ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ ২৬ - মেলা...

image_1379_339689.gif.jpg

সকালে উঠে চারটা মুখে দিয়েই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাচ্ছিলো বিভা। পিছন থেকে প্রভার কথা শুনে ফিরে তাকায়। প্রভা বলে,
-মা, কাইল রাইতে তোমারে যা কইছিলাম মনে আছে?
বিভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। মন খারাপ হয়। মেয়ের ছোট খাট আবদার পূরণ করারও সামর্থ্য ওর নেই। কাল রাতে মেলা থেকে চুড়ি, ফিতা কিনে দেবার জন্য আবদার করেছে প্রভা। বিভা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় অনেকটা দায়সায়রাভাবেই বলে,
-দেহি, টাকা পাইলে আনুমনে
-তোমার কাছে কিছু চাইলেই খালি এমন কর, প্রভা অভিমানের সুরে বলে।
-এত্তবড় মাইয়া, তুমি বুঝনা এইগুলান কিনতে টাকা লাগে। ভাতই জোডেনা, তায় আবার সখ পূরণ!
-থাউক, লাগবে না
-কইছি না টাকা পাইলে আনুমনে, বলে বাজারের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে বিভা।

দুপুরের খাবার পর থেকে অয়ন অনেকটা তৈরি হয়েই ছিল। সুবল চলে আসলে মন্টুমামার সাথে মেলার উদ্দেশ্যে বের হল। শীতের দিনগুলো যেন খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, তাই একটু আগেভাগেই বেরিয়ে পড়লো ওরা। বড় রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে মিরাজদের বাড়ির সামনে এসে সুবল বাড়ির ভিতরে গিয়ে মিরাজকে ডেকে আনে। তিনজন মিলে মন্টুমামার সাথে এগিয়ে চলল উজানগাঙের পাড়ে, তেমাথার পুলের দিকে। বাজারের দিকে থেকে ঘুরপথ হলেও তেমাথার পুলের কাছে আসতে হলে এটাই সবচেয়ে কাছের রাস্তা। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা নদীর পাড়ে চলে আসলো। কোটাখালী খালের এপারে শ্যামলপুর আর ব্রিজের ওপারে ভবানীপুর। ব্রিজ পার হয়ে ভবানীপুরে ঢুকে রাস্তাটা দু’দিকে ভাগ হয়ে গেছে। ওরা বামদিকের নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে মেলার পথে হেঁটে চলল। এই গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় অনেক বড় একটি খোলা জায়গা, অন্যান্য ধানী জমি থেকে জায়গাটি কিছুটা উঁচু, এটিকে এলাকাবাসী বলে গড়ের মাঠ। প্রতিবছর এখানে এই সময়ে মেলা বসে, পালাগান হয়। যাত্রাদলের তাঁবু খাটানো থাকে বেশকিছুদিন পর্যন্ত। নদীর পাড়ের সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা। এখান থেকে দুরত্ব খুব বেশী না, এক মাইলের মত হবে। পাকা ধান কেটে নেবার পর আশেপাশের জমিগুলোর বেশীর ভাগই এখন ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও কোথাও পরিত্যাক্ত নাড়াগুলোর মধ্যে থেকে কলাইয়ের সবুজ চারাগুলো জেগে উঠেছে। কোন কোন জমিতে চাষ করা হয়েছে তিল কিংবা সরিষার। একটু পরই নদীর পাড়ের রাস্তার দু’পাশে খেজুর গাছগুলো কাটার কাজে লেগে যাবে লোকজন। সন্ধ্যার পর প্রতিটা গাছে ঝুলবে ছোট ছোট রসের হাড়ি। এখনও রোদের তাপ বেশ কড়া তবে নদীর দিকে থেকে বয়ে আসা চমৎকার বাতাসে হাঁটতে খারাপ লাগছে না ওদের। হঠাৎ অয়ন খেয়াল করে মিরাজ যেন অনেকটাই চুপচাপ। ভবানীপুরে ঢোকার পর একটা কথাও বলেনি। মিরাজের কাছে এসে অয়ন বলে,
-কি রে মিরাজ, তুই এত চুপচাপ ক্যান? কি অইছে?
-কিছুনা, এমনিই
-মেলায় যাওনের লইগ্যা কেউ রাগ করছে?
-না রে! কেউ কিছু কয়নাই। এমনিই
এখন রাস্তা থেকেই দেখা যাচ্ছে মেলার ভিড়। অনেকদূর থেকেই অয়নের চোখে পড়ে নাগরদোলাটা। গতবছরও ও এই নাগরদোলায় চড়েছিল। সেবার বড়দি আর ছোটদিও সাথে ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌছে যায় ওরা। মেলায় দূর দূরান্ত থেকে এসে নানা সামগ্রীর পশরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। ঢুকতেই নানা ধরনের খাবার দোকান, তারপর ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং এরপরই রয়েছে ওদের বয়সী ছেলেমেয়েদের হরেক রকম খেলনার দোকানগুলো।
মেলার একপাশে খালের পাড় ঘেঁষে একটা বটগাছ। ওখানে গানের আসর বসেছে। গাছের নীচে বয়স্ক একজন লোক একতারা হাতে গান গাচ্ছে। বটতলায় কাছাকাছি গিয়ে মন্টুমামা অয়নদের বলে- আমি ঐহানেই থাকুম, তোমগো ঘুরাঘুরি শ্যাষ অইলে গাছের নীচে চইলা আইও। মন্টুমামা গানের আসরের মাঝে বসে পড়লে ওরা তিনজনে মিলে নাগরদোলার দিকে এগিয়ে যায়। আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকে অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ পর অয়নরা ওদের পছন্দমত খেলনা আর খাবার কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

অয়নদের কেনাকাটার এক ফাঁকে মিরাজ ওদের থেকে সরে এসে খালের পাড়ে দাঁড়ায়। খালের ওপারে অনেকটা খোলা জমি ছাড়িয়ে আবছায়াভাবে চোখে পড়ছে ঘন সবুজ গাছপালায় ঢাকা একটা বাড়ি। মিরাজ সেই বাড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অয়ন আর সুবল আজ অনেক উচ্ছ্বসিত, কিন্তু মিরাজকে মেলার আনন্দ ছুঁতে পারছেনা একটুও। তেমাথার পুল পার হয়ে আসার পরই ওর মনটা খারাপ হয়ে যায়। এটা ওর সবসময়ই হয়। তেমাথার পুলের কাছে আসলেই ওর বাড়ির কথা মনে পড়ে। ওর কাছে গতবছরের এই মেলার স্মৃতিটা অন্যরকম। মনে আছে গতবারের মেলায় আসার সময় মা ওকে সুন্দর জামাকাপড় পড়িয়ে রফিক ভাইয়ের সাথে পাঠিয়েছিলেন। ঠিক এই জায়গাটায়ই মেলা বসেছিল। আজকে মাকে খুব মনে পড়ছে। মা-হারা আট বছরের একটি কিশোরের জন্য কষ্টকর অভিজ্ঞতাই বটে।

মেলায় ঘোরাঘুরির মাঝে অয়নের হঠাৎ খেয়াল হয় মিরাজ ওদের সাথে নেই। ভিড় থেকে বেরিয়ে ও আর সুবল মিলে মিরাজকে খুঁজতে থাকে। সুবলের চোখ পড়ে মেলা থেকে একটু দূরে খালের পাড়ে চুপচাপ বসে আছে। অয়নকে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়, কাছাকাছি গিয়ে অয়ন জিজ্ঞেস করে,
-কি অইছে মিরাজ?
-কই, কিছু না তো!
-তুই এইহানে চুপচাপ বইসা আছিস, তোর চোক্ষে পানি ক্যান?
-কিছু না এমনিই। তোগো কেনা শ্যাষ?
-হ, তুই কিছু কিনবি না?
-না, আমি তো তোগো লগে দেখতে আইছি।
-মিরাজ তোর কি অইছে আমগো কইতে পারস না?
-কিছু অয়নাই। এমনিই, ভাল লাগতাছিল না, তাই বইয়া আছি।
-তোগো বাড়ি না এইদিকে?
-হ, খালের ঐ পাড়ে।
-এইহান থেইক্যা দেহা যায়?
-হ, ঐ যে দূরে বড় গাছটা দেহা যায়তেছে, ঐডাই আমগো বাড়ি।
-তোর বাড়ির লইগা খারাপ লাগতাছে না?
মিরাজ কিছু বলে না। উঠে বলে এহন বাড়ি যাবি?
-হ, যামু তো, অয়ন জবাব দেয়।
-তাইলে ল।
মিরাজকে সাথে নিয়ে মন্টুমামার খোঁজে ওরা পালাগানের আসরের দিকে এগিয়ে যায়। গেরুয়া রঙের কাপড় পড়া লোকটি একমনে গেয়ে চলেছে “চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’ আর মন্টুমামা তন্ময় হয়ে শুনছে। অয়নরা পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ওদের দেখে মামা বলে, তোমরা আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি কর, আমরা একটু পরেই চইলা যামু। অয়নের চোখে পড়ে বটগাছ ছাড়িয়ে একটু সমনে একপাশে বড় তাঁবু টানানো। ও মন্টুমামাকে জিজ্ঞেস করে,
-মামা, ঐহানে কি অয়?
-ঐহানে যাত্রা অয়
-এহন অইতাছে?
-না বাবা, যাত্রা সমসময়ই রাইতে অয়। যাও, তোমরা আরও কিচ্ছুক্ষণ আনন্দ কর।
ওরা তিনজনে বটগাছ থেকে একটু দূরে একটি জটলা দেখে এগিয়ে যায়, লোকজনের ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখে দুটি বড় মোরগের লড়াই চলছে। দু’দিক থেকে লোকজন বাহবা দিয়ে চলেছে। উপস্থিত লোকজন দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে। একদল চিৎকার করে বলছে পাঞ্জা জিতবে, আরেকদল বলছে ঈগল। মোরগ দুটি লাফিয়ে লাফিয়ে একটি অন্যটিকে আক্রমন করছে। কিছুক্ষণ ওরা হাড্ডাহাড্ডি মোরগের লড়াই দেখে বেরিয়ে আসলো।
ভিড় ছেঁড়ে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ পিঠে কারো হাতের ছোঁয়া পেয়ে পিছন ফিরে তাকায় মিরাজ। দেখে রফিক ভাই ওর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে। রফিককে দেখে মিরাজের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
-কেমন আছস মিরাজ?
-ভাল, তুমি ভাল আছ রফিক ভাই?
-ভাল, তুই কার লগে আইছস?
মিরাজ অয়নদের দেখিয়ে দিয়ে বলে, অগো লগে আইছি। ফুফু কেমন আছে?
-মার শরিলডা বেশি ভাল নাই, মায় কতদিন তোর কতা জিগাইছে! আমারে তোর খবর আইনা দিতে কইছে। বাড়ি যাবি না মিরাজ?
মিরাজ চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিচ্ছুক্ষণ পর বলে- কার কাছে যামু?
-আমগো কাছে যাবি, মায় তোরে দেখবার চায়।
-ফুফুর কি অইছে?
-কইতে পারিনা, কয়েকদিন ধইরা বুকে ব্যথা, পায়ের গিডে গিডে ব্যথা, ঠিকমত হাঁটতে পারে না।
-ফুফুর কতা খুব মনে অয়
-তোর বাপের কতা জানতে মনচায় না?
-না।
-মিরাজ, আমার লগে যাবি? মায়রে দেইখ্যা চইলা আবি।
-একটু পরই তো সন্ধ্যা অইয়া যাইব, আমি একলা ফিরা যাইতে পারুম না।
-তোর ভয় নাই, আমি তোরে পৌছাইয়া দিমু। মায় খালি তোর লইগ্যা কান্দে।
অয়ন আর সুবল বলে- তাইলে যা, তোর ভাই তো তোরে পৌছাইয়া দিবো, ডরের কি আছে?

মিরাজ প্রথমে কিছুটা ইতস্থত করলেও অবশেষে রাজী হয়ে যায়। রফিকের সাথে খাল পেরিয়ে মিরাজ গৌরিপাশায় ঢুকে পড়ে। অয়ন ও সুবল মন্টুমামার খোঁজে বটতলার গানের আসরের দিকে হাঁটতে থাকে।

চলবে....

পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ আজ গাশ্বীর রাত ২২• ধূসর গোধূলিঃ তারুণ্যের জয়গান
২৩• ধূসর গোধূলিঃ জলে ভাসা জীবন ২৪• ধূসর গোধূলিঃ সমীকরণ
২৫• ধূসর গোধূলিঃ মুক্তনগর

ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পটি ছিল অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার ক্ষেত্রে আগের লিংকগুলো সংযুক্ত করা হল।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


সুন্দর!

তানবীরা's picture


পড়ছি

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।