নাও হয়, তবুও অপরাধী হিসেবে তাদের কপালে অঙ্কিত মোহর দেখে তাদের চিহ্নিত করা যাবে সহজেই। একবার পরিচয় বেরিয়ে পড়লেই ঘৃণা ছাড়া আর কিছু বের হবে না এদের জন্য। বেঁচে থাকলেও এ থেকে মুক্তি নেই এদের কারোরই। তবে আমি দু’জনের মৃত্যূ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ব্যবস্থা করার পক্ষে। এই লেখাটা লিখছি কারণ আমি সমাজকে সঠিক পথে দেখতে চাই। যেখানে অপরাধীকে শাস্তি পেতে দেখে আরেকজন অপরাধকে ছেড়ে দেয়। কেননা তার ধারণা জন্মায়, অপরাধীর জীবন কখনোই কোনো মানুষের কাম্য নয়।
কিন্তু মন পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে, যখন ওরা বন্ধুরা গাঁজা খেতে গিয়ে গণপিটুনি খেয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসে আমার কাছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি এতে করে যদি সত্যিকারের ডাকাতেরাই মারা যেতো, তাহলেও না। ডাকাতেরা এর আগে মানুষের, বলতে হবে গরীব মানুষের সারাজীবনের ধন লুটপাট করেছে, তাদের সোমত্ত বউ-ঝি’দের টান দিয়েছে, অনেককে মেরেছে-কেটেছে- ওদের ব্যপারটাই ভিন্নরকম; তাও।
আর এই যে আজ ছয়টা পুরোদস্তুর ছাত্র বিনাবিচারে মরে গেলো গণপিটুনিতে, এর জবাব কে কিভাবে দেবে? এমনকি ছাত্র বলেই ওদের পক্ষে সম্ভব, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মধ্যরাতে নদী তীরে বসে ফুরফুরে বাতাসে কয়টা স্টিক বানিয়ে তাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টান দেয়া। এইটুকু অপরাধের এত বড় শাস্তি! লেখার শুরুর দিকে গাঁজার ক্ষতিকর দিক নিয়ে কথা বলেছি। তাই ঐ ছেলেদের এ কাজটিকে আমি অপরাধ হিসেবেই মানলাম।
বলা হয়ে থাকে, আইনের ফাঁক গলে নয়জন অপরাধী বেরিয়ে গেলেও অসুবিধা নেই, কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না ভোগ করে। এটা আসলে অনেক দিন থেকেই একটা ফ্রিক কথা হয়ে আছে আমাদের দেশে। চূড়ান্ত রূপ বোধহয় আমরা এই শবেবরাতে দেখলাম।
আমিও সারারাত বাইরে ছিলাম। বনানী কবরস্থানে গিয়ে দেখেছি বন্ধুরা আত্মীয়-স্বজনের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেছে। মসজিদে, রাস্তায় টুপি-পাঞ্জাবী পড়া ছেলেদের ভীড় ছিলো। রাস্তায় মোটরসাইকেল অনেক কম ছিলো। শহরের একরাত্তিরের নামাযি পোলাপাইনদের ভেতরে শবে বরাতের মুডটাই ছিলো বেশি। উগ্রতার প্রবণতাটা কম ছিলো।
অথচ মসজিদে নামায পড়ছিলো যেসব ময়মুরুব্বী-চাচা-নানারা, যুবক বয়সী প্রকৃত মুসল্লীরা, যারা হয়তো প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত করে করে নামায পড়ে; তারা মাইকে ডাকাত পড়েছে শুনে লাঠি-সোটা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো! কিভাবে সম্ভব? উগ্র হওয়ার কথা কাদের, হতে দেখলাম কাদের?
শবেবরাত। কি অপার স্মৃতিময় একটা বাৎসরিক উপলক্ষ! একেক বছর শবেবরাতের রাতে একেক রকম প্ল্যান থাকতো। রাতভর নামায, দৌড়ঝাপ, মৌজ-ফূর্তি সবকিছু চলতো। রীপা সেবার রোমেলের প্রস্তাবে সাড়া দেয় নি বলে, শবে বরাতের রাতে ওদের থাই গ্লাস ঢিল মেরে ভেঙ্গে দিলাম। ইয়া আধলা এক ইটের টুকরা। ঐ এক ঢিলেই ওদের দু’জনের প্রেম হয়ে গিয়েছিলো। খুব কপালটা ভালো, যাদের সঙ্গে আমার শবেবরাতের রাতগুলোয় দেখা হয়েছে ওরা সবাই মানুষ ছিলো। জানোয়ার ছিলো না। নাহলে আমার মা হয়তো কোনো একদিন কান্না চাপতে চাপতে বলার চেষ্টা করতেন,
“সকালে সাড়ে পাঁচটার দিকে ছেলের মোবাইলে ফোন করি, ওপাশ থেকে থানার পুলিশ জানায়; আপনার ছেলের বিপদ হইসে, থানায় আসেন। সেই বিপদ মানে যে থানায় গিয়ে আমার ছেলের ডেড বডি দেখতে হবে বুঝি নাই।”
আমার নিজের যায় নি। তারপরও বেদনা টের পাই। তাই চাই আর কারো যেনো এভাবে না যায়। এরচে’ বেশি কিছু তো করার নেই। প্রথমেই একটা কথা বলেছিলাম। গরীব হতে পারলেই সাত খুন মাপ। এই ছেলেগুলোকে এভাবে পিটিয়ে মারার পরেও গ্রামের গরীব মানুষদের বিপক্ষে কেউ জোর গলায় কিছু বলছে না। সবাই চোরের মতো মুখ করে বলছে, সেখানে খালি ডাকাতি হয় আর ডাকাতি হয়; লোকজন তাই খুব ক্ষেপে ছিলো।
ব্যস্? লোকজন ক্ষেপে ছিলো বলে এরকম ছয়টা জলজ্যন্ত মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে?
পাঁচ-ছয়শ’ অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে মামলা হয়েছে। কোনো একদিন অপরাধী ধরা পড়ে শাস্তির মুখোমুখি হবে সেই আশা খুবই ক্ষীণ। ভীষণ খারাপ লাগছে। নিজের জন্য। এ কি ভয়ংকর সময় পড়েছে চারপাশে?
---





এই একটা জিনিষ সবসময় লক্ষ্য করেছি ঢাকায়। সবার মনে ভয়ানক একটা রাগ। কোন না কোন ভাবে আরেকজনকে একটু ধাক্কা দিতে পারলেও যেন ফ্রয়েডীয় পুলক পাওয়া যায়। গনপিটুনি সেই মানসিকতা থেকেই আসে। ভীড়ের মধ্যে মিনিট খা্নেকের জন্য হলেও নিজের অক্ষমতা ভুলে এবং পরিচয় লুকিয়ে নারায়ে তাকবীর বলে ঝাঁপায়ে পড়া যায়। কে কে মেরেছে জিজ্ঞেস করতে যান, একটা লোকও যদি বলে, নাম বদলায়ে রাখবো। এই হলো মূলোবোধের মাত্রা।
আসলে মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই যেখানে নেই, সেখানে মূল্যবোধের আশা বাতুলতা। সেদিন একটা ছেলে অসুস্থ মা'কে হসপিটালে দেখতে গিয়ে মাথায় কনস্ট্রাকশনের ইট পড়ে মরে গেল। অবশ্য এই ধরনের দুর্ঘটনার সঙ্গে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলার বীভৎসতাকে তুলনা করা যায় না। তবে এ ঘটনাগুলো (যেখানে একটা সর্বনিম্ন সম্ভাবনাও কাজে লেগে যায় এবং মানুষের প্রাণসংহার ঘটে) সমাজে নিষ্ঠুরতাকে বৈধতা দেয়ার কাজটি করে। যেমন ৬ সংখ্যাটিকে কিন্তু এখন ততটা ক্ষতিকর মনে হচ্ছে না। কারণ ক'দিন আপনি আরেকটা সংখ্যা পড়েছেন ৪৪। দুইটাই নিরপরাধ মানুষের লাশের সংখ্যা।
মসজিদে ডাকাত পড়ছে সবাই আসেন ঘোষণা দিয়ে তারপর গনপিটুনি। এই হচ্ছে শবে বরাতের রাত। ভাবা যায়!
আমাদের সহ্যক্ষমতা, চিন্তাশক্তি, হিতাহিতজ্ঞান- এসব কমতে কমতে কোথায় পৌঁছেছে সে সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যায়। বলা যায় আমরা এখন পাশবিক হয়ে উঠেছি। টিকে থাকার জন্য যেকোন কিছু করতে পারি। বাঁধে না কোথাও।
এই পিচ্চি ছেলেগুলা ডাকাত!!! বুইড়া ব্যাটাদের তাই মনে হইল? শবে বরাতের রাতে মানুষ/ ডাকাত খুন করে বেহেস্তের টিকেট কিনছে। এদের কারো বিবেক তাড়না করে পুলিশের কাছে আনবে না ফেলবে না, বলবে না ভাই আমি অপরাধ করেছি, আমাকে শাস্তি দাও। এরা কিভাবে স্বাভাবিকভাবে খাবে-ঘুমাবে? রাতের বেলায় সেই ছেলেকটির মুখ তাদের স্বপ্নে ধাওয়া করবে না? নাকি পরের শবেবরাতের রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেই হয়ে যাবে?
টিভিতে কথাগুলো শোনার সময় ভাবছিলাম, আমার পরিবার কতোটা নিরাপদ। আজ এই ছেলের মা কাঁদছে কালকে কার মা তারপরদিন???? ৪৪টি লাশের ঘা না শুঁকাতেই আরো ছটি
পরের শবেবরাতে ক্ষমা চেয়ে নেবে। সে সময় হয়তো যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করবে, নিজের সহায়-সম্পদ, বউ-বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে কাজটি করেছি। মাফ করে দিও পরওয়ারদেগার। কিন্তু কাজটি না করলেও যে সহায়-সম্পদ, বউ-বাচ্চার কোনো ক্ষতি হতো না এবং করার পর এখনও যে ওগুলো নিরাপদ নয়- সেটি ভাবার দরকার মনে করবে না।
আসলে চিন্তাগুলো এমনভাবে সেট করা যে, কোনোক্রমেই বিবেকের দংশনের মুখে পড়তে হয় না। যা করছি করছি, এখন আর বিবেকের দংশন সহ্য করে কি লাভ?- এমন চিন্তা নিয়ে আবারো ঘরসংসার শুরু করবে পশুগুলো।
হুম।গরীব হলেই সাতখুন মাপ হয়না।আর এখন যে সময় তাতে এখন কেউ আমরা আর নিরাপদ না।মানুষ এখন এক বিশাল অংশে নিষ্ঠুর।সহ্য ক্ষমতা নাই কারো।আছে শুধু ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা।কয়েকদিন পর সব ভুলে আবারও নতুন করে কিছু একটা ঘটাবে।তা নিয়ে চলবে ঘরে বাইরে হাহুতাশ।তারপর সব আবার আগের মত।ভাল লাগেনা।
গরীব হলে সাত খুন মাপ হয়, এবং সেটি যে সুনির্দিষ্ট একটা ক্ষেত্রে হয়েছে; সে ব্যপারেই এখানে আলোচনা হয়েছে। এর বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় নি। আমার কথা হচ্ছে, গরীব হলে মাপ হয় না- এ কথাটা আসবে কেন? আইন গরীব-ধনী কাউকে অন্যায় সুবিধা দেয়ার কথা চিন্তা করে বানানো হয় নি। তাহলে এখানে গরীব বলে এক ধরনের সমবেদনা দেখানো হচ্ছে কেন অপরাধীদের প্রতি?
খুবই ভয়াবহ ঘটনা। আমার ভাইয়ারা দেখতাম ছোটবেলায় শবে বরাতের নামাজ পড়তে মসজিতে যেত আর পরদিন খুব মজা করে গল্প করতো কার বাসা থেকে ডাব চুরি করেছে এইসব। ওদের চুরির তালিকায় ডাবই ছিল কারন ঢাকা শহরে অন্য কোন গাছএর প্রাচুর্য্য ছিল না। কিশোর বা কিশোর উর্তীণ ছেলে মেয়েরা একটু এডভেঞ্চার প্রিয় হয় তাই বলে আমরা এত অস্থীর হয়ে গেছি যে বাচ্চাগুলিকে ঠিকভাবে না দেখেই মেরে ফেলব শুধু মেরে ফেলা নয় প্রাগঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার পিটিয়ে মেরে ফেলা। কী পরিমান কষ্ট তাদের হয়েছে। উহ্ অকল্পনীয়।
একটা ঘটনা বলি। মাস খানেক আগে আমাদের গ্রামে একদল ডাকাত ধরা পড়ে তারা সবাই কলেজের ছাত্র। বয়স ২০থেকে ২২। তারা পুলের উপর দাঁড়িয়ে হাটের দিনে করে হাটুরের সর্বস্ব নিয়ে নিত আর তাকে বেঁধে ফেলে রাখত। যদি কেউ গাইগুঁই করতো তবে তাকে ছুরিকাঘাত ও করতো।
এরা ধরা পরার পর বুঝা যায় এদের সাথে পুলিশ ও জড়িত। পরে ম্যাজিট্রেট, ব্যাব, পুলিশের বিশাল বাহিনী এসে ওদের নিয়ে যায়।
পুলিশও জড়িত থাকে ডাকাতদের সাথে আর এই বয়সের ছেলেরাই সাধারনত ড্রাগ কিনবার পয়সার জন্য এই কাজে জড়িয়ে যায় এই অনিশ্চয়তা থেকেই গ্রামবাসীর এই আগ্রাসন।
তবে মানুষ মানুষকে আঘাত করে আনন্দ পায় এটা চিরন্তন সত্য, সেই থেকেই এই হত্যাকান্ড। সেই গ্রামে কি একটিও স্বাভাবিক বুদ্ধির মানুষ নেই যে ওদের অমানুষদের হাত থেকে বাঁচাতে পাড়তো।
পেশাদার ডাকাতেরা কিশোর বয়সী হয় না। যারা নেশার টাকা জোগানোর জন্য নয়, সংসার চালানোর জন্য ডাকাতি করে তাদের কথা বলছি। কিন্তু তারাও যদি গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলার পক্ষে আমি নেই। তারপরও অপরাধী হাতে নাতে ধরা পড়লে সেই স্পটে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। যেমন কেউ যদি দেখে ডাকাত তার বাড়িতে ঢুকে তার সব সহায়-সম্পদ লুট করে, মেয়েকে ধরে নিয়ে চলে যাচ্ছে তখন সে প্রতিরোধ করতে পারে। সে অবস্থায় ঐ ডাকাতকে মেরে ফেললেও বিষয়টা অতোখানি বীভৎস হয় না, যেটা নদীর পাড়ে বসে থাকা অবস্থায় ডাকাত সন্দেহে কয়েকজনকে পিটিয়ে মেরে ফেললে হয়।
যেকোন ধরনের অনিশ্চয়তা'ই পেছনের কারণ হতে পারে, কিন্তু সেজন্য এই আগ্রাসন গ্রহণযোগ্য নয়।
ছয়টা তাজা তরুণের লাশ!! এরপরও লোকগুলো আরামে ঘুমাবে ?
আরামে ঘুমাবে মানে? বংশবৃদ্ধি পর্যন্ত করবে। বিবেক বলে কোনোকিছু থাকলে তো প্রথম কাজটা করতেই বাধতো, তাই না?
কী বলবো ? ছেলেটা বড় হচ্ছে... ভয় হয়, ভয়ে থাকি সবসময়। আল্লাহ ছেলেগুলোর বাবা-মাকে শোক সইবার শক্তি দিক।
সমস্যার একটা ভালো সমাধান হচ্ছে ছেলেকে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলা। টেক্সট বইএর কথা বলছি না। সব ধরনের বই, প্রচুর পরিমাণে। আর খেলাধুলার সুযোগ থাকতে হবে পর্যাপ্ত। এবং সেটা শুধু কম্প্যূটারে থাকলে চলবে না, মাঠে খেলার সুযোগ দিতে হবে।
মন্তব্য করুন