বেড়াল এবং বৃক্ষ কথন

ঘরে ইদানিং ইদুরের উৎপাত খুব। ডিশ আর নেটের ক্যাবল বেয়ে আশপাশের ফ্লাট থেকে তাদের আগমন। রাত দশটার পরই আমাদের বাড়িটা হ্যামিলন হয়ে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুটুরখাটুর রূপ নেয় ধুপ ধাপে। রান্নাঘরে হাড়ি পাতিল উল্টে যায়। ডাইনিং টেবলে হুটোপুটিতে নামে জেরীর দল। প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবই ব্যর্থ। জানালা টাইট করে বন্ধ রাখা, ক্যাবল বদলানো- কোনো কাজেই এলো না। তারা ঘরেই ঘাটি গেড়ে বসেছে। ইদুর মারার বিষ, ছোটো ছোটো গম দানা সেভাবেই পড়ে থাকে। রাজকন্যার আবার মাটি থেকে খুটিয়ে খাওয়ার একটা বদভ্যাস আছে, সেদিকেও নজর রাখতে হয়।
আমার রাতজাগা অভ্যাস। লেখালেখির সময় ওটা। আর শব্দদুষনের পুরোটা আমার উপর দিয়েই যায়। মাঝে যখন কম্পিউটারের ফোকর গলে কয়েকটা তারও কাটা গেলো আর থাকতে পারলাম না। নীচে পিচ্চি একটাকে ধরে ৫০ টাকার লোভ দেখালাম। যে একটা বেড়াল নিয়ে আয়তো, বাচ্চা দেখে। বলতেই যা দেরি, সকাল হতেই বাবু হাজির। কাপড়ে মোড়ানো এক মিউয়ের বাচ্চা। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তাকে স্বাগত জানালো না কেউই। এতো ছোটো বেড়ালকে উল্টো ইদুর খেয়ে ফেলবে, এটা যেখানে সেখানে হেগে নোংরা করবে- ইত্যাদি আপত্তির মুখে বললাম। দেখি কয়টা দিন। না হলে বিদায় করে দেব।
জুতার বাক্স সাইজ করে বেড়ালের বিছানা তৈরি হলো, পুরানো কথা দিয়ে গদি। রাজকন্যা পাশে বসে তইতইতইতইতই জাতীয় এক বিচিত্র শব্দ করে আঙুল দিয়ে দেখায় বেড়ালছানা, আর দেখে তার বাবার কাণ্ড। ১৩ টাকা খরচ করে একটা আড়াইশো গ্রামের দুধ নিয়ে আসা হলো। সেটা কেনো মেলামাইনের বাটিতে দেওয়া হলো এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে এক রাউন্ড। আমি আমার কোলে বসিয়ে বেড়ালের গলায় চুলকে দিই। গড়গড় করে সে সন্তুষ্টি জানায়। পাশ থেকে উড়ু মন্তব্য আসে- নিজের মেয়ের খবর নাই, বিলাইয়ের বাপ সাজছে! ১০ টাকা দিয়ে একটা রাবারের বল আনি। ওটা দিয়ে খেলে আমাদের নতুন অতিথি।
মাঝে সোফায় সে টয়লেট সারে। কেউ দেখার আগেই ঝটপট ব্যবস্থা নিই। সেরাতে কোনো ইদুর নামে না। পরদিন স্ট্যাটাস তাই একটু উন্নত হয় বেড়ালের। মা নিজেই একটা বাটি পরিষ্কার করে দুধ দেয়। ভাই বউ এসে মাছের কাটা দিয়ে ভাত মাখায়। সমস্যা শুধু রাজকন্যার মা'র। বেড়ালটা তার পায়েও মুখ ঘষতে চায়। সে আউ করে লাফিয়ে ওঠে, তারপর গালাগালি- এটাকে সরাতে হবে। হাউকাউয়ে অস্থির চারপাশ। বিছানার নীচ থেকে আমার একজোড়া দামী কনভার্স বের করে এনে দেখায় বেড়ালের কাণ্ড- হাগু মাখানো। তারপরও বেড়ালটা আরো দিন দুই টিকে যায়। রাতে এসে বসে থাকে আমার কোলে। আমি গলা চুলকে আদর দিই।
আজ ঘুম থেকে উঠে শুনি সে নেই। হুকুম শুনে বুয়া বাইরে ফেলে দিয়ে এসেছে। তুমুল রাগে আমার শরীর কাপে। বুয়াকে জিজ্ঞেস করি কোথায় ফেলেছে। নীচে যাই দৌড়ে। না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। মাস কয়েক আগে রাসেলের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে দেখা একটা দৃশ্য মনে পড়ে। বাচ্চা একটা বেড়ালকে গলায় দড়ি দিয়ে টেনে হেচড়ে নিচ্ছে একদল শিশু। আমার বয়সী একটা মানুষ মান সম্মান রেখে যতোটা যেভাবে খুজতে পারে, আমি তাকে খুঁজে যাই। পাই না। ফিরে এসে আমার খুব কান্না পায়।
অনেক আগে আমাদের ঘরের পাশে একটা পেপে গাছ লাগিয়ে ছিলাম। সেটা একসময় বড় হয়েছিলো। বেশ যত্ন নিতাম। একদিন আমাদের বুয়া সেটা দা দিয়ে কেটে ফেললো। তার কথা পুরুষ গাছ নাকি গৃহস্তের অকল্যান করে। নিষ্ফল আক্রোশ আর পরম মমতাভরা আবেগে খুব কেঁদেছিলাম। সেই কান্নাটাই ফিরে এলো আবারও। পোস্টটা লিখতে লিখতে খোলা দরজার দিকে বারবার তাকাচ্ছি। সে কি আসে! আমি তো শুনছি তার ডাক! তবে নিশ্চিত জানি- সে ফিরবে না আর।
ছবি: দেয়ালে তেলাপোকার দিকে শিকারী চোখে তাকিয়ে সে





খুব ভালো লাগল বস।
অনেক ধন্যবাদ, ছবি এড হয় না কেন? প্রথম পোস্টে তো হইছিলো
আজ সকালে দেখলাম এক বস্তির মহিলা কুকুরের বাচ্চা মনিষের বাচ্চার মট করে কোলে নিয়ে বিড়ি ফুকতে ফুকতে যাচ্ছে। কুকুরটা এত সুন্দর করে কাধে শুয়ে আছে ঠিক যেন মানুষের বাচ্চা।
আমিও ওইটারে সেইভাবেই রাখতাম
আমারও একখানা বিড়াল ছিল এক কালে? কই যে হারাল
আমার খুব মন খারাপ
আমার ছোটবোন পালতো একসময়
আমাদের কিচেনও ইদুরের অভয়ারণ্য। ঐদিন রাতে লাইট না জ্বালিয়ে কিচেনে গেলাম। বিশাল এক ইদুর হাই জাম্প দিয়ে ফ্লোরে পড়লো। আমাদের দেখে ইদুর একদিকে দৌড় দিলো , আমি আওয়াজ শুনে অন্যদিকে দৌড় দিলাম। পরে খুবই অপমানিত বোধ করলাম ইদুর দেখে এমনি দৌড় দিলাম!! পরে লাঠি নিয়ে তাকে খুজলাম, পেলাম না, মনে হয় হিজরত করছে।
আমার পোষা তেমন কিছু ছিলো না, তবে ছোট বেলায় একটা মুরগী ছিলো। আপনার লেখাটা আসলে মন খারাপ করা লেখা। করুন রস বোধহয় একেই বলে।
আমার অভিজ্ঞতাও কমবেশী একই। তবে একটা মজার ব্যাপার খেয়াল করলাম। আগে ছিলো তেলাপোকার উপদ্রব, ইদুর আসার পর সেটা একদমই নেই
ভালো লাগলো
ধন্যবাদ আপু
এতো জীবন্ত লেখাটা! বেড়ালটাকে ফিরে পেলেন, পিয়ালভাই?
স্কুলজীবনে একবার রাস্তা থেকে একটা পিচ্চি কুকুর ধরে নিয়ে এসেছিলাম, এতো মায়াবী ছিলো, না খেতে পেয়ে শুকিয়ে গিয়েছিলো। কয়েকদিনের মধ্যে একটু তরতাজা হয়ে উঠলেও সে ছিলো ভীষণ ঘরকুণো আর ভীতু। বাইরে কোন কুকুরের ডাক শুনলেও এক লাফে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে লুকিয়ে যেতো। আসলে ওই একটুখানি নিশ্চিন্ত নিরাপদ জীবন সে হাতছাড়া করতে ভয় পেতো! সত্যজিতের বাদশাহী আংটির কুকুরের নাম অনুসারে তার নাম রাখা হয়েছিলো বাদশা। আমার দাদী বলতেন, ফকিরেরও অধম একটা কুকুর তার নাম আবার বাদশা! দাদীর ধারণা ছিলো ঘরে ফেরেস্তা আসবেনা কুকুর থাকলে তাই বাদশাকে তাড়ানোর সব রকম কায়দা প্রয়োগ করা হয়েছিলো। আবার আমি খুঁজে নিয়ে আসতাম অথবা সে নিজেই কীভাবে যেন ফিরে ফিরে আসতো। তারপর একদিন একটা পিচ্চিকে দিয়ে চটের বস্তায় পুরে তাকে অনেক দূরে নিয়ে ফেলে আসা হয়েছিলো যেন রাস্তা শুঁকে শুঁকে ফিরতে না পারে... আমরা কী নিষ্ঠুর...
অনেক ধন্যবাদ নুশেরা, আপনার মন্তব্যটা আলাদা পোস্ট হওয়ার যোগ্যতা রাখে। না আপু, আর পাইনি বেড়ালটা
মায়া লাগছে। ইঁদুর রাজকন্যার মায়ের পায়ে কামড় দিক, কি বলেন পিয়াল ভাই?
আপনার প্রার্থনাটা লাগুক। আমার বউর জল ঘোলা কইরা খাওয়ার অভ্যাসটা বহুত পুরানো, তাইলে দেখা যাবে সে কাটাবন গিয়া সিয়ামিজ ক্যাট একটা কিনে নিয়ে আসছে। তবে আমার ভয় রাজকন্যারে না কামড়ে দেয় কখনও
আমরার একটা বিলাই আছিলো। ম্যাচো নাম ছিলো। বেচারা চোখ ফুটার সময় আমার ছোট ভাই চুরি কৈরা আনছিলো। চোখ বুজা পর্যন্ত আমাগো লগেই ছিলো। বড় ভালা বিলাই ছিলো। বাবা মা ফিরার সময় সে ক্যামনে জানি আগেই টের পাইতো আর দৌড়াইয়া গিয়া রাস্তার মাথা থেইকা ম্যাও ম্যাও করতে করতে আগাইয়া আনতো। তার আবার খাওনের একটা বাটি ছিলো । সেই বাটি ছাড়া সে খাইতো না। জম্পেশ লেখা হৈছে পিয়ালদা।
অঃটঃ রাজকন্যা কিরাম আছে?
ধন্যবাদ পদ্ম, এইটার তো নামও রাখার সময় পাই নাই :(
রাজকন্যা ভালোই আছে, দুষ্ট হইছে খুব। তবে একটু ফাপড়েও আছে। ওরে আল্টিমেটাম দিছি যদি কথা কইতে না শিখে তাইলে জন্মদিন বাতিল
কোন কিছুকে এক মুহুর্তের জন্য ভালোবাসলেও আত্মার সাথে একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরী হয়। সেই বন্ধনে টান পড়লে ভাঙ্গনটা একটু বেশীই হয়।
লেখাটা খুব ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ, ব্যাপারটা আসলেই সেরকম। আমার ভালোলাগার জিনিস খুব বেশী নেই যাই আছে তাই আকড়ে রাখি, কিছু হারালে কষ্ট পাই খুব
মুগ্ধ হয়ে পড়লাম।মনটা খারাপ হয়ে গেলো।ছোটবেলায় আমার একটা বিড়াল ছিলো।নানুবাড়ি থেকে এনেছি।আমার প্রিয় সঙ্গী।কোলে বসে খেত..খাটে ঘুমাত।শীতের সময় লেপের নীচে।যখন বাচ্চা হলো..বাচ্চা নিয়েই কোলে বসে থাকত।নামাজ পড়তে নিলেই জায়নামাজে উঠে কোলে বসত।মা খুব বিরক্ত হতো।দাদী বলতো....ফালাছ না কেন বিলাইডা?এমুন জালায়!নামাজ রোজা অইব নি এই বাড়িত?মাইনসে বিস্কুট খাইতে পায় না তরা বিলাইরে খাইতে দেস!!!সেই বিড়ালটা একদিন মরে গেলো বুড়ি হয়ে।খুব কেঁদেছিলাম।আবার মনে পড়লো আজকে।
দারুণ মন্তব্য, ধন্যবাদ জয়িতা
বিলাইডার লিগা খারাপ লাগ্লো :(
আমাগো বাসা হইলো পুরা চিড়িয়াখানা। চিটাগাং এ যখন আছিলাম তখন অনেক বড় বাসা আছিলো আর টানা বারান্দা আছিলো। তখন রেলিং এর এক পাশে আব্বা আমাদের নিয়া নেট কিনে এনে খাঁচা বানিয়ে মুরগী পালতো। খরগোশ এতোগুলা আছিলো আর প্রত্যেক মাসে এতোগুলা বাচ্চা দিতো যে আম্মার নামই হয়ে গেছিলো খরগোশ আন্টি :) ছোটো বেলা থেকে আরেকটি জিনিস কমন, সেটা হলো পোষা টিয়া পাখি। আমাদের বাসায় সবসময় ছাড়া টিয়া পাখি থাকে, মারা গেলে কিংবা হারিয়ে গেলে আরেকটা বাচ্চা কিনে পোষা হয়। এই ঢাকা শহরে এই শখ মেটানোর উপায় কই। তবুও এই ষোলোশো স্কয়ারফিটের ঘরেও দুটো টিয়া, তিন জোড়া কবুতর, এক জোড়া মুরগী, এক জোড়া কচ্ছপ, এক জোড়া লাভবার্ড, এক গাদা মাছভর্তি ছোটো ছোটো তিনটা একুরিয়াম আর একটা ঘুগু পাখি --- এরা আমাদের সংসারেরই একটা অংশ :)
মনে করাইয়া দিলেন, আমার বাপে একসময় সাপও পালছে জারে কইরা। আর গিনিপিগ, খরগোস, কুত্তা, পাখী এইসব তো নিয়মিতই। শেষ ছিলো বাজরিকা। একশো পাখী একদিন ছাইড়া দিছে
বিড়াল কথন ভালো লাগলো।
আমাদের আগের বাসাটায় প্রচুর ইঁদুরের উৎপাত ছিল। একদিন ছোটবোনের বান্ধবীর বাসা থেকে একটা বিড়ালছানা ধরে আনা হলো, সেই পিচ্চিকে পোষ মানাতে বেগ পেতে হয়েছিল খুব। পিচ্চিটা কোন শাহী বিড়ালের বংশধর হতে পারে, কারন ভুনা মাছ মাংস ছাড়া কিছু খায় না। কাটাকুটা ছুয়েও দেখবে না। আমার ছোট বোনটি ওই বিড়ালের সকল শাহী যোগানদার। তবে যাই হোক, কোনমতে পোষ মানালেও ইঁদুর ধরানোর কাজে লাগানো গেল না তাকে। চট দিয়ে, জুতোর বাক্সের মধ্যে স্পেশাল বিছানা দেয়া হলেও মাঝরাতে কখনো পানি খেতে উঠলে দেখি ড্রইংরুমের সোফায় আরামসে ঘুমোচ্ছে খোকাবাবু।
বছরখানেক পর একরাতে নিয়ম ভঙ্গ করে সে প্রচন্ড ডাকাকাকি করছে আমাদের খাটের কিনারে এসে। সবাই জেগে উঠে বাতি জ্বালিয়ে দেখে বিল্টু মিয়া(বিড়ালছানার নাম) পুচকে একটা ইঁদুর ধরে রেখেছে। আমাদের দেখে একগাল হাসিও দিল বোধহয়। "এই দেখোনা কেমন সুন্দর ইঁদুর ধরেছি"। তারপর মুখ থেকে ছেড়ে দিয়ে টম এন্ড জেরী খেলা দেখানো শুরু করলো। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে তুমি খেলা দেখাও। ব্যাটা। ইচ্ছে হলো একটা গদাম দেই বিড়ালটাকে। কিন্তু মা বললো, থাক... বেচারা শিখছে বোধহয়।
দারুণ বললেন। আমারটাও সেই সার্কাস দেখাতো, আমার সিগারেটের প্যাকেট, পরে কিনে দেওয়া বল দিয়ে।
মন্তব্য করুন