ইউজার লগইন

অবশেষে পছন্দের কাজটি খুঁজে পাওয়ার খবর

কালকেই আমার এক সহকর্মী জানতে চাইছিল আমি কি একটি ভারতীয় বান্ধবী খুঁজে পেতে চাই কি না। সহকর্মীর ভুল ভাঙাতে প্রথমে বললাম, আমি ভারতীয় নই। বাংলাদেশি। যদিও আমি খুব চেষ্টা করছিলাম, আমাকে ভারতীয় হিসেবে ধরে নেয়ার জন্য সহকর্মীটিকে যেন আমার মন অপছন্দ করা শুরু না করে, কিন্তু চেষ্টায় সফল হতে পারি নি।

আমার ক্ষেত্রে একটা "কুইক টার্ন-অফ" হচ্ছে যখন কেউ আমাকে ভারতীয় বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশের নাগরিক হিসেবে ধরে নেয়। কিংবা কথা-বার্তার শুরু হিসেবে আমার নাগরিকত্ব অনুমান করার চেষ্টা করে। সে যেই হোক না কেন। মাঝে মাঝে আমি ভাবি, কেন আমাকে কেউ অন্য কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশের নাগরিক মনে করলে সাথে সাথে আমি "অফ" হয়ে যাই? এটা এখনও আমার একটা মানসিক সংকট যেটাকে হয়তো কাটিয়ে উঠতে হবে। আজকের লেখায় মানসিক সংকট নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে আছে। ইচ্ছে আছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকটগুলো মোকাবেলার পথ খুঁজে পাওয়ার। মাঝে মাঝে এটা যে আমার জন্য সবচেয়ে ভাল ফলটি বয়ে আনে না তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। এই যেমন গতকাল যিনি আমাকে ভারতীয় ধরে নিয়ে উল্লিখিত প্রশ্নটি করেছিলেন, তার আসল উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল আমাকে সাহায্য করা। অথচ প্রথম বাক্যটির কারণে আমরা দুইজনে চেষ্টা করেও পরে আর তেমন কোনো ফলপ্রসূ আলোচনা চালাতে পারি নি!

আমি যে ধীরে ধীরে "ফানলেস" একটা জীবে পরিণত হচ্ছি সেটাও একটা সংকট। ইদানীং যেমন খাওয়া-দাওয়া নিয়মিত করতে হয়, ঘুম ঠিক-ঠাকমতো না হলে ভাল লাগে না- এমন কিন্তু আগে ছিল না। একটা সময় বছরের পর বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ক্যান্টিনে দুপুরের ভাত ছিল আমার দিনের প্রথম খাদ্য। টেরও পাই নি কোনোদিন, যে নাস্তা ছাড়া একটি আস্ত সকাল পার হয়ে গেছে জীবন থেকে। সেই আমাকে ইদানীং প্রায় সকালে নাস্তা বানাতে ব্যস্ত অবস্থায় দেখা যায়। ভোর পাঁচটা না বাজলে যার ঘুম আসতো না, তার এখন জোর করে রাত ১১টায় ঘুমানোর চেষ্টা করতে হয়। বিষয়গুলো সাস্থ্যের জন্য ভাল হলেও মাঝে মাঝে নিজের প্রাক্তন, অনিয়ন্ত্রিত আর বাঁধনবিহীন জীবনটাকে আমি 'মিস্' করি। রাতভর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গুচ্ছের ছোট ভাই-বড় ভাই আর সমবয়সীদের সাথে হল্লা করে সকালবেলা ঝড়ো কাকের মতো চেহারা নিয়ে বাসায় ঢুকে একটা শাওয়ার নিয়েই আবার মোটরসাইকেলে করে প্রেসক্লাব বা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির উদ্দেশ্যে ছুট লাগানো আমাকে এখন টেনেটুনেও রাতের কোনো প্রোগ্রামে বের করা সম্ভব না। যদি না সেখানে ছেলেদের তুলনায় সংখ্যায় অতি সহজে দৃশ্যমান অনুপাতে গরম ও ধোঁয়া-ওঠা মেয়েদের উপস্থিতি আগে থেকে নিশ্চিত করা থাকে। তারচেয়েও জরুরি হচ্ছে যেসব মানুষকে আমি পছন্দের চাইতেও বেশি কিছু করি, তারা যদি না থাকে। সেটা আমি করি আবার খুবই কম সংখ্যক মানুষকে। মানে আমি পছন্দ করি সবাইকেই প্রায়, কিন্তু খুব অল্প সংখ্যক আছেন যাদের আমি পছন্দের চাইতেও বেশি কিছু করি। সুতরাং সেইসব মানুষদেরকে তো থাকতে হবেই, প্লাস বেশি অনুপাতে থাকতে হবে উল্লিখিত ক্যাটেগরীর মানুষদেরকে। চাওয়ার উচ্চতা এত বেশি যে পাওয়ার সাথে সামঞ্জস্য ঘটে না প্রায় কখনোই। ফলাফল ক্রমে আরও বেশি নিজের ভেতর গুটিয়ে আসা।

এতকিছু পরও জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনকে দেখতে, গ্রহণ করতে এবং সে অনুযায়ী জীবনটাকে সাজিয়ে তুলতে আমার ভাল লাগে। এক সময় পরিবর্তনকে ভয় পেতাম। ২০০৭ কিংবা ২০০৮ সালের দিকে যখন 'সামহোয়ারইনব্লগ' নামের একটা ব্লগে লিখতাম, তখন একবার তাদের ইউজার ইন্টারফেস্ পরিবর্তন করা হয়েছিল যেকোন কারণে। সেটার পর থেকে আমি আর কখনো ওই ব্লগে নিয়মিত হতে পারিনি। 'সর্বদাবেলায়েত' নামে ওই ব্লগে আমার একটি অ্যাকাউন্ট আছে এখনও।

পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার সেই অবস্থার পরিবর্তন এসেছে জীবনে। এখন পরিবর্তনই আমাকে বেশি টানে। যেমন, এ বছর সেপ্টেম্বরের শেষে ক্যাম্পাসের ঢাউশ ওই ডর্মিটরিটা ছেড়ে এসে উঠেছিলাম সাতজনের একটা যৌথ অ্যাপার্টমেন্টে। সাতজনের কেউ পড়াশোনা করে, কেউ চাকুরী, আর কেউ করে খোঁজাখুজি। অল্প সময়ের ভেতর পরিবর্তনটাকে ভাল লেগে গিয়েছিল সত্যি, কিন্তু সামনের মাস থেকে এ জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তখন উঠবো আরও ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্টে। যেখানে সম্ভবত অ্যাপার্টমেন্টের মালিক আর তার 'পার্টনার' থাকবেন নিজেদের মতো করে, আর থাকবো আমি। যাকেও সবকিছু করতে হবে নিজের মতো করে এবং একা একা। তারপরও আমি ভীষণ উত্তেজিত। কেননা আজ বহুদিন পর আমি সেই কাজটা খুঁজে পেয়েছি যেটার জন্য আমি এতদিন, এতটা পথ পাড়ি দিয়ে নিজেকে আজকের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছি।

আমার মনে হয়, মানুষের সবারই আসলে যেকোন প্রাপ্তিলাভের পূর্বে একটা কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া উচিত। অন্যথায় কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণতা লাভ করার সুযোগ পায় না। অকালে ঝড়ে যাওয়ার সম্ভবনা বরং বেড়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে এটা অতীতে এতবার হয়েছে যে, এবার যেটার জন্য আমি আনন্দিত- নতুন কাজটার কথা বলছি, সেটাকে আমি চাচ্ছিলাম যেন সহজে ধরা না দেয়। চাচ্ছিলাম যেন চাকরিটা আমাকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জ দেয়, এবং ঘটেছিলও তাই।

জার্মান দেশের হাজারটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রতিটি প্রতিযোগিতায় ঝাঁকে ঝাঁকে মেধাবীদের আনাগোনা, বয়সে যারা ক্ষেত্রবিশেষে দশ বছরেরও ছোট আমার চেয়ে- সবাই মিলে দারুণ একটা 'ফাইট' উপহার দিয়েছিল আমাকে! এর পাশাপাশি আমার ব্যক্তিগত সংকটগুলো তো ছিলই। মানে প্রতিটি দিনই ছিল আমার জন্য অভাবনীয় আনন্দ ও বেদনার। আনন্দের কারণ, আমি জানতাম যে কষ্ট করলে অতি অবশ্যই কেষ্ট মেলে এবং সবুরে মেওয়া ফলে এবং অপেক্ষার ফল বড়ই মধুর। অন্যদিকে একই সময়ে পুরো বিষয়টা ছিল বেদনার কারণ, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুতগতিতে। সবমিলিয়ে দশটি মাস ছিল একটা টানটান উত্তেজনাময় গাড়ি-ভ্রমণের মতো। গতিবেগ প্রতি ঘন্টায় ১৮৯ কিলোমিটারের উপরে ধরে রাখতে হয়েছে পুরোটা সময়।***

লেখার শুরুর দিকে বলা সংকটগুলোর মধ্যে প্রথমটি এখনও একটা বড় সমস্যা, যেটার সমাধান আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। 'ফানলেস' জীবন আপাতদৃষ্টিতে যাই মনে হোক না কেন, ওটা আসলে উপকারীই! তাই আমি ওটা নিয়ে বেশি চিন্তিত নই। এখন আমি অবশেষে পছন্দের কাজটা খুঁজে পাওয়ার আনন্দটুকুই শুধু উপভোগ করছি। আগামী মাস থেকে শুরু হবে নতুন জীবন।

এই বেলা এক মুহূর্তের জন্য আমি থমকে দাঁড়াতে চাই। পেছনে ফেলে আসা পথটাকে একবার খুব ভাল করে দেখে নিতে চাই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই মা-বাবা, বোন, ভাগনী, বন্ধু ও সহকর্মীদের কাছে। যারা জার্মানীতে মাস্টার্স শেষ করার পর থেকে নিয়ে চাকুরি খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত সময়টায় আমার পাশে ছিল ছোট্ট জরুরি সেই কথাটিকে দরকারমতো মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যে, "চিন্তা করো না রকি। সবকিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে।"

ধন্যবাদ দিতে চাই প্রকৃতিকে। আসলেই মানবজীবন এক অমূল্য ধন।

পৃথিবীতে কতো মানুষ শত চেষ্টাতেও একটু ভাল থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুখের চাবিটা খুঁজে পায় না। আমি ভাগ্যবান কারণ আমার চেষ্টাগুলো বৃথা যায় নি। হয়তো জীবনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায় নি, কিন্তু সমাধানগুলোর আমার দিকে এগিয়ে আসার পথ আরেকটু পরিস্কার হয়েছে। প্রতিজ্ঞায় রয়েছে পথটাকে আরো অনেক পরিস্কার আর পরিচ্ছন্ন করে তোলার, এবং সবসময় সেভাবে রাখার। দেখা যাক কি হয়।

সবাইকে শুভেচ্ছা।

---

***এই লাইনটা যারা বুঝেন নি তাদেরকে আমার নিজের লেখা মৌলিক গল্প "সাদা বকপাখিদের ঝাঁকে যদি আপনি আর আমি থাকতাম" পড়ে আসার অনুরোধ রইলো!

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অভিনন্দন, সুপ্রিয় মীর্ভাই।

এরকম কিছু মানসিক সংকট না থাকলে পথচলাটা খুব বেশি পানসে হয়ে যাবে বলেই আমার মনে হয়। এনিওয়ে, শেষে এসে মন ভালো হয়ে গেল। Smile

মীর's picture


সুপ্রিয় বর্ণ,

ধন্যবাদ অভিনন্দন আর তোমার মনোভাব জানানোর জন্য।

কিছু কিছু সংকট না থাকলে জীবনটা পানসে হয়ে যায়, আসলেই ঠিক। তবে আমি যে সংকটটার কথা বলেছি- কেউ যখন আমাকে বাংলাদেশ ব্যতীত দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোন দেশের নাগরিক মনে করে বসে, তখন সেই ব্যক্তিকে আর পছন্দ করতে না পারা কিংবা তার সাথে কোন কথোপকথনের আগ্রহ খুঁজে না পাওয়া- এই বিষয়টায় কোন পরিবর্তন আনার জরুরি কি না, হলে কিভাবে আনা যায় সেসব ভাবছি। Smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


এটা আসলে আমার কাছে সংকটই মনে হয়নাই, এমনটাই হওয়া উচিৎ বলে মনে হইছে। ফার্স্ট ইম্প্রেশন বিশাল একটা ব্যাপার, সেখানে আমাকে আমি বলেই মনে না হলে তো ব্যাপক সমস্যা!

মীর's picture


না সেটা বলি নাই। অবশ্যই আমি যেমন তেমন তো মনে হইতেই হবে। কিন্তু আমি তো "ইন্ডিয়ান" না। ওইরকম লাগলে জিজ্ঞেস করা যাইতে পারে। সবচাইতে বড় কথা এলাকাভিত্তিক চেহারার গঠনে আমাদের কারও তো হাত নাই। এইটা নিয়ে কথা বলার কিংবা ওইটারে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে একজন কোথা থেকে আসছে অনুমান করার প্রবণতাটা কি আসলেই খুব গ্রহণযোগ্য? অন্যপক্ষেরও তো তার ফার্স্ট ইম্প্রেশনের কথাটা মাথায় রাখা উচিত।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


গ্রহণযোগ্য না বলেই তো তার কথা শোনার আগ্রহই মরে যায়, তাই না?

মীর's picture


ঠিক, কিন্তু এই আগ্রহ মরে যাওয়াটা সবসময় ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে না- যেটা একটা সমস্যা। আমার মনে হচ্ছে, এই মানসিকতাটা পরিবর্তন করা দরকার Glasses

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম, আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। এটি একটি মৌলিক ব্লগ। দিনলিপি, ছোটগল্প, বড়গল্প, কবিতা, আত্মোপলব্ধিমূলক লেখা এবং আরও কয়েক ধরনের লেখা এখানে পাওয়া সম্ভব। এই ব্লগের সব লেখা আমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত, এবং সূত্র উল্লেখ ছাড়া এই ব্লগের কোথাও অন্য কারো লেখা ব্যবহার করা হয় নি। আপনাকে এখানে আগ্রহী হতে দেখে ভাল লাগলো। যেকোন প্রশ্নের ক্ষেত্রে ই-মেইল করতে পারেন: bd.mir13@gmail.com.

ও, আরেকটি কথা। আপনার যদি লেখাটি শেয়ার করতে ইচ্ছে করে কিংবা অংশবিশেষ, কোনো অসুবিধা নেই। শুধুমাত্র সূত্র হিসেবে আমার নাম, এবং সংশ্লিষ্ট পোস্টের লিংকটি ব্যবহার করুন। অন্য কোনো উপায়ে আমার লেখার অংশবিশেষ কিংবা পুরোটা কোথায় শেয়ার কিংবা ব্যবহার করা হলে, তা
চুরি হিসেবে দেখা হবে। যা কপিরাইট আইনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। যদিও যারা অন্যের লেখার অংশবিশেষ বা পুরোটা নিজের বলে ফেসবুক এবং অন্যান্য মাধ্যমে চালিয়ে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই কথাগুলো হাস্যকর লাগতে পারে। তারপরও তাদেরকে বলছি, সময় ও সুযোগ হলে অবশ্যই আপনাদেরকে এই অপরাধের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনার ব্যবস্থা নেয়া হবে। ততোদিন পর্যন্ত খান চুরি করে, যেহেতু পারবেন না নিজে মাথা খাটিয়ে কিছু বের করতে।

ধন্যবাদ। আপনার সময় আনন্দময় হোক।