মাসব্যাপী কার্ণিভাল ০৩
ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্য ঢাকা শহরের শ্রীবর্ধন প্রকল্প চলছে, শহরের ভাঙাচোড়া পথঘাট কালো পিচে মসৃণ করছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর, প্রধান প্রধান রাস্তাগুলোর দু-পাশের নির্মানাধীন এপার্টমেন্ট হাউজিংগুলোর বাইরের টিনের দেয়াল রং এ ঢেকে ফেলছে শ্রমিকেরা, পুরোনো শ্লোগান আর বিজ্ঞাপনে ঢেকে থাকা দেয়ালগুলোতে নতুন রংএর পরত লাগছে, একটা সাজ সাজ রব শহর জুড়ে, সেখানেই পেপসি খাও গেম বদলে দাও শ্লোগানের পোষ্টারে বিচিত্র যোদ্ধাভঙ্গিতে মুখব্যাদন করে আছে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল আর মাশরাফি মোর্তজা।
পয়সা দিলে মানুষ অনেক আনন্দ নিয়ে অনেক অশালীন কাজ করে ফেলে কিংবা ক্রমাগত উপস্থিতির মাধ্যমে অশালীনতাকে দৃষ্টিনন্দন এবং সহনীয় করে তোলার একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে কেউ, বডি পেইন্টিং এর ভেতর দিয়ে আদুল গায়ের সাকিব আল হাসান আর তামিমের যোদ্ধাভঙ্গিটা চোখে খোঁচা দেয় প্রতিদিনই, কিন্তু এই অশালীন পোষ্টারটা দৃষ্টিনন্দন ভাবছে হয়তো শহরের কতৃপক্ষ সে কারণেই হটানো হচ্ছে না এটাকে।
অতিথির সামনে যেভাবে যাবতীয় সাংসারিক টানাপোড়েন লুকিয়ে সুখি গেরস্থের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয় সামাজিক মানুষেরা, বাংলাদেশও তার দারিদ্রকে এনামেল পেইন্টে লুকিয়ে বিশ্বের সামনে নিজের সৈন্দর্যমন্দিত রূপ তুলে ধরতে আগ্রহী, সেই প্লাস্টারে মোড়া উন্নয়নের ছবি দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম, গন্তব্য বই মেলা।
আরও অনেক মানুষ হাঁটছে একই অভিমুখে, বাংলা মোটর, শেরাটন, ডায়াবেটিস হাসপাতাল থেকে যাদুঘরের পথ পর্যন্ত বেশ নির্বিঘ্নে হেঁটে আসা গেলো, ফুলের দোকানের সামনে থেকে ভীড়ের পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে, রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে বুঝলাম শহর ভেঙে মানুষ এসেছে বইমেলায়। তাদের দীর্ঘ সারির মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া যেতো, কিন্তু পরে বুঝলাম যেটাকে আমি লাইন মনে করছি, আমার সামনের মানুষের ব্যারিকেড সেটার অন্য অংশ,তারাও এই লাইন মেনেই ভেতরে ঢুকতে চায়, তাদের অবহেলা করে নিজের মর্জিমতো দিব্য ড্যাংড্যাং করে চলে যাওয়া অসভ্যতা হবে। এই সারির সূচনা খুঁজে পেলাম না, আমার সামনের মানুষটাকে বললাম
আমি কি এখানে ঢুকতে পারবো? না কি আরও পিছে যেতে হবে?
তিনি বললেন সমস্যা নাই ঢুকে পরেন।
আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম, সেই লাইন মেনে হাঁটতে হাঁটতে যখন মেটাল ডিটেক্টরের সামনে পৌঁছালাম তখন পুলিশ বললো এখানে দুইটা লাইন, অন্য লাইনে গেলেও ক্ষতি নেই, সে লাইনে কোনো মেটাল ডিটেক্টর নেই।
বই মেলা আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্যই মেটাল ডিটেক্টর বসানো গেট, পুলিশ পাহারা, কেউ যেনো হঠাৎ করেই এই ধর্মনিরপেক্ষ বইমেলায় আত্মঘাতী হামলা চালাতে না পারে সেজন্যই নিরাপত্তার এত আয়োজন, নইলে আরও এক যুগ আগের বইমেলায় এত নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছিলো না। যদি এই ভীড়ের চাপে সেটাকেই বাতিল করতে হয় তাহলে মেটাল ডিটেক্টর গেটের নামে একটা হয়রানির সূচনা করা কেনো? বই মেলার প্রবেশ পথে জটলার একটা আশংকা থাকবে হয়তো, এই একসারিতে হেঁটে যাওয়া মানুষের শৃঙ্খলা হয়তো তাতে নষ্ট হবে কিন্তু দীর্ঘ সাপের মতো সারির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যেতো
সুস্থ সুন্দর ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাটা বিশ্বকাপ আয়োজনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা এমন না, এমন ইমেজ নির্মাণের সর্বাত্মক চেষ্টা করছে জয়নাল হাজারী, ফেনীর বিখ্যাত সন্ত্রাসের গড ফাদার, যার কারণে ফেনীর নতুন আদালত নির্মিত হওয়ার ২ বছর পরও উদ্বোধন করা সম্ভব হয় নি, বিচারক, উকিল এবং বিচারপ্রার্থী সবাই যে মানুষটার সন্ত্রাসী বাহিনীর সামনে ভীত সন্ত্রস্ত জীবনযাপন করেছে ,সে মানুষটা গত বইমেলায় আত্মজীবনি লিখেছে, সে আত্মজীবনী পড়বার আগ্রহ আমার হয় নি, অকৃতদার মানুষটা যখন তারা সিঁড়িবিহীন দোতালা বাসা থেকে পালিয়ে গেলো ভারতে তখন তার বাসা খুঁজে পাওয়া গেলো ভায়াগ্রা ,আমি তখন নিশ্চিত ছিলাম তিনি মশারী টাঙানোর জন্যই ভারাগ্রা সেবন করতেন, তিনি কবি নির্মলেন্দু গণের সার্টিফিকেট পাওয়া ভালো মানুষ, অন্য কারো যুবতী কন্যা ও গৃহবধুকে তুলে এনে যৌন নির্যাতনের যেসব মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে সেসব আসলে রাজনৈতিক হয়রানি এবং তার চরিত্রে কালিমা লেপনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মাত্র।
শুধু নির্মলেন্দু গুণ হাজারীর গুণ গেয়েছেন এমন না, গত বইমেলায় বর্ষীয়ান এবং স্মৃতিভ্রষ্ট্র আওয়ামীপন্থী কলাম লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক, অতিদুরদৃষ্টি সম্পন্ন আব্দুল গাফফার চৌধুরীও তার সুনাম করেছেন, তিনি লন্ডন থেকে উড়ে এসেছিলেন হাজারীর বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে, তিনি এবং অন্যান্য সুশীল মানুষেরা জয়নাল হাজারীর নামে যা যা ভালো কথা বলেছিলেন সেসব ছাপিয়ে নিজের সন্ত্রাসী ইমেজ মুছবার চেষ্টা করছেন হাজারী সাহেব।
সম্ভবত রাজনৈতিক বিবেচনায় স্টল বরাদ্দ পেয়েছে আওয়ামি লীগের মুখপত্র "উত্তরণ", পাক্ষিক এই পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা রয়েছে এর স্টলে, সেটার লেখার মাণ, কিংবা ছাপার মাণ খুব খারাপ, সরকারী আর্থানুকল্যে এত বাজে মানের পত্রিকা ছাপানোর নেপথ্য কারণ একটাই হতে পারে, যারা এই পত্রিকা প্রকাশ করছে তারা বেশ বড় অংকের টাকা নিজেদের পকেটে ঢুকাচ্ছে। সরকারের টাকা যে যেভাবে খুশী লুটপাট করতেই পারে, আমরা আমজনতা এইসব নিয়ে বেশী বাখোয়াজী করলে অনেকে এটাতে আওয়ামীবিদ্বেষ আর রাজাকারীপণা খুঁজে পেতে পারেন।
লিটলম্যাগ চত্ত্বরে গতবারের মতো এবারও টিআইবির স্টল , ট্রান্সপারেন্সী প্রকাশের জন্যই সেটার পেছনে বেশ বড় একটা আয়না লাগানো হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মাথার চুল আঁচড়ানো যায়, আর তারা গত বিভিন্ন বছরে প্রকাশিত তাডের রিপোর্ট আর পরামর্শ সাজিয়ে রেখেছে, গতবছর সেবাখাতে দুর্নীতি নিয়ে যে প্রতিবেদনটার জন্য তাদের কর্তাব্যক্তিদের বিভিন্ন আদালতে জামিন নিতে হচ্ছে সেই প্রতিবেদনটিও সেখানে আছে, আমার ধারণা ছিলো এই সেবামূলক কার্যক্রমের বিষয়টা তারা জনসচেতনতার জন্য বিনামূল্যেই সরবরাহ করবে। কিন্তু না শালার ভাইয়েরা ১৬ পাতার রিপোর্টের দাম হাঁকছে ৫০ টাকা, এবং সেটা তাদের প্রকাশিত বইয়ের মূল্যতালিকায় লিপিবদ্ধ নেই।
মূল্য তালিকাজনিত বিপাকে পড়েছিলো বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবি সমিতির স্টলও, সেখানেও আইনিপরামর্শ ও অন্যান্য কয়েকটি বই সাজানো ছিলো, তারা বইগুলো বিক্রী করতে চায় কিন্তু সংশোধিত মূল্য তালিকা এখনও আসে নি, একজন ক্রেতা ২৫% ডিসকাউন্ট চাওয়ায় সেখানকার কর্মী ক্ষিপ্ত, সেই মহিলা আইনজীবী ফরফরিয়ে কিছু বলবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ক্রেতা ভদ্রলোক তাকে বইমেলার আইন শেখানোর চেষ্টা করছিলেন, বইমেলায় পুরোনো বই ২৫% ডিসকাউন্ট দিতে হবে এটাই বইমেলার আইন, এই আইন না মেনে আপনি এখানে বই বিক্রী করতে পারবেন না।
আইনজীবীকে এমন আইন শেখানোর ধৃষ্টতা দেখে আইনজীবী ভদ্রমহিলা ইংরেজীতে কিছু সবক দিলেন, ইংরেজী এখনও বিতর্ক-কুটতর্কের ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়ে আসবার কার্যকর পদ্ধতি, অন্যপক্ষও ইংরেজীতে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে, বক্তার স্মার্ট ইংরেজীর সামনে নিজের আধোইংরেজীর অক্ষমতায় হাল ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, এই বিতর্কের পরিণতিও তেমনই হলো, ভদ্রমহিলা সামনের আরেকজনকে বিশ্রীভাবে ঝারি দিয়ে বললেন আপনি যখন বিষয়টা বুঝেন নি আপনার এই বিষয়ে কথা বলা ঠিক না।
তারা আগামী রবি বার সংশোধিত মূল্য তালিকা ছাপিয়ে বই বিক্রী শুরু করবে, যেহেতু বইয়ের গায়ে লেখা দাম তারা কমাতে অনিচ্ছুক সুতরাং সংশোধিত মূল্য তালিকায় তারা প্রথমেই ২৫% বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করে লাভেই বিকিকিনি করবে। জনসচেতনতামুলক কার্যক্রমের এমন অহেতুক অসভ্য ব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য না কিন্তু যারা এইরকম বাণিজ্যিক সমাজসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত তাদের এই সেবাপ্রদানের বাণিজ্যিক মানসিকতাটুকু পীড়াদায়ক হয়ে যায়। তাদের উচ্চমন্যতা তাদের সেবাপ্রদানী মানসিকতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়, তারা নিজস্ব সামাজিক ক্ষমতার বলয় থেকে দেখেন কতিপয় অসভ্য মানুষ তাদের এই আন্তরিক সেবার বিরোধিতা করছে, এই অসভ্য মানুষটা আইনজীবীকে কেনো আইন শেখাতে গেলো। সেটাই হয়তো তার একমাত্র অপরাধ। ভোক্তা অধিকার বলে একটা বিষয় আছে, আইনজীবী সমিতির এইসব কেষ্টুবিষ্টুরা এইসব গালভরা কথা বিক্রি করে সভাসেমিনারে, কিন্তু মহিলার অস্থির অশোভন ব্যবহারের কারণে তাকে এমন কি যেকোনো ডিপার্টমেন্টার স্টোরের ক্যাশিয়ারের চাকুরি থেকেই বরখাস্ত করে দিতো ম্যানেজার। কিন্তু আমি নিশ্চিত এই মহিলার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হবে না। অসভ্য বাঙালীর সাথে এমন আচরণই উপযুক্ত এবং সেটা বিধিমালাবহির্ভুত হলেও গ্রাহ্যসীমার ভেতরেই থাকবে।
মহিলা আইনজীবী সমিতির পাশের স্টলটাই আইন ও সালিশ কেন্দ্রের, তারা মাঝে মাঝেই বেশ ভালো ভালো কাজ করেন, মানবাধিকার রিপোর্টও প্রকাশ করেন নিয়মিত, সেসব মানবাধিকার রিপোর্টের দামও বেশী। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদগুলোর ভেতরে হত্যা ধর্ষণ, রাজনৈতিক হানাহানি এবং অন্যান্য জনসম্পৃক্ত বিষয়ের পরিসংখ্যান ছাপা হলে সেটা জানবার জন্য আপনাকে দিতে হবে ২৫০ টাকা। সাধারণ মানুষ খুব সহজে সেসব তথ্য পাবেন না। তথ্য অধিকার আইন অনুমোদিত হওয়ার পরও তথ্য সংগ্রহে অনেক রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সাধারণ মানুষকে। সেখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছে "নারীর ৭১ এবং যুদ্ধপরবর্তী কথ্যকাহিনী" , ১৯জন নারী ১৯৭১ সালে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, সেই বইয়ে ৮জন নারী স্বীকার করেছেন তাদের উপরে যৌননির্যাতন হয়েছিলো। মেহেরজানের পরিচালক তার লেখায় এই বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, এটা ডকুমেন্টেড এবং সেটা উপস্থাপনযোগ্য। তালিকাবদ্ধ করবার প্রয়োজনীতা এখানেই, আবেগ, বিশ্বাস এবং উপলব্ধি নয়, চোখে দেখা অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ভাষ্যের বাইরে তালিকাবদ্ধ ইতিহাসই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ডকুমেন্টেড হিস্টোরী বার্তাবহ হয়ে যাবে, ১৯৭১ এ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের কৃত অত্যাচারের ঘটনা লিপিবদ্ধ করবার গৃহীত উদ্যোগটুকু পরিত্যাক্ত না হলে অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতার লিখিত রেকর্ড থাকতো এবং তখন সেসব তথ্য তুলে ধরে একটা জবাব দেওয়া যেতো, সেটা যেহেতু সম্ভব হয় নি, যেহেতূ বীনা ডি কস্টা প্রতিটি ধর্ষিতা মেয়ের নাম ও ঠিকানা লিপিবদ্ধ করেন নি, এবং যেহেতু কেউই আসলে এটাকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন নি, সে কারণে ৪০ বছর পর একটা আদর্শিক সংকটে পড়েছে শিক্ষিত!! মানুষ।
অথচ অন্য ভাবেও দেখা যায় বিষয়টাকে, ১৯জন নারীর ভেতরে ৮জন বলেছেন তারা ধর্ষিতা হয়েছিলেন, সুতরাং সে সময়ে জীবিত অসংখ্য নারী কি পরিমাণ নিরাপত্তাহীনতা ভুগেছেন, বাংলাদেশের ২ কোটি তরুণীর ভেতরে এমন মানসিক নির্যাতনের ভেতরে দিয়ে গিয়েছেন কতজন তরুণী, যারা প্রতিদিনই ধর্ষিত হতে পারেন এমন আশংকা নিয়ে রাতের বালিশে মাথা রেখেছেন, কতজন জীপের হর্ন আর গুলির শব্দে মজা পুকুরে গিয়ে লুকিয়ে থেকেছেন, কতজন হেলিক্পটারের শব্দে গিয়ে লুকিয়েছেন চৌকির নীচে, আর কতজন নির্মম নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত দেখেছেন? ২ থেকে ৪ লক্ষ নারী-কিশোরী-তরুণী নির্যাতিত হয়েছিলেন শারিরীক ভাবে কিন্তু প্রতিমুহূর্তে ধর্ষিতা হওয়ার শঙ্কা নিয়ে বেচেছিলেন সবাই, বিবাহিত হলে ধর্মপ্রাণ সেনাবাহিনী হয়তো ধর্ষণ করবে না কিংবা তুলে নিয়ে যাবে না এমন আশংকা থেকেই সে বছর অসংখ্য পিতা নিজকন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন, কিংবা কন্যাকে পরিচিত জনের মাধ্যমে সীমান্তে ওপারে পাঠিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করেও রয়ে গিয়েছিলেন অবরুদ্ধ স্বদেশে, সেসব স্বাভাবিক বিবেচনাবোধের বদলে পরিসংখ্যান আর তথ্যনির্ভর জীবন যাপনের আধুনিক ব্যাধিটুকু গবেষকের দায় বলা যায়। তাদের সাদা কালোয় লিপিবদ্ধ ঘটনাকে উপযুক্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে হয়।
ব্লগার সংবাদ:
লিটলম্যাগ চত্ত্বর গতবারই দখল করে নিয়েছিলো ব্লগারসম্প্রদায়, এবারও তার ব্যতিক্রম নেই, আমারব্লগ ডট কমের স্টলের সামনে ব্লগারদের আনাগোনা ছিলো, সচলায়তনের একদল ব্লগার আজ এসেছিলো বইমেলায়, নজরুল ৩টা থেকেই বইমেলা চত্ত্বরে ,গত বছর বই কিনে সেরা ক্রেতার পুরস্কার পাওয়া নজরুল পরিচয় করিয়ে দিলো চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র বিজয়ের সাথে, বিজয় সুন্দরবন ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে নতুন একটা মিউজিক ভিডিও বানাতে চায়। ৪ বছর আগে যখন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতা শুরু হলো সেখানে সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্তি তার চৈতন্যে বেশ বড় পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশের ইমেজসংকটে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন প্রতিটা মানুষই বিপন্ন বোধ করে, দুর্নীতি-বন্যা আর দারিদ্রের পরিচিতির বাইরে যেকোনো উজ্জ্বল ছবিই তারুণ্য গ্রহন করতে ব্যাগ্র, আর সেই ব্যাগ্রতার একটা প্রমাণ এইসব তরুণের নিজস্ব উদ্যোগে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য হিসেবে ভোট দেওয়ার প্রচারণা।
আমি বাইডিফল্ট সমালোচক, মুখ দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বের হয়ে যায়ই, এই ছেলেগুলোর আন্তরিক উদ্যোগ কর্পোরেট পূঁজির দখলে চলে যাওয়ার পর কিংবা সুন্দরবনকে ভোট দেওয়ার সুশীল আহ্বানে প্রথম আলো গোষ্ঠি যুক্ত হওয়ার আগে এই প্রচারণার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই যতটা আন্তরিক ভাবে এটার সাথে যুক্ত ছিলো প্রথম আলো নিজের ভালোত্ব প্রমাণের তাগিদে নিজের কর্মিবাহিনীকেই সংযুক্ত করেছে এ উদ্যোগে। পথিকৃতদের পথ থেকে ছুড়ে ফেলেছে তারা নির্দয় ভাবেই, অথচ তারুণ্যের আবেগ বাধা মানে না। তাই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে বিজয় সুন্দরবনকে ভুলতে পারে না। আমি বললাম কর্পোরেট পূঁজির সামনে একলা মানুষ অসহায়, তুমি লড়াই করতে পারবে না। তোমার একক স্বর কর্পোরেট সাউন্ড সিস্টেমের জোরালো আওয়াজে চাপা পরে যাবে, তুমি নেহায়েত একজন ফালতু উদ্বিগ্ন ক্ষ্যাপা চিহ্নিত হবে, ১০ লক্ষ মানুষ আর ৪০ লক্ষ ভোক্তার সামনে তোমার ক্ষ্যাপা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে লোকজন সেটাকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাববে। লোকজন প্রথম আলোর প্রচারিত ভাবনা অনুসরণ করে অন্ধের মতো।
গত ২০০ বছর ধরেই সুন্দরবন উজার হচ্ছে, পটুয়াখালী বরগুণা থেকে উজার হতে হতে সুন্দরবন এখন খুলনার রূপসা নদীর তীরে বেঁচে আছে, মানুষ বাদায় যেতো আগে ভাগ্য বদলাতে, সুন্দর বনের একাংশ কেটে, নিরিয়ে সেখানে ক্ষেতের ফসল ফলিয়েছে মানুষ, তারা ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ আর বাঙলার অন্যান্য জেলা থেকে সেখানে ছুটে গিয়েছিলো, কেউ গিয়েছিলো সর্বসান্ত হয়ে, যাদের নীলসদাগর আর পাটোয়ারী জমি থেকে উচ্ছেদ করেছিলো, যারা ইংরেজী কালেকটর সাহেবের পাওনা দিতে না পেরে ফেরার হয়েছিলো, তারাই জীবিকার প্রয়োজনে বন উজার করে বসতি গড়েছিলো সেখানে।
এখন সুন্দরবন প্রচারণায় আসবার পর সৈন্দর্য্যবিলাসী মানুষ লঞ্চে করে প্রতিদিনই যাচ্ছে সুন্দরবন, বিশেষ প্যাকেজে তিন রাত্রি ৪ দিনের সুন্দরবন ভ্রমনের খরচ ৮০০০ টাকা, সে টাকা দিয়ে হিন্দি গান আর বাদ্য বাজাতে বাজাতে সুন্দরবন যাচ্ছে শহুরে মানুষ, গানের অত্যাচারে বাঘ হরিণ পালিয়েছে, মানুষ বন উজার করে বসতি বানাচ্ছে, এমন যদি চলতে থাকে তাহলে একদিন এই বন উজার করতে করতে মানুষ পৌঁছে যাবে সীমান্তে, আমাদের অবিবেচক সৈন্দর্য্যপিয়াস আমাদের রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে আমাদের জাতীয় পশুকে, তারা ভারতের সুন্দর বনে নিরাপদ আবাস খুঁজে পেয়েছে। আমাদের বাঘশুমারি আমাদের জাতীয় চেতনা আমাদের কোনো ভাবেই সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে নি, তোমরা সুন্দরবনের পক্ষে প্রচারণা করে হয়তো সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে পরিণত করতে পারো কিন্তু কি লাভ হবে এতে? যদি সুন্দরবন উজার হতে হতে চলে যায় সীমান্তের ওপারে, যদি সব বন্য প্রাণী ভারতের অভয়ারণ্যে নতুন বসতি গড়ে তাহলে আমাদের এত রংবাজির গুরুত্ব কি?
আমার লেকচার তার পছন্দ হলো কি না জানি না, কিন্তু আমার বয়স্ক চেহারার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ অশোভন আচরণ করতে পারে না। আমাদের তারুণ্য অনেক বেশী সম্মান প্রদান করে বর্ষীয়ানদের।
আরিফ জেবতিক এসেছিলো, বইমেলায় তার বই "প্রকাশিত ও অর্ধপ্রকাশিত বক্রবয়ান" এসেছে জাগৃতি থেকে, এসেছিলো রনদীপম বসু, শুদ্ধস্বর থেকে তার দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে, এসেছিলো জাহেদ সারোয়ার, তার দুটো উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে, অন্বেষা থেকে।
তবে অন্য সবাই যাদের কোনো বই প্রকাশিত হয় নি তারাও এসেছিলো বইমেলার আমেজ গায়ে মাখতে, তাদের সাথে বিভিন্ন রকম কথা হয়, তাদের অভিজ্ঞতা, আক্ষেপ শুনি, দেশ-ব্লগ আর অভিজ্ঞতা হাতবদল হয়ে চলে আসে আমার কাছে, আমি হয়তো সেসবের কোনোটা কোনটা ব্যবহার করি নিজের লেখায়, অধিকাংশই নিজের ভেতরে রেখে দিতে হয়।
ব্লগের কারণে ব্লগাররা প্রতিদিনই সম্প্রসারিত পরিবারে পরিণত হচ্ছে, ভিন্ন ধরণের একটা সামাজিক যোগাযোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে, আনন্দ-দুঃখ ভাগাভাগি করবার নতুন এই প্রাযুক্তিক উপলক্ষ্য মানুষকে কাছে এনেছে। নজরুল-নূপুরের পরিবারের স্বজন হয়ে উঠেছে ব্লগাররাই, নিধিকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে সবাই, বইমেলার আজকের সন্ধ্যার আকর্ষণ ছিলো নিধি, সে যাদের পছন্দ করেছে তাদের মুখ ছিলো উজ্জল আর যাদের সাথে খেলতে চায় নি ও তারা সবাই দুঃখভারাক্রান্ত মনে বইমেলা ছেড়েছে।





মুগ্ধ পুরোই মুগ্ধতা ছড়ানো লেখা। রাসেল ভাই'র দেখার চোখটা এত নিবিষ্ট!
আজকর পত্রিকায়ই সাকিব গংদের আদুল গায়ের ছবি দেখলাম, যেখানে টিমে ঠাঁই না হওয়া মাশরাফিও আছে!, কেমন গা গুলানো ছবি। যোদ্ধাভঙ্গিতে দাঁড়ানো ক্রিকেটারদের নিজেদের ছেলে ভাবতে পারছিলাম না।
জয়নাল হাজারীর প্রতি সংসদেই বন্ধুত্বের আহবান এসছিলো। সেই সংসদেই তারানা হালিমকে নোংরা কটাক্ষ করেছিলেন তিনি, সেই বক্তব্য পরে এক্সপান্জড হয়। হাজারীকে নিয়া একশো একটা গল্প বলা যায়। ফেনীতে হাজারীর চাঁদাবাজি নিয়ে আগে একটা কথা চালু ছিল- জয়নাল হাজারী শুধু ফেনী রেল স্টেশনের ভিক্ষুকদের কাছে চাঁদাবাজি করে না আর সবার কাছ থেকে চাঁদা নেয়। যে বইটার কথা বললেন সেইটার জন্য বইমেলায় বেলুন উঁড়িয়ে সারামাস হাজারী তামাশাও করেছিল। যে ভদ্রমহিলাকে নিয়ে বইটি লেখা হয় তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ, তার ছেলে আমাদের সাথে একটা ফোরামে ছিল, আমার সেই ম্যাডামের জন্য এখনো খুব খারাপ লাগে ।
বইমেলা নিয়ে আপনার এই আয়োজন চলতে থাকুক। শুভকামনা রাসেল ভাই।।
নিধি যার কোলে যায় তারই বিবাহ হয় তাড়াতাড়ি। মাহবুব লীলেনদা তার বড় প্রমান
আজকের পর্বও দারুন। আপনার সাথে রোজ বইমেল ঘুরে আসবো।
প্রতিদিন চাই নতুন পর্ব। অসাধারণ।
এইসব সুশীল বুদ্ধিজীবীগো পতিত হইতে দেইখা ভালো অভ্যাস রপ্ত হইছে । এখন আর সুশীল বুদ্ধিজীবীগো পতনে আশ্চর্য হইনা । দুঃখও পাইনা ।
আমার ধারাণা, চোস্ত ইংরেজী বলা উকিল ম্যাডামরে আপনি দু'একটা বাক্য বলছেন, আপনি কি কিছুই বলেন নাই তারে ?
রাসেলের মত দেখার চোখ আমার নাই । আমিওতো গতকাল গিয়েছিলাম, এসব কিছুই আমার চোখে পড়লোনা । আমি গেলাম একা, ফিরে এলাম একা । আমি কাউকে চিনিনা, আমাকে কেউ চেনেনা । আমার বয়েসী দু'একজন মানুষ ছিল, যাদের সাথে ছিল নাতি/নাতনি । আমার সাথে কেউ ছিলনা ।
বই দেখে আনন্দ - নিস্কলুষ বিনোদন । আসলে বিনোদন উপকরণের প্রকট সংকটের কারণে বইমেলার পথ সকলকে এত বেশী টানে । বইয়ের প্রতি টান এখানে অনেকটাই গৌণ । শিশুরা ভিড়ের চাপে পিষ্ঠ হয়েও আনন্দ লুটছে, তরুণ-তরুণীরা যৌবনের উচ্ছলতায় হাওয়ায় ভাসছে । ভিড়, ধূলি, গুমোট বাতাস কোন কিছুই তাদের কোনকিছুতে এতটুকু বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারছেনা ।
এসব দেখে আমার দীর্ঘশ্বাস পড়েনা । আমার অন্তর ভরে উঠতে থাকে এক অনাবিল আনন্দে । আমি এখন যা করতে পারছিনা, তা অন্য কাউকে করতে দেখলে তাও আমার জন্য আনন্দ বয়ে আনে । রাসেলের দেওয়া দৈনন্দিন মেলার খবর পড়া আমার কাছে বিরাট এক বিনোদন, অতি আনন্দের উপাদান । আশা করছি, প্রতিদিনের হালচাল নিয়মিত পাব ।
রাসেল ভাই, বই মেলার টাইম টেবিলটা জানালে খুশি হব। বাচ্চাদের নিয়ে কোন সময় গেলে ভাল হবে, একটু ফাঁকা পাওয়া যাবে। মহিলা, স্কুলের ছাত্রদের জন্য কোন সময় নিধারন আছে কি?
লেখার ধার দেখে মনে হচ্ছে আপনি এই মাসের সব দিনই মেলায় যাবেন। আপনার সাথে পরিচিত হবার ইচ্ছা রাখি।
আপনি কি এটার কথা বললেন?
বড় করে দেখতে
কী বিশ্রী ! কোথায় আছে এটা ? সরায়না কেন ? সৌন্দর্যবর্দ্ধনকারীদের চোখে এটার কদর্যতা ধরা পড়ে না ? ছি !
ব্লগার গ্রুপি চোখে পড়ে নাই ?
মন্তব্য করুন