ইউজার লগইন

কুর্কুমা বাটো মেন্দি বাটো ----- ৩

বিয়ের আগের দিন সকাল সাড়ে সাতটার বাসে চড়ে রওনা দিলাম কোশালিনের উদ্দেশ্যে। সাথে একটা ছোট ব্যাগ আর ডজনখানেক সফর সঙ্গিনী , প্রায় নয় ঘন্টার জার্নি খুব মেজাজ খারাপ নিয়ে শুরু হলো , বাস ভর্তি লোকজন কিন্তু সুন্দরী সফর সঙ্গিনী নাই একটাও। সুন্দরী তো দুরের কথা ত্রিশের নিচেই কেউ নাই। জানলা দিয়ে বাইরের প্রাকৃতির ফটু তুলতে তুলতে পুরাটা রাস্তা কাটাইলাম। বাইরে মন খারাপ করা থেমে থেমে ঝিরঝির বৃষ্টি, এরমধ্যেই বিকাল সাড়ে চারটায় কোশালিন নামলাম। একেবারে উত্তরের মফস্বল শহর একটা, ছয় কিলোমিটার দুরেই বালটিক সাগর, শহরটা ছিমছাম সুন্দর এবং তুলনামূলক বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। লোকজন অনেক কম এবং চমৎকার চমৎকার স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ধাচের বাড়ি-ঘর সারা শহর জুড়ে।

ফোন দিলাম লীনাকে, উচ্ছসিত কন্ঠে বললো -
- যাস্ট সাত মিনিট অপেক্ষা করো দোস্তো আমি আসছি ।
বলেই ফোন রেখে দিলো, একটা সিগারেট ধরিয়ে চিন্তা করতে থাকলাম সাত মিনিট আবার কি রকম হিসাব !
ঘড়ি ধরে সাত মিনিটের মাথায় দুরে লীনাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখা গেলো, লীনার কোকড়া চুলের রং বদলে গেছে ইতিমধ্যে, আগে হালকা বাদামী ছিলো এখন লালচে কমলা। কিছু বুঝে উঠার আগেই আশপাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে তার শহরে স্বাগতম জানালো।
বাসায় যাবার পুরোটা পথে বকবক করে আশেপাশের জায়গাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকলো। গাড়ি থেকে নামলাম একটা ছিমছাম চারতলা বাড়ির সামনে, এলাকাটা একটু পাহাড়ী উঁচু নিচু রাস্তা কিন্তু বেশ ছিমছাম। নেমেই গেটের ভিতর শেফার্ডের সাথে আমার ভালো মতন পরিচয় করিয়ে দিলো । ঘরে ঢুকে সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় দোতালায় ফিসফিস করে বললো এইটা আমার বাবার ফ্লোর এখানে কখনো শব্দ করবা না, বাবার হার্টের সমস্যা আছে। তিনতলায় তিনটা বিশাল বিশাল বেড রুম । এরমধ্যে একটাতে আমাকে ঢুকিয়ে ম্যাট্রেসের উপর একটা স্লিপিং ব্যাগ দেখিয়ে বললো,
- এখানে তুমি ঘুমাবা । তোমার ব্যাগ রেখে উপরে চলো..
ব্যাগ রেখে চারতলায় গিয়ে দেখি পাঁচ ছয়জন ছেলে-মেয়ে তুমুল আড্ডা দিচ্ছে। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে লীনা বললো,
- এই ফ্রীজে যত কিছু আছে , এবং ঐপাশে যত খাবার আছে এবং কাবার্ডের উপর যত সিগারেট আছে সব আমার বন্ধুদের জন্য মানে তোমাদের সবার জন্য সুতরাং যখন যা লাগবে যাস্ট নিয়ে খেয়ে ফেলবা, কাউকে জিজ্ঞাসা করার কিছু নাই । আর ভাল কথা , আমি জানি তুমি পোর্ক খাও না সুতরাং ফ্রীজে পোর্কের তৈরী কোন খাবার নাই , নিশ্চিন্তে সব খেতে পারো। আরেকটা কথা এই রুমে যতখুশী সিগারেট খেতে পারবা কিন্তু ব্যালকনিতে সিগারেট খাওয়া নিষেধ।
সেখানেই আড্ডায় জমে গেলাম, একজন একজন করে আরো কয়েকজন এসে যোগ দিতে থাকলো। সন্ধ্যে নয়টার দিকে সবাই মিলে ঠিক করলো সাগর পাড়ে যাবে । হৈ হৈ করে সবকটা মিলে তিনটা গাড়ি বোঝাই করে বালটিকের পাড়ে রওনা দিলাম। লীনা আমাকে তার গাড়িতে নিলো, গাড়ি চালাতে চালাতে চিৎকার করে গান গাচ্ছিলো সারা রাস্তায়, একসময় আমাকে বললো,
- তোমাদের দেশি একটা গান শোনাও। মিনমিন করে গাইলে হবে না আমার মত গলা ছেড়ে গাইতে হবে, শুরু করো ।
বেচারী তখনো জানে নাই আমি কি জিনিস ! হেড়ে গলায় গান গাওয়া আমার কাছে ওয়ান-টু'র ব্যাপার।
শুরু করলাম হ্যাপী আকন্দের 'চলো না ঘুরে আসি' দিয়ে শেষ হতেই হাইওয়ের পাশে ঘ্যাচ করে গাড়ি থামিয়ে লীনা বললো ,
- ঐ ব্যাটা ! তুমি কি গান গাও নাকি !! আগে বল্লা না কেন !!! যাইহোক , গানটা মারাত্মক লাগছে আমার এই নাও তোমার পুরষ্কার বলে আমার হাতে এক প্যাকেট মার্লবরো ধরিয়ে দিয়ে বললো আরেকটা শুরু করো ।

মিনিট পনের পরে সাগরে কাছে পৌছলাম, সাগর দেখা যাচ্ছে না কিন্তু প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস বুঝিয়ে দিচ্ছে সাগরের উপস্থিতি। দু'মিনিট হেঁটেই পুরনো বন্ধুর দেখা মিললো, বালটিক সাগর । হালকা কাপড় পড়ে চলে আসছিলাম আমি প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাসে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলাম। ওদিকে বিয়ের কনে বালুর উপর তার আরেক বন্ধুর সাথে জুডো শুরু করে দিয়েছে। পরের দিন এই মেয়ের বিয়ে কে বলবে !

বাসায় ফিরে লীনা বন্ধুদের নিয়ে পাড়া দেখাতে বের হলো, প্রতিটা গলি প্রতিটা বাসা নিয়ে তার শৈশবের অনেক গল্প। তার ছোট বেলার খেলার মাঠ , মাঠের পাশে বিরাট গাছে ছোটবেলার গাছবাড়ি। বড় এক পাথরের উপর মাথা ফাটিয়ে ফেলার সেই পাথরটা। মাথার উপর তখন হাজার তারার রাতের আকাশ। হৈ-হুল্লোর করতে করতে আবার সব বাসায় ফিরলাম, বাসায় ফিরে চরতলার হলরুমে আবার আড্ডা শুরু হলো । এমন সময় লীনার বাবা আড্ডায় হাজির হলো । ৫৪ বছর বয়সী পেটানো শরীরের ভদ্রলোক। গমগম স্বরে সবাইকে 'দোব্রে ভিয়েচর' জানালো। একটা চেয়ার ছেড়ে দেয়া হলো উনার জন্য, লীনার বাবা আসার পর আড্ডার ভলিউম একটু নেমে গিয়েছিলো । উনি হাসি মুখে বললো - তোমরা ভলিউম কমিয়ে দিলে কেন ? আমি কিন্তু এখনো তোমাদের মত তরুন .. অবশ্য শরীরের বয়সটা সামান্য একটু বেড়ে গিয়েছে।
কথা শুনে সবাই আবার চিৎকার চেচামেচি শুরু করলো ।

সবার সাথে টুকটাক কথা বলে আমার কাছে এসে ভদ্রলোক আটকে গেলেন । লীনাকে বললেন ,
- তুই তো কখনো বলিস নাই তোর বাংলাদেশী বন্ধু আছে !!
লীনা দুষ্টামির হাসি দিয়ে বললো,
- এখন বল্লাম ।
আমাকে উনি হাসি মুখে হুকুমের স্বরে বললেন,
- মাই সান , এখানে আমার পাশে তোমার চেয়ারটা নিয়ে আসো, তোমার কাছে আমার অনেক কিছু জানার আছে ।
তারপর প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে আমার সাথে কথা হলো উনার । প্রচন্ড রকমের মেধাবী লোক । বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাসা ভাসা জানতেন, আমাকে পেয়ে পুরোটা জেনে নিলেন (উনার সাথে কি কি কথা হয়েছে পুরোটা বলতে গেলে সেটা আরেক পর্বের সমান হবে)।
যাবার সময় বললেন ,
- আমাদের গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হয় নাই । আশা করি কাল আমরা আবার আড্ডা দিবো।

একে একে সবাই উঠে ঘুমাতে চলে গেলো । শেষে আমি লীনা আর মারেক নামে লীনার ছোটবেলার এক বন্ধু রইলাম। মারেক ছেলেটা লন্ডন থাকে, বন্ধুর বিয়েতে চলে আসছে এখানে।

এখানে একটা কথা বলে রাখি , পুরো বাড়িতে বয়স্ক লোক বলতে একমাত্র লীনার বাবা। কনের বাড়ি , পরদিন বিয়ে অথচ সারা বাড়ি ভর্তি শুধুমাত্র কনের বন্ধু-বান্ধব । এক ফাঁকে লীনার কাছে তার মায়ের কথা জানতে চাইলাম। লীনা স্বাভাবিক গলায় বললো ,
- আমার বাবা-মা'র ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমার ছোট বোনটা মা'র সাথে থাকে, এ শহরেই। আমি হচ্ছি বাবার মেয়ে , বাবা আমার সবকিছু এবং আমিও বাবার সবকিছু। কাল বিয়েতে আমার মা আর ছোট বোনটা আসবে তুমি তখন তাদের দেখতে পাবে।
আমি বোকার মত আরেকটু আগ্রহ দেখালাম ... লীনা বললো,
- না, মা বিয়ে করেনি । আমার ধারনা বাবা-মা দু'জন দু'জন কে এখনো ভালবাসে, তাও দু'জন আলাদা থাকে। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে আমার মা একটা প্রচন্ড রকমের উচ্চাকাংখী মহিলা। তার চাহিদার শেষ ছিলো না। আমাদের এই বাড়িটা দেখছো এটা আমার দাদা বানিয়েছে । আমরা দু বোন এখানেই শৈশব কাটিয়েছি তার পরেও বাবাকে মা বাধ্য করেছে শহরের উচ্চবিত্ত এলাকায় আরেকটা বাড়ি কেনার জন্য। বাবা পরে সেখানে বাড়ি বানিয়েছে .... এবং সেই বাড়িতে ওঠার কয়েক মাসের মধ্যেই বাবা-মা'র ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

পরদিন মেয়েটার বিয়ে, তাই মন খারাপ করা বিষয়টা নিয়ে আর ঘাটালাম না। শুভ রাত্রি বলে ঘুমাতে চলে গেলাম।

......... চলবে

পোস্টটি ১৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


লেখা চমৎকার!

লীনার বাবার সঙ্গে আড্ডা নিয়ে আরেকটা পোস্ট আসুক, সেটা আবার বললাম। তবে স্টকের লেখা দিতেই এতোদিন লাগলে ক্যাম্নে কী!

রোবোট's picture


কি খবর? শহীদ হৈসো নাকি?

বিষাক্ত মানুষ's picture


সামুতে তো সেই কবে থিকাই শহীদ।
সেইটা দুঃখ না .. দুঃখ হৈলো জানা আমাকে তার শত্রু ভেবে বসে আছে। জানার মাথায় কত ছটাক মগজ আছে সেইটা এখন অনায়াসে মাপা যাচ্ছে

রোবোট's picture


সেই শহীদ না, বৈবাহিক শহীদ। ঐটাতো জানি। 

 

বিষাক্ত মানুষ's picture


আরে নাহ ... মাথা খারাপ !! এত এত সুন্দরীদের মাঝে আমি অনেকদিন জীবিত থাকতে চাই Tongue

কাঁকন's picture


নানা আবার পোস্ট না পইড়া মন্তব্য কর্সে 

কুকুর্মা  বাটো মেন্দি বাটো দেইখা মনে কর্সে এইটা বিমার বিবাহ 

রোবোট  আর মানুষ হইলো না আপসুস

বিষাক্ত মানুষ's picture


চরম দৌড়ের উপ্রে আছি গো আফা Sad
কত লেখা মাথায় আছে সেগুলোও সময়ের অভাবে হচ্ছে না.. কর্পোরেট চাকরদের মনে হয় লেখা লেখি করতে নেই , ব্যস্ততা একেবারেই সময় দেয় না Sad

~স্বপ্নজয়~'s picture


চামে বইলা দিলো যে বিমা গান করে


বিষাক্ত মানুষ's picture


হে হে হে হে Wink

১০

~স্বপ্নজয়~'s picture


চামে বইলা দিলো যে বিমা গান করে
তবে তাই হোক ... এইখানে বিমার গাওয়া একটা গান (আমার ফেবারিট)
http://www.esnips.com/doc/2a62e500-532e-4306-8711-809db864d423/Balark_-_Psychovina

এনিওয়ে ... পর্ব ৪ কবে আসপে? অপেক্ষায় আছি ...

১১

বিষাক্ত মানুষ's picture


আরে !! এইটা তো আমি না .. আমি এত বাজে গান গাই না Cool

১২

টুটুল's picture


চলুক ... তবে লীনার বাবার সঙ্গে আড্ডা নিয়ে নতুন পোস্ট আসুক ... সব জানতে চাই Smile

পিকনিকে বিমার গান শুন্তে চাই Smile

১৩

বিষাক্ত মানুষ's picture


আমি তো সারাজীবন চাপাবাজী কইরা কইছি আমি গান জানি .. Wink

১৪

নীড় সন্ধানী's picture


উত্তম কাহিনী...............পড়ে গেলাম Smile

১৫

বিষাক্ত মানুষ's picture


থ্যাংকু

১৬

সোহেল কাজী's picture


সবগুলো পর্বই দারুন উপভোগ করছি।  বর্ণনার সরলতা মুগ্ধ করলো।
চলুক

১৭

বিষাক্ত মানুষ's picture


থ্যাংকু থ্যাংকু Smile

১৮

হাসান রায়হান's picture


পুরাটা শেষ করে ফেলো এইবার।

১৯

সাঈদ's picture


দারুন । । কিন্তু এত দেরী করে করে দেন কেন ?

২০

জেবীন's picture


এদ্দুর পর্যন্ত পড়া আছে...... নতুনটা জলদি আসুক...

আর বিমা'র অইটা ছুটবেলার গান, তাই এমন লাগছে, বড়ো বিমা'র গলা এখন অনেক ভালা।। Laughing out loud

২১

শওকত মাসুম's picture


বিমার গান শুনতে চাই নিরাপদ দূরত্বে খাইকা।

২২

মামুন ম. আজিজ's picture


GHUM

২৩

তানবীরা's picture


এধরনের গল্পের প্রতি আমার আকর্ষন প্রচুর।

চলুক জোর গতিতে

২৪

জ্যোতি's picture


সবগুলো পর্বই দারুন।এদ্দুর পর্যন্ত পড়া আছে...... নতুনটা জলদি আসুক...

২৫

আহমেদ রাকিব's picture


সবার অনুরোধ রাইখা লীনার বাবার সাথে কথোপকথান নিয়া একটা পোষ্ট দিয়া ফালান। এত সরল সাবলীল বর্ণনা, পড়তে খুব ভালো লাগছে।

২৬

বিষাক্ত মানুষ's picture


ঠিকাছে সেইটা আনবো লেখায় Smile

২৭

সাঁঝবাতির রুপকথা's picture


এইটাতে কি লিখুম খুইজা পাইতেসি না ...Thinking

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.