ইউজার লগইন

ধন্যবাদ বিশ্বকাপ

সেই ৯০ সালের ইতালীর বিশ্বকাপের কথা। পেপারে টিভিতে ফেবারিট নাম্বার ওয়ান হিসাবে দেখানো ব্রাজিল প্রি-কোয়ার্টারেই আর্জেন্টিনার কাছে এক গোল খেয়ে বিদায় নিলো। সেই ম্যাচে ব্রাজিল গোল খায় খেলা শেষ হবার ১০ মিনিট আগে। এর এক সেকেন্ড আগ পর্যন্তও একশোভাগ বিশ্বাস ছিলো যে যেভাবে ব্রাজিল একের পর আক্রমণ করে খেলছে, গোল হবেই! সেই পরাজয়ের শোকটা এখনও মনে আছে, জীবনে কখনও খেলা দেখে এত কষ্ট পাইনি।

এর পরের বিশ্বকাপগুলো ছিলো ব্রাজিলের জন্য শুধুই গৌরবের, পরপর তিনটা বিশ্বকাপের ফাইনাল খেললো, দুটা জিতলো।২০০৬ এর গত বিশ্বকাপটা যখন চলছে তখন আমার পিএইচডি'র শেষ সময়টুকু পার করছি, বিশ্বকাপ শুরু করার সপ্তাদুয়েক আগে মনে হয় প্রি-ডিফেন্স শেষ হয়েছিলো, বিশ্বকাপের একমাস পরেই ফাইনাল ডিফেন্স। নানান ঝামেলা মাথায়, বিশ্বকাপ অতটা আমলে ছিলোনা। তাও কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ব্রাজিলের হেরে যাওয়ার সেই খেলাটা দেখেছিলাম, এক জিদানের দাপটের কাছে কিভাবে ব্রাজিলের মাঝমাঠ দিকভ্রান্তের মতো খেললো! সাপোর্টের দল হেরে গেছে, কষ্ট পেয়েছিলাম, তবে নানান জাগতিক ঝামেলা মাথায় চেপে থাকায় হোক, অথবা পরপর তিনবার ফাইনাল খেলার পর একবার না হয় আউট হয়েই গেলো এধরনের কোন সান্ত্বনার কারণেই হোক, তেমন কষ্ট পাইনি। মনে হয়েছিলো, আহা সেই ৯০ এর কৈশোরের মতো নির্জলা কষ্টের অনুভূতি হয়তো আর হবেনা।

নব্বইয়ের বিশ্বকাপের সময় ক্লাস নাইনে পড়ি, ততদিনে ছিয়াশির বিশ্বকাপ দেখার পরের দুয়েক বছর লালন করা ম্যারাডোনা, প্লাতিনি, জিকো বা হ্যাজি হয়ে বেড়ে ওঠার স্বপ্ন যে সম্ভব হবেনা তা বুঝে গেলেও, ফুটবল দেখার আরেকটা স্বাদ পাবার মতো উপযুক্ত হয়ে উঠেছি। শুধু গোল দেয়াই নয়, ভালো খেলা কাকে বলে, পাসিং, পজিশনিং, ড্রিবলিং, সেট প্লে, ডিফেন্স -- এসব সম্পর্কে কিছুটা ধারনা থাকায় অন্যরকম মজা নিয়ে বিশ্বকাপ দেখেছিলাম। ব্রাজিলের খেলায় টুকটুক পাসের নেটওয়ার্কে প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে বারবার গোলের দিকে ধেয়ে যাওয়ার যে ছন্দ -- মুগ্ধ হয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো অন্ততঃ এইক্ষেত্রে ঠিক দলটাকেই সাপোর্ট করছি। সেজন্যই হয়তো শোকে পাথর হয়ে পড়েছিলাম।

এবার যখন বিশ্বকাপ আসলো, প্রত্যেকবারের মতোই সেই নব্বইয়ের স্মৃতিটা ফিরে আসলো। ব্রাজিল হারলে কি আর কখনও সেইভাবে কষ্ট পাবো? হিসেব করে দেখেছি, মনে হয়েছে, পাবোনা। সেই বয়েসও নেই, ফুটবল এসেছে বলে সব ভুলে দিনরাত ফুটবল নিয়ে পড়ে থাকার সময়ও নেই।

অথচ গতকাল যখন ব্রাজিল প্রথম গোলটা খেলো, অদ্ভুত রকমের অস্বস্তিবোধ শুরু করলাম। কারণ আছে। এমনিতে হল্যান্ড দলটির শক্তি সম্পর্কে আমি অবগত, সত্যি বলতে ব্রাজিলের পর হল্যান্ডই সব বিশ্বকাপে আমার ফেবারিট দল, তবে এবার তাদের খেলা দেখে অতটা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। সেই ধার ছিলোনা, শুধু স্লোভাকিয়ার ম্যাচে রোব্বেনের একক প্রচেষ্টাগুলো দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তারওপর গতকালের ম্যাচে প্রথমার্ধে তারা এতই অগোছালো খেললো যে ব্রাজিল তিন গোলের লীড নিয়ে মাঠ ছাড়লেও অবাক হবার কিছু ছিলোনা (হুয়ান, কাকা, মাইকন তিনটি চমৎকার সুযোগ পেয়েছিলো)। তাই প্রথমার্ধ শেষে ভেবেছিলাম, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ব্রাজিল আরেকটা দিয়ে দেবে, তারপর খেলার শেষ দিকে হয় হল্যান্ড একটা শোধ করবে, অথবা কাউন্টারে আরেকটা খাবে। মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম ব্রাজিল এই ম্যাচ জিততে যাচ্ছে।

সেজন্যই হয়তো সেকেন্ড হাফের শুরুতে ব্রাজিল গোল খেয়ে গেলে সেই নিশ্চিত প্রত্যাশাটা নিমিষেই ভেঙে গেলো। প্রচন্ড টেনশন শুরু হলো, আর খেলা দেখা চালিয়ে যেতে পারলামনা, হাঁটতে বের হয়ে গেলাম বাইরে। এখানে তকন রাত বারোটার বেশী। তাও ব্রাজিলের গোল খাওয়া বা হেরে যাওয়া দেখার চেয়ে গরমের রাতে হালকা বাতাসে বাইরে হাঁটাটাই আমার জন্য স্বস্তির মনে হলো। সময় হিসেব করে যখন অতিরিক্ত সময়ের আর এক মিনিট বাকী থাকতে পারে ভাবলাম, তখন বাসায় এসে ঢুকলাম। মনের কোণায় আশংকা ছিলো গিয়ে দেখবো দল পিছিয়ে গেছে, হয়তো লালাকার্ডও খেয়েছে। আবার একটু আশাও ছিলো যে দেখবো ব্রাজিল উল্টো আরো দুটো দিয়ে ফেলেছে, ফ্যাবিয়ানো হ্যাট্রিকের জন্য পাগল হয়ে খেলছে শেষ মুহুর্তটা।

অদ্ভুত! আশংকাগুলো কিভাবে মিলে যায়!! গিন্নী আমার পাগলামি দেখে হতবাক, তার সামনে কাষ্টু হাসি হেসে "কি আর করা" এমন ভাব দেখানোর চেষ্টাও করলাম। তবে ফিফার ওয়েবসাইটে লুইস ফ্যাবিয়ানোর আগের কোন ম্যাচে গোলের আনন্দ করার ছবিটা দেখতে দেখতে অনুভব করলাম -- একটা বড় ধরনের আনন্দের অপেক্ষায় ছিলাম, কমপক্ষে চার বছরের জন্য সেটা পেন্ডিং হয়ে গেছে!

একই সাথে খুব ধীরে ধীরে আরেকটা অদ্ভুত অনুভূতির শুরু হলো, বুঝতে পারলাম কিছু একটা ফিরে আসছে। বুঝতে পারছিলাম যে সেই পুরোনো স্মৃতি, নব্বইয়ের সেই কষ্টটা, পুরোপুরি না হলেও নতুন একটা রূপে ফিরে আসছে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে অজান্তেই, ম্যাচের যতটুকু দেখেছি তার একেকটা দৃশ্য ভেসে উঠছে মনের পর্দায়, আর ভাবছি, "ইস্, কাকার ঐ বলটা গোল হলেই তো হতো!" অথবা, "ফেলিপে মেলো লাফটা না দিলেই তো হতো!"

হয়তো জীবন এখন অনেকটা থিতু, গিন্নীর বদৌলতে দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়না তেমন, সে যদিও পড়বেনা তঅ কৃতজ্ঞচিত্তে বলছি সুখেই আছি সেই ছোটবেলার মতোই। অন্যান্য টেনশনও তেমন নেই; সেজন্যই হয়তো সেই কৈশোরের মতো শুধু ফুটবলে ডুব দিয়ে ফেলেছি কোন্ অজান্তেই।

গতকালই সম্ভবত শাহাদুজ্জামান লিখেছিলেন, বিশ্বকাপ মানুষের ভেতরের শিশুটাকে বের করে আনে। কাল অনুভব করলাম, আমার সেই হারানো কৈশোর, নব্বইয়ের অনুভূতি, তা কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ফিরে এসেছে। চিনিনা জানিনা, কোন রকমের যোগাযোগ বা সম্পর্ক নাই -- এমন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের বিষন্ন মুখ দেখে একজন চৌদ্দ বছরের কিশোরের মতোই দীর্ঘশ্বাস ফেলছি একটু পরপর।

ধন্যবাদ বিশ্বকাপ, যে জীবন দোয়েলের, ফড়িঙের, মানুষের সাথে যার দেখা হয়না, কয়েক ঝলকের জন্য হলেও তার সাথে দেখা হওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


ধন্যবাদ বিশ্বকাপ, যে জীবন দোয়েলের, ফড়িঙের, কয়েক ঝলকের জন্য হলেও তার সাথে দেখা হওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য।

এটাই ... সেই কৈশরের দিন.. উত্তেজনা.. Sad

জ্বিনের বাদশা's picture


হ বস্, কয়দিন ইচ্ছামতো চললাম ... Wink

লীনা দিলরুবা's picture


সমবেদনা।

জ্বিনের বাদশা's picture


আরে, আপনে ব্রাজিল সাপোর্টার না?

বাফড়া's picture


৯০ এর বিশ্বকাপের সময় আমার বয়স ছিল নয়... ফুটবল ভাললাগে, যদিও বড়দের মত বোদ্বা দর্শক ছিলাম না..।এখনো মনে আছে কি পরিমাণ মনোকষ্ট আর যাতনা নিয়ে ঘুমাতে গেছলাম ব্রাঝিল হারার পর.. গরমের রাত ছিল.। ফ্লোরে বিছানো শীতল পাটিতে শুয়ে শুয়ে নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছিলাম..

আমিও মাঝে মাঝে ভাবতাম যে বড় হয়েছি... কিশোরবেলার সেই ইনোসেন্স আর ইনটেনসিটি কি আর আছে.. ব্রাঝিল কখনো হারলে খারাপ লাগলেও ঐ খারাপ লাগা পর্যন্তই মনে হয়... কালকের হারের পর বুঝলাম সেই নয় বছরের ফুটবলবুঝে-কি-বুঝেনা শিশু ব্রাঝিল সাপোর্টারই থেকে গেছি..

লাইফ থেকে অনেক তুচ্ছ, বৃহত, পছন্দের অপছন্দের জিনিস হারিয়ে গেছে বা সময় কেড়ে নিয়েছে... এইটুকু নিতে পারেনি এইবা কম কি..

====

এই পোস্টের পর আমার আর পোস্ট লেখার প্রয়োজন থাকল না.. যা বলার তা সব আপনি বলে দিয়েছন Smile .. থ্যাংস ম্যান Smile.। প্রিয়তে নিতে হবে

জ্বিনের বাদশা's picture


এই পোস্টটা আসলে আপনার ফেসবুক স্টয়াটাসে কমেন্ট করতে গিয়াই জন্ম নিছে ... একই রকম অনুভূতি দেইখা ইন্টারেস্টিং লাগছে
তিন ঘন্টা আগাইয়া আছি দেইখা আমি লিখছি আর কি! Wink

বাফড়া's picture


আরে তাইটো.। আপনে ৩ ঘন্টা আাগয়া থাকায় এইটা হইলো.. সু-ব্লগিংয়ের স্বার্থে আমারে তাইলে জাপানে ঘাটি গাড়তে হইব দেখতাছি Smile

===

আপনার প্রকাশভংগি টা আসলেই অতুলনীয় হইছে.. আমি মুগ্ধতা টা আবার জানায়া গেলাম.. Smile

অদিতি's picture


বাদশা ভাই, খুব সুন্দর লেখা।

জ্বিনের বাদশা's picture


ধন্যবাদ

১০

মুকুল's picture


Sad

১১

জ্বিনের বাদশা's picture


দেশী! আপনেরে ফ্যান্টাসী লীগে মনে মনে খুঁজছি ... ব্যস্ত নাকি?

১২

রন্টি চৌধুরী's picture


বাফড়ার জন্য সমবেদনা Sad

১৩

জ্বিনের বাদশা's picture


হুমমম... নিজে তো টপে উইঠা আছেন Wink

১৪

রন্টি চৌধুরী's picture


আজকে আর্জেন্টিনা হারলে তো আবার আগের জায়গায় ফিরে যাব Smile

১৫

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


Sad Sad হারলো ভাল কথা, নেদারল্যাণ্ডের কাছে ক্যান Crying Crying

১৬

জ্বিনের বাদশা's picture


সেমিতে হারলেও হইতো ... সাতটা খেলা অন্ততঃ দেখা যাইতো Sad

১৭

মীর's picture


আরে দোয়েল, ফড়িংয়ের সেই সময় জীবনে ফ্ল্যাশব্যাক দিয়ে গেছে, এই কি কম পাওয়া? জীবনে এমন কয়বার হয়? ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা কোনটিই সাপোর্ট করি না। তবুও মন থেকে বলছি, বেটার লাক নেক্সটাইম।

আপনাকে কষ্ট পেতে দেখে খারাপ লাগছে। Stare

১৮

জ্বিনের বাদশা's picture


থ্যাংক্যু

১৯

শওকত মাসুম's picture


দলের সমর্থন হয় তো এক না, কিন্ত অনুভূতিগুলো প্রায় একই। একই রকম একটি লেখার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

২০

জ্বিনের বাদশা's picture


আসলেই ... অনুভুতিগুলা এক

২১

তানবীরা's picture


একটা চরম মজার জিনিস মিস করেছেন বাদশাহ ভাই। ব্রাজিলের গোল কীপার বাদ দিয়ে বাকি ২১ জন কিন্তু এক মাঠে ছিল। এমন দৃশ্য খুব সাধারনত দেখা যায় না।

আবারো অনুভব করলাম কারো পৌষমাস - কারো সর্বনাশ। কিন্তু আমি সেদিন খেলা শেষ হওয়ার পর সবাইকে আপনার কথা বলেছিলাম। আপনি আমাকে অফিসের ফুটবল পোলের জন্য হল্যান্ড ২ আর ব্রাজিল ১ ফীলাপ করতে বলেছিলেন। আমি করি নাই। আমি এক - এক দিয়েছিলাম। আপনার কথা শুনলেতো আমার কপাল খুলে যেতো Laughing out loud

২২

জ্বিনের বাদশা's picture


বলেন কি? আমি তো বিরাট মিস করে ফেললাম!!

২৩

নুশেরা's picture


লেখাটা কেমন করে মিস করে গেছিলাম! ভালো লাগলো খুব।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.