ইউজার লগইন

আমরা পরিত্রান চাই

গতকাল ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছিলো

ঢাকা শহরে থেকে ঋতু পরিবর্তনের রেশ বুঝতে পারি না, ক্যালেন্ডার দেখে বুঝতে পারি কখন কোন ঋতু, কিন্তু বিলম্বিত শ্রাবনের বৃষ্টিতে জবুথুবু শহরের সবকটা উপচে পড়া ম্যানহোলের আবর্জনা আর স্যুয়ারেজের পানি ডিঙিয়ে আসতে আসতে মনে হলো শহরটা বাপ মা ছাড়া বাদাইম্যা পোলার মতো বেড়ে উঠেছে বহরে গতরে। কোনো পরিকল্পনা নেই, শহরের নিচু জমিগুলো দখল করেছে হাউজিং এস্টেট কোম্পানী, তাদের সাইনবোর্ড ভেসে আছে গলা পানিতে, পাশাপাশি জেগে আছে গাছের মাথা। সেখানেই নামি-দামি আর অপরিচিত হাউজিং প্রকল্প দেখতে দেখতে দিব্যি শহরের বাইপাস ধরে চলে যাওয়া যায়।

ঢাকা শহরের আশে পাশের নিচু জমিগুলো বন্যাপ্রবন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলো ষাটের দশকেই, সে সময়েই শহরের জমে থাকা বন্যার পানি নিস্কাশনের প্রয়োজনীয়তা অনুভুত হয়েছিলো, তার পর দেশ বদল হয়েছে, নিয়মিত সরকার বদল হয়েছে, যে শহরে একদা লাখখানেক লোকের বসতি ছিলো সেখানে হাউজিং বিপ্লব ঘটেছে, শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে শতগুন। এখন শহরের যেদিকের চোখ পড়বে সেখানেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বৈধ-অবৈধ ভবন। সেসব ভবনের মেঝে বেঁচে বড়লোক হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ক্ষমতা অনেক। তারা প্রকাশে হুমকি দিতে পারে, আন্দোলন করতে পারে, তাদের পেপার-পত্রিকা আছে, তারা সেখানে ভাড়াটে লেখক দিয়ে কলাম লিখতে পারে, দাবী জানাতে পারে তাদেরও নগর পরিকল্পনার অংশ করা হোক।

শিক্ষা ও রুচীবিহীন মানুষের কদর্যতার ছাপ শহরটার সর্বাঙ্গে, সেখানে নতুন করে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই আসলে। কিন্তু গতকালের বৃষ্টিটা প্রয়োজনীয় ছিলো। আমাদের এইসব লোভী-ক্ষুধার্ত মানুষদের জন্য বৃষ্টিটা প্রয়োজনীয় ছিলো। এমপি হোস্টেলের সামনে জমে থাকা আবর্জনা আর নোংরা পানির স্রোত অনেক উঁচু থেকে আমাদের মাননীয় আইনসভার সদস্যগন দেখেছেন, দেখেছেন তাদের পরিবারবর্গ। কিভাবে শহরটাকে অচল করে দেয় জলের বর্শা, কিভাবে বর্ষা বর্শা হয়ে আঘাত হানে জনজীবনে, শহরটা অচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েকঘন্টা। সেসব দেখে তাদের উপলব্ধি হওয়ার কথা আমাদের লোভ আমাদের বসতিকে কিভাবে ধ্বংস করেছে?

পরিত্যাক্ত নগরগুলো এভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়, একটা পর্যায়ে এসে কঠোর হয়েও সংশোধনের সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র ধ্বংস হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতার পরিবর্তন, পরিবেশ দুষণ আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভেতরে বসবাসরত উপকূলবাসীদের বাইরে আমাদের রাজধানীর নাগরিকেরা সামান্য বৃষ্টিতে একগলা পানিতে বসে আল্লাহ দে পানাহ দে পানাহ গান গাইছেন দৃশ্যটা দৃষ্টিকটু না।

আমিও নোংরা পানি ডিঙিয়ে বাসা ফিরেছি, আর পরবর্তী জেনে আশ্চর্য হয়েছি এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম ছিলো। দেশে এ সময়টাতে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা সে পরিমাণ বৃষ্টি হয় নি। বন দখল করে হাউজিং প্রকল্প আর হাজার কোটি টাকা খরচ করে নতুন এয়ারপোর্ট তৈরির মচ্ছবে কি পরিমাণ প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসন্ন সেটা কেউই গননায় আনেন নি। একটা হাইওয়ে তার আশে পাশের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করতে পারে সেটা বলেছিলেন ৭০ এর দশকের বিজ্ঞানীরা, কিন্তু সে ঘটনার ৪০ বছর পরেও সেটা আমলে আনবার প্রয়োজন মনে করে নি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা। আমাদের আরও রাস্তাঘাট দরকার, আমাদের উন্নয়ন অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা, সেটার জন্য দেশটার এপাশ ওপাশে এসফল্ট আর পীচের রাস্তা থাকা গুরুত্বপূর্ণ, একটা নতুন এয়ারপোর্ট তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের বনভুমির প্রয়োজন নেই, একটা দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য ২৫ শতাংশ বনভুমির কথা ঘোষনা করেছিলো জাতিসংঘ, কিন্তু বাংলাদেশে এখন সংরক্ষিত বনভুমি ১৫% এর কম। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে প্রকৃতিতে, দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমান কমবে, একই সাথে তাপমাত্রা বাড়বে, ঋতুবৈচিত্র থাকবে না, দিনে প্রচন্ড গরম আর রাতে শীত এমন মরু আবহাওয়ার বসবাস করতে হবে আমাদের। উন্নয়নের জন্য খানিকটা ছাড় দিতেই হবে আমাদের। উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া সরকারের সহস্রাব্দ শপথ এবং দারিদ্র বিমোচনের অঙ্গীকারের সাথে আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয় একসুতায় গাঁথা থাকলেও আমাদের সাময়িক ভাবে ভুলে যেতে হবে আমাদের সামনের দিনগুলো বৃষ্টিবিহীন কাটবে,

আমাদের শ্রাবন যাবে বৃষ্টির হাহাকারে, আমাদের মাটির নীচের জলের স্তরে নেমে যাবে ফিবছর আর আমরা আরও এক ফুট লম্বা পাইপ লাগিয়ে আরও গভীর থেকে জল টেনে আনবো ক্ষেতে।
বৈজ্ঞানিক কারিশমাতে হয়তো ভবিষ্যতে বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প টেনে দিব্যি বেড়ে ওঠা ধান পাট আবাদ হবে বাংলাদেশে, উন্নয়নের বিকল্প নেই কোনো। আমাদের যেকোনো মূল্যেই মধ্য আয়ের দেশে পরিনত হতে হবে।

কিন্তু মধুপুরের বন উজাড় করে ৫০০০ কোটি টাকা খরচ করে একটা এয়ারপোর্ট বানানোর প্রয়োজন কি? ঢাকা শহরের মাঝখান দিয়ে আরও ২০০০ কোটি টাকা খরচ করে উড়াল সেতু আর রেলওয়ে লাইন বসানোর প্রয়োজন কি? আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের উদ্ভট খেয়ালে প্রাকৃতিক গ্যাস চালিত ব্যক্তিগত যানবাহনের বার্থ কন্ট্রোল প্রসেসটা আরও আগে শুরু করলে হয়তো ভালো হতো, কিন্তু সেসব যানবাহনের মালিকদের অতিরিক্ত করারোপ করে তাদের নিরুৎসাহিত করবার কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয় নি।

আমাদের উন্নয়নের নেশায় নিহত হচ্ছে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ, দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী রাজা উজির মারা বাদ দিয়ে গতকাল তার বাসভবন থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে ঘুরলেই জনাব বিপু, জনাব দীপু, জনাব সোবহানের প্রতি ক্ষোভটুকুর যথার্থতা বুঝতেন, বুঝতেন তার ১ টাকার সরকারী /ব্যক্তিগত প্রাসাদের বাইরে ভীড় করে থাকা গাড়ীগুলো আটকে আছে কারণ তারা সামনে আগানোর পথ পাচ্ছে না, জলের সন্ত্রাসে বিপর্যস্ত ঢাকা শহরে শুধু নিরীহ পথচারী আর আটকে পড়া যাত্রীদের ব্যক্তিগত ভাবনাগুলো গালিমুখর হয়ে উঠেছিলো, আর আকাশের কোনে লেপ্টে থাকা কালো মেঘের চোখ রাঙানি দেখে তারা আতংকিত হয়ে ভাবছিলো আজ ইফতারের আগে বোধ হয় বাসা ফেরা হবে না।

এই নোংরা শহর আমাদের প্রয়োজন নেই, আমরা পরিত্রান চাই।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মুক্ত বয়ান's picture


গাছপালা আসলে ১৫% থাকলেও সেটা যদি সবখানে বন্টিত থাকতো তাহলে মনে হয় এত ভয়াবহ বিপর্যয় হতো না। যেটুকু আছে তারও ৮০% দেখেন কিছু জায়গায় ঘন বেষ্টিত অবস্থায়। ঢাকায় একেবারেই ধূ-ধূ মরুভূমি! মানুষের স্বাভাবিক নি:শ্বাস নেবার জায়টুকুও নেই।
আর, রাস্তাঘাট করা প্রয়োজন, তবে কেবল সড়ক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে বসে না থেকে আমাদের নৌপথ সংস্কারের যে উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিছে, সেইটা বাস্তবায়নটা অনেক বেশি জরুরি মনে হয় আমার কাছে।

মীর's picture


লাভ নাই। যত যাই বলেন কোনো লাভ নাই।

তবে ঢাকাকে প্রাণাধিক ভালবাসি। বিয়ার পর বউ মোটা হয়ে গেছে। কিন্তু একসাথে জীবন না কাটিয়ে উপায় নাই।

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


বন দখল করে হাউজিং প্রকল্প আর হাজার কোটি টাকা খরচ করে নতুন এয়ারপোর্ট তৈরির মচ্ছবে কি পরিমাণ প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসন্ন সেটা কেউই গননায় আনেন নি।

নুশেরা's picture


বীভৎস বাস্তবতা! লেখা ভালো লেগেছে।

শুধু ব্যক্তিগত যানবাহন না, ব্যক্তিরও বার্থ কন্ট্রোলের বড় বেশি দরকার হয়ে পড়েছে। এই সেক্টরে গত দেড় দশকে তার আগের পনের বছরের চেয়ে পিছু হেঁটেছি আমরা। একজনের আমলে সবুজ ছাতা সাফল্য পেলে পরের জন সেটা বন্ধ করে। খলনলচে বদলে সূর্যের হাসি ফোটাতে ফোটাতে আরেকজন এসে সেটা অকার্যকর করে।

মেসবাহ য়াযাদ's picture


লেখা বরাবরের মত সেরাম হৈছে।
কী করবেন কন ? আপনে, আমি আর আমরা হৈলাম আম জনতা। আমগো চিন্তা ভাবনার কতা হেরা শুনবো ক্যান ? আমরাও যে হেগো থেইকা কম ভাবতে পারিনা, আমগো যে দেশটারে নিয়া ভাবনা আছে- এই কতাটা হেরা ডদ্দিন না বুঝবো, তদ্দিন দেশের এই হালই হৈবো... আল্লা ভরসা ! হক মাওলা !!

নীড় সন্ধানী's picture


এই নোংরা শহর আমাদের প্রয়োজন নেই, আমরা পরিত্রান চাই।

নীড় সন্ধানী's picture


মন্তব্য লেখলাম গেল কই??????? Puzzled

মুকুল's picture


Star Star Star Star Star

তানবীরা's picture


চাই চাই চাই, পরিত্রান চাই। যানজট মুক্ত বিদ্যুতসম্পন্ন পরিচ্ছন্ন দেশ চাই।
বর্শা না হয়ে বর্ষা হলে ভালো হবে Big smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.