ইউজার লগইন

অসমাপ্ত বাস্তবতা... ৯

রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে এ ক'দিনে অসংখ্য লেখা পড়া হলো। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে অনেক খবরই দেখলাম। বিচার-বিশ্লেষণে যেতে চাচ্ছি না, কিন্তু বিষয়টিকে আর পাঁচ-দশটা স্বাভাবিক ইস্যূর মতোই নিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। কোনো কোনো দিন রোহিঙ্গা গণহত্যার খবর বিবিসির লিড হচ্ছে, আবার খানিক পরেই ওটা নেমে যাচ্ছে। উঠে আসছে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো খবর। সিএনএন, আল-জাজিরারও একই অবস্থা। মানুষের প্রাণের মূল্য কতোটা কমে গেলে গণহত্যার মতো একটা বিষয়কে পাশে সরিয়ে রেখে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংবাদ নিয়ে অধিক মাতামাতি হতে পারে?

দেশিয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রথম পাতায় রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে খবর ছাপা হচ্ছে প্রতিদিন। আমি কল্পনায় দেখতে পারি, নিউজরুমগুলোতে সন্ধ্যার ব্যস্ততায় হয়তো কোনো ভারিক্কি নিউজ এডিটর বা সিনিয়র সাব-এডিটর হাঁক দিচ্ছেন আজ রোহিঙ্গাটা কে করছে? কোনো এক জুনিয়র হয়তো কম্পিউটারের মনিটর থেকে মাথা তুলে উত্তর দিচ্ছে, আমি ভাই কিংবা আমি আপা। আমাদের গণমাধ্যমগুলো চলে কিছু ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্য দিয়ে। ক'বছর কাজ করলে সেসব কাজ সম্পর্কে কাজ চালানোর মতো জ্ঞানার্জন কঠিন কিছু নয়। এমনকি একটা মিডিয়া চালিয়ে নেয়ার মতো জ্ঞানার্জনও সম্ভব। শুধু চোখ-কান খোলা রাখলেই সম্ভব। কিন্তু আমার মনে হয়, যাদের চোখ-কান খোলা রাখা সবচেয়ে বেশি দরকার সেই সংবাদিকদের চোখ-কানই সবচেয়ে বেশি বন্ধ আজ। তাই গণহত্যা, ক্রিকেট খেলা, সিনেমার নায়িকারা কে কোথায় সেলফি তুললো আর গরুর মাংস কিভাবে ভুনা করলে খেতে কেমন লাগবে- এই সব নিয়েই আজকালকার পত্রপত্রিকা ভরা হচ্ছে দেদার। সরকারের লোকদের মধ্যে আছে ওবায়দুল কাদের আর বেসরকারী লোকদের মধ্যে আছে ফখা ইবনে চখা। এই ফর্মূলায় দেশে প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে শত শত প্লেট। মুদ্রণযন্ত্রের ভেতর দিয়ে সেই প্লেট থেকে প্রিন্ট হয়ে আসছে লক্ষ লক্ষ ব্র্রডশীট। কানাকড়িও মূল্য নেই সেই কোটি টাকার বিনিয়োগের। প্রতিদিন দেশের সংবাদিক সমাজ উৎপাদন করছেন কোটি কোটি শব্দ। কিন্তু বিশাল এই সমাজের উৎপাদন কোনো কাজেই লাগছে না দেশের। প্রায় ফেসবুকের মতো একটা জিনিস। আমরা প্রচুর সময় ব্যায় করি এখানে, কিন্তু কাজ হয় না এক ফোঁটাও। গণমাধ্যমেও আমরা প্রচুর লগ্নি করেছি, কিন্তু কি কাজ হচ্ছে? আমাদের দেশে কি গণমাধ্যম আসলেই কোনো কার্যকর ভূমিকায় আছে? কোনো সামাজিক উন্নতি ঘটিয়েছে? মানুষকে কোনোকিছুতে সচেতন করতে পেরেছে? জনমত গড়ে তোলায় কখনো গঠনমূলক কিছু করতে পেরেছে?

২০১৩ সালে ফেব্রুয়ারিতে যখন দেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত 'রাজাকারদের' সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে উত্তাল, সে সময়ও গণমাধ্যমের
মূল ভূমিকা ছিল দ্বিধা ছড়ানো। এক পত্রিকায় খবর আসছে শাহবাগে গণজোয়ার দানা বাঁধছে তো আরেক পত্রিকায় খবর আসছে শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। সব পত্রিকা আবার স্ট্যান্ডে সাজানো থাকছে পাশাপাশি। মানুষ যারা স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বা চলার পথে এক পলক পত্রিকাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে, তারা জানেও না কত গোপনে তার মনটা টুইস্ট হয়ে গেল। দু'টো পরস্পরবিরোধী শিরোনাম তার মাথায় ঢুকে গেল, এখন তাকেই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে যে আসলেই কি হচ্ছে শাহবাগে! অথচ পত্রিকাগুলোর দায়িত্ব ছিল সত্যটাকে কোনো দুধ-চিনি না মিশিয়ে কাঁচা সত্য হিসেবেই তুলে আনা। টিভি চ্যানেলগুলোর দায়িত্ব ছিল একদল টক-শো পেশাধারী বুদ্ধিজীবী না গড়ে, নিজেদের কন্টেন্ট আর কোনদিকে ডেভেলপ করা যায় সেদিকে মন দেয়া। কিছুতেই কিছু হয় নাই। আমরা পড়ে রয়েছি অন্ধকূপেই।

তাই আজও রাজধানীতে খোলা হাওয়ায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীর চর্চা করতে পারি না আমরা। গার্হস্থ্য অর্থনীতির বইয়ে মেয়েদের বলা হয়, মেয়ে তুমি আরও বেশি মেয়ে হয়ে নিজের মেয়ে জন্মকে ঘেন্না করো। নিজের আত্মসম্মানকে বাড়তে দিও না আর। আমরা ভাল কোনোকিছুই গ্রহণ করতে পারি না। রোহিঙ্গারা আসছে তাদের সর্বস্ব হারিয়ে, আর আমাদের লোকজন তাদের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিচ্ছে অবলীলায়। যেন কিছুতেই ওদের কিছু যায় আসে না। নিজের মা-বাবার সাথে একই ঘটনা ঘটলেও ওদের নিষ্ঠুর চোখের পলক পড়বে না।

আসলে আমার একান্তই ব্যক্তিগত একটা মত হচ্ছে, আমরা জাতিগতভাবে ভীষণ অপরাধপ্রবণ এবং ধূর্ত। সুযোগের অভাবে আমাদের অনেকেই হয়তো ভাল মানুষ, কিন্তু সত্যিকারের পরীক্ষায় আমাদের খুব কম লোকই পাশ করবে। এর পেছনে অবশ্যই অনেক কারণ আছে। দারিদ্র, বেকারত্ব, অশিক্ষার মতো প্রকৃত সমস্যা যেমন আছে, তেমনি ঈর্ষা, লোভ, কাম- ইত্যাদির মতো চিরকালীন মানবিক সংকটও আছে। এই সব নিয়েই আমরা টিকে আছি। যদিও সময়ে সময়ে বোঝা যায়, এই টিকে থাকা অনেকাংশেই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক মোড়ল গোষ্ঠীর ওপর।

মোড়ল গোষ্ঠীকে সিরিয়া কিংবা ইরাক ধ্বংস করতে যে কষ্টটুকু করতে হয়েছে, আমাদেরকে ধ্বংস করতে তার কিছুই করতে হবে না। সামান্য মিয়ানমার চাইলেই যে আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তাকে কতোখানি কাঁচকলা দেখাতে পারে, সেটা এখন সবার চোখের সামনে। ওদের দেশের সংকটকে চাইলো তো আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিলো। বাংলাদেশ চাইলে কি পারতো নিজেদের কোনো সমস্যাকে এভাবে সীমানাছাড়া করতে?

আমরা খুব খারাপ আছি। এই খারাপ থাকাকে ফ্র্যাব্রিকেটেড করে ফুটানি করছি। এরকম চলতে পারে না। কিছু একটা করা জরুরি। ভীষণ জরুরি বুঝছেন? বুঝতে পারলে শুরু করে দেন কিছু একটা করা। নাহলে সবাইকে নিয়ে ডুবতে হবে অবধারিতভাবে।
---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.