ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ খেলা...

dhusor godhuli-19_0.jpg

বটতলার হাটের ইজারা নিয়ে হাঙ্গামা আজ নতুন নয়। গত কয়েক মাস ধরেই ঘাটের মাঝি কিংবা হাটের দোকানদারদের সাথে বাদলের বাক-বিতণ্ডা যেন নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। বিনা নোটিশে ঘাটের টোল বাড়ানোর প্রতিবাদে খেয়া নৌকার মাঝি, মাছ ধরার নৌকার মাঝিরা কয়েক দফায় নৌকা বাওয়া বন্ধ রেখেছিল। এই নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ইজারাদার বাদল আর হারু মেম্বরের ভাই মজনুর রেষারেষি লেগেই আছে। ঘাটের মাঝিরা তাদের দাবীতে অনড়, তারা বাড়তি টোল দিবে না। দরকার হলে তারা নৌকা বাওয়া ছেড়ে দিবে। বাদলের অভিযোগ মজনু নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছে।

অনেকদিন ধরে জমাটবাধা বরফ গলাতে আজ দুই পক্ষকে একসাথে বসানো হয়েছে। চেয়ারম্যান বশিরুল্লাহ পাটোয়ারীকে আনা হয়েছে একটা শান্তিপূর্ণ ফয়সালা করতে। নৌকার মাঝিদের অভিযোগ জানতে চাইলে কাজেম মাঝি বলে ওঠে,
-আইজ চল্লিশ বছর ধইরা ঘাডে নাও বাই, কোনোদিন কেউ বেয়াদবি করেনাই। কতদিন পয়সা ছাড়া কত মানুষরে পার কইরা দিছি। এই মানুষগুলার মানসম্মান নিয়া টিইকা থাকাই এহন চিন্তার বিষয়। হেইদিনের পোলা অইয়া বাপের বয়সী এই মানুষটার লগে যে ব্যবহার করছে তার বিচার না অওয়া পর্যন্ত এই ঘাডে কেউ নাও বাইবো না। মোক্তার মাঝিকে সবার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় কাজেম মাঝি।
-বাদল, তোমার কি কওনের আছে? চেয়ারম্যান বলে
-এরা সবাই য্যামনে আমার উপর ক্ষেইপা গেছিল, আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনাই ভাইসাব।
-মাথা ঠিক থাকবো ক্যামনে? শরিলের শক্তি দেহাইতে অইব না? এগো রক্ত ঝড়ইন্যা পয়সা পকেডে না ঢুকলে শক্তি বাড়বো ক্যামনে? মজনু বলে ওঠে
-গাঁটের পয়সা খরচ কইরা ইজারা নিছি কি তামশা দেহার লইগ্যা? বাদল বলে উঠে
-তুই কি প্রথম ইজারা নিছস? তোর আগে আর কেউ এই ঘাডের ইজারা নেয় নাই? এরাম কইরা যহন তহন টোল বাড়াইয়া দিছে কেডা? আবারও মজনু বলে।
-দিন বদলাইয়া গ্যাছে, সবকিছুর দাম বাড়ছে। আমারও তো টাকা উডাইয়া নিতে অইব
-সবকিছুর দাম বাড়ছে আমরাও জানি কিন্তু নাও ভাড়া তো বাড়েনাই! ওরা দিবো কোত্থেইক্যা? কাজেম মাঝি আবার বলে।
দর্শকদের মধ্য থেকে হইচই উঠলে চেয়ারম্যান হাত তুলে সবাইকে থামায়, তারপর সভার কয়েকজনের সাথে পরামর্শ করে বলে, সবার দিকটাই দেখতে হইব। যারা দীর্ঘদিন ধইরা এই ঘাডে নাও বায় তাগো স্বার্থ য্যামন ঠিক রাখতে অইব ত্যামনি যারা টাকা খরচ কইরা ইজারা কিনছে তাগো ব্যাপারডাও দেখতে অইব। সর্বশেষে সিদ্ধান্ত হয় দুই বছরের প্রথম বছর নদীর ঘাট কিংবা হাটের দোকানের কোন ভাড়া বাড়বে না, দ্বিতীয় বছর থেকে বাড়তি ভাড়া কার্যকরী হবে। সভা শেষ হবার ঠিক আগেই মজনু আবার বলে ওঠে,
-বাদল্যা যে এই মুরুব্বির গায়ে হাত তুলল হের কি অইব?
-মনে অয় তোর দরদ উথলাইয়া উঠছে, তুই মনে অয় সাধুপুরুষ? বাদল বলে উঠে
-আমি সাধুপুরুষ না, তয় তোর মতন জুলুমবাজও না
-মুখ সামলাইয়া কথা কইস মজনু, ভালো অইবে না কইলাম। বাদল উঠে তেড়ে আসে মজনুর দিকে। মজনুও উঠে সমানভাবে তেড়ে গেলে হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়। মজনুর সাথে সাথে হারিস, গিয়াস, পলাশও দাঁড়িয়ে যায়। বাদলের সাথের লোকজনও দাঁড়িয়ে তেড়ে আসলে খালেক মেম্বার উঠে এসে বাদলকে ফিরায়। তারপর মজনুর উদ্দেশ্যে বলে, ব্যাপারডার একটা সুরাহা চলতেছিল, তুই মাঝখান থেইক্যা বাগড়া দিয়া ঝামেলা বাধাইলি ক্যান?
-ব্যাপারডা একপেইশা হইতেছিল, তোমার ভাই যে এই বুড়া মানুষটারে মারলো তার তো কোন বিচার অইলো না, কাউরে না কাউরে তো পরতিবাদ করতে অইব!
মাঝিদের পক্ষ থেকে এবার একটা শোরগোল ওঠে। হ, মোক্তার মাঝির গায় হাত তোলার বিচার না অইলে আমরা কেউ বইডা হাতে তুলুম না।
চেয়ারম্যান এবার ধমকে ওঠে, তারপর ক্ষেপে গিয়ে বলে, এতগুলা মানুষের মতামতের যদি কোন দাম যহন তোরা দিবি না তাইলে আমগো ডাকলি ক্যান?
চরকমলের আরজ আলী মাঝি এবার বলে ওঠে- চেয়ারম্যানসাব, আমরা আপনেরে সম্মান করি। আপনে ন্যায় বিচার করেন, আমগো মান সম্মানের ব্যাপারডাও দেখেন!
-ঠিক আছে, এই ব্যাপারডারও ফয়সালা হইব। তারপর বাদলের উদ্দেশ্যে বলে,
-তুমি এই মুরুব্বির কাছে মাপ চাও, আর সবার সামনে ওয়াদা কর এরপর আর এমন ব্যাপার যেন না ঘটে।
বাদল উঠে মোক্তার মাঝির হাত ধরে মাপ চেয়ে নেয়। তারপর মজনুর দিকে কটমট করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সভা ছেড়ে চলে যায়।

শালিসের পর নৌকার মাঝি আর হাটের দোকানদার মধ্যে ফিরে আসে আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য। অনেকদিন পর মানুষের পদভারে আবার মুখরিত হয়ে ওঠে কলাবতী ঘাট। কাজেম মাঝি তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। অন্য মাঝিরা অবশ্য আরও কিছুদিন তাকে ওদের মধ্যে চায়। মোক্তার মাঝি কাজেমের উদ্দেশ্যে বলে,
-তুমি আমগো ফালাইয়া চইলা যাইতেছ?
-আমি আর কই যামু? তোমগো লগে তো সবসময়ই দ্যাহা অইব।
-তুমি থাকলে আমরা অনেক বল পাই, তাই তোমারে আরও কিছুদিন আমগো মধ্যে চাইছিলাম
-পোলাডা একলা দোকান সামলাইতে পারতাছে না, অরে একটু সময় দেয়া দরকার। আমি তো এলাকায়ই থাকুম, তোমরা ডাকলেই আমারে পাইবা। তাছাড়া এহন তো অনেকেই তোমগো সাহায্যে আগাইয়া আসতাছে, আইজ দ্যাহো মজনুই তো তোমগো পাশে আইসা দাঁড়াইলো।
-হ, আমরা সবই বুঝি। সময় বদলাইয়া গ্যালে এই মজনুই আবার আমগো উপরে অস্ত্র ধরতে ছাড়বো না! বাদইল্যার লগে ওর কাইজ্জার লইগাই আইজ অর বিরুদ্ধে কথা কইছে। বলে ওঠে রমেন শীল।

এই চিত্র ওদের জন্য নতুন কিছু নয়, আজকের ঘটনার জন্য যদিও অনেকেই মজনুকে বেশ বাহাবা দিয়েছে, কিন্তু তারা জানে মজনু নিজের স্বার্থেই আজ মাঝিদের পক্ষে কথা বলেছে। দুদিন পর নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব মিটে গেলে বাদলের সাথে এক সুরেই কথা বলবে।

আমাবস্যা রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোটাখালী খালের পাড়ের রাস্তা ধরে তালুকদারের হাটখোলার দিকে হেঁটে চলেছে খালেক মেম্বর আর বাদল। বাদল ভেবেছিল আজকে মজনুরে একটা শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে, তাই ওর দলের লোকজনকে কাছাকাছি থাকতে বলে দিয়েছিল, কিন্তু পারল না বড়ভাইয়েরর জন্য।
-ভাই, তুমি আমারে থামাইলা ক্যান? আইজ অরে একটা শিক্ষা দিয়া ছাড়তাম
-আরে বলদা, সবাই এহন তোর বিরুদ্ধে, হাডের হগগলের সামনে কিছু করলে বিচারে তুই তো হাইরা যাইতি। সামনে ইলেকশন, শুনতেছি এইবার মজনু নাকি মেম্বর পদে খাড়াইব। এই সময় খুব সাবধানে চলতে অইব। এমন কাম করতে অইব যেন সাপও মরে কিন্তু লাডিও না ভাঙে।

চলবে....

আগের পর্বগুলো (নিচ থেকে ধারাবাহিকভাবে) -
• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ...
• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী...
• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু...
• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার...
• ধূসর গোধূলিঃ পঞ্চম পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি
• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প...
• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক...
• ধূসর গোধূলি - চতুর্থ পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা
• ধূসর গোধূলিঃ মায়া
• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
• ধূসর গোধূলি - তৃতীয় পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া
• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন
• ধূসর গোধূলিঃ দ্বিতীয় পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ প্রথম পর্ব

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


সুন্দর!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ শান্ত

তানবীরা's picture


জমে গেছে ..... ইলেকশনের আশায়

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ঘটনার ঘনঘটা সামনে আসছে.. Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।