ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক...

dhusor godhuli-20.jpg

পড়ন্ত দুপুর। সুর্য্যের কড়া তেজ কমে গেছে অনেকটাই। জানালা দিয়ে তাকিয়ে সুবলকে আসতে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো অয়ন। আজ স্কুল থেকে ফেরার পথে মিরাজ বলছিল- উজানগাঙের ওপাড়ে অনেক কাশফুল ফুটেছে। বিকালে ঝাঁকে ঝাঁকে বকের মেলা বসে। তখনই ওরা ঠিক করেছিল আজ নদীর ওপাড়ে যাবে। মিরাজদের বাড়ির সামনে আসতেই দেখে ও রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনে ছুটতে থাকে নদীর দিকে। কোটাখালী খালের পাড় ধরে সরু রাস্তার দু’পাশে বুনো ঝোপঝাড় আর মাথার উপর বড় গাছের ছায়ায় ছায়ায় ওরা এগিয়ে চলে উজানগাঙের দিকে। গ্রামের মধ্য দিয়ে একেবেঁকে খালটি যেখানে এসে নদীর সাথে মিশেছে, সেখানটাতেই একটি কাঠের ব্রিজ। এলাকার লোকজন এই জায়গাটিকে বলে- তেমাথার পুল। এই ব্রিজ পার হয়েই সরু রাস্তাটা নদীর পার ধরে চলে গেছে বহুদূর। এই ব্রিজের পরের গ্রামটির নাম ভবানীপুর। তারপর গৌরীপাশা, চন্দ্রপাশা, ইন্দ্রকাঠী এবং সর্বশেষ প্রান্তে একবারে নদীর পাড় ঘেঁষে গ্রামটির নাম কমলডাঙা।
তিনজনে নদীর সেই মোহনায় এসে দাঁড়ায়। তখন জোয়ার এসেছে মাত্র। হঠাৎ মিরাজ যেন কিছুটা আনমনা হয়ে যায়, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তেমাথার পুলের ওপার দিয়ে ছুটে চলা রাস্তাটার দিকে। এখানটায় আসলেই ওর এমন হয়, মনটা চলে যায় ওর নিজের গ্রাম গৌরীপাশায়।
অয়ন তাকিয়ে আছে নদীর ওপারে, যতদূর চোখ যায় চরজুড়ে সফেদ শুভ্র কাশের বন আর তার উপর দিয়ে মনের সুখে উড়ে বেড়ানো ধবল বকের ঝাঁক।
-ইস! দ্যাখ কি সুন্দর! কিন্তু আমরা ঐ পাড়ে যামু ক্যামনে? অয়ন বলে
অয়নের কথা শুনে ফিরে তাকায় মিরাজ। বলে- আমগো ছোট্ট একটা নাও আছে কিন্তু আমি কোনদিন নদীতে নাও বাইনাই
-ল আমরা দুইজনে মিল্লা বামুনে, সুবল মিরাজকে বলে
-আমার ডর লাগতাছে, যদি ডুইবা যায়!
অয়নের ভয় দেখে ওরা আর সাহস করে না। তখনই মিরাজ বলে- ল আমরা বটতলার ঘাট থেইক্যা নৌকায় পার হইয়া ঐ পাড় দিয়া ঘুইরা আহি। ঘাটের সবাই আমারে চিনে, পয়সা লাগবো না।
ঘাট থেকে নৌকা পার হয়ে গেলে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হবে, তবুও অয়ন আর সুবল রাজী হয়ে যায়। তিনজনে মিলে ছুটতে থাকে কলাবতী বাজারের দিকে।

নদী পার হয়েই চরকমল। যতদূর চোখ যায় শুধু ধূ ধূ বালুচর, আর সেই চরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে কেবল শুভ্র কাশের বন। নিচের দিকে চরে আটকে থাকা কচুরীপানা আর তাতে ফুটে আছে রাশি রাশি বেগুনী ফুল। বেড়িবাঁধ ধরে তিনজনে এগিয়ে চলে কাশের বনের দিকে। কিছুদূর এগিয়ে রাস্তা ছেড়ে ওরা নেমে পড়ে নদীর চরে।
শরতের আলো ঝলমল নির্জন বিকেলে তিনটি উচ্ছ্বল বালক ছুটে বেড়ায় ওদের স্বপ্নের বালুকাবেলায়, বাঁধনহারা হয়ে নেচে বেড়ায় কাশবনের ছায়ায় ছায়ায়। নরম বালুর চরে ওদের কচি পা’গুলো ডেবে যায়। মাথার উপর উড়ে বেড়ানো নীল আকাশজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা। বন্ধনমুক্তির এই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য ওদের নেই। গুভ্র কাশের বন, নীরব নিথর পরিবেশ আর ধবল বকের ঝাঁকের সাথে মিলেমিশে ওরা প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।

পূজা শুরু হতে আর বেশী দেরী নেই। হরিপদর বাড়িতে জোর আয়োজন চলছে। প্রতিবারের মত এবারও ওদের ভিটাবাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে দুর্গাপূজার। পাশাপাশি বসবাসকারী বেশ কয়েকটা হিন্দু পরিবার একসাথে পূজার আয়োজন করায় এবারের উৎসবের মাত্রাটা যেন একটু বেশীই। প্রতিমা গড়ার জন্য আনা হয়েছে যতীন পালকে। প্রতিবছর পূজায়ই ওদের প্রতিমা গড়ার কাজটা যতীনই করে থাকে। হালকা পাতলা গড়নের যতীন পালের হাতে যেন যাদু আছে, ওর হাতে গড়া মায়ের প্রতিমা বরাবরই অসাধারণ হয়। এ বছর ওর সহকারী হিসেবে এসেছে ছোট ছেলে নির্মল।
প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় অয়ন আর মিরাজ সুবলের সাথে ওদের বাড়িতে পূজার আয়োজন দেখতে যায়। ভিটেবাড়ির খোলা জায়গাতে নতুন ঘর তোলা হয়েছে, সেই ঘরে প্রতিমা গড়ার কাজ চলছে। উপরে টিনের ছাউনি দেয়া ঘরটির কেবল পিছন দিকে টিনের বেড়া দেয়া আর তিনদিকই খোলা। গত কয়েকদিন ধরেই চলছে মূর্তি বানানোর কাজ। আজ সকালেও ওরা এসেছিল, তখন দেখেছিল গতকাল তৈরি বাঁশের কাঠামোগুলোর মধ্যে খড় কুটো দিয়ে মানুষের আকৃতি তৈরি করছে কারিগররা। এখন তার উপর মাটির প্রলেপ দিচ্ছে, ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে বাঁশের কঞ্চি আর খড়কুটোগুলো। সুবল বলে- দুইদিন পর দেহিস, পুরাপুরি মূর্তি অইয়া যাইব। তারপর রঙ কইরা সুন্দর কাপড় পড়াইয়া দিবে তাইনা রে? অয়ন জিজ্ঞেস করেছিলো। শুক্কুরবার মায়ের বোধন অইব, তহন অনেক মজা অইব, তোরা আইবি? ওরা দুজনেই ঘাড় নেড়ে আসবে বলে চলে এসেছিল সেদিন।

অনেকদিন পর পূজার ছুটিতে বাড়িতে আসে শ্যামল আর তাপস। সবার আনন্দের কেন্দ্রস্থল ওদের ভিটাবাড়ির পূজা মন্ডপকে ঘিরে। মণ্ডপের টিনের ঘরটার সামনের জায়গা সামিয়ানা টাঙিয়ে রঙিন কাপড়ের বেড়া দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে, পূজায় আগত লোকজনের বসার জন্য। বাড়ির প্রবেশপথে সাজানো হয়েছে গেট, তারপর বাহারি রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হয়েছে সারা বাড়ি। আর চালের গুড়ার আলপনা আঁকা হয়েছে ভিতর বাড়ির সারা উঠোন জুড়ে। সন্ধ্যার পর আলোর ব্যবস্থার জন্য তৈরি রাখা হয়েছে হ্যাজাক বাতি। শ্যামল আর তাপসের ছুটির সময়টা কেটে যাচ্ছে নানা ব্যস্ততায়। দুই দাদাকে একসঙ্গে পেয়ে ভীষণ খুশি সুবল। দাদারা যখন যা বলছে করে দিচ্ছে সানন্দেই আর এটা ওটা নানান প্রশ্ন করে অতিষ্ঠ করে তুলছে দুজনকেই।

মহাঅষ্টমীর মহা আয়োজনে সরগরম হয়ে উঠেছে সারা বাড়ি। ঢাক-ঢোল বেজে চলেছে বিরামহীনভাবে। ঢাক-ঢোলের সাথে সাথেই সারা অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত হয়ে তুলেছে সানাই আর কর্নেটের সুর। ঘন্টার শব্দ আর উলু ধ্বনি শোনা যাচ্ছে থেমে থেমেই। গ্রামের হিন্দু মুসলমান শ্রেণিভেদাভেদ ভুলে হাজির হয়েছে পূজার মণ্ডপে। কেউ এসেছেন মায়ের আশির্বাদ নিতে আর কেউ এসেছেন পূজার আনুষ্ঠানিকতা উপভোগ করতে। অয়নের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। দুপুরের পর থেকেই সুবলদের বাড়িতে মিরাজকে সাথে নিয়ে পূজা দেখতে হাজির হয়েছে ও। প্রবল আগ্রহ নিয়ে দেখে, ভিটাবাড়িতে বিশাল সামিয়ানার নীচে টিনের ঘরটির একপাশের দেয়াল জুড়ে কয়েকটা মূর্তি দাঁড় করানো। মাঝখানে দাঁড়ানো একটি নারীমূর্তি যার দশটি হাত। অয়ন অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে দেখছে নারীমূর্তিটির কোন হাতে শোভা পাচ্ছে খড়্গ, বর্শা, ত্রিশূল কিংবা চক্র, আবার কোন কোন হাতে পদ্ম কিংবা শঙ্খ। তাঁর পায়ের কাছে একটি সিংহ। তিনি তার হাতের বর্শাটা দানবীয় চেহারার একটি লোকের দিকে তাক করে রেখেছেন। তার দু’পাশে আরও দু’টি নারীমূর্তি, একজন রাজহংসের উপর দাঁড়ানো আরেকজনের সাথী একটি পেঁচা। তাঁদের দু’দিকে দু’জন পুরুষের মূর্তি, একজনের মাথাটা মানুষের বদলে হাতির। তাঁদের সামনের জায়গাটিতে নানান ধরনের জিনিসপত্র সাজানো। একটা কাসার পাত্রে ধান, দূর্বা, জবা ফুল, বেলপাতা রাখা আছে। বিভিন্ন বাড়ি থেকে আনা হচ্ছে নানা ধরনের খাবার, ডালায় সাজিয়ে। একজন পৈতা পড়া বয়স্ক লোক মন্ত্র পড়ছেন আর মাঝে মধ্যে ঘন্টা বাজাচ্ছেন। তাঁর পড়নে ধবধবে সাদা ধুতি আর গায়ে পেচানো নামাবলী। নামাবলীর ফাঁক দিয়ে মাঝে মধ্যে পৈতাটা চোখে পড়ছে। তিনি কখনও ডালা থেকে ফুল নিয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন সেই মূর্তিগুলোর গায়ে আবার কখনও প্রদীপ হাতে নিয়ে আরতি করে চলেছেন ওদের সামনে। ঘন্টা বাজানোর সাথে সাথেই পাশে থেকে মহিলাদের কন্ঠ থেকে ভেসে আসছে উলুধ্বনি। পুরোহিতের এই আরতি পর্বটি মূর্ত করে তুলছে বাদকদলের চমৎকার বাদন। অয়ন দেখছে বাদক দলের সাথে মিশে গিয়ে শ্যামলদা আর তাপসদা ঢোল বাজাচ্ছেন আর তাদের সাথে ধোপা বাড়ির অজিত ধুপদানি নিয়ে নেচে নেচে আরতি করছে। সন্ধ্যার আগমূহুর্ত পর্যন্ত পূজা মন্ডপেই কাটায় ওরা। তারপর মিরাজকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে ওরা।

সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে আঁধার নেমে আসে। মা আর ছোটদির সাথে ঘরের সিঁড়িতে বসে গল্প শুনতে শুনতে বেশ রাত হয়ে যায়। বাবা, মন্টুমামা পূজার অনুষ্ঠান থেকে তখনও ফেরেনি। সিঁড়িতে অনেকক্ষণ বসে থেকে মায়ের সাথে ঘুমাতে চলে গেল ও। প্রতিদিনের মত মায়ের কোলে মুখ রেখে শুয়ে পড়ল। মায়ের গা থেকে মা মা গন্ধটা না পেলে যেন ওর ঘুমই হয়না ঠিকমত! মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছিল ওর, তখনও পূজার অনুষ্ঠান থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছিলো ঢাক আর বাঁশির শব্দ।

চলবে.....

পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


চলুক!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


চলবে. Smile

শুভ্র সরকার's picture


বেশ ভালো লাগলো৤ পরের পবে‍র্র জন্য অপেক্ষমান৤

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ, পরের পর্ব আজকেই আসছে....

মীর's picture


লেখা স্ক্যাটার্ডলি পড়ে আসলে সেই মজাটা পাচ্ছি না। দুই মলাটের মধ্যে কবে পাবো?

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ মীর।
লেখাটা পুরোপুরি শেষ হয়নি। দ্রুত পোষ্ট করা হয়না, কারণ একটা লেখা অনেকদিন প্রথম পৃষ্ঠায় পড়ে থাকে।
আমার মত অখ্যাত মানুষের এই লেখা দুই মলাটের মধ্যে কেউ প্রকাশ করতে রাজী হবে কিনা বলতে পারছি না Smile

আহমাদ আলী's picture


ধান, নদী, খাল, বন আর কাঁশফুল আমাকে আজো আকর্ষণ করে, ভালো লেগেছে পোস্টটি।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ

তানবীরা's picture


বেশ ভালো লাগলো৤ পরের পবে‍র্র জন্য অপেক্ষমান৤

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।