খেলা দেখুন বিশ্বকাপে, ঝড় তুলুন চায়ের কাপে! ১৩
ব্রাজিলের পর যদি আর্জেন্টিনাও সেমিফাইনালে হেরে যায় তাহলে সম্ভবতঃ বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ উন্মাদনা ফুরিয়ে যাবে। বাংলাদেশের কোটি সমর্থকের জন্য হলেও আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনাল খেলতে হবে তাহলে!? বাস্তবিক আর্জেন্টিনা নিজের যোগ্যতাতেই সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য রাখে। জার্মানীর চমক জাগানো ফুটবল ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে তাদের সমর্থক বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এপর্যন্ত টূর্নামেন্টে দু'দলের পারফরম্যান্সের নিরীখে আমি আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখতে চাই। আর্জেন্টিনার ডিফেন্স নিয়ে আমি নিজেও সমালোচনা করেছি প্রথম রাউন্ডে, তাদের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ডেমিচেলিসের ভুলে বেশ কয়েকটা গোল খেয়ে যাওয়াতেই এই বদনাম তৈরী হয়েছে। জার্মানীর বিরুদ্ধে ওয়াল্টার স্যামুয়েল আবার দায়িত্ব বুঝে নিবে এটা নিশ্চিত। বর্ষীয়ান স্যামুয়েল এবার ইন্টারমিলানের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতেছে। ডেমিচেলিস বায়ার্নের মূল নির্ভরতা না হলেও লুসিওর সহচর হিসাবে তার রেকর্ড কিন্তু খুব একটা খারাপ না। দুজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মাসচেরানো আর গুতিয়েরেজও ডিফেন্সকে বেশ সহযোগিতা করে। এরমধ্যে ম্যারাডোনার নেকনজরে না পড়লেও ফুটবলবোদ্ধাদের নজর কেড়েছে গুতিয়েরেজ। তবে আমার বাজী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডের উপর; শুরুতে ভেরনের বদলী হিসেবে নামলেও পরবর্তীতে ম্যাক্সি রড্রিগেজ প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে বেশ ভালোই ভুগিয়েছে। আর আমার পছন্দের খেলোয়াড় তেভেজ লাতিনো-ইউরোপিয়ান নামের এক নতুন ধরনের ফুটবল খেলছে এবারের বিশ্বকাপে।
ক্ল্যাসিকাল স্ট্রাইকার ইগুয়াইনকে পৃথিবীর যেকোনো পেশাদার কোচ লুফে নেবে জেনেও আমার তাকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় মনে হয়নি কখনোই। তবে মেসি'র পাশে থাকা দ্বিতীয় সারির স্ট্রাইকারও অনেক উজ্জ্বলতা পাবে এটাতো খুব স্বাভাবিক। মেসি'র পায়ে বল মানেইতো পাশের স্ট্রাইকারের আনমার্ক্ড হয়ে যাওয়া। এখন পর্যন্ত মেসিকে ট্যাকল করার জন্য দুজনের কম ডিফেন্ডারকে আসতে দেখিনি।
অন্যদিকে জার্মানীর ম্যাথুশ্যাকার বেশ ভালো খেলছে। ফ্রিদিরিক রুনির মার্কার হিসাবে সফল ছিলেন। ভুলেও ভাববেন না যে সে মেসিকে সামলানোর ক্ষমতা রাখে। ফিলিপ লাম ঠিকঠাক ডানপ্রান্তে কিন্তু তাকে আমার ব্যতিক্রমী মনে হয়নি কখনো, একটা ম্যাচের গতিপ্রকৃতি পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা তার নেই। বাম প্রান্তে বোয়েটাংও সাধারন মানের। জার্মানির মিডফিল্ড ভালো, শোয়েইনস্টেগার ভালো খেলছে তবে তাদের চোখে পড়ার মতো জায়গাটা হলো তাদের আক্রমণভাগ। মেসুৎ ওজিল, ম্যূলার, খেদিরা, পোডোলস্কি কিংবা ক্লোসা সবার দক্ষতাই প্রমাণিত। আর্জেন্টিনার আক্রমণশক্তির সাথে এদের পার্থক্য কেবল ড্রিবল স্কিলে।
সব পজিশনের তুলনামূলক আলোচনাতে আর্জেন্টিনাকেই এগিয়ে রাখতে হবে এটা নিশ্চিত। জার্মানরাও হারবার আগে হেরে যাওয়া দল নয়। ইংল্যান্ডকে ৪ গোল দিয়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের এর অর্ধেক গোল হজম করে বিদায় নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আর সবশেষে আরেকজনের প্রশংসা না করে পারছিনা, আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক রোমেরোকে আমার অনেক বিশ্বস্ত মনে হয়েছে। তরুণ এই গোলকিপারের আত্মবিশ্বাসী আচরন দেখে তার অভিজ্ঞতার অভাব টেরই পাওয়া যায় না।





আর্জেন্টিনা জিতলেই ভালো। হল্যান্ডের জন্য ঠিকাছে
আত্মবিশ্বাস আসলে মানুষকে ডোবায়। আর্জেন্টিনা দল ডুবলো, আমি নিজেও একই কারনে ভুল প্রমাণিত হলাম। জিতলেন ইয়াকিম লো। আর্জেন্টিনার সাথে খেলায় তিনি মাঝমাঠ ভারী করে খেললেন। ডিফেন্সকে খেলালেন অদ্ভুত খেলা, নিজেদের অর্ধে তার খেলোয়াড়রা একবারো মেসি-তেভেজ অথবা মারিয়াকে ট্যাকল করলো না। একটু দূর থেকে জায়গা ব্লক করে গেলো। যাতে মেসি তার পায়ের জাদুতে বল নিয়ে ঘুরলেন কিন্তু কোন ফাক পেলো না। মেসির পায়ে বল গেলেই ডিফেন্সের ফ্রিদিরিক এবং বোয়েটাং সামনে থেকে আর মিডফিল্ডের ম্যুলার আর ওজিল বা শোয়েনস্টেইগার পেছন থেকে ঘিরে ধরলো তাকে। মারিয়ার অতিমাত্রায় ড্রিবল আর তেভেজের স্বার্থপরতাকে দিলেন ছাড়। যে কারনে সুযোগ মনে করে আর্জেন্টাইন মধ্যমাঠ খালি করে আরো দুতিনজন উপরে উঠে এলেই করলেন নিখুঁত কাউন্টার এ্যাটাক। অসাধারণ!
ইয়াকিম লো বা ক্লিন্সমান যাকেই ধন্যবাদ জানানো হোক না কেনো, নতুন চেহারার তারুণ্যের জার্মানী চমকে দিচ্ছে পৃথিবীকে। ট্যাকটিক্স আর স্কিল এক করে ফুটবল বিজ্ঞানকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য লো আর ক্লিন্সমানকে ইতিহাসে অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন