মাসব্যাপী কার্নিভাল ০৬
সপরিবারে ঢাকার রাস্তায় নামবার একটাই বিপদ, মুখে কুলুপ এঁটে রাখতে হয়, সিগন্যালে গাড়ী থেমে আছে, ঠিক পেছনেই একটা ৯২ মডেলের টয়োটা বিশ্রীভাবে হর্ণ বাজাচ্ছে, মেজাজ তিরিক্ষি, মিশুকের পেছনের ফাঁক দিয়ে তাকালাম, যদি সত্যযুগ হতো তাহলে সে আগুণে বিস্ফোরিত হতো গাড়ীটা কিন্তু কলিকালে এইসব ঘটে না। ভীষণ ইচ্ছা করতেছে নীচে নেমে ড্রাইভারের কলার চেপে নামিয়ে বলি ' বাঞ্চোত তোমার হোগা দিয়া হর্ণ ভইরা তার পর বাজাবো, এই সিগন্যালে হর্ণ বাজায়া উইড়া যাইবা তুমি?' কোলে ছেলেকে নিয়ে এই স্বরস্বতী পূজার দিন এইসব বলা হয়ে উঠে না। পেছনে টয়োটার হর্ণ বাজতে থাকে
দুপুরে মেইল চেক করতে গিয়ে দেখলাম এনটিভির ব্লগারদের নিয়ে টক শো হবে, সেখানে আমাকে আমন্ত্রন দিয়েছে কৌশিক, যদি হাতে সময় থাকতো তাহলে কি হতো বলা যায় না, কিন্তু ঘড়িতে সময় দেখে বুঝলাম টক শো এয়ার হওয়ার পর আমি বইমেলা পৌঁছাবো, একটুর জন্য টিভিসেলিব্রিটিটকশোব্লগার হওয়া হলো না। গতকাল বইমেলা যাওয়া হয় নি, আজ যাবোই যাবো ভাবছিলাম, অনভ্যাসে আগ্রহ চলে যেতে পারে, সপরিবারে স্বরস্বতী পূজায় গিয়ে সেখান থেকে আমি বাউলি কেটে চলে আসবো বইমেলা আর লিপি,পিচ্চি আর ছোটোবোন পূজার মন্ডপ দেখবে এমনটা পরিকল্পনা করেই বের হয়েছিলাম, কিন্তু জগন্নাথ হলে গিয়ে বুঝলাম সেটা বেশ কষ্টকর হবে। মানুষ আর মানুষে গিজগিজ করছে সম্পূর্ণ হলের মাঠ, স্বরস্বতী পূজার লক্ষ্য যাই হোক না কেনো এই উপলক্ষ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা সেজেগুঁজে জগন্নাথ হলে আসে, একটা দায়িত্বের মতো হয়ে গেছে এটা, আমাদের সময়ে আমরাও একই দৃশ্য দেখেছি।
ভীড়ের চাপে হাত সামলে রাখতে হয়, হাত নাড়ানো মুশকিল, কখন কোথায় হাত পড়বে আর নারীনিগ্রহের দায়ে গনপিটুনি জুটবে সে আশংকায় সিঁটিয়ে হাঁটি। মাঠের মাঝখানে পৌঁছে ক্ষণিকের বিশ্রাম, অন্তত হাট পা ছড়িয়ে হাঁটা যাবে এখানে, কারো গায়ে লেগে যাওয়ার ভয় নেই, শুধু পূজামন্ডপে গিয়ে আবারও হাত পকেটের ভেতরে নিয়ে হাঁটি। সেখান থেকে বের হয়ে বইমেলা।
আমরা যখন বইমেলা পৌঁছালাম তখন অনেকেই বইমেলা থেকে বাসা ফিরে যাচ্ছে। আমাদের সামনেই একজন গর্বিত মহিলা বইমেলা থেকে দুহাত ভরে ঘর সাজানোর জিনিষ কিনে নিয়ে যাচ্ছে, ২টাকার প্লাস্টিকের ফুল, কাঠের চুড়ি, আর কপালে লাল টিপ, তিনিও আমাদের মতো স্বরস্বতী পূজা হয়ে বইমেলা ঢুকেছিলেন।
গালে ছবিআঁকিয়েদের পাশ কাটিয়ে ঢুকলাম, ওরাও মুদ্রাস্ফ্রীতির কারণে এবার গতবারের দ্বিগুণ দামে গালে বর্ণমালা লিখছে, এটা এখন একক কোনো কাজ না, দলীয় কাজে পরিণত হয়েছে বলা যায়। বাংলা একাডেমীর গেট দিয়ে ঢুকবার পর ছেলে হাত টেনে বললো ' বাবা বাবা দেখো ওখানে না যাদু হয়'
আমি যাদুগরের খোঁজে এদিকে ওদিকে তাকাই, ছেলে আঙ্গুল তুলে দেখায় ' মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর'
ভাবলাম ওর ভুল ভাঙাই, পরে মনে হলো কথাটা খুব একটা ভুল বলে নি ও। আমাদের বাংলাদেশের তেলেসমাতি কাজকারবার প্রতি ৫ বছর পরপর জাতীয় ইতিহাসই বদলে যায়, মেহেরজানের প্রিমিয়ারে উপস্থিত থাকেন মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘরের কর্মকর্তারা, মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের বই নিয়ে ব্যবসা করা মফিদুল হক, আলী যাকের আর অন্য সবাই যাদের মুক্তিযুদ্ধের কর্তাব্যক্তি মনে করা হয়, তারাই সেখানে উপস্থিত থেকে মেহেরজানে স্বাধীনতাবিরোধী কিছু খুঁজে পান না, ব্লগের কিছু অপোগন্ড ছেলে দিন-রাত বিশ্রী প্রচারণা চালিয়ে সে ছবির প্রদর্শণী বন্ধ করে দেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসার চৌহদ্দি অনেক বড়, যে মানুষটা ৫০ হাজার টাকার ইট কিনে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের নতুন ভবন নির্মাণে সহযোগিতা করছেন, তিনিই মেহেরজান দেখে বিগলিত হয়ে বাইরে এসে বলছেন এটা নিছক ফ্যান্টাসি, প্রকাশক মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ করেন লাভের ধান্দায়, ২৬৬ দিনে স্বাধীনতা বইটির মূল্য নির্ধারিত হয় ৪ হাজার টাকা, এই টাকা দিয়ে যেসব মানুষ বইটা কিনে পড়বেন তারা সবাই কোনো না কোনো ভাবে মেহেরজানের প্রিমিয়ার শোর টিকেট পান।
ব্যতিক্রম শুধুমাত্র মোরশেদুল ইসলাম, তিনি মেহেরজানের প্রিমিয়ার দেখবার পর থেকেই ক্ষিপ্ত, সেই ক্ষ্যাপামী অন্যসব মুক্তিযুদ্ধপ্রেমিক মানুষদের স্পর্শ্ব করে নি। আমাদের প্রকাশকদের কেউ বলে দেয় নি এইসব ইতিহাস নিয়ে ব্যবসা করা ইতিহাসের বিস্তৃতি কমায়, সে সুযোগে ৫০ টাকায় নকল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকাশ করে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো সহজ হয়ে যায়। এই যাদুঘর যাদু জানে, তাদের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য তারা কোনো ছাড় না দিয়েই তাদের লাইব্রেরী থেকে বই বিক্রী করে এবং সেসব বইয়ের কয়েকটি গুরুতর তথ্যগত অসংগতিতে পরিপূর্ণ, এই বিষয়টি যাচাই করে বলবার মতো কোনো কর্তাব্যক্তি নেই সেখানে, সুতরাং সেখানে যাদুকরী পন্থায় ইতিহাস রক্ষা হয় ছেলের এই উপলব্ধিকে ভুল মনে হয় না আমার।
ছেলেকে বৌ আর বোনের হাতে দিয়ে আমি গুটিগুটি হেঁটে গেলাম ব্লগার'স কর্নারে, এই অবেলায় সেখানে কেউ নেই, দুরে দেখলাম রাইসুকে হাতে ফোন, রাইসু দীর্ঘদিন ধরেই থ্রিকোয়ার্টার পরে বইমেলায় ঘুরে, এবার বইমেলায় এই প্রথমবারের মতো দেখলাম, কাছে গিয়ে বললাম ' আপনার প্যান্ট বড় হয়ে যাচ্ছে'
'আমিই ছোটো হয়ে যাচ্ছি' রাইসুর ত্বরিত উত্তর, শুকায় যাচ্ছি
বললাম পরে কথা হবে, বাই।
হেঁটে হেঁটে চা সিগারেট খেতে গেলাম ব্যাচেলার্স কোয়ার্টারে, সেখানেই বাতিঘরের স্টল, বাতিঘরের শ্লোগান ' বইয়ের আলোয় আলোকিত হন' খুবই সময়োপযোগী শ্লোগান, আমাদের মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রীর সহযোগী কোম্পানী টেন্ডার পায় নি বলে ৩০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ থেমে আছে ১ বছর ধরে, এক বার পুণঃটেন্ডার করে আর আরেকবার টেন্ডার ম্যানিপুলেট করেও তিনি কবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু করতে পারবেন তা জানা যায় নি, আসন্ন বোরো মৌসুমে যখন গ্রাম সেচের চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ প্রদান করা হবে তখন ঢাকা শহরের রাস্তায়, ল্যাম্পপোষ্টে বই ঝুলিয়ে শহর আলোকিত করবার ব্যবস্থা করতে হবে। আমিও ভাবছি কয়েকটা বই কিনে সেলিংয়ে সাঁটিয়ে রাখবো, সেইসব অন্ধকার রাতে আলো দেওয়ার জন্য। প্রকাশনীটির অধিকাংশ অনুবাদের বই আসলে বিভিন্ন হলিউডের ছবির ভাষান্তর, তারা বেছে বেছে হলিউডের ছবির গল্পগুলো কেনো অনুবাদ করেছেন আমি জানি না, সম্ভবত এই বই হাতে নিয়ে ছবি দেখলে ভালোভাবে বুঝা যাবে ছবিটা।
সেটার পাশেই একটা বইয়ের প্রকাশনীর নাম ' আত্মপ্রকাশ' কোথায় কে আত্মপ্রকাশ করলো জানি না, সে স্টলে জাফর ইকবাল এবং হুমায়ুন আহমেদ প্রকাশিত হয়েছেন দেখা গেলো, গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের একটি হলো শিশুর যতন নিন, অন্যটি দেশ বিদেশের মেকাপ। আত্মপ্রকাশে সহযোগী প্রকাশনী এটা স্বীকার করতেই হবে।
তার উল্টো পাশে জাসাসের স্টলের শ্লোগান তারেক জিয়া বাংলাদেশ তোমার অপেক্ষায়, বাথরুমে পিছলে পড়ে কোমরের হাড় ভাঙা তারেক জিয়া একজন ব্যবসায়ীর মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তিনি বিলাতে বিলাসবহুল জীবনযাপন শেষে গোলাপী হয়ে দেশে ফিরলে ধূপ-ধুনা দিয়ে তাকে বরণ করবে যুবদল, ছাত্রদল। তাদের চোখে বিশ্ব দেখার স্বপ্ন দেখা হবে সফল, তার লাগোয়া বইয়ের দোকানের উপরে ব্যানার ঝুলানো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া স্টলগুলোর কাছে পাশাপাশি দুটো স্টল, সংহতি আর ইসলামিক থ্যট। সংহতির আধ্যাত্মবাদী সমাজতন্ত্রের ভাবধারা নিশ্চিত ভাবেই ইসলামিক থ্যটের অনুগামী। লুঙ্গির সাথে কোট টাই পরা মানুষ দেখলেও আমার তেমন আশ্বর্য লাগে না আজকাল, তেমনভাবেই ইশ্বরবিশ্বাসী সমাজতন্ত্রীদের আমার ভালো লাগে।
আবারও ব্লগার্স কর্নারে ফিরে এসে দেখলাম একজন রাগে গজগজ করতে করতে হাঁটছে, আমি কি বলবো না বলবো সেটা কি তোমাকে ঠিক করে দিতে হবে? পাশের পুরুষ সঙ্গী ক্যাবলার মতো হাঁটছে, মুখে কথা নেই, বাসায় কি অপেক্ষা করছে তার জন্য এই ভয়েই ভীত সম্ভবত।
মেলায় দেখা হলো নিধির সাথে, ও আরেকজনের সাথে বসে ছিলো ব্লগার্স কর্নারে, আমি পিচ্চির সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দিলাম, অবশ্য দুজন তেমন কোনো কথা বলে নি। আমরাও মেলার ঘন্টা বাজবার আগেই ফেরত আসবো ঠিক করলাম। বাইরেই গেটের সাথে বঙ্গবন্ধু রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্টল, এই রিসার্চ ফাউনডেশনের অফিস শেখ হাসিনার ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়, যতদুর জানি এটার কর্তাব্যক্তি আরাফাত, তিনি বই প্রকাশ করেছেন কোনো এমনটা আমার জানা নেই, কিন্তু পারিবারিক পরিচয়ে তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন, যাদের কথায় অনেক কিছু ঘটে যায় বাংলাদেশে, তিনি সেইসব মানুষদের সাথে উঠাবসা করেন।
এবার বইমেলায় ফটোসেশন চলছে জম্পেশ, সাত ভাষাশহীদের মুর্তির সামনে দাঁড়িয়ে, বাংলা একাডেমীর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আর বইমেলার প্রবেশ পথের সামনে দাঁড়িয়ে ফটোসেশনে মগ্ন মানুষদের দেখে প্রতিদিন মনে হয় এখানে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না তুললে বইমেলা আগমন বৃথা। পা তুলে, ঝুকে, বাঁকা হয়ে, হেসে এবং গম্ভীর হয়ে ছবি তুলছে ব্যস্ত আগন্তুকেরা, আমি তাদের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরছি আর ভাবছি দীর্ঘদিন ছায়াচ্ছন্ন থাকতে থাকতে হয়তো চেহারাই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, ইদানিং যার সাথেই দেখা হচ্ছে সেই বলছে আপনি ফর্সা হয়ে গেছেন। আমি ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম মাখছি না, কিন্তু কারো কাছে নিজের গায়ের রং বিষয়ে মন্তব্য শুনে সেটার প্রত্যুত্তর দেওয়ার মতো অন্য কোনো বাক্যও খুঁজে পাচ্ছি না। এর প্রতিকারে মনে হয় এখন কয়েক দিন রাস্তায় হেঁটে গায়ের রং পুড়িয়ে ফেলতে হবে।





হা হা হা !
যথারীতি চমৎকারভাবে সব কিছু বললেন!
চলুক
উপভোগ করতেছি সিরিজটা। চলুক।
জটিল ----------------------
চলুক.।.। ফটো সেশনের একটা ইচ্ছা ছিল, বাদ দিলাম!
আপনার সাধে দেখা হলেই বলবো, ফর্সা হয়ে গেছেন।
মন্তব্য করুন