ইউজার লগইন

ঝরা পাতার গান পর্ব-2

মনে পড়ে, কাজের সন্ধানে কয়েকবার যেতে হয়েছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ। বর্ষায় দিগন্তবিহীন হাওর--কূল নাই, কিনারা নাই--এযেন, সাগর। শীতের আগমনে ছোট ছোট নদী-নালা-খাল-বিল হাওর থেকে যেন, জেগে উঠে ফসলের মাঠ। নদী-নালা-খাল-বিল-পুকুর-ডোবা মিলেই এ সুবিশাল হাওর। শীতকালে হাওরের সীমানায় দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য চোখে আমি তাকিয়ে থাকি। ভাবি, হাওরের পানি কোথায় চলে যায়। দেখি, চারদিকে মাছ ধরার মেলা; কোন কোন নৌকার খোলা, মাছে পরিপূর্ণ। কোথাও হাঁটু পানি; গরু-মহিষ সেই পানি পেরিয়ে যাচেছ সবুজ তৃণভুমিতে। বিল-ঝিল হাওরের অতি আপন বৃক্ষ হল হিজল গাছ; মাসের পর মাস পানিতেই কেটে যায় এদের জীবন। শকুন, ভূবন চিল মাছ শিকারের ফাঁকে এ গাছের ডালে ডালে বিশ্রাম করে। ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ি, বক, শালিক ইত্যাদি জানা-অজানা বিদেশী পরিযায়ী পাখিরা ভীড় করে হিজল গাছে, জেগে উঠা জলাশয়ে খুঁজে খাবার। কাজের অবসরে আনমনে ভাবতে থাকি--বর্ষাকালের জলডুবা হাওর আর শীতকালে সেই হাওরে ঢেউ খেলানো সবুজ ফসলের মাঠ--প্রকৃতির কি বিচিত্র খেলা!

রূপসী বাংলার হাওর-বাঁওর-বিল-নদী-নালা-খাল শীতকালে অতিথি পাখিদের কলকাকলীতে মুখরিত হয়। শ্রীমঙ্গলের হাওরের বাইক্কা বিল, সুনামগঞ্জের হাকালুকি, রাজশাহীর চলন বিল অথবা দিনাজপুরের রাম-সাগর, চট্রগ্রামের ফয়েজ লেক অথবা করতোয়া, নাগর, বাঙ্গালী, ইছামতি, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মাতামুহুরী, কপোতাক্ষ, সুরমা, কর্ণফুলি, তুরাগ, কুশিয়ারা, নাফ, কির্ত্তনখোলা,পশুর ইত্যাদি জলধারায় মাছ ধরা অথবা নৌকার কত না ম্মৃতি মনে পড়ে। শুকনো নদ-নদীর শাখার বদ্বীপে, ঘাটে অথবা নদীর কূল ঘেঁষে ক্ষনস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে গ্রাম-গঞ্জ-বন্দর । বর্ষায় সব প্লাবিত হয়ে একাকার হয়ে যায়। আবার শীতের অপেক্ষায় জেগে থাকা মানুষেরা অন্য জায়গায় ছুটে চলে।

গায়ে ফিরে বীনাকে নানা দেশের নানান গল্প বলি। গল্পের স্রোতে ভেসে এক সময় বলে উঠে, ‘তুমি কেমনে সাজাও এত কথার মেলা, এত সুন্দর করে!’ নদী ভাঙ্গা আর নদী গড়ার মধ্যেই আমাদের জীবন। পদ্মা নদীর পারে আমাদের মত আরো কিছু পরিবারের বসতি। এক রাতের ভাঙ্গনে নদী আমার পরিবারের সব কেড়ে নিয়ে গেছে। আর বীনার পরিবারের বীনা আর ওর বাবা ছাড়া কেউ বাঁচেনি। স্কুলের বোডিং-এ আমি ছিলাম, তাই বেঁচে গেছি। বীনার বাবা সব হারিয়ে বীনাকে ওর নানীর কাছে রেখে কোথা যেন চলে গেছে। আমাদের দু’জনার নানী বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরার পূর্ব নাওডোবায়, উত্তর-দক্ষিণে দুই পুকুর আর পূর্ব-পশ্চিমে চার ঘর বেষ্টিত একই উঠোনে। দু’জনার সম্পর্কের বিষয়ে সবাই জানে। আমার নানী আমার ভবঘুরে জীবন মাটির ঘরের মুলি বাঁশের বেড়ায় বাঁধার জন্য শীতকালের সময়টাকেই বেছে নিয়েছে। দুই নানীর বকা খেতে খেতে শীতের এক বিকালে ‘কবুল’ করে কাঁশ আর নাড়া দিয়ে নতুন ছাউনি করা ধঞ্চে-পাটখড়ী বেড়ার মাঝে মুলিবাঁশের দরজা ঠেলে দুজনে ঢুকলাম। ঢুকলাম না বলে, বলা যেতে পারে, দুই নানী ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং বলে দিয়েছে, এই শীতেই যেন, নাতির গন্ধ পাওয়া যায়, আচারের ব্যবস্থা তারাই করবে। আসলে আমার ভবঘুরে, বাউল জীবন নিয়ে আমার নানী বড়ই উদ্বিগ্ন ছিল। কত তাবিচ কবচ যে আমার হাত-গলা-মাজায় দিয়েছে--তা গুনে শেষ করা যাবে না। মসজিদের হুজুর আর মাজারের খাদেমের পানি পড়া আর নাই বললাম। শুনেছি, হিন্দু পাড়ার শিব-কালী মন্দিরের ঠাকুরের দেওয়া তাবিজ, পানি পড়াও নানী আমায় দিয়েছে। বনজঙ্গলে ঘুরি বলে, শ্মশান-জঙ্গলের শিব-মা কালী যেন, আমায় রক্ষা করে। প্রকৃতির বিশাল অথচ ক্ষূদ্র অংশ বীনা, তার কাছ থেকে ছুটে চলি অন্য প্রকৃতিতে, আবার ফিরে আসি তার কাছে। বিনা বাঁধায়, সহজেই বিনাকে পেয়েছি বলে, নাকি, ভবঘুরের সূতার টানে আস্তে আস্তে বীনা প্রকৃতির গদ্য আমার কাছে ফুরিয়ে যেতে থাকে; আমি আরো গভীর গদ্যে হারিয়ে যেতে থাকি।

হাইস্কুল পর্যন্ত লেখাপড়া জানা, কর্মঠ, গল্পপটু, গাতক, বই পড়ুয়া--সাথীদের কাছে আমি ইত্যাদি গুনে পরিচিত। তাই ওরা, যে যেখানে, যতদূরে, যে কাজেই যায় আমাকে স্মরণ করতে ভুল করে না। আমিও জায়গা পছন্দ হলে ওদের সাথে যে কোন কাজে চলে যাই। সালাম, বাবুল, শম্ভু, দুলাল--এদের সাথে শীতের রাতে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম জঙ্গলের বনপথে। পদ্মা নদীর শাখা বেস্টিত বিশাল জঙ্গলের মহল। ঘাস, বাঁশ, গাছ ইত্যাদি কাটতে হবে--তুলতে হবে বড় বড় নৌকায়। নির্জন, ভীতিকর জায়গা। সারি সারি শাল-গজারী গাছ, নদীর কাছে ঝাউবন, কাঁশচর। কাঁশ, বাঁশ আর খড়ঘেরা দু’একটা ঘর--বনের ভিতর মাঝে মাঝে দেখা যায়। দু’একটা জনবিরল বন্য গ্রাম আর ছোট ছোট টিলা আছে আশেপাশে। শীতের বিকাল। ঘন ছায়া পড়েছে বিস্তীর্ণ জঙ্গলে। বনের মাথায় উঁচু গাছের পাতায় পাতায় অল্প অল্প কুয়াশা জমেছে। নির্জন শীতের সন্ধ্যা। কোথা থেকে মটর শাকের সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে। বিশাল আকৃতির বট আর ভেটকী গাছ--জড়াজড়ি করে আছে, গভীর আলিঙ্গনে। শত শত লতাগুল্মের গাছ বিশাল বটগাছকে জড়িয়ে আছে। ডালে ডালে পাখির বাসা। শীতের তীব্রতা আস্তে আস্তে বাড়ছে, এ বনপথে। পাখির বাচ্চারা এখন বেশী চেঁচামেচি করছে--হয়তো ক্ষুধায়, হয়তো পিতা-মাতার দেরীতে ফেরা অথবা না ফেরার কারণে; কারণ কিছু পাখি শিকারী সারাদিন বনে ঘুরাফেরা করে। মা-বাবার পালকের উষ্ণতা বড় বেশী প্রয়োজন এই শীতে কারণ বাচ্চা পাখির পালক পূর্ণভাবে গজিয়ে ওঠে না। শীতকালে দিন নয় থেকে দশ ঘন্টা। প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতেই সময় ফুরিয়ে যায়।

নদীর কাছে দীর্ঘ বনঝাউ, কাঁশবনের মাঝে সারি সারি গজারি, বাবলা, বন্য কাঁটা বাঁশ, বেত ঝোপ। সন্ধ্যায় বাতাসে বন্যপুষ্প ও তৃণগুল্মোর সুগন্ধ, পাখির কিচিরমিচির ডাক, বনের ডোবার অগভীর জলে ফুটন্ত লিলি ফুল--বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে দেয়। শীতকালে আমাদের অঞ্চলে লিলি ফুল হেমন্ত কালে দেখা যায়। নির্জন আকাশতলে দিগন্তব্যাপী জোৎস্না রাতে বনপুষ্পের সুবাশ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, শীতের মধ্যে শিয়ালের পাক্কা হুয়া ডাক--রাত্রির পরিবেশে আমাকে যে কোথায় নিয়ে যায়। নির্ঘুমে আমরা সবাই। বিড়ি-সিগারেটের ফাঁকে গাছ ও ঘাস কাটার হিসাব শেষ করে বনের শুকনো ডাল-পাতা জ্বালিয়ে, আগুনের চারিদিকে পাটি, গামছা বিছায়ে বসে শীতের গান আর সেই সাথে বনমুরগী, বনহাঁস অথবা বনজলের মাছ পুড়াইয়া ভাত অথবা মুড়ী-পিয়াজ-তেল দিয়ে খাওয়া। আহা! সে কি স্বাদ, কি শান্তি এই ঘন কুয়াশা রাত্রিতে। মনে হয়, পিকনিক অথবা মাসুদ রানা সিরিজের কোন কাহিনীর নির্জন দ্বীপের ছবি। রাতের শীত বাড়লে অথবা শীতের ভোরে ধনে পাতার ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়া। শীতের পার্বণের কত স্বাদ নিয়েছি কত সাথীদের বাড়ী গিয়ে; অন্যের ক্ষেত থেকে পিয়াজ তুলে আনতে গিয়ে ধরাও পড়েছি। গ্রামে থাকলে মা হয়তো শুঁটকী, মটরশুটি, শীম, আলু, ধনে পাতার ভর্তা দিয়ে চিতের পিঠায় মেখে দিত। মায়ের কথা মনে হলে শীত যেন, আরো বেড়ে যায়। পূরাণের গঙ্গা (পদ্মা নদী) দেবী যে, মা-বাবা সহ সবাইকে নিয়ে গেছে, দূরে থাকলে--তা মনে হয় না। বরং মনে হয়, বাড়ি গেলেই মাকে দেখতে পাব।

উদীয়মান চন্দ্রের গোলাকার বৃত্তের নিচের পরিধি যেন বাঁশের চিকন পাতা ছোঁয়া দিয়ে যায়। আগুনের কাছে থাকলে শান্তি, দূরে গেলেই কনকনে শীত। মনে পড়ে, উত্তরবঙ্গের পথে--এখানকার মত ওখানেও খড়ের ঘর; তার মেঝে জমির সাথে সমতল; ঘরের বেড়া শুকনো ঘাস, পাটখড়ি, বনঝাউয়ের ডাল-পাতা; কোথাও কোথাও কাঠ, বাঁশ, বনঝাউয়ের সরু সরু গুঁড়ির বেড়া; তার উপর মাটি দিয়ে লেপা। এখনো সেই ঘরের কাটাখড়, অর্ধকাচা ঘাস, মুলি বাঁশের গন্ধ নাকে ভেসে আসে। শীতের রাতের গরুর গাড়ীতে যাত্রার কথা ভাবলে হাত পা গুটিয়ে আসে। জামা-কাপড়-কম্বল সব ঠান্ডায় বরফ হয়ে যায়। শুয়ে থাকা পাশে শীত কম থাকলেও অন্য পাশে কাত হয়ে শুতে গেলে মনে হয়, মাঘ মাসের জলডোবায় ডুব দিয়েছি।

. (চলবে)

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


প্রকৃতি নিয়ে আপনার বর্ণনাভঙ্গি বেশ ভাল লাগে। সাথেই আছি। চলুক।

শাশ্বত স্বপন's picture


গতিশীল জীবনে কেউ আজকাল প্রকৃতি পড়তে চায় না কিন্ত প্রকৃতি দেখতে চায়। এই ব্লগে ছবি যোগ হয় না। তাই প্রকৃতির ছবি সাথে দিতে পারছি না।
গল্প, উপন্যাসও পড়তে চায় না। সবাই স্বল্প সময়ের খিস্তি খেউর,হিউমার পছন্দ করে। বাবুই পাখির বাসা দেখতে সবাই পছন্দ করে, বেশী ভাবতেও চায় না, ঐ রকম করে গড়ার কথা চিন্তাও করে না। অথচ কে না জানে, স্বপ্ন--পথ ও পথিক হয়...। মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়, তার আশার সমান বড় করে................

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


কে বলে ছবি যোগ করা যায় না!

এই লেখা টা পড়ে নিন। http://www.amrabondhu.com/riton/437

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ভাল লাগলো ঝরা পাতার গান।

শাশ্বত স্বপন's picture


ধন্যবাদ

তানবীরা's picture


চমৎকার! অপূর্ব! অসাধারণ!

প্রকৃতি নিয়ে আপনার বর্ণনাভঙ্গি বেশ ভাল লাগে। সাথেই আছি। চলুক।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শাশ্বত স্বপন's picture

নিজের সম্পর্কে

বাংলা সাহিত্য আমার খুব ভাল লাগে। আমি এখানে লেখতে চাই।