পহেলা ফাল্গুনে জ্যৈষ্ঠের স্মৃতিচর্বন
ভয়ানক গরম পড়ছে আজ। জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা দুপুর। ক্লাস শেষে কোনমতে ষ্টেশানগামী শেষ বাসটা ধরে ঝুলে পড়লাম। ষ্টেশানে এসে দেখি ট্রেনে ঠাসাঠাসি ভীড়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুপুর দেড়টার ফিরতি ট্রেনের যাত্রাটা মোটেও সুখকর নয়, বিশেষ করে এই দাবদাহে। কোন বগিতেই সুঁচ ঢোকার জায়গা নেই। বগির পাদানি গুলো পর্যন্ত দুজন করে বসে দখল করে রেখেছে। হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে যাবার আশাও মাঠে মারা গেল।
বিকল্প পথে নাজিরহাটের বাসে যাওয়া যায়। কিন্তু পকেটে আছে সাড়ে সাতটাকার মতো। আড়াই টাকা বাসভাড়া তিনটাকা রিকশা ভাড়া চলে গেলে দুই টাকা দিয়ে বিকেলটা পার করা যাবে না। একটা গোল্ডলীফেই দুইটাকা চলে যাবে। নাহ এই মাগনা ট্রেনই ভালো। আবার ট্রাই দেই।
পেছনের দিকে একটা মালগাড়ীর বগি দেখা গেল, ঢোকা যাবে ওখানে। বাছাবাছি না করে ওখানেই উঠে গেলাম। ওটাও ভরে গেল পাঁচমিনিটে। মালগাড়ীর বগিতে কোন আসন থাকে না। পুরোটা একটা লোহার বদ্ধ খাঁচা বিশেষ। দুপাশে পাঁচফুটের মতো খোলা মালামাল ওঠানামা করার জন্য।(ওরকম মালবাহী বগি ভার্সিটির ট্রেনে যুক্ত করার কোন যুক্তি আমি আজো পাইনি)
মালগাড়ীতে ধরার মতো কিছুই নেই। দুই পায়ের ব্যালেন্সই একমাত্র ভরসা। সেই ভরসায় মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পুরোনো লোহার জং ধরা বগি। বয়স একশো বছরের কম না। আগাগোড়া মরচে দিয়ে ঢাকা। মাথার উপরে.... পায়ের নীচে... ডানে..... বামে... শুধুই লোহা আর লোহার মরচে। এই গরমে লোহাগুলো যেন ফুটছে, আর আমাদের ফোটাচ্ছে। শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কাবাব হয়ে যাই কিনা।
ট্রেন ছাড়তেই একটু হাওয়ার পরশ মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু ওই হাওয়াটাও বাইরের উত্তাপে তেতে আছে। মালগাড়ীতেও প্রচন্ড ভীড়। একজন আরেকজনের গায়ে ঠেকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এইছোট্ট জায়গায় ছাত্রছাত্রী পঞ্চাশজনের কম হবে না। সবাই ঘামছে আর হাঁসফাস করছে। আমার অবস্থা একটু বেশীই কাহিল সেদিন। কারন আমি এমনিতেই বাকীদের তুলনায় ছোটখাট আর দাঁড়িয়েছি মাঝখানে। ওখানে বাতাস প্রবেশ করছে না। পুরো শরীর ভিজে চুপচুপে। ঘামে মাথার চুল ভিজে পানি ঝরছে।
তখনো ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ট্রেনের সেই গরমে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারিনি। মালগাড়ীতে আগেও দুয়েকবার উঠেছি। কিন্তু আজকের মতো জঘন্য অবস্থা আর হয়নি। জান বেরিয়ে যায় অবস্থা। ইচ্ছে হচ্ছে ভীড় ঠেলে লাফ দিয়ে নেমে জীবন জ্বালা জুড়াই এই লোহার নরক থেকে। ট্রেন কতক্ষন চলেছে জানি না। হঠাৎ ঘাড়ে একটা বাতাসের পরশ লাগলো। মোলায়েম এবং অপেক্ষাকৃত শীতল। ভাবলাম বাহ্ দারুন তো। এত মানুষের ভীড় সরিয়ে কোন ফাঁকে এই সুমতির বাতাস আমার কাছে পৌঁছে গেছে।
একটু পর পেছনে তাকাতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম, ওটা মোটেও প্রকৃতির হাওয়া নয়। আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো পেছনের একটা মেয়ের হাত পাখার বাতাস। মেয়েটার অজান্তেই তার বাতাসের কিছুটা আমার ভাগে চলে আসছে তার কাঁধ পার হয়ে। আমি চুপচাপ ওই অপ্রত্যাশিত বাতাস উপভোগ করে যেতে লাগলাম। সেই দোজখে ওই অচেনা মেয়েটার হাতপাখাটা আমাকে এয়ারকন্ডিশনের মতো স্বস্তি দিল।
ধড়ে যেন প্রান ফিরে এল। ভীষন ভীষন কৃতজ্ঞ বোধ করলাম মেয়েটার প্রতি। পেছনে না তাকানোর ভান করলাম। যেন অনিচ্ছায় বাতাস খাচ্ছি। কিন্তু আরো কিছু সময় পর খেয়াল করলাম বাতাসটা আগের চেয়ে একটু যেন বেশীই লাগছে। পেছন ফিরে আমি তো তাজ্জব!! মেয়েটার হাতপাখা আরো পেছনে এসে আমার ঘাড় বরাবর বাতাস দেয়া শুরু করেছে। সচেতন ভাবে সীমানা লংঘন করেছে হাতপাখাটা। শুধু তাই নয় এবারের বাতাসের প্রায় পুরোটা আমাকেই দিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা বোধহয় বুঝতে পেরেছে আমি বাতাসের জন্য কিরকম কাঙ্গাল হয়ে আছি। আহ কি মায়া রে। আমি চুপচাপ ওই জায়গায় দাড়িয়ে বাতাসটা দিয়ে প্রান জুড়াচ্ছি আর ভাবছি নামার আগে মেয়েটাকে অবশ্যই একটা বিশেষ ধন্যবাদ দেবো। এরকম একজন মায়াবতীর সাথে পরিচয়ের লোভও হলো।
কিন্তু না। বিধাতার ইচ্ছা ছিল না।
ট্রেনটা ষোলশহর আসতেই মেয়েটা তাড়াহুড়ো করে নেমে গেল বগি থেকে। আমার কিছু বলা হলো না, ধন্যবাদ রয়ে গেল পকেটে। "চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে............." কি এক আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর চলে যাওয়ার দিকে। এই চল্লিশ মিনিটের যাত্রাপথে এমন মায়াবী হাওয়া দিয়ে যে আমার প্রানটা তাজা রাখলো, তাকে কিছুই বলা হলো না, এমনকি তার চেহারাও দেখলাম না আমি।
হে অচেনা মায়াবতী, আপনার সেই হাত পাখার বাতাসকে আমি এখনো কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করি আজ একুশ বছর পরেও।
[নিজের পুরোনো লেখা থেকে চর্বিতচর্বন গোত্রীয় বর্নন]





কোন মায়াবতীর জন্য এটাই কি প্রথম?
অচেনা মায়াবতীর জন্য পরথম
আমারে কেউ বাতাস করলো না আইজ পর্যন্ত
তাহলে তো আপনার সম্ভাবনা উজ্জ্বল
আহাহা জৈষ্ট মাসের গরমের মায়াবতীর হাত পাখার বাতাস

শুভ বসন্ত
কার ছবি দিলেন? আপনার একান্ত কেউ?
জৈষ্ঠ্যে বসন্তের বাতাস !!!
হা হা.....খুব অসময়ে হয়ে গেল নাকি?
চমৎকার লাগলো! আমার এক কাজিন পড়ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ওর থেকে শাটল ট্রেনের কাহিনী শুনেছি।
শাটল ট্রেনের প্রতিটি যাত্রায়ই একেকটা কাহিনী থাকে
আহা শাটল ট্রেন... ভীড়ের মধ্যে দাঁড়ানো অবস্থায় আমি দুইবার ফেইন্ট হইছিলাম, ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই... ফেইন্ট হওয়ার মজা আছে। সাথে সাথে পুরা একটা লম্বা সিট খালি করে ছেলেমেয়েরা সরে যায়... একবার জ্ঞান আসার পরও আধঘন্টা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম...
পরে খোলামেলা চেয়ার কোচ ধরণের বগি আসলো, আর কাউকে পড়ে যেতে দেখিনাই
ফেইন্ট হবার দারুন উপাকারিতা আমিও একবার পাইছিলাম, পোষ্টে লেখার জন্য জমা রাখলাম আপাতত
ভালো কথা, ইঞ্জিনে উঠেন নাই কখনো? আমার এক বান্ধবী ষোলশহর স্টেশন থেকে ইঞ্জিনের নিয়মিত যাত্রী ছিলো। ট্রেনের লোকোমাস্টার আব্বাসভাইকে মনে আছে নিশ্চয়ই। উনি একদিন বলছিলেন "দীপাআপা ট্রেন চালায় নিতে পারবো "
আপনার বান্ধবী এখন কোথায় আছে? ওনারে লাল সেলাম। ট্রেনের ছাদের যাত্রী হইছি কয়েকবার, কিন্তু ইঞ্জিনের যাত্রী হইবার দুঃসাহস করি নাই কখনো
বান্ধবী আছে মুরাদপুরে। তারে লাল সালাম পৌঁছায় দিবো।
আপনি নির্ঘাত বটতলীর যাত্রী ছিলেন। আমি ঝাউতলার। ষোলশহরের একটা গ্রুপ বগিতে বগিতে চান্স না খুঁজে সোজা ইঞ্জিনে চড়ে বসতো। আব্বাস ভাই মিনমিন করে বলতেন অন্তত সামনের একটা কাঁচ যেন ভীড়ের চাপে আড়াল না হয়... সেই ওনাকেও কয়েক বছর আগে ছুরি মারে কিছু ছাত্র...
হ আমি বটতলীর যাত্রী ছিলাম। সেই অচেনাও কিন্তু ঝাউতলার নামছিল। আপ্নাদের কোন প্রতিবেশী আপা হইতারে
কিন্তু ড্রাইভার আব্বাস ভাইরে চিনলাম না। তবে একবার মোটা করে এক ড্রাইভাররে জেট বিমানের বেগে ট্রেন চালানোর দায়ে ফতেয়াবাদ নামিয়ে কিলাইতেছিল পোলাপান, উনি না তো?
আরে কাহিনী কোন্ সালের কন তো! দেখি চিনতে পারি কিনা
না, মোটাতাজা উনি আব্বাস না। দুবলা কিছিমের ছিলেন।
কাহিনী ৯২-৯৩ সালের হবে। আমরা তখন থার্ড ইয়ারে বোধহয়। আপনারা ঢোকার আগে।
আহারে, অল্পের জন্য মিস করছি।
ম্যাক্সিম গোর্কি একটা ছোটোগল্প পড়সিলাম , সেও আপনার মতো লাস্টের প্যাড়ায় ফাটায়া দিয়া গেসিলো , গল্পটা আমার এখনো মনে আছে , আজীবন থাকবে। আপনারটা আজীবন থাকবে গ্যারান্টি দিতে পারতেসি না , তবে খুব ভালো যেহেতু লিখসেন , অনেকদিন পর্যন্ত রাখা উচিত।
আহারে প্রেম , এই জীবনে আর হইলো না .......
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এত বড় সার্টিফিকেট দেবার জন্য। ভাল থাকবেন
সিরাম সিরাম সিরাম।
আপনেও তো দেখি আমাগো দেশাইত্তা ভাই!! চাঁটগাইয়া।
আমি ভার্সিটিতে ৩/৪ বারই গেছি। ২ বার শাটল ট্রেনে আসছি। পোলাপাইনের কখনো অভাব হয় নাই।
সিট সবসময়ই ম্যানেজ হইয়া যায়। 
ইস। কখনো কারো বাতাস খাওয়া হইল না।
কপাল ভাই আপনের!
কপালের দোষ নাই, সব গরমের দোষ
আহা !
..এইসব ছোটোখাটো মায়া খুব ভালো লাগে....
বসন্ত বাতাসে সইগো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে বন্ধু বসন্ত বাতাসে।
মন্তব্য করুন