ইউজার লগইন

তোমাকে নিয়ে কোনো গান লেখা হয় নি চেষ্টা করেছি বহুবার

আজকাল মনে হয় আমি একা একাই নায়াগ্রায় চলে এসেছি। উঁচু পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটছি। একা, ওক গাছের সারির ভেতর। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা খড়িগুলো দেখলে অনেক লোভ হয়। কিন্তু তুলি না। প্রকৃতি সম্ভবত অপচয় পছন্দ করে না। হাঁটার সময় পড়ে থাকা খড়ি তুলে লাভ নেই। শক্তির অপচয়। সন্ধ্যা নামার পর খড়ি খুঁজতে বের হতে হয়। মোটা ধরনের একটা বা দু'টো ডাল হলেই সারারাতের চিন্তা শেষ। আর কিছু শুকনো পাতা। পাতা পাওয়াও যায় প্রচুর পরিমাণে। আমার একটা ঝুড়ি থাকলে ভালো হতো। কিন্তু সেটা নিয়ে হাঁটাহাটি করাটা খানিক কষ্টের হতো। তারপরও পাতা কুড়ানোর সময় প্রতিদিন একবার ঝুড়ির অভাব অনুভব করি।

তুমি কি দেখতে পাও আমাকে? আমার সবকিছুই ঠিক-ঠাক আছে। শুধু আমি আর থামতে পারছি না। তুমি দেখতে পাচ্ছো? আমি হেঁটে হেঁটে ক্রমাগত দূরে চলে যাচ্ছি। আমি জানি তুমি টের পাচ্ছো। হয়তো হৃদয়ে তোমারও চলচ্ছে ক্ষরণ, অবিরাম। কিন্তু, এই দূরে সরে যাওয়া ছাড়া আমাদের যে আর কোনো উপায় নেই। আমি জানি, এই কথাটা তুমিও জানো।

আমি যখন পেছন ফিরে তোমাকে দেখতে চেষ্টা করি, তখন একটা ছোটবেলার দৃশ্য দেখতে পাই জানো? দেখি তুমি একটা আকাশি রঙয়ের ফ্রক পড়ে বাগানে ফুল তুলছো। তোমার বাহুতে একটা ছোট্ট ঝুড়ি। বেতের ঝুড়ি। বাদামি রঙয়ের। আমি তোমাকে দূর থেকে বহুবার ডাকার চেষ্টা করেছি। তুমি টের পাও নি। মাঝে মাঝে সচকিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছো শুধু, কিন্তু পরক্ষণেই মনের ভুল ভেবে আবারো ফুল তোলায় মন দিয়েছো। এত দূর থেকে আমার ডাক তোমার কাছ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাতে পারে নি শেষ পর্যন্ত।

মানুষের মনে বেশি শক্তি থাকে, নাকি শরীরে? আমি মন থেকে তোমাকে মুছতে পারি নি। কিন্তু শরীর থেকে তোমাকে মুছে ফেলেছি। তাই হাঁটার সময় আমার পা দু'টো বিদ্রোহ করে না একবারও। সামান্য ব্যথাও না। কিন্তু বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়। শুকনো ধারালো ওক গাছের ডাল দিয়ে তৈরি খড়ির মতো একটা কিছু বিঁধে আছে সেখানে। অথচ আমার পা দু'টো কখনো বিশ্রাম নিতে চায় না। শুনেছি প্রচুর রক্তক্ষরণে নাকি মানুষ একসময় নিশ্চল হয়ে পড়ে। আর কতো রক্ত ঝরার পর আমার সঙ্গে ব্যপারটি ঘটবে?

তোমাকে নিয়ে কোনো গান লেখা হয় নি চেষ্টা করেছি বহুবার

হ্যাঁ, তোমাকে নিয়ে কোনো গান লেখা হয় নি, কখনোই। একটা গান লিখতে পারলেও হয়তো ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ পেতাম কোথাও। আজকাল মাঝে মাঝেই ঠান্ডা বাতাসের জন্য আকুল হয়ে উঠে বসে থাকি। নির্ঘুম রাত কাটে। একটুখানি ঠান্ডা বাতাসও ভেসে আসে না কোনো দিক থেকে। ক্লান্তিরা একসময় কালিগোলা অশ্রু হয়ে ঝরে যায়। তবু জেগে থাকি। যখন তুমি জানবে যে, তোমাকে বরাদ্দ জীবনের শেষ সেকেন্ডটিও গিলতে হবে, কোনো নিস্তার নেই; তখন ঠায় বসে সময় কাটানোটা তোমার জন্য কঠিন বিষয় থাকবে না আর। আমি এখন যেকোন হাইওয়ের ধারে, নিওন সাইনের নিচে, এয়ারপোর্টের মাঠে দীর্ঘ সময় ঠায় বসে থাকতে পারি। আমার কোনো অসুবিধা হয় না।

আমি জানি তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাও না। তুমি ডুবে আছো তোমার শাক, মাছ, মরিচের হিসাবে। তোমার ব্যাংক, তোমার টেবিল, তোমার চেয়ার তোমাকে একটা ধ্রুব হাতছানির ভেতর বন্দি করে রেখেছে। তুমি সেখান থেকে বাইরে তাকিয়ে ঝাপসা কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাও না। কিংবা কে জানে, হয়তো দেখতে চাও না। কিন্তু তোমার জানা নেই, আজ চেষ্টা করেও তুমি আমায় আর দেখতে পাবে না।

আজ মুক্তি যখন শাদা শান্তির পায়রা হয়ে তোমার ঘুলঘুলিতে বাসা বেধেছে; তখন তুমি তার দিকে তাকানোর সময় পাচ্ছো না। তোমার জীবনটাকেও আমার মাঝে মাঝে কষ্টেরই মনে হয়। আমি এখন আর চোখ বন্ধ করে তুমি কি করছো, সেটা দেখতে পাই না। এটা এক সময় আমাদের একটা মজার খেলা ছিলো মনে আছে? তুমি ফোন করে আমাকে বলতে, ‘চোখ বন্ধ করে দেখার চেষ্টা করো তো আমি এখন কি করছি? দেখি পারো কিনা?’

তারপরও প্রতিদিন ভরসকালে সূর্য যখন আমায় ঘুম থেকে ডাকাডাকি করে জাগিয়ে তোলে, তখন আমার চোখের ওপর তোমার মুখের একটা ছায়া পড়ে। দিনে এই একটা ঘটনাই আমাকে আনন্দ দেবার জন্য ঘটে। আমি আরেকটা দিন পাড়ি দেবার মানসিক শক্তিটুকু খুঁজে পাই। বুঝতে পারি মানসিক শক্তিটাই বেশি থাকে আমাদের। মনটাকে সহ্য করতে হয় কতকিছু, আর শরীরটাকে সহ্য করতে হয় সামান্য পথচলার পরিশ্রম।

নিরাপত্তার জন্য আগুন না জ্বালাতে হলে আমি বোধহয় বেশি খুশি হতাম। আগুনের সামনে বসে থাকলে এসব চিন্তা অনেক বেশি মাথায় আসে। একেক সময় তো মস্তিষ্কের নিউরণগুলোয় বাজতে থাকে বিচিত্র সব সুর। সেদিন একমনে সুক্ষ্ণভাবে খেয়াল করে দেখলাম, আমার নিউরণে বাজছে-

এই বুড়ো পুরোনো গিটার, দিয়েছে তোমাকে দিয়েছে,
এলোমেলো কতসব অন্য লোকের গানে তোমাকে কাছে টেনে নিয়েছে...।

---

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


শিরোনাম এবং লেখায় ব্যবহার করেছি প্রিয় গায়ক অঞ্জন দত্তের গান। তার প্রতি সর্বৈব কৃতজ্ঞতা।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


মাঝে মাঝে কাউকে কাউকে অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করে
আবার বলতে গিয়েও শেষে দেখা যায়
কিছুতেই কিছু বলা হয় না।

আপনি এইসব
না বলা কথার তোড়ে এতটাই ভাল সার্ফার হয়ে উঠেছেন,
এখন আপনার ডাকে জলে পায়ের পাতা ভেঁজাতেই
আপনাতেই ভেসে যেতে হয়!

ভাল থাকুন, অনেক ভাল। সবসময়।

ফাহমিদা's picture


মনের গোপন কথাগুলো এত সুন্দর করে কিভাবে লিখে ফেলেন ভাইয়া ? খুব সুন্দর হয়েছে লেখা সবসময়ের মতোই....

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আপনার ভাষার বুনন অসাধারণ ! চমৎকার প্রকাশভঙ্গি পাঠককে চুম্বকের মতই আটকে রাখে।
খুব ভাল লাগলো আজকের পর্ব।

নাজনীন খলিল's picture


চমৎকার! অপূর্ব! অসাধারণ!

আরাফাত শান্ত's picture


এই লেখাটা মোবাইলেই পড়ছিলাম করা হয় নাই কমেন্ট। করে দিলাম আজ।
প্রিয় শিল্পী সুমন অঞ্জন
মীর ভাইয়ের লেখা ব্লগে আপনজন।> Big smile

তানবীরা's picture


চমৎকার! অপূর্ব! অসাধারণ!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!