মৌমিতা জান্নাত নিপা'এর ব্লগ
এই দ্যাশেতে ধানের কৈতর
চলি আইসো ধান খ্যাতের কৈতর
কথা কইবা আগুনের ভাষায়
পরান যেদিন ভাঙ্গিছিলো পতাকার
দেইখ্যাও সেইদিন কেন দেখো নাই তুমি?
বলি আইস্যো মাইনষেরে
ক কতটা পুড়িছে খ এর যন্ত্রণায়
ভালোবাইস্যা হাত ধরিলে মিছিলের
কেউ আর অচিন থাকে নাগো সই...
ও কৈতর, আইস্যো দেখিবা দহনেরে
মুখগুলান কেমন কাঁপতেয়াছে কতদিন
কলিজার পিরিত উৎলায়া উঠিলে
আমার দ্যাশের লাগি
ঠোঁটে জিয়াইয়া রাইখ্যো বাঙলা বোলের ঘ্রাণ
চলি আইসো ধানের কৈতর, তুমি চলি আইসো
দেখিবা এই দ্যাশেতে আবার কেমন
এহানে ওহানে ফুটিছে আলোর আন্দোলন
জোছনার ঢল, সমস্বরের আগুনখাকি রজণীগন্ধা।
(উৎসর্গ: শাহবাগে যে আগামী প্রজন্মের শিশুরা গত নয়দিন দেশকে ভালোবেসে স্লোগান দিয়েছে।)
খুঁজে ফেরা
কাকে দেবো ভালোবাসা
কাকে দেবো এই উষ্ণতম চুমু?
ভেসে যায় জলের মত মায়াবি জোছনার রাত
উড়ে যায় হাওয়ায় হাওয়ায় রাত্রি প্রেমের সময়
তবু খুঁজে ফিরি এমন একজন
যাকে দেবো আমার সর্বস্ব বুভুক্ষু চুমু
পাঁজরের সবকটি হাঁড়, ভরা বর্ষা, চোখের জল।
প্রেমহীন এই শহরিক গ্রামে
আজ শ্যাওলা পড়ে দেয়ালে,
কিলবিল করে মাতাল চন্দ্র আলো
এমন এক স্বপ্ন সময়ে কাকে দেবো ভালোবাসা?
আমার নিখাদ ভরাট চুমু?
যদি মনের কাঁটায় পা না দিয়ে
জল না থাকে চোখে
যদি মন না নাচে প্রেমে!
দুই অলিন্দ
জীয়ন্তে আর ফেরে না ঘরে প্রজাপতি
ফেরে না মাঠ, ধুলো জমিন বাটে
দৈনন্দিন ফাঁক ফোঁকর পরিণতি
বিবর্ণ সময় একলা একলা কাটে।
নিশানা খোঁজে ফসলের দানা ভূমি
চিহ্ন কাটা ধানের শীষের বুকে
মরচে পড়েছে শ্বাস গন্ধ চুমি
সীমানা রেখা চলছে ধুঁকে ধুঁকে।
জীয়ন্তে চাই আবার তোমার দেখা
স্পন্দন চাই বুক অলিন্দ জুড়ি
ভালোবাসা ফোটে অঘোর মগ্ন একা
হৃদয়ে বন্দি তোমার চোর কুঠুরি।
(জীয়ন্তে/০৯.০৬.১২)
<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<
আমাকে পৌঁছে দেবে আমার ঘরে
সে বড্ড দূর, আরো বহু দূর
একবারে ঘাট পেড়িয়ে জল ছুঁই ছুঁই মুখ
পাপের প্রজন্মে বাঁধা প্রান্তিক নৌকা
তার কেবল হাঁটা আর হাঁটা
রুক্ষ, কান্তিময়, ব্যাথাতুর।
আমাকে পৌঁছে দেবে কেউ
আমাকে, আমার বাড়ি..
অকারণ আশায় আর বিশ্বাসে
লেগেছে অকাল মড়ক
দেবে কেউ পৌঁছে আমায়
নিভু নিভু, তবু যেমন জ্বলে আগুনের ফানুস
এখানে অরন্যে ওৎ পেতে আছে বাঘ
আর নগরীতে মুখোশে ঢাকা মানুষ।
(আমাকে পৌঁছে দেবে কেউ/১১.০৬.১২)
এই জনপদে
শুনুন, আমি হলফ করে বলছি-এই শহরে আর একবারও আসবে না জাদুকর কোনদিন।কালো টুপির মায়াবি ওড়না সে আর উড়াবে না এইখানের বাতাসে। গোলামের ভেতর বিবি অথবা বিবির পেটে গোলাম তেড়েফুঁড়ে টেক্কা দিয়েছে মায়াজাল। স্বর্ণাভ রুমালের পায়রা যে খুদ খেয়ে গেছে প্রান্তরে তা আজ বিরান, ছাই। জাদুকরের ঝুলি এখন শূণ্য, গতিহীন। বলেছে সব জাড়িজুড়ি ব্যার্থ তার। নড়ছে না ফুল, পড়ছে না মন্ত্রের কলকাঠি। কেবল বরাহের মত পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে চক্রান্ত। সাড় দেয়া নরকের মত চিমনির ধোঁয়া হাসছে খিকখিক চারপাশে। এখানে আর জাদু চলে না, পাখিরা উড়ে না আলস্য বাতাসে।
তীর্থযাত্রা
চলো করি তীর্থযাত্রা
খালি পায়ে পথে হেঁটে হেঁটে
নেশায় কেমন চুর হয়ে আছে সময়ের দেহ
টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে ঘড়ি..
এখনি সময়, এখনি মোক্ষম মুহূর্ত
চলো আমরা হাঁটবো সন্তর্পনে।
দেখবো চলো তীর্থের আলোকচ্ছটা
সেগুন কাঠের বার্নিশ তার্থিক কফিন
মরে আসা রোদ ফেলে আসা ঘর
আর শুকিয়ে যাওয়া যবের ক্ষেতও দেখবো চলো
মানুষ কালে কালে কত আকালে ফেলে গেছে মানুষেরে।
এসা হাঁটো তীর্থে যাবার পথে
একে একে কদমে কদমে
যেমন মাঠের মধ্যে মাঠ হয়েছে বিরান
জলের মধ্যে জল হয়েছে ডুবডুব
তেমনি আমরাও চলো হাঁটবো শিকড়বিহীন
মৃত কঙ্কালের এপিটাফ গুণে গুণে
নিশ্চিহ্ন
জাহাবাজ জোস্নায় র্নিবৃক্ষ প্রান্তর
এখানে ধু ধু চক্ষুসীমা।
অবশেষে তবে ফিরে চলো কারণিক
চাক্ষুস সমূদ্র আর নেই কোথাও।
ছায়া নেই, রৌদ্র নেই এমন কি বৃষ্টির কণাও
দূর তুর পাহাড়ে ঈশ্বর যে কথা দিয়েছিলেন মুসাকে
তাও ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি।
মেষ পালক, হে বন্ধু আমার- তুমি তবে ফিরেই যাও
এ পথে আমার আর কোন চিহ্ন পড়ে নেই।
মানুষ বনে হাঁটি
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়
আমি মানুষের বনে হাঁটি
একটা গহিনের প্রত্যাশা
কিংবা আলো ছায়ার অপেক্ষায়।
যেন খুব একটা পুরাতন আঁকড়ে রাখে আমায়
অথবা আমিই আঁকড়ে থাকি তাকে!
মানুষের বন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়
তবু আমার হাঁটা ফুরোয় না।
চাঁদ যায়, ক্ষণ যায়, আলো যায়
ঘরে ফেরে ফেরারি বাতাস
অথচ দেখো, কেমন নির্লিপ্ত হয়ে
কাঁটাঝোপে রক্তাক্ত হতে হতে
সাপের মত দেহ টেনে টেনে
আমি কেমন মানুষের বনে হাঁটি।
আইসক্রিম
কাল রাতে হাটতে হাটতে অনাহারী চক্ষুদল চাক্ষুস করেছে একটা নক্ষত্রের আইসক্রিম। পিপাসা আর তৃষ্ণার ছুরি আমার মাতৃভাষা বোঝেনি। আইসক্রিমটা সোজা চলে গেছে অন্য কারো হাতে। বুকভর্তি হাহাকার নিয়ে পথ চলেছি। অর্থহীন স্বরে ধ্বনির সাথে ধ্বনি। তবু একটা অদৃশ্য আইসক্রিমের ছায়া আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বহুকার। আমি হাতজোড় করে বলেছি, এই মুহূর্তে একটা আইসক্রিম কেনার স্বামর্থ আমার নেই। তবু নক্ষত্র কথা শোনেনি। অকারণে চোখে ঝরেছে জল, পিপাসার্ত হয়েছি আরো বেশি। হঠাৎ দেখি আইসক্রিমটা হয়ে গেছে হীমবাহ। নিরেট আর গভীর ছদ্দবেশী।
বিষপাঁচালি
সন্ধ্যে বেলা পেখম নাচানো সুর
বুকের বাবুই বুনেছিলো তার বাসা
মানুষ জীবন কুহকে ভরপুর
আর পাওয়ার করিনি উচ্চাশা।
অনিশ্চিত অদ্ভুতেড়ে ক্ষণ
বিষমন্তর ঢেকে রেখেছে গলা
স্বর্গমিতা কোথায় সন্তরণ?
প্রেম পদ্য অনুর্বর নিস্ফলা
অনিচ্ছার উসকানো জলরঙ
বাজে মানুষের বাজারি ছিনালপনা
তোমার ভালোতে তুমিই জবরজঙ
আমিই তবে হই কালনাগের ফনা
অংক
যেদিন একটা অংক কষতে পারবে
সেদিন বুঝবো আসল মুন্সিয়ানা।
যোগ, গুণ ভাগের দুনিয়ায়
শিখেছো খালি বিয়োগ হতে
ধারাপাতের ধারা বর্ণনায় এমনই আনাড়ি তুমি
বরাবরই ভুল উত্তরে দিয়েছো দাগ।
জীবনের পাটিগণিত যখন এসে দাঁড়িয়েছে সম্মুখে
তৈলাক্ত বাঁশ পিছল থেকে পিছল হয়েছে কেবল
বাদরটা হিমশিম খেয়েছে , তবু
উচ্চতা, সময় দৈর্ঘ্য মাপতে পারেনি কোনোদিন।
শুধু চক্ষু সীমায় ধু ধু সাদা খাতা
তিন রেখার আড়ালে হয়েছো ত্রিভুজ।
শোন হে অনাহুত,
মানব অংক কি এতই সহজ যে
চাইলেই বিয়োগের পদ ছেড়ে
যোগ ভাগের ভাগ্যে গুণ বসিয়ে
হাসতে হাসতে দিয়ে দেবে উত্তর?
উড়ো সোনাপাখি
আজ একটা অন্যমনস্ক পাখি ডেকে গেছে আমায়। বলেছে উড়াল দাও এই শহরের আকাশে। এর অলিগলি রাজপথ ঘুরে উড়তে থাকো তুমি শূণ্যে। উড়তে উড়তে মিলিয়ে যাও শেষ বিন্দুতে।
পাখিটা ঠোঁটে করে নিয়ে এসেছিলো জল। বলেছে- এই নাও রুক্ষ তোমার জিহ্বায় দিলাম তৃষ্ণার অবসান। এবার শুধু উড়তে থাকো সোনাপাখি। যেখানে যখন গিয়েছিলে তুমি, অথবা যাবার কথা ছিলো যেখানে আবার। চষা ক্ষেত, হলদে ফুলের ঝোপ, কিংবা পেরিয়েও যেতে পারো সমুদ্রের ফেনারাজি। তবু থেমো না বিরহী, উড়তে থাকো কেবল। অনন্ত আগুনে শেষ হয়েছে পথ, সীমারেখা নেই অপেক্ষাতে তোমার। উড়ো, উড়ো তুমি সোনাপাখি, মগ্ন চিলের মত ঘুরতে ঘুরতে উড়তে থাকো আকাশের ছায়া তলে।