ইউজার লগইন

নিরুদ্দেশ যাত্রা- আহমাদ মোস্তফা কামাল

অনেক অনেক দিন পর ৬ ফর্মা ৮ ফর্মার ফরমায়েশী উপন্যাসের বাইরে আহমাদ মোস্তফা কামালের নিরুদ্দেশ যাত্রা পড়লাম। প্রথম পাঠে মনে হলো উপন্যাসটা অনেক কিছুই হয়ে উঠতে পারতো, হয়তো লেখকের নিস্পৃহতায় কিংবা অনাগ্রহে কিংবা দুর্বল সম্পাদনায় কিংবা ব্যক্তিগত মোহে ঠিক কোথাও গিয়ে দাঁড়ালো না। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ভাবনাবিলাসিতার অবসরে লেখকের উচ্চকিত স্বর, এই অবদমনের কালে প্রত্যেকের কিছু না কিছু বলবার ছিলো, উপন্যাসের পটভূমিতে চরিত্রের বরাতে সেসব বলার স্বাধীনতা ছিলো না, তাই যখন নিজেকে সচেতনে আড়াল রাখা প্রয়োজন ছিলো, ঠিক সে সময়েই লেখক সকল অর্গল খুলে নিজের ভাবনার স্রোতে ভাসাচ্ছেন পাঠককে। সজীব কিংবা রাজীব কিংবা তাদের বন্ধুদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার যেটুকু বর্ণনা এই উপন্যাসে আছে- নেহায়েত অপ্রয়োজনীয়। অসম্পাদিত, পরিকল্পনাহীন রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ উপন্যাসে বর্ণনার বাহুল্য এনেছে, তবে যে চরিত্রের প্রয়োজনে এমন পণ্ডশ্রম, এই স্মৃতিচারণ তার চুড়ান্ত পরিণতিকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করে না। ব্যক্তিগত স্বরগুলোকে অগ্রাহ্য করে, কিংবা উপন্যাসের মাঝের ৪ ফর্মায় এলেমেলোভাবে লেখকের রাজনীতি দর্শণ উঠে এসেছে- সবগুলোকে যথাযথ গ্রন্থিত করে, এক ফর্মায় আটকে রাখার পর উপন্যাসের যতটুকু টিকে থাকবে- সেটুকু থাকলেও এটা ১২ ফর্মার চমৎকার উপন্যাস।

আমাদের উপন্যাসের চরিত্রেরা মারে তো গন্ডার, লুটে তো ভান্ডার। সাদামাটা কিছুতে তাদের অরুচি। কখনও বাঘের ল্যাগে কান চুলকাচ্ছে, কখনও টাট্টু ঘোড়ার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করছে , কখনও মরাল, কখনও ম্যুরাল, আবার কখনও ব্যাঙ হয়ে চিপে ধরছে সাপের গলাটা।লেখকের অপত্য স্নেহে অসংখ্য পাটকাঠির মাঝে বেড়ে উঠছে বিকট এক মহিরুহ, এমনই অত্যাশ্চার্য্য এক চরিত্র যে বাম হাতে মলটেভ বোমার সলতেতে আগুণ জ্বালাচ্ছে আর ডান হাতে লিখছে অনবদ্য প্রেমের কবিতা। উপন্যাসের কলেবর জুড়ে এমন সর্বপটু মানুষের নিজস্ব জীবনযন্ত্রনা, তাদের প্রেমবোধ, তাদের শিহরণ, তাদের অপ্রাপ্তিটুকুও ভীষণ রোমাঞ্চকর।

আহমাদ মোস্তফা কামাল লেখেন ভালো। তিনি রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় হতাশ বাস্তববাদী হলেও উপন্যাসিক হিসেবে বিষন্ন রোমান্টিক। তিনি তার সবটুকু স্নেহ, মমতা দিয়ে এই উপন্যাসের সজীব চরিত্রটাকেই নির্মাণ করেছেন। সজীবের আত্মমগ্নতা, তার আত্মঅনুসন্ধান , তার চারপাশে তৈরী করা অধিবাস্তবতার জগতের ভেতরে সজীব নিটোল বেড়ে ওঠে। তরুণ, প্রৌঢ় সকল চরিত্র নিয়ে উপন্যাসটার প্রথমার্থ ঝুলে থাকে গত শতকের আট এর দশকে। একদিকে স্বৈরাচারী এরশাদ তার কুটিল রাজনীতি শাণ দিচ্ছে, অন্য দিকে ক্ষমতার লোভে পথ হারাচ্ছে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় নেতা কর্মীরা। যদিও প্রচুর আন্দোলনের দিন-তারিখের উল্লেখ আছে, তবে উপন্যাসটা মোটেও রাজনৈতিক উপাখ্যান না। এমন কি উপন্যাসের চরিত্রগুলো, যারা রাজনীতিতে সক্রিয়, তারাও রাজনীতিটা দেখছে খবরের কাগজের ভাষ্যে, সেখানে প্রাণ-চাঞ্চল্য নেই। স্বৈরাচারের বুটের লাথিতে ক্ষতবিক্ষত যাদের কৈশোর, তারুণ্য, তারা মিছিলে নেমেছে, শ্লোগানে গলা মিলিয়েছে, তবে লেখকের বর্ণনায় সেই উন্মাতাল সময়ের কোনো ছাপ নেই। পড়ে মনে হয় যতটুকু দুরত্ব থেকে দেখলে স্ফটিকের মতো উজ্জ্বল হয় স্মৃতিগুলো, লেখক সম্ভবত তার চেয়ে ঢের বেশী দূরে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট ফোকাসে তার তারুণ্যকে দেখছেন সংবাদপত্রের কলামে।

রাজনৈতিক অপ্রাপ্তির হতাশা আছে, প্রাক্তন স্বৈরাচারকে দোষারোপের প্রবনতা আছে, দুর্নীতি- স্বজনপ্রীতি, লুটপাটতন্ত্র নিয়ে বিস্তর আক্ষেপ আছে, আছে এক ধরণের মোহমুগ্ধতা। আমরাই বদলে দিতে পারতাম, যদি আমাদের নেতাগুলো একটু কম জোচ্চোর হতো আমরাও বিশ্বে নিজের নাম উজ্জ্বল করে ফেলতাম- এমন আশাবাদী রোমান্টিসিজম দিয়ে শুরু হয় উপন্যাসের দ্বিতীয় অর্ধ যা আদতে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের বাংলাদেশ। এই উপন্যাসের একটা মাত্র চরিত্র যে সরাসরি স্বৈরাচারের ভুক্তভোগী, তাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে যাওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো অনেক বেশী প্রাণহীন, ফ্যাকাসে লাগে। উপন্যাসের চরিত্রগুলো যতটা না নিজের তাগিদে, তার চেয়ে ঢের বেশী অকারণেই রাজনৈতিক কলামিস্টের মতো দেশ ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে থাকে। তাদের নিজস্ব জীবনযাপনের সাথে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির টানাপোড়েনের বিষয়টা স্পষ্ট করে না সেসব বর্ণনা, মনে হয় ক্লিষ্ট একজন চায়ের দোকানে বসে খোশ মেজাজে দেশ ও জাতি উদ্ধারের মিশনে নেমেছে আজ।

আত্মমগ্ন, সংস্কৃতিপ্রবন সজীব শেষ পর্যন্ত কোথাও ঠিকানা খুঁজে পায় না। দ্বিতীয় যৌবন নিভে যাওয়ার আগে তার প্রথম প্রেম ফিরে আসে, সঙ্গমস্বেদ এবং নিরুৎসক সঙ্গমের মাঝামাঝি সে প্রেমও ফিরে যায়। সজীব যেভাবে আঁকড়ে ধরে ছিলো তার অতীত সম্পর্কগুলোকে, নতুন কোনো সম্পর্কই তাকে তেমন স্পষ্ট আশ্বাস দেয় না। অসম্ভব সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা সজীব শেষ পর্যন্ত কোথাও কোনো ঠিকানা খুঁজে পায় না। কবর কিংবা পুরোনো ঘর, পুরোনো পুকুরের মজা ঘাট কিংবা ফেলা আসা নদীর দীর্ঘশ্বাস, কোথাও নিজেকে ন্যস্ত করতে পারে না সে। নিজস্ব কোমলতা নিয়ে সে রাস্তায় নামে-

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,