ইউজার লগইন

আমাদের ইস্কুল

(১)

বিয়ে বাড়ী। বেসামাল হৈচৈ।খাওয়া এখনো শুরু হয়নি। দোতালায় কনেকে সাজানো হচ্ছে। কনে সাজবে, বিয়ে পড়ানো হবে তারপর খাওয়া। এটা বরের বাবার হুকুম। আমরা বর যাত্রী। কাজেই বরের বাবার হুকুমের বিপরীতে কউ সচল হ’ল না। এদিকে বর বসে আছে গোমড়া মুখে। বিয়ে করতে এসে এত দুখী থাকতে দেখিনি কাউকে, কখনো। বর থাকবে হাসিখুশি। কনের বান্ধবীরা খুনসুটি করবে আর বর চাপা হাসিতে তাদেরকে প্রলুব্ধ করবে, এটাই বিয়ের চিরচেনা রূপ। কে জানে পুরনো প্রেমিকার কথাই মনে পড়ে গেছে কীনা। উনি বয়সে বড় বলে জিজ্ঞাসা করতেও পারছি না। বরের বন্ধুরা এদিক সেদিক কনের বান্ধবীদের নজরে পড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যদিও কোন ফল হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে নিরিবিলি এসে বসেছি দোতলা উঠার সিড়িটার কাছেই।সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে এরকম বাচ্চা কয়েকটা ছেলে-মেয়ে একবার সিড়ি দিয়ে উঠছে একবার নামছে।ফুটফুটে একেকটা। মায়াকাড়া।
কীরে কি করছিস একা একা? প্রশ্ন শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি বরের ছোট ভাই (যার সুবাদে আমার এখানে আসা) ও তার কয়েক বন্ধু এসে দাড়িয়েছে পাশে। ওদেরকে বসতে বলে, আবার তাকালাম বাচ্চাদের দিকে। বাচ্চারাও আমাদের মনযোগ ওদের দিকে দেখে প্রবল উৎসাহে সিড়ি খেলা খেলে যাচ্ছে। দুষ্টের সেরা যেটিকে মনে হ’ল, হাত ইশারায় ডাকলাম।কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ শেষে দলবল নিয়ে ছেলেটি হাজির।আমাদের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে নিরবে নেতৃত্ত্ব ঘোষনা করলো। নাম কি তোমার ? আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো, পল্টু। এ জামানায় নামটি যথেষ্টই আলোচ্য।বললাম গল্প শুনবে. একযোগে মাথা নাড়লো সবাই।শুরু করলাম,
আমি যখন ছোট, তোমাদের মতই, সবে স্কুলে গিয়েছি, কি করতাম জানো ? সবাই একযোগে ঝুকে এল, পল্টু বললো, কী করতেন ? বললাম, মাঝে মাঝেই বেঞ্চ এর উপর দাড়াতাম। তারপর, তারপর? বলেন না কী করতেন?বলে উঠলো ছেলেটির সহপাঠি।
শুরু করলাম আবার। প্রথমে বেঞ্চের উপর দাড়িয়ে এদিক- সেদিক তাকাতাম, তারপর, দাড়িয়েই……. বলে আবার বাচ্চাদের একনজর দেখে নিলাম। প্রবল আগ্রহে সবার চোখ চকচক করছে। বললাম, দাড়িয়েই পিসু করে দিতাম। সব বাচ্চারা হেসে প্রায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো। বরের ভাই ও তার বন্ধুরাও হাসলো সতর্ক্ হয়ে।
একটা বাচ্চা বলে উঠলো, তুমি মিসকে বললেই পারতে? বললাম, আমি যে বোকা ছিলাম। ওরা আবারও হেসে ফেললো, দু-একজন মনে হয় একটু লজ্জায় পেল।শুধু পল্টু তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে।
বললাম, যাও বাচ্চারা, খেল গিয়ে, গল্প শেষ। ওরা সবাই আবার সিড়ি খেলায় ব্যস্ত হয়ে পরলো।
একজনকে পাঠালাম বিয়ে পড়ানো-খাওয়া বিষয়ে খোঁজ নিতে।অন্যরা মাতলাম রাজনীতির গল্প নিয়ে। একসময় হঠাৎ মনে হ’ল কেউ আমাদের খেয়াল করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পল্টু্। অন্যরা যেখানে খেলছে, সেখানে সে খেলায় মনযোগ হারিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারায় ডাকলাম। প্রায় বুক ফুলিয়ে চলে আসলো।
জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলবে? বললো, মিস তোমাকে বকা দিতো না?
বকবে কেন? আমি তো জিপার খুলতে পারতাম না। পল্টু কি যেন একটা ভাবলো। ভেবে, হাচড়ে পাচড়ে উঠে পড়লো পাশে খালি একটা চেয়ারে। সটান দাড়িয়ে বললো, আমিও তোমার মত, জানো। বলেই, পল্টু সবার সামনেই তার প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললো। আমি তো হতবাক। অন্য সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। পল্টুর বন্ধুরাও যোগ দিল হাসিতে। পল্টু নির্বিকার। মুখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি নিয়ে স্হির দাড়িয়ে আছে, ভাবটা এমন, কাজ পুরো সমাধা না হওয়া পর্যন্ত সে থামবে না। এমন সময় দোতলার ব্যালকনি থেকে চিৎকার, পল্টু, হচ্ছে কি এসব? সবাই তাকালাম উপরে, তাকিয়েই রইলাম। এদিকে পাশ থেকে পল্টু চিৎকার করে জবাব দিল, আম্মু, চাচ্চুও তো এরকম করেছে ? মিস তো বকা দেয়নি, জান?
হাসি চেপে রাখায় পেট ফেটে যাবার আগেই যে যার মত সেই স্থান দ্রুত সাময়িক প্রস্থান করলাম। পরে জেনেছি, মেয়েটি কোন এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়, তার ছেলেটিও ওই স্কুলের পড়ে।
কনে সাজানো শেষ, বিয়ে পড়নো হচ্ছে, আমরা সব ফেলে খাওয়ার টেবিলে বসেছি। গুমড়া মুখে বর কবুল বলছে, দূর থেকেও ষ্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভাবছি বাসর রাতেই ওই ব্যাটা পালিয়ে যাবে নাতো? পাশের টেবিলেই মিস তার ছেলেকে নিয়ে বসেছে। ইতিমধ্যেই ছেলেটির প্যান্ট-শার্ট্ পাল্টানো হয়েছে। এতদ্রুত প্যান্ট-শার্ট্ কোথায় পেল ভাবছি। আজকাল অবশ্য মেয়েরা এত্তোবড় ব্যাগ নিয়ে ঘুরে।ফ্যাশন কিংবা প্রয়োজন। কে জানে? মেয়েটা ক্ষণে ক্ষণে যেভাবে তাকাচ্ছে, যেন ওনার স্কুলে ভাগ্যচক্রে যদি আমাদের ছাত্র হিসেবে পান তবে খবর আছে। দ্রুত খেয়ে প্রস্থান করাটাই যুক্তিযুক্ত বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রস্থানের মুহুর্তে ছেলেটির চোখে এত আলোর ঝিলিক দেখেছি যা ছড়িয়ে পড়ছিল তার মৃদু হাসিতেও।

(২)

পাপ্পা।আমার ছোট বোন। কিন্ডারগার্টেন এ পড়ায়। ভাইবোনদের মধ্যে ওই কিছুটা খাটো। যদিও গড় পরতা বাঙালী মেয়েদের উচ্চতাই ও পেয়েছে। ওর উচ্চতা যাই হোক ওর চুলের দৈর্ঘ্য মোটেও ফেলনা নয়। প্রায় পায়ের গোড়ালী ছুঁই ছুঁই চুলের পরিচর্যা চাট্টিখানি কথা নয়। প্রায়ই দেখতাম বেপক আয়োজন করে প্রচুর সময় নিয়ে বসতো চুল ধুতে। উচু চেয়ার বা টুলে বসে নানান কসরতে চুল ধুয়ে দিতে আরেকজনের সাহায্য প্রয়োজন হ’ত।

একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুই চুল সামলাতেই হিমসিম খাস, স্কুলের বাচ্চাদের সামলাস কিভাবে? ও বলল, ওরা তো এই চুলের জন্যই আমার ভক্ত। ক্লাশ শেষ হওয়া মাত্রই প্রায় গোড়ালী ছুই ছুই এক বেনীর চুল ধরতে সবাই ছুটে আসে। যে দুষ্টুমি করে তাকে ধরতে দিইনা। কাজেই দুষ্টুমি বন্ধ।কেউ কেউ টিচার্স রুম পর্যন্ত যায় চুলের বেনী ধরে পিছনে পিছনে হাটতে হাটতে। কেউ কেউ অবশ্য বেনী ধরে ঝুলে পরতে চায়।বলে, আমি টারজান।
এখন ওর ছেলেই লম্বা বিনুনি ধরে ওর পিছন পিছন এঘর ওঘর ঘুরে বেড়ায়, আর বলে, আমি মিঃ বিন। ও টারজানের থেকে মিঃ বিনেরই ভক্ত।

(৩)

আমার ভাগ্নী মাস চারেক হ’ল স্কুলে যেতে শুরু করেছে। স্কুলে যেতে তার আপত্তি নেই। তবে স্কুল ড্রেসে তার ভীষন আপত্তি। অনেক ধমক ধামক দিযে যদিও বা তাকে স্কুল ড্রেস পরানো হয়, তারপরও ঘর থেকে বের হওয়ার আগমুহুর্ত্ পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে অন্য আর সব ড্রেসের দিকে। আহা বেচারী।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পর ওকে জিজ্ঞেস করলাম, আম্মু আজকে কি শিখলে? বললো, বাংলাদেশের রাজধানীর নাম। জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশের রাজধানীর নাম বলতো মা। সে একটু ভেবে নিয়ে বললো, নিউমার্কেট।আমি চুপ করে রইলাম। আর কি শিখলে। ও উৎসাহের সাথে বললো, সূর্য্ কোনদিকে উঠে, কোন দিকে অস্ত যায়? জিজ্ঞেস করলাম, কোন দিকে অস্ত যায়, তুমি জান? দুই বিনুনি দোলাতে দোলাতে বললো, ডান দিকে।ওর দিকে তাকিয়েই থাকলাম, অনেকক্ষণ। ভাবলাম যেমন মামা তেমন ভাগ্নী। মনে পড়ে গেল পদার্থ্ বিজ্ঞানে অনার্স্ করবো বলে ভাইবা দিচ্ছিলাম। স্যার জিজ্ঞেস করলেন চুম্বক বিষয়ক প্রশ্ন, আর আমি উত্তর দিয়েছিলাম বিদ্যুৎ বিষয়ক। সেদিন স্যার বলেছিলেন, “ অপদার্থ্, তুই আমার সামনে থেকে যা, তা না হলে আমিও পদার্থ্ বিজ্ঞান ভুলে যাব”।
এতসব ভাবছি,আর ফিস ফিস করে বলছি, মারে, তুই তোর বাবা- মার মুখ নাহোক, অন্তত মামার মুখ উজ্জল করবি। এমন সময় আপা হন্ত দন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বললো, এখনো তোরা গল্প করছিস। মেয়েকে বললো, মামার সাথে গল্প পরে করো, এখন উঠো তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, নিউমার্কেট যাবো। আমাকে বললো, ডানদিকের ড্রয়ারে টাকা আছে, বাজারে যা। ঘরে রান্নার কিছু নাই। মনে মনে গুনগুন করতে লাগলাম, বাংলাদেশের রাজধানী নিউমার্কেট, সূর্য্ ডান দিকে অস্ত যায়…………….।

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


মেয়েকে বললো, মামার সাথে গল্প পরে করো, এখন উঠো তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, নিউমার্কেট যাবো। আমাকে বললো, ডানদিকের ড্রয়ারে টাকা আছে, বাজারে যা। ঘরে রান্নার কিছু নাই। মনে মনে গুনগুন করতে লাগলাম, বাংলাদেশের রাজধানী নিউমার্কেট, সূর্য্ ডান দিকে অস্ত যায়…………….।

Rolling On The Floor Rolling On The Floor Rolling On The Floor

মিতুল's picture


ভাগ্নী বলেছে, ফিরার পথে আমার জন্য চকলেট নিয়ে আসবে।সেটার জন্যই অপেক্ষায় আছি।

সামছা আকিদা জাহান's picture


হা হা হা --মামার মুখ উজ্জ্বল করবে!? দোয়া রইল।

মিতুল's picture


অবশ্যই মামার মুখ উজ্জল করবে। ও টিফিনের সবটুকু বা অন্তত অর্ধেক আমার জন্য বাসায় বয়ে নিয়ে আসে। পাশে বসে খাওয়ায়।ওর স্কুলের টিফিন খেতে খেতে আমার মুখ যে উজ্জল হয় তা সে ঠিকই টের পায়।

রশীদা আফরোজ's picture


মিঃ বিন আমার খুবই পছন্দের, টিভিতে মাঝে মাঝে দেখি, দেখতে দেখতে বলি, ব্যাটা ফাজিল!
নিউমার্কেট আমার খুবই অপছন্দের জায়গা, ঐখানে গেলে আমি খালি ঠকি, কারণ আমি দরদাম পারি না।
লেখাটা পড়ে খুবই আনন্দ পেলাম। Big smile

মিতুল's picture


আমার পছন্দ মানুষ দেখা। এত বিচিত্র আকার, রঙের , ভাষার অসংখ্য মানুষের মেলা সম্ভবত আর কোথাও দেখা যাবে না

শওকত মাসুম's picture


আমার ওয়ানে পড়া মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, ক্লাশে বন্ধুদের সঙ্গে কী কথা বলো? মেয়ে বললো, উ হু, বলা যাবে না। সিক্রেট।

মিতুল's picture


ওর জন্য শুভকামনা রইলো।

জেবীন's picture


বাচ্চাদের কান্ডা কারখানা মজার! লেখাটা পড়তে ভাল্লাগছে! Laughing out loud

১০

মিতুল's picture


মজার জন্যই লেখা। গদ্য/গল্প লেখা আমার কাজ না।আকিদার কষ্ট অনূভূতি যেভাবে ছড়িয়ে পরেছিল, সেখান থেকে সবাইকে একটু রিলিফ দেয়ার জন্যই বাচ্চাদের নিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছি।মনে হয় সফল হই নাই।

১১

চাঙ্কু's picture


বাংলাদেশের রাজধানী নিউমার্কেট, সূর্য্ ডান দিকে অস্ত যায় Big smile Laughing out loud

১২

মিতুল's picture


কি ইমো দিমু ভাবতেছি...............

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মিতুল's picture

নিজের সম্পর্কে

অনেক চেষ্টা করেও সফল হই না, এমন ঘটনা যদি থাকে, তবে বলতেই হবে ‘আমরা বন্ধু’ তে সম্ভবত প্রবেশের আগেই আমার প্রস্থান অবশ্যম্ভাবী।লিখবো কি, এন্ট্রিই পাচ্ছি না।ভাইরে, গেইটলক করে ফেললে, আমার মত লোকাল বাসের যাত্রীরা কি করবে ?