ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ ২১ - আজ গাশ্বীর রাত...

dhusor godhuli-21.jpg

শিউলির শহরে যাওয়ার দিন ঠিক হয়ে গেছে। আর মাত্র এক সপ্তাহ, তারপর সবাইকে ছেড়ে ও চলে যাবে বহুদূরে। চলে যাবার আগে কয়েকটা দিন মা-বাবার সাথে কাটাবে ও। মেয়েটা চলে যাবে তাই মষ্টারসাব আর সালমা বেগমের মনটা খুব খারাপ। এতদিন শ্বশুরবাড়িতে ছিল, ইচ্ছে হলেই গিয়ে দেখে আসতে পারত। দূরে চলে গেলে মনটা বড় কাঁদবে।
অয়ন বড়দি আসার পর থেকেই বলে আসছে, ওকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। শহর সম্পর্কে ওর কথার উত্তর দিতে গিয়ে শিউলিকে হিমসিম খেতে হচ্ছে।
-বড়দি, তুমি কবে শহরে যাবা?
-এই তো আগামী সপ্তায়
-তুমি একলা যাবা শহরে?
-না, কাইল তোর ভাইয়া আইব। আমারে লগে কইরা নিয়া যাইব
-আমারেও কিন্তু তোমগো লগে নিতে অইব
ভাইয়ের আবদার শুনে শিউলি হাসে। তারপর বলে- বাবা, মা, বকুলরে ছাইড়া তুই থাকতে পারবি অনু?
-আমি তো শহরে ঘুইরা আবার চইলা আমু
-ও আইচ্ছা, শুধু শহর দেখতে যাবি, আমার লইগা তোর কোন মায়া নাই, তাইনা?
-আমি কি তাই কইছি? তোমার কাছে কয়দিন থাইক্যা বাড়ি চইলা আমু, আমার স্কুল আছে না?
-হুম, আমি তো ভুইলাই গ্যাছিলাম আমার ভাইটা প্রতিদিন স্কুলে যায়। আমি শহরে চলে গ্যালে তোর খারাপ লাগবে অনু?
-হ, খারাপ তো লাগবোই। শহর তো অনেক দূর, তুমি তো তহন অনেকদিন বাড়ি আইতে পারবা না। জান? হেদিন বাবা-মা তোমারে নিয়া আলাপ করতাছিল। তুমি চইলা যাইবা তাই বাবার খুব মন খারাপ। তোমার খারাপ লাগবো না বড়দি?
শিউলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ছোট ভাইটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে- মেয়েদের অনেক কষ্ট, সবকিছু ছাইড়া চইলা যাইতে অয়। তুই বড় হ, তহন বুঝবি।

হেমন্তের সুবাতাসে শরতের বিদায় ঘন্টা বাজছে চারিদিকে। শরতের শেষদিকে এসে গ্রামের ঘরে ঘরে আশ্বিনের বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। মনে প্রাণে উৎসব পাগল গ্রামের মানুষ কার্তিককে বরণ করে নেবার উৎসবে মেতে উঠেছে। সবার মুখে একই কথা- ‘আজ গাশ্বীর রাত’। গাশ্বীর রাতে আনন্দ উৎসব করে আশ্বিনকে বিদায় জানাবে এরা।

সুবলদের বাড়িতে গাশ্বির উৎসবের আঁচ লেগেছে বিকেল থেকেই। শ্যামল, তাপস ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। চারুকে নিয়ে দিনভর উঠানে আলপনা একেছে, যে কোন উৎসবেই এটা করে থাকে ওরা। সুরবালা আর বিজয়া নানা ধরনের পিঠা পায়েসের আয়োজনে ব্যস্ত। বিকেলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চারু জোগাড় করেছে উৎসবের নানা উপকরণ- কাঁচা হলুদ, নিমপাতা, পিপেল পাতা, তিল, সরষে। উঠোনের এক পাশে বসে সবগুলো পিষতে ব্যস্ত সে। চারুদির প্রতিটা কাজে অত্যন্ত আনন্দের সাথেই সহযোগিতা করে চলেছে সুবল।

শেষ বিকেলে অয়ন সুবলদের বাড়িতে ঢুকে দেখে ওদের সারা বাড়িতে সাজ সাজ রব। সিঁড়ির উপরে বড় একটা কাঁসার থালায় কয়েক ধরনের জিনিস বেটে সাজিয়ে রাখা। ও সুবলের খোঁজে সিঁড়ির কাছে যেতেই তাপসদা এগিয়ে এসে- অনু, ক্যামন আছিস রে? বলেই থালা থেকে হলুদ নিয়ে ওর গালে মাখিয়ে দেয়। চারুদি উঠানের মাঝে দাঁড়িয়ে জোরে হেসে ওঠে। বলে- দাদা, অরে এহনই মাখাইয়া দিলা? অয়ন সেদিকে ঘুরে তাকিয়েই বেশ অবাক হয়ে যায়। সারা উঠানজুড়ে আঁকা সাদা আল্পনার মাঝখানে লাল ফ্রক পড়া চারুদি’কে অসাধারণ লাগছিলো!

অয়নকে নিয়ে সুবল ওদের বাড়ির দক্ষিন পাশের হিজল গাছের সাথে ঝোলানো দোলনায় গিয়ে বসে। দুজনে নানা গল্পে মশগুল হয়ে পড়ে। সুবল বলে,
-জানস, কাইল খুব বিহানে আমরা সবাই মিইল্লা খালে নাইমু, তোরা খালে আইবি না?
-না রে! বড়দি কইছে কাইল বিহানে আমরা আমগো পুকুরে নাইমু
-পুকুরে তো আমরা প্রতিদিনই নাই! কাইল দেখবি সব বাড়ির মানুষেরা খালে নাইতে আইব
-তোরা অনেক মজা করবি, না?
-হুম, অ-নে-ক মজা!

অয়নদের বাড়িতেও গাশ্বীর উৎসবের ছোঁয়া লেগেছে। শিউলিকে শহরে নিয়ে যেতে নাহিদ এসেছে আজ। এই দিনটির জন্য সালমা বেগম অপেক্ষা করছিলো। রান্নাঘরের পিছনে জমানো শুকনো তালের আঁটিগুলোর ভিতরে শাঁস হয়ে গেছে এতদিনে। আজ মন্টুকে দিয়ে ওগুলো কাটিয়ে শাঁস বের করে নিচ্ছে সালমা বেগম। প্রতিবছর এই সময় তালের আটির ভিতরের শাঁস দিয়ে মিষ্টান্ন তৈরি হয়। নারিকেল-গুড়ের কুলি পিঠার জন্য চালগুড়া করে রেখেছে আগে থেকেই। গাশ্বীর রাত উপলক্ষ্যে নানান রকম খাবার তৈরি হবে আজ। নাহিদের সাথে শিউলির দেবর ননদ আসায় বকুলদের জন্য এবারের গাশ্বীর উৎসবের মজাটা বেশ বেশী। বকুল দীপাকে সাথে নিয়ে একে একে সব ধরনের উপকরণ সংগ্রহ করে বেটে উঠানে শিশিরে ভেজানোর উদ্দেশ্যে রেখে দেয়। সবাই মিলে আজ শেষ রাত্রে গোসলের আগে এগুলো গায়ে মাখবে ওরা।

রাত নামার সাথে সাথে বাড়িটা কেমন যেন নিরব হয়ে যায়। এই নির্জন রাতে জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোচ্ছটাকেও ম্লান মনে হয়। ঘন গাছপালার আড়ালে জমে থাকা ছোপ ছোপ অন্ধকার পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করে তোলে। ঘরের সামনের সিঁড়িতে বসে আছে শিউলি। শিপন, দীপা, অয়ন ঘুমিয়ে পড়েছে একটু আগেভাগেই। অয়ন বলে রেখেছে, শেষরাতে গোসলের আগে ওকে অবশ্যই তুলে দিতে হবে। সুবলদের বাড়িতে গাশ্বী উৎসবের আয়োজন দেখে ও অনেক উচ্ছ্বসিত। আগামীকালের কথা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে যায় শিউলির। এ বাড়িতে আজকেই ওর শেষ রাত, কাল সকালেই চলে যাবে শ্বশুর বাড়ি। তারপর সেখান থেকে শহরে। আবার কবে আসবে কে জানে! একে একে সবার মুখ ভেসে ওঠে মনে-বাবা, মা, অয়ন, বকুল! চাইলেই যখন তখন আর ছুটে আসতে পারবে না ওদের কাছে। কিছুক্ষণ পর বকুল এসে বসে ওর পাশে। বড়দিকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। শিউলির মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়। নিজেকে সামলে নেয় ও, তারপর বকুলের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে- অনুরে দেইখ্যা রাখিস। ও তো অবুঝ, ওর লগে রাগারাগি করিস না। বাবার দিকে খেয়াল রাখিস আর মা’রে কামে সাহায্য করিস। আমি শহরে গিয়েই চিঠি দিমু, তুইও আমারে চিঠিতে সবকিছু জানাবি।

হরিপদ ঘোষের বাড়িতে আজ রাতে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। যে কোন পার্বণে ওদের বাড়িতে উৎসবের মাত্রাটা একটু বেশিই থাকে। আশেপাশের বাড়ি থেকে সমবয়সী ছেলেমেয়েরা এসে জমা হয়েছে ওদের বাড়ির উঠোনে। আকাশে চমৎকার চাঁদ, সারা বাড়িটা আজ জ্যোৎস্নার আলোয় ঝলমল করছে। উঠানের মাঝখানে বিছানো পাটিতে বসে সুরেলা কন্ঠে গান ধরেছে চারু। শ্যামল, তাপস গানের সাথে তাল মিলিয়ে হারমোনিয়াম আর তবলা বাজিয়ে চলে। আজ রাতভর গান বাজনা আর আনন্দে মেতে থাকবে সবাই। চারুর গানের গলা বেশ। আশেপাশে কয়েক গ্রামে ওর কন্ঠের প্রশংসা শোনা যায়। যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাই চারুর উপস্থিতি থাকবেই। গল্প ও গানে, আনন্দ আয়োজনে রাত গভীর হয়, গাশ্বীর রাতটা জমে ওঠে বেশ। গানের পর্ব শেষ হলে শুরু হয়ে যায় অন্যরকম আনন্দ উৎসব।
সুবলের জন্য আজকের রাতটা অনেক বেশী আনন্দের। গতবারের গাশ্বীর রাতে এতটা মজা পায়নি সে। তাপসদা ওকে জিজ্ঞেস করে- একটা মজার খেলা দেখবি?
তাপসদার সবকিছুই সুবলের ভাল লাগে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে ও ঘাড় কাত করে সায় দেয়।
-তাইলে খেজুরের ডালের গোড়া থেইক্যা শুকনা জাল্লি বের করে আন
সুবল দৌড়ে গিয়ে গোয়ালঘরের পাশ থেকে শুকনো খেজুরের ডালপালার মধ্য থেকে সরু শলাকাযুক্ত কিছু পাতলা জাল এনে জড়ো করে। তাপস সেই শুকনো জালগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা। পাতলা জালগুলো পুড়ে ছাই হলেও শলাকাগুলোতে তখনো আগুন জ্বলছিলো। তাপস কিছুটা আধোনিভু ছাই বড় কচুর পাতায় মুড়িয়ে রশি দিয়ে মুখটা আটকায়, তারপর পাতার বলটায় ছোট ছোট ছিদ্র করে সুবলের হাতে দেয়। সুবল রশিটা হাতে নিয়ে সাঁই সাঁই করে ঘুরাতে থাকে মাথার উপরে আর অবাক হয়ে দেখে- কচুপাতার ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে জ্বলন্ত শলাকাগুলো বের হয়ে চারিদিকে ছুটছে। যেন আগুনের ফোয়ারা!

চারু উৎসবে যোগ দেয়া অন্য মেয়েদের নিয়ে রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, অনেকটা পিকনিকের আমেজে। আশ্বিনের শেষ রাতে গোসল শেষে কার্তিকের সকালে শুরু হবে ভোজন পর্ব। এটি যেন গ্রামবাংলার চিরাচরিত প্রথা। আনন্দ উৎসবে রাত্রি শেষপ্রহরে পৌছে যায়। অতঃপর, শিশিরে রেখে দেওয়া বাটা কাঁচা হলুদ, নিমপাতা, পিপেল পাতা, তিল এবং সরষে একে অন্যের গায়ে মাখিয়ে দিতে থাকে।
সূর্য্য ওঠার আগেই কোটাখালী খালের দু’পাড়ে শুরু হয় এক ভিন্নরকম উৎসব। আশ্বিনের বিদায় লগ্নে খালের দু’পাড়ের ঘাটগুলোতে যেন মানুষের মেলা বসে যায়। এই খালে একসাথে এত মানুষের সমাবেশ এই একটি দিনেই হয়ে থাকে। একজন আরেকজনের গাঁয়ে পানি ছিটিয়ে, কখনও সাঁতারের প্রতিযোগিতা করে, নাচানাচি করে স্মরণীয় করে রাখে আনন্দের এই দিনটিকে।

চলবে.....

পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক

ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পটি ছিল অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার ক্ষেত্রে আগের কিছু পর্বের লিংক দেয়া হল।
Smile

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


আবারও একই কথাগুলো বলবো, অনন্য লেখনী। এই লেখাটাকে দুই মলাটের মধ্যে চাই।

তানবীরা's picture


ভাল লেগেছে

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।