আবোল তাবোল
আজ থেকে ২৩০ বছর আগে যখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে আমেরিকা স্বাধীন হলো তখন ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকজন মন্তব্য করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশের কারণেই সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা জন্ম নিয়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থা কিংবা শিক্ষা প্রদানপদ্ধতিকে শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সেটাই প্রথম উদাহরণ হয়তো নয় কিন্তু সমসাময়িক সময়েই ইংল্যান্ডে ভারত উপমহাদেশের বাসিন্দাদের শিক্ষিত করে তুলবার রাজনৈতিক চাপ শুরু হলে ভারত উপমহাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের ভেতরে বিতর্ক শুরু হয়েছিলো।
পরবর্তীতে ইংরেজ বণিকগণ শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সুবিধার্থে এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়ে উদ্যোগী ভুমিকা পালন করে কিন্তু তাদের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শতাব্দীপ্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাঙ্গনকে পঙ্গু করে মাথাভারী এক ধরণের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সচেতন উদ্যোগ। কারিগরী শিক্ষা নয় বরং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে যতটুকু প্রয়োজনীয় এর বেশী শিক্ষা প্রদান না করবার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে বণিকদের বিশেষ বেগ পেতে হয় নি।
আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছিলো খোদ ইংল্যান্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলেই, ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ভাবধারা ও শিক্ষিত সমাজের ভাবনাগুলো আমেরিকার শিক্ষিত মানুষদের আলোড়িত করেছিলো কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে তেমন আলোড়ন সমাজ কাঠামোকে নড়বরে করে দিতে পারে নি।
মধ্যযুগীয় কাঠামোতে যেখানে ইউরোপে চার্চভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটছে, তারও আগে থেকে উপমহাদেশে পৃথক শিক্ষায়াতন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে বিদ্ব্যৎজনের সমাবেশ ঘটেছে, এখান থেকে শিক্ষিত মানুষেরা পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে সেখানে শিক্ষাবিস্তার করেছেন। সেসব অতীত গৌরবের চর্বিতচর্বন হয়েছে উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হওয়ার সময়। তবে বর্তমানের প্রচলিত কাঠামোভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে আরও পরে।
এখন শিক্ষাপদ্ধতিতে একটি ধারাবাহিকতা এসেছে, এমন কি শিক্ষাগবেষণাপদ্ধতি উন্নত হওয়ার কারণে শিক্ষাঙ্গনের পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, শিক্ষার্থীর বয়েস ও মেধায় বিকাশ বিষয়ে পৃথক অনুমাণের কারণে বয়েসভিত্তিক শিক্ষাপাঠ্যক্রম প্রণীত হয়েছে। একজন ৬ বছর বয়েসী শিশুর মেধা ও মননের ব্যবহার কোনোভাবেই ২৬ বছর বয়স্ক একজনের মতো হবে না , এই ব্যবধানটুকু মেনে নিয়েও শিক্ষা পাঠ্যক্রম তৈরী হচ্ছে- শিশুরাও ধারাবাহিক ভাবে শিখছে, প্রতিটি ধারণাই অতীত ধারণাকে ধারণ করেই বিকশিত হচ্ছে- সে কারণেই এখন প্রাক-প্রাথমিক স্তর, প্রাথমিক স্তর এবং বাজার ব্যবস্থা এবং মানুষের আকাশছোঁয়া চাহিদাকে সম্মান করে ভবিষ্যতের আইনস্টাইন তৈরির প্রকল্প গ্রহন করা হচ্ছে- গর্ভকালীন অবস্থায় কোন ধরণের সঙ্গীত শিশুর মেধা বিকাশে সহায়ক হবে, কোনো ধরণের চিত্র প্রদর্শনী, কোন ধরণের খাওয়ার এমন কি কোন ধরণের পোশাক পড়লে গর্ভ থেকে ভবিষ্যত আইনস্টাইন ধরাধামে অবতীর্ণ হবে এমন গবেষণাও হচ্ছে-
শিশুর ধারণার বিকাশ এবং ব্যবচ্ছেদ হচ্ছে- শিশু কিভাবে শিখছে এবং কিভাবে শিক্ষার আগ্রহ হারাচ্ছে বিষয়গুলো গবেষকদের ভাবাচ্ছে। সে কারণেই অতীতের তুলনায় এখন শিক্ষাপদ্ধতি অনেক বেশী প্রাতিষ্ঠানিক, অনেক বেশী শ্রেণীবিন্যস্ত এবং হয়তো সহজ হয়েছে।
কিন্তু শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য কি পূরণ হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে?





শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য কি পূরণ হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে?
শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য কী সে বিষয়ে যদি একটু আলোকপাত করতেন তা'হলে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সুবিধা হতো ।
শিক্ষানীতি প্রণয়নের একটা উদ্দেশ্য আছে কিংবা সকল শিক্ষানীতির একটা উদ্দেশ্য ছিলো- ইংরেজ এনলাইটেনড ফিলোসফারদের কাছে সেটার যে অর্থ ছিলো সেটা প্রয়োগ করে আমেরিকার উদাহরণ ঘেঁটে যখন তারা উপলব্ধি করলো "হয়তো তাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নিজের অবস্থা পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে এবং এইসব দার্শণিক জটিলতার প্রেক্ষিতে তাদের ভেতরে সার্বভৌমত্বের বোধ জন্মায়" সুতরাং আত্মনির্ভরশীল এবং বিজ্ঞানমনস্ক একটা শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করলে সেটা আদতে ঔপনিবেশিকতার জন্য ক্ষতিকারক বিবেচিত হতে পারে- এটা খুব বেশী নির্ভর করার মতো বক্তব্য না কিংবা আমেরিকার যারা স্বাধীনতা আন্দোলনের দার্শণিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন তারা যেভাবে ধর্মনির্ভরতা থেকে ব্যক্তি ও আত্মনির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন সেটা হয়তো ইংল্যান্ডের তৎকালীন শিক্ষাবিদদের তেমন আপ্লুত করে নি- সে কারণেই ১৮০২ সালে প্রথম বার সবার জন্য আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা কিংবা এনলাইটমেন্টের প্রস্তাবটুকু উত্থাপিত হলেও উইলিয়াম গ্রান্ট এটা অবশেষে সম্ভব করতে পারলেন ১৮১৩তে , কিন্তু তারপরও এই ফান্ড ব্যবহার করে শিক্ষায়াতন প্রতিষ্ঠা করতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত-
ফোর্ট উইলিয়াম ইংরেজ উচ্চাকাঙ্খী যুবকদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে কাজ করবার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, সেটা শোষণের সুবিধার্থে- তুমি ভাষা ও সংস্কৃতি যত ভালোভাবে উপলব্ধি করবে শাসন করা তত সহজ ধারণা থেকে- সেটা ইংরেজ সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র- বাঙালদের জন্য বিজ্ঞান ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানবিহীন একটা শিক্ষাকাঠামো তৈরী হলো কিংবা বাঙালরা নিজেরাই যন্ত্রভীতিতে ভুগে নিজেদের বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হলো বিতর্কটা গৌতমের জন্য রেখেদেওয়া উচিত, ও এ বিষয়ে অভিজ্ঞ।
কিন্তু আমাদের শিক্ষানীতির মৌলিক উদ্দেশ্য ছিলো ইংরেজ বণিকদের সহায়তা করবার জন্য উপযুক্ত কেরানী তৈরি করা, বাঙাল বৈদেশ গিয়েছে প্রায়োগিক বিজ্ঞান শিখতে, চিকিৎসা শাস্ত্র শিখেছে, কৃষিবিদ হয়েছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশী হয়েছে উকিল মোক্তার আর বিচারক- সেটা কোন অর্থনৈতিক চাহিদার প্রেক্ষিতে- বলা মুশকিল।
বর্তমান শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য বিজ্ঞানমনস্ক একটা প্রজন্ম তৈরি করা, যাদের ভেতরে দেশপ্রেম আর নৈতিকতাবোধ থাকবে- বাংলাদেশের প্রতিথযশা শিক্ষাবিদগণ সেভাবেই শিক্ষানীতি তৈরি করেছেন বলে দাবি করেন- আমাদের অতীত একটি শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ছিলো দেশের জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি করা-
তারা কি সেটাতে সফল হয়েছেন?
প্রতিষ্ঠানের চাওয়া এবং ব্যক্তির চাওয়ায় ভিন্নতা আছে- আপনি একজন শিক্ষিতের কাছে কি ধরণের প্রশিক্ষণ ও সংস্কৃতি আশা করেন- সেটা আপনার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার পরিমাপ। এই দার্শণিক প্রশ্নটা সবার নিজের বোঝাপড়ার জন্য- কেরাণী তৈরির প্রশিক্ষণার্থে নির্মিত শিক্ষানীতি উপযুক্ত কেরাণী তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে
না
আরেকটু ডিটেইল্ড হইলে ভাল হইতো। এখন যেই শিক্ষা আমরা পাই, পুরাটাই ওয়েস্টার্ন সিসটেমে। আধুনিক হইলেও সেইটা পশ্চিমা মডেল থেইকাই নেয়া হয়। কিন্তু আসলে এর বাইরে কি আছে, কিংবা এর বাইরে যা আছে তা দিয়া কি আসলে কেউ সারভাইভ করতে পারবে কিনা এখনকার পশ্চিমা মডেলে তৈরি হওয়া সিস্টেমে, এইটা একটা বড় প্রশ্ন।
আমরা আসলে কি পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা পাই? আমরা কি পাই এটা নিয়ে আমার নিজের ব্যপক সংশয় আছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একটা সার্কাস, অনেক জোকার, অনেক জাগলার, কেউ চোখ বেঁধে ছুড়ি ছুড়ছে, সেটা কোন লক্ষ্য পূরণে সেটা দাঁড়িবাজ জানে না, জোকার জানে না, জাগলার জানে না। যে মানুষটা বাঘের খাঁচার সামনে বসে ঝিমাচ্ছে সেও জানে না, দর্শকের মনোরঞ্জনের বাইরে এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কি?
শিক্ষা হয়তো একটা নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ- সকল চিহ্ন আর সংকেত পাঠ করবার প্রশিক্ষণ, সেইসব সংকেত আর চিহ্ন পাঠ করে কে কোন গন্তব্যে পৌঁছাবে সেটা কি পূর্বনির্ধারিত কোনো বিষয়? কিংবা গন্তব্য কি নির্ধারিত এবং নির্দিষ্ট?
পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা আমরা পাই না, এমন কি ইংলিশ মিডিয়াম আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনেও আমরা পশ্চিমার বাঁদর অনুকরণ শিখি, সেটা পশ্চিমা ধাঁচের অনুকরণ- সেটার ভেতরের খোলস আদি ও অকৃত্রিম দেশী। সাংস্কৃতিক অন্ধ অনুসরণ হয়তো একটা ধন্দ তৈরি করে কিন্তু সেটা আদৌ শিক্ষার্থীকে নতুন কিছু শেখায় না। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কিংবা ভাবনার পরিসরে নতুন কিছু তৈরি হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবিদদের দাবি নতুন জ্ঞান ও সংস্কৃতি উৎপাদন কেন্দ্র- আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এমন কোনো নতুন জ্ঞান কিংবা সাংস্কৃতিক বোধের জন্ম দিচ্ছে? আমরা যা যা শিখবার তাও কি সম্পূর্ণ শিখছি?
বৈজ্ঞানিক চিন্তন পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয় বাংলা মাধ্যমে নবম শ্রেণীতে- বেকন কিংবা গ্যালিলিও কিংবা সেই ষষ্টদশ শতকের ভাবনাই এখনও অনুধাবণ করতে পারলো না সবাই, প্রতিবছর এসএসসি পাশ করে এখন কয়েক লাখ ছেলে মেয়ে- তাদের ভাববার ধরণ যাচাই করলে বিষয়টা আরও পরিস্কার হয়ে যাবে-
এর বাইরে কি আছে আমার জানা নাই- জোরাতালি দিয়ে একটা কাগজের দুর্গ বানানো হয়েছে- সেটা কোনো ভাবনা ধারণ করতে পারে এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন কিন্তু কোনো এক জায়গায় গিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়, আস্থাবান হতে হয়- সেই জায়গাটা কি বলা কঠিন।
আমরা হয়তো আদর্শ পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা পাইনা, কিন্তু শিক্ষার মডেল তো আমাদেরকে তৈরি কইরা দিয়ে গেছে সেই ব্রিটিশরাই। সেইটাই আমরা এখনো আঁকড়াইয়া ধইরা আছি। শিক্ষা বিষয়ে আমি নিজেই একটু বিভ্রান্ত, কারন একটা সিস্টেমে থাকতে হয় ব্যাপারটা, আর পারফেক্ট কোন সিস্টেমের অস্তিত্ব আছে কিনা সেইটাই তো জানিনা। প্রাতিস্ঠানিক শিক্ষাটা তো আসলে শেষ পর্যন্ত কেরানী তৈরি করার-ই একটা পদ্ধতি এই দেশে। পশ্চিমেও তো একি, অনেক ফ্রিডম, কিন্তু আসলে কি চিন্তার স্বাধীনতা পুরাপুরি থাকে? একটা ছকেই তো ফেলায় সবাইরে, মেশিনের মত, কেউ কিমা হয়, কেউ হয় সসেজ আর কেউ হয়ত হান্টার বিফ। স্বাধীন চিন্তার জায়গাটা কোনখানে?
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়া বন্ধু মহলে আলোচনা করতে গিয়া একটা উপলব্ধি হইছিলো আমাগো যে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা হয় পোস্ট কমিউনাল নয়তো পোস্ট কলোনিয়াল অ্যাপ্রোচে তার ভিত্তি তৈরী করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো সেই উনবিংশ শতকের পশ্চিমা নীতিই এখনো অনুসরণ করা হয়, যেই জায়গা থেইকা হয়তো পশ্চিমারাও আরো একশো বছর আগেই আরো বহুদূর চইলা গেছে। আমাগো শিক্ষকেরা পশ্চিমাগো কোর্স মডিউল কপি পেইস্ট মাইরাই মনে করে আমরা আন্তর্জাতিক হইলাম। আমি একটা স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেইকা স্নাতকোত্তর পাস দিছি ১৩ বছর আগে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার প্লাজারিজম বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিলো না। আমাগো শিক্ষকেরাও দেখছি অন্যের লেখা আর্টিকেল থেইকা সমানে কপি কইরা পাবলিকেশন বানাইতো।
লেখাটা ভালো লাগলো। কিন্তু কিছু বিষয় আসলে আরো স্পেসিফিক কইরা বলা দরকার। যেমন শেষ মন্তব্যে তুমি ভেতরের ভ্রমরটারে আদি অকৃত্রিম দেশী বলছো, সেইটারে আমার ঠিক মনে হয় না আপাতঃ দৃষ্টিতে। এই দেশের পাঠশালা কিম্বা প্রাচীন শিক্ষালয়ের যেই ঐতিহাসিক নমূনা পাওয়া যায় তাতে বিদ্যমানটারে আরো বেশি সংকীর্ণ লাগে। এমনকি কমিউনাল ধারাটাও একসময় এর চাইতে বিস্তৃত ছিলো। প্রায়োগিক শিক্ষার নামে চাকুরীমূখিন শিক্ষারে নতুন প্রচ্ছদে চালাইয়া দেওনের চেষ্টা হইতাছে, এই শিক্ষা আসলে বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার অবদান...তারে খাটি দেশি কওয়া হইলে অহেতুক শ্রদ্ধা করা হয় বইলাই আমার মনে হয়।
"প্লাজারিজম" মেধাসত্ত্বের স্বীকৃতি না দেওয়ার অপরাধ- অন্যের মৌলিক গবেষণার অবদানকে স্বীকৃতি না দিয়া নিজের উপলব্ধি কিংবা আবিস্কার বলে চালায়া দেওয়ার বিষয়টা বেশ নিন্দনীয় অপরাধ - এখানে শিক্ষিত ব্যক্তিদের ভেতরে উদারতা কম, অন্য কারো মেধার স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয় নি- জ্ঞানার্জন একটা সম্মিলিত প্রয়াস এখানে যেকোনো সমস্যাই অনেকে মিলে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলনশীল, সে বিষয়গুলোর উপলব্ধি না হওয়াটা দুঃখজনক। এটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা
দেশীয় পাঠশালার উচ্চমাণ নিয়ে একটা রোমান্টিক বিভ্রান্তি আছে, কিংবা জাতীয়তাবাদী ধারণার কারণে এক ধরণের মোহ আছে এই উচ্চমাণ নিয়ে- আমরা অতীতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার উত্তরপুরূষে যা হাতে পাচ্ছি সেসবকে পুন:বিবেচনার জন্য প্রস্তুত না করেই স্মার্তদের মতো বলে যাচ্ছি উচ্চমাণী প্রতিষ্ঠান- উচ্চমাণ যাচাই করবার কোনো প্রক্রিয়া কি আমাদের আছে? অতীশ দীপংকর তিব্বতে গিয়েছিলেন, নালন্দা একদা উপমহাদেশের বিখ্যাত শিক্ষাপীঠ ছিলো, এদেশের সম্রাটেরা শিক্ষার জন্য নিস্কর জমি দান করেছেন, মসজিদকে শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করেছেন- কিন্তু উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কি উমাইয়া শাসকদের যৌক্তিক পরিণতির কোনো কিছু ধারণ করতে পেরেছিলো? মিশরে দ্বাদশ শতাব্দিতে বিজ্ঞানে মুসলমান বিজ্ঞানীদের অবদানের কতটুকু মাদ্রাসায় পঠিত হয়েছে?
প্রায়োগিক ক্ষেত্রে যতটা উৎকর্ষতা অর্জন করেছে পশ্চিমা উপাসনালয় ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা, একই উপাসনালয় ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এখানে নতুন জ্ঞান উৎপাদিত হয়েছে- কল্পনার সাথে প্রায়োগিক বিষয়ের সংযোগ এখানে ছিলো না, সেই খামতিটুকু এখনও আছে, আধ্যাত্মিকতার বলে বস্তুর সরণ ঘটানোর প্রয়াস হয়তো অনেক বেশি আকর্ষণীয় কিন্তু যন্ত্রের সাহায্য যেকোনো স্থানে ভ্রমন করতে পারবার সস্তিটুকু আমাদের চাই- এখন কিংবা অতীতে কোনো সময়ই জ্ঞানের দার্শণিক আলাপ আলোচনা থেকে বস্তুতান্ত্রিক প্রায়োগিক ভুমিতে শিক্ষা পদার্পন করে নি। আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা কিংবা বিপনন ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটে নি গত ৩ সহস্রাব্দে- এই খামতিটুকু মেনে নিলে বলতে হয় অতীতের উচ্চমাণ একটা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারণার প্রক্ষেপণের বাইরে বস্তুনিষ্ঠ কিছু না।
আমি মনে হয় না এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক শিক্ষারে উন্নতমানের বা প্রয়োজনীয় শিক্ষা কইতে চাইছি। আমার বক্তব্য হইলো বৃটিশ উপনিবেশিকতা আমাগো যেই শিক্ষাব্যবস্থারে আধুনিকতার রসে চুবাইয়া খাওয়াইছিলো একসময়, সেই শিক্ষা আসলে ঐ যূগের সংকীর্ণ শিক্ষা পদ্ধতি বা ধারণার থেইকাও সংকীর্ণ করছে মানুষরে। মানুষ আরো চিপাতে পড়ছে। তারা বরং তাগো ঔপনিবেশিক সংকীর্ণ ধারণাটারে এই দেশীয় সাম্প্রদায়িক ধারণাটার মুখামুখি দাঁড় করাইয়া দিছে। যাতে সাম্প্রদায়িকরা আরো সাম্প্রদায়িক হইছে, আর চাকুরীমূখিন কেরানি বানানের কারখানাটা আরো চাকুরীমুখীন হইছে।
আজকের যূগে আইসা বিষয়টা পাইছে সর্বোত্তম রূপ। এখন যে কোনো বিষয়ের চাইতে ব্যবসায় প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ বেশী। পদার্থ বিদ্যায় এক্সেপশনাল ফলাফল না করলে মানুষ একটা বিবিএ ডিগ্রী নেওনের ধান্ধা করে। একই কথা খাটে প্রকৌশলি এমনকি চিকিৎসকের বেলাতেও। চাকুরীমূখিন ডিগ্রীটা এখন গুরুত্বপূর্ণ অনেক বেশি।
তোমার লগে আমার বেইসিক বিরোধটা হইতেছে আমি পশ্চিমা উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গীটারে দেশীয় সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থার চাইতেও ক্ষতিকর বলতে চাইতেছি। এর বাইরে মনে হয় দুইজন একই কথা কইতে চাই।
হইলে সেইটা সমস্যা না। এইখানে অল্প আয়াসে সিদ্ধিলাভের কামনায় প্রশিক্ষিত না হয়েও শিক্ষিত হওয়া যায় , এমন কি একটা ডিগ্রী বগলদাবা করা যায়। কেলাশ ওয়ান থেকে বুড়া সচিব, সবার প্রয়োজনেই একটা কোচিং সেন্টার আছে, সেইখানে সবই তৈরি বিষয়, নাম ঠিকানা আর রোল নাম্বার বদল করে কোনো নিজস্ব মেধার প্রয়োগ না করেও এইখানে চাকুরী বাগানো যায়,
যুগের প্রয়োজনে এবং বাণিজ্যিক প্রয়োজনে বিশেষায়িত সেবাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে- সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিপ্রয়োজন, সেই প্রয়োজন অর্থনৈতিক ভাবে পুরণ করা হবে- সে কারণেই ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ, সে কারণেই পাবলিক হেলথ, সে কারণেই জনসংখ্যাগবেষণা, সে কারণেই মাস জার্নালিজম,
এইসব বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই প্রথমত বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সামাজিক গবেষণার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান দ্বিতীয়ত এখানে যারা বিভিন্ন পদে নিজস্ব মেধার প্রয়োগ করবেন বলে ধারণা করা হয় সেখানে স্বদেশী সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজবেন এইসব ব্যক্তি এমনটা অনুমান করা হয়- কিন্তু কোচিং সেন্টারে এইসব প্রক্রিয়া শেখানো হয় না বলে আমাদের উন্নয়ন গবেষকেরা স্থানীয় সংকটের সমাধানের জন্য বিদেশী টোটকা সমাধান প্রয়োগে বেশী আন্তরিক হয়ে উঠেন- কেরানিগিরি করবার জন্য শিক্ষিত হলেও গণমানুষের সেবার অযোগ্যতার পরেও অন্য সবার চেয়ে আরও উন্নততর জীবনযাপন ও বক্তিমেবাজীতে আমার আপত্তি আছে, সেটা হয়তো আমার কাছে শিক্ষার উদ্দেশ্য মনে হয় না।
লেখাটা ভালো লাগলো। এ ধরনের আরো লেখা এবিতে আশা করি।
যাদের জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো বিদেশে এসে কামলা খাটা, তাদের শিক্ষানীতি কামলা খাটার ফরে হওয়াটাই বাঞ্চনীয়। এটা যারা যতো দ্রুত শিখতে পারে তারাই লাভবান বোধহয়। দেশপ্রেম দিয়েতো পেট ভরবে না। চীনারা আগে এটা শিখেছে, আই।টির রাঘব বোয়াল বেশির ভাগ চৈনিক। এখন ইন্ডিয়ানরা সব টেক ওভার করতেছে তাও চৈনিকদের চেয়ে সস্তায়
বিষয়টা নিয়ে আরো আলোচনা হোক। আমি পইড়া পইড়া শিখি। গৌতমদা'রে একবার দেখা গেলে ভালো হৈত।
এখন তো মনে হয় শিক্ষার উদ্দেশ্য হল পুরাপুরিই অর্থনৈতিক। এর বাইরে আরো কোন মহৎ উদ্দেশ্য নাই।
এমন গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের শিরোনাম "আবোল তাবোল", এটা মোটেও মানাচ্ছে না । বিষয়টি কোনক্রমেই আবোলতাবোল নয়, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট এ পোস্টটির শিরোনাম বদলাবার জন্য লেখকের প্রতি অনুরোধ এবং পোস্টটি প্রথম পাতায় কয়েকদিনের জন্য রেখে আলোচনার সুবিধা দেবার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন করছি ।
মন্তব্য করুন