শুধু একাকীত্বটুকু যেন সে কেড়ে না নেয়
ভয়াবহ শীত লাগছে। ভরাগ্রীষ্মে এমন মাঘের শীত কোথা থেকে এলো বুঝতে পারছি না। মনটা জমে আছে একদম বরফের মতো। আর মাঝে মাঝে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। যেন একটা শীতল অভ্যন্তর ধারণ করে আছি শরীরের ভেতর।
সন্ধ্যারাতে কালবোশেখী হয়েছিলো। সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে অনেক জড়াজড়ি করেও আজ মন ভরে নি। মনে হচ্ছিলো এই বৃষ্টিটা সারারাত ধরে ঝরুক। আমি সারারাত বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবো। ঢাকা শহরের ফুটপাথগুলোতে মানুষের ঘরবাড়ি না থাকলে হাঁটতে অনেক আরাম। এখন বৃষ্টির দিন বলে ফুটপাথের ঘরগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। আচ্ছা, ফুটপাথের বাসিন্দারা এখন কই গিয়ে থাকে? বৃষ্টির সময় কি তাদের মাথার উপর থাকে একটুকরো ছাদ?
হাঁটতে হাঁটতে আমি বিকল হয়ে যাওয়া মনটাকে নিয়ে ভাবি। সোনালী জীবন কি আমার জন্য সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে কোনো আলো রেখেছে? ভুল করে? ওর জানা উচিত, আমি আলো পছন্দ করি না। আর সুড়ঙ্গটাকে আমার একটা প্রকান্ড টিটানোবোয়ার পেটের মতো লাগে। আমাকে এটার ভেতর কে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো? আজ আর মনে করতে পারি না। তবে এটা নিশ্চিত যে, আমি সারাজীবন এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটার পেটের ভেতর ছিলাম না। এক সময় আমার একটা নিশ্চিন্ত জীবন ছিলো। সেই মহার্ঘ্য জীবনটাকে আমি অনেক যত্নে হাতের মুঠোয় আগলে রেখেছিলাম। কিন্তু চলার পথে সেটা যে কখন টুপ করে হাত থেকে পড়ে গেছে, টের পাই নি। যখন টের পেয়েছি তখন অনেকদূর চলে এসেছি। আতিপাঁতি করে খুঁজেও তাই সে জীবনটাকে আর কোনোদিন ফিরে পাই নি।
আজকাল তুচ্ছ একটা জীবন বয়ে বেড়াই। সম্ভাবনাহীন, বোঝার মতো একটা জীবন। যে জীবনে সূর্যালোকাবৃত দিনগুলোকে আমি ভয় পাই। আর রাতের প্রথম পর্যায়ে নেট চালাই, তারপর কিছু একটা পড়ি বা দেখি, তারপর সব বন্ধ করে দিয়ে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকি।
তুচ্ছ জীবনের ভালো দিকটা হচ্ছে, এর যতই গভীরে যাই ততই মধু। গভীর রাতের অন্ধকার-নিঃসঙ্গতা যে কি ভীষণ মাদকতাময়, সেটা আমি লিখে কাউকে বোঝাতে পারবো না। তাই রাতের প্রতি আমার আসক্তির ব্যারোমিটার প্রতিদিন একটু একটু করে ওপরে ওঠে।
সেদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর মনে মনে খুশি হচ্ছিলাম ভেবে- আবার সবকিছু শেষে একটা শেষরাত আসবে। আবার আমি অন্ধকারের কোলে সমর্পিত হবো। আমার কাছে ধরা দেবে আরাধ্য একাকীত্ব। যাকে আমি অনেক চেয়ে-চিন্তে মাদার নেচারের কাছ থেকে আদায় করেছি। একাকীত্ব আমার সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি। একান্ত সম্পদ।
আর দিনগুলোকে ভয় পাই কারণ, দিন মানে আরেকটা যুদ্ধের শুরু। আরেকবার রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়া। আরেকবার স্বহস্তে নিজেকে নিংড়ে দিয়ে আসা রাজপথের কোণায় কানায়। আরেকবার একাকীত্ব ঝেড়ে ফেলে জনারণ্যে মিশে যাওয়া।
আমি ঘুরে ঘুরে নিজেকে বিলাই, আর মনে মনে ঘরে ফেরার প্রতীক্ষা করি। অপেক্ষায় থাকি গভীর রাতের। মহাজীবন আমাকে যা কিছু দেয় নি, তা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। শুধু একাকীত্বটুকু যেন সে কেড়ে না নেয়। আর কিছু চাই না।
---





এই গভীর একাকী রাতে কী ভীষণ সুন্দর-বিষণ্ন একটা লেখা পড়লাম! অনেক ধন্যবাদ মীর।
দূরের এক বন্ধুর কল্যাণে একটা বিষণ্ন গান শুনছি একটানা, বাইরে একলা রাত বয়ে যায়, তার ভেতরে এই লেখা...
আপনার জন্য গানটির লিরিক -
__________________
প্রেম মরে যায় মরে যায়
এত কাছাকাছি থেকো না আমার
এত বেঁধে বেঁধে রেখো না আমায়
কাল কী হবে জানি না আজ
মেনে নিয়ে যদি থাকো দুজনে মিলে
দুজনে মিলে আজ চাঁদ দেখা যায়
খোলা উদার আকাশ যদি ছোঁয়া না যায়
প্রেম মরে যায় মরে যায়
যদি উড়ে যেতে চাও, যাও
নেবো তুলে পথের বাঁধন
মন যদি চায়
মন যদি চায় নীল বরষায়
যদি হৃদয় না চায় পাশে থাকা কি যায়
প্রেম মরে যায় মরে যায়...
_____________________
(অনলাইন লিংক নেই বলে শেয়ার করা গেল না। যদিও জানি, শুধু লিরিক পড়ে গানের প্রায় কিছুই অনুভব করা যায় না।)
** মন যদি চায় ভেজো নীল বরষায়
(এই লাইনটা লিখতে ভুল করেছিলাম)
খুব খুব ভাল লাগা একটা লেখা।
অনেকগুলি অনুভূতিই আমার খুব চেনা বলেই হয়তো।
এই লেখাটুকু নিয়ে আমার ভাল লাগা টুকু জানাতেই লগ-ইন করা হল।
আমার ৪ ডিজিট ছোঁয়া মন্তব্যে প্রিয় ব্লগারের জন্য অসংখ্য ভালোবাসা।
একাকীত্ব আমার একটুও ভাল লাগেনা। একা থাকতে ভয় হয়। প্রিয়জনকে হারানোর ভয়।
চমৎকার লেগেছে লিখাটা, তবে কোথাও যেন একটা বিষন্নতা ছাপ।
আপনার সকল চাওয়া পূরণ হোক ...
দারুণ লিখেছেন!!
কী হইছে?
লেখা ভাল হয়েছে কিন্তু ভাই আপনি বড় শীতল লেখা লেখেন। লেখায় জীবনের গতি চাই, রক্ত গরম করা কথা চাই, আনন্দে ভাসবার উপকরন চাই
মনটা কি একটু বেশি খারাপ, বস ?
লেখার কথা আর কী বলবো ?
তথৈবচ
'আশা রেখো মনে দূর্দিনে কভু নিরাশ হয়ো না ভাই, কোনো দিন যাহা ফুরোবে না হায়, তেমন রাত্রী নাই।'
কি হইছে ?
মন ভালো হয়েছে? বিষন্ন কেন এত? কে বকেছে?কে মেরেছে?
কেন জানি মনে হয় একাকীত্ব যেমন উপভোগ করতে পারি অন্য সময়টা তেমন নিবিরভাবে উপভোগ করতে পারি না। একাকী কিছুটা সময় বোধ হয় জীবনে সত্যি দরকার।
মন্তব্য করুন