যে লড়াই লড়ে যাই আমরা সবাই
এ বছর দিব্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে রুৎকার নোটবই, সুদীপ্ত সালামের অনুবাদে। রুৎকা বন্দীশিবিরের কিশোরী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বন্দীশিবিরে যার জীবনের শেষ বছর কেটেছে, সে বছরের প্রথম চার মাসে সে নোটবুকে তার জীবনের অভিজ্ঞতা লিখেছিলো। সুদীপ্ত সালামের অনুবাদের হাত চৌকষ না কিন্তু কিশোরীর সরল স্বীকারোক্তি এবং আন্তরিক উচ্চারণে অনুবাদের দুর্বলতার বদলে রক্তমাংসের একজন মানুষের বেচে থাকবার তৃষ্ণাটুকুই উজ্জ্বল হয়ে থাকে ভাবনায়।
আমাদের ইতিহাসেও এমন সময় এসেছিলো, শরনার্থী মানুষ প্রতিদিন সহায়সম্বলহীন ফেরারী জীবনযাপন করেছিলো শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে চেয়ে, বাঁচবার তীব্র আগ্রহে পশুর মতো লুকিয়ে কিংবা সীমান্তের কাটাতার ডিঙিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিলো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে, সেই আশ্রয়ের খোজে তারা শহর থেকে গ্রামে, দগ্ধ লোকালয় থেকে পুড়ে যাওয়া ধানক্ষেত আর রক্তে লাল নদী সাঁতরে নিজেকে বাচিয়ে রাখতে চেয়েছিলো।
আমাদের কিশোরীরাও রুৎকার মতো সময় কাটিয়েছে, যুদ্ধবিক্ষত জীবনে ভালোবাসা উঁকিঝুকি দেয় নি কখনও এমনটা বলা যাবে না, অনিশ্চিত জীবনে হয়তো সে ভালোবাসা কোনো স্থায়িত্ব পায় নি শেষমেশ, কিন্তু ভালোবাসা ছিলো। বহমান জীবনে কখনও না কখনও প্রেম আসে, বিরহ কিংবা হারানোর বেদনাও থাকে সে জীবনে। রুৎকার কিশোরী জীবনে ভালোবাসার স্থায়িত্ব ছিলো না, কিংবা যুদ্ধবিক্ষত সময়ই এমন, কোনো ভালোবাসাই তার সম্পূর্ণ পাখনা মেলে উড়তে পারে না। অনিশ্চিত কিশোরী জানে না সে কাকে ভালোবাসে, চঞ্চল মনে সে অনেককে ভালোবাসে কিংবা ভালোবাসে সে একজনকেই কিন্তু নিজের কাছেই সে সত্য স্বীকার করতে সাহস পায় না, সে জীবনে ক্ষোভ আছে, ইর্ষা আছে, আছে ছোটোখাটো মানবিক অভিমান। যুদ্ধ কিশোরীর কৈশোর ছিনিয়ে নিতে পারে নি। আচমকা সমাপ্ত হওয়ার আগেই রুৎকা বন্দী শিবিরের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে জীবন শুরু করে, অবশেষে বন্দীশিবিরেই কলেরায় মৃত্যু বরণ করে সে বছরের সমাপ্তিতে এসে। প্রায় যুগ পরে তার নোটবই প্রকাশিত হয়েছিলো এবং সেটা ব্যপক সাড়া জাগিয়েছিলো।
বইটির ছাপা মানসম্মত নয়, প্রকাশক বইটি প্রকাশ করেছেন এবং অতি অযত্নে প্রকাশ করেছেন বইটি। মাত্র ছেচল্লিশ টাকার বইয়ের মান যেমন হওয়ার ঠিক তেমন মানের বই এটি, তবে সুদীপ্ত সালাম যদি আরও একটু মনোযোগী হতো তাহলে হয়তো বইটি আরও সুলিখিত হতে পারতো। কিংবা রুতকার জীবনির সাথে সুচনায় যদি আরও বিস্তারিত বন্দীশিবির উঠে আসতো সেটা আরও চমতকার হতে পারতো, তবে সুদীপ্ত সালাম ব্যস্ত লেখক, একটি মাত্র বই লিখে বই মেলায় নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চায় নি, সে কারণেই তার বই প্রকাশিত হয়েছে তিনটি, অন্য দুটো হাতে নিয়ে দেখেছি, আশাপ্রদ মনে হয় নি তেমন।
আমাদের কিশোরীরা কি তাদের যুদ্ধকালের অভিজ্ঞতা লিখেছে এমনভাবে, জাহানারা ইমামের লেখা একাত্তরের দিনলিপি সে অর্থে দিনলিপি নয়, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, এইচ টি ইমাম কিংবা অন্য যারা একাত্তরের দিনলিপি লিখেছেন তাদের দিনলিপির ব্যক্তিগত অংশটুকু তেমন প্রকাশ্যে আনতে চান নি তারা । একজন তসলিমা নাসরিনের ভাষ্যে তিনি তখন সদ্য শৈশবঅতিক্রান্ত একজন, তার জীবনে একাত্তর পালিয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা যদিও তেমনভাবে যুদ্ধসন্ত্রস্ত জীবন দেখবার অভিজ্ঞতা নেই তার।
প্রতিটি যুদ্ধের অমানবিকা এবং অপ্রয়োজনীয় ঘৃণার চর্চা ব্যথিত করলেও যুদ্ধকে অস্বীকার করা যায় না, যুদ্ধসভ্যতার ইতিহাসের মতো প্রাচীন বাস্তবতা, মানুষে মানুষে বৈরিতা কিংবা স্বজাত্যভিমান সামাজিক ব্যবহারের অংশ, ‘দ্যা বয় ইন দ্যা স্ট্রিপড পাজামা’ দেখে মুগ্ধ হলাম, যুদ্ধের ভেতরের যুদ্ধটুকু তুলে আনবার দক্ষতা ভালো লাগলো, একটা শিশুর জীবনের সামান্য কয়েকটা দিন, তার যোগ্যতা এবং হতাশা উত্তেজনা সবটুকু মাত্র ৯০ মিনিটে ফুটিয়ে তোলা সহজসাধ্য নয়, কিন্তু সেটা অনায়াসে করেছেন পরিচালক,
আমাদের যুদ্ধবিষয়ক ছবির তালিকায় কি এমন একটি ছবি কখনও থাকবে না, আমাদের ফিকশন, হারে রে রে রে যুদ্ধ এর বাইরে অন্য রকম পরিপক্ক কিছুর জন্য আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে। মিডিওকারদের হাতে সকল কিছু সমর্পন করে আমরা অপেক্ষা করছি কবে তারা তাদের সামর্থের বাইরের কিছু আমাদের দেখাবে। এখানে মেহেরজানের পরিবেশক আলোচনা সভায় বলেন তিনি ছবি দেখে পছন্দ করেই তার সামাজিক পরিচিতিকে ব্যবহার করে পরিবেশকদের নিয়মনীতি উপেক্ষা কওরে বলাকা আর সিনেপ্লেক্সে ছবিটি মুক্তি দিয়েছিলেন, সামাজিক চাপের কারণেই তিনি ছবিটি হল থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, কোন আদর্শিক কারণে না, বরং নিছক মানসিক প্রশান্তির জন্য তিনি ছবি প্রত্যাহার করে হয়তো সবাইকে সান্তনা পুরস্কার দিয়েছেন।
আমরা আনন্দিত হয়েছি, বিনোদিত হয়েছি, অন্তর্জালিক দেশপ্রেমের লড়াই জিতে সাফল্যের ঢেঁকুর তুলেছি। পরবর্তি ছবির জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু যুদ্ধবিরোধী কোনো ধারণাই আমাদের মাথায় নেই, আমাদের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে নি, এবং এই অসমাপ্ত যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে সবাই একমত নন। অনেক রকম সমাপ্তির একটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সে বিচার রাজনৈতিক কারণে, না কি আমাদের অদক্ষতায় বিলম্বিত হচ্ছে কে জানে। একটা জাতি প্রচারণায় মানুষকে পশু ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে, স্ট্রিপড পাজামা ছবিতে এমন একটা বাস্তব খোঁচা ছিলো, আমাদের ভেতরেও এমন পশু আছে, এমন সাপ ফণা তুলে আছে, আমরা সে ফণায় হাওয়া দিচ্ছি এবং আশা করছি এভাবেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে একদিন।
সে দিন বইমেলায় সবুজ বাঘের সাথে বেশ লম্বা একটা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম, তীব্র জাতিয়তাবাদী উন্মাদনায় ও বলেছিলো পাকিস্তানকে ঘৃণা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য এবং আমাদের জাতীয় কর্তব্য পালন করা উচিত। ঘৃণা অন্ধ একটা আবেগ, যৌক্তিক পরিণতিবিহীন নিছক আবেগের অপচয়, অথচ এটুকু বুঝাতে ব্যর্থ হলাম তিন জন মিলে। ক্ষোভ যৌক্তিক, প্রতিরোধ কিংবা প্রতিবাদ ক্ষোভের যৌক্তিক প্রকাশ, সেখানে অযৌক্তিক ঘৃণা তেমন কোনো শুভ প্রভাব বয়ে আনবে না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণার বিরুদ্ধে ছিলো , না কি পাকিস্তানের শাসকদের ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে ছিলো এটা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। আমরা কেনো স্বাধীকার আন্দোলন শুরু করেছিলাম, আমরা কি একাত্তরে এসেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পেরেছিলাম, পাকিস্তানী শাসকদের অন্যায়, অবিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যৌক্তিক ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের কোনো অংশে কি পাকিস্তানীদের প্রতি অযৌক্তিক ঘৃণার অস্তিত্ব ছিলো,
আমাদের যৌক্তিক সংগ্রামের পরিণতি সম্পর্কে এই স্বাধীনতা সংগ্রামের আশাবাদী অংশের ধারণা ছিলো এই সংগ্রামের যৌক্তিক পরিণতি হবে আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্যহ্রাস, আমাদের শাসকশ্রেণীর শোষক মানসিকতার পরবর্তন, সবার জন্য একটি মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ,
আমরা যে লড়াই লড়েছিলাম পাকিস্তানী শাসক এবং তাদের অনুগত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সে লড়াইয়ে আমরা কি আশা করেছিলাম। যদি লড়াইটা নিছক উর্দুভাষী ঔপনিবেশিক মানসিকতার শাসকদের বদলে বাংলাভাষী জনবিচ্ছিন্ন শাসকের দাবিতে রক্তক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায় কোনো রাজনৈতিক ভুলে তাহলে হয়তো তেমন পরিবর্তন আসবে না। পাকিস্তানী বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিকার এবং শাস্তির দাবি উত্থাপনের সাথে সাথে আমাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যহ্রাসের দাবিতে অবস্থান গ্রহন জরুরি।
শাসকের মুখের ভাষা বদলেছে, শাসন কিংবা শোষণের ধরণ বদলায় নি, একাত্তরপূর্ববর্তী সময়ে যদি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরোধিতা জাতীয় অকর্তব্য চিহ্নিত হয় সেই একই কারণে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরোধিতাও জাতীয় কর্তব্য । সে জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবলে স্বাধীনতাপূর্ববর্তী শাসকদের প্রতি আমাদের ঘৃণা একই সাথে আমাদের বাধ্য করে নতুন শাসকদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শণে। বৈষম্যবিহীন একটি মানবিক রাষ্ট্রনির্মাণের ব্যর্থ আমাদের যৌক্তিক ভাবেই এই বৈষম্য নির্মূলে কাজ করতে হবে।
এই কথাগুলো নিছক ব্যকরণগত বক্তব্য, বিদ্যমান ব্যবস্থার কোথাও এমন আশাবাদী হয়ে উঠবার উপকরণ নেই, আমাদের যাবতীয় ব্যর্থতার দায়ভার আমরা পূর্ববর্তী প্রজন্মের উপরে ন্যস্ত করে আক্ষেপ এবং বিক্ষোভে জীবন কাটাতে পারঙ্গম, অথচ নিজের অবস্থানগত দায়িত্ব পালনে ততটাই অনীহা আমাদের। সুতরাং আমাদের ঘৃণার উপলক্ষ্য হয়ে যায় একটি জাতি, প্রথা কিংবা সংস্কার নয় বরং আমাদের ঘৃণার উপলক্ষ্য হয় একটি শব্দ, শব্দের বাইরে গিয়ে শব্দের পেছনের ইতিহাসটুকু, আমাদের রাজনৈতিক প্রতিরোধের অবস্থানটুকু ভুলে আমাদের তীব্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনায় ঘৃণা করেই নিজের নাগরিক দায়িত্ব সমাপ্ত করতে হবে। এই দাবীর প্রতি ঐক্যমত পোষণ না করতে চাওয়ায় যতটুকু বিপত্তি, তার চেয়ে সহজ অবশ্যই অযৌক্তিক ঘৃণার জলন্ত প্রদর্শনী।
সে দিন আড্ডায় যা সমাপ্ত হয় নি, পরবর্তী আড্ডাগুলোতেও এ বিতর্ক সমাপ্ত হবে না। শাসক শ্রেণীর চরিত্র ও মানসিকতাকে প্রতিরোধ না করে সবার জন্য মানবিক একটি রাষ্ট্র নির্মান করা সম্ভব হবে না, এবং চাই বা না চাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপনের সাথে সাথে এইসব পদক্ষেপ গ্রহনও একদিন নাগরিক কর্তব্য বিবেচিত হবে। এবং একদিন আশা করবো সেইসব মানুষেরাও এটা উপলব্ধি করবে, আমাদের লড়াই আমাদের লড়ে যেতে হবে।





কেন নয়? তিনি হয়তো কিশোরী ছিলেন না, দুই পুত্রের মা ছিলেন কিন্তু তাতে দিনলিপি কেন দিনলিপি হবে না?
"একাত্তরের দিনলিপি সে অর্থে দিনলিপি নয়" , সেটা স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হবে জাহানারা ইমাম নিজের দিনযাপনের কথা লিখেছেন, ব্যক্তিগত অনুভব সেখানে আছে, কিন্তু এটা নির্মিত, তিনি প্রায় এক বছর গবেষণা করে সেখানে যাদের নাম লিপিবদ্ধ আছে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে লিখেছেন ইতিহাস। সেটা ঐতিহাসিক বই, এবং ইতিহাসের বই হিসেবে যতটা নির্ভুল হওয়া সম্ভব ততটা নির্ভুল তথ্য আছে সেখানে।
দিনলিপি এ চরিত্র ধারণ করে না। কিংবা এমন দিনলিপি যদি কেউ লিখতে চায় তাহলে তার উদ্দেশ্যমুখীনতা তার অনুভবকে স্পর্শ্ব করবে।
আপনি কায়দা করে আপনার মনগড়া কথাকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে চাচ্ছেন।
১। আপনার দেওয়া দিনলিপির সংজ্ঞা, যুদ্ধবিরোধী চেতনার সংজ্ঞা ইত্যাদি অদ্ভুত ও ভীষণ ভাবে খন্ডিত। মুক্তির গান, মুক্তির কথা, আগুনের পরশমণি - এইছবিগুলা আপনার চোখে পড়ে না - কী আজিব!
২।
ভাই, কিশোরীর দিনলিপি হঠাৎ এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন? মূল ব্যাপারটা হল যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা - সেটা বুড়ি লিখল, না ছুঁড়ি লিখল সেটা গৌণ। মানছি যে দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য থাকবে - কিন্তু সেতো যে কোন আত্মজ়ৈবনিক লেখাতেই থাকবে। আপনি নৈর্ব্যক্তিক ডকুমেন্টাশান চান - দলিল পড়েন, প্রবন্ধ পড়েন।
যদি সাহিত্যগুণে জারিত কোন লেখার স্বাদ পেতে চান এইটুকু সাব্জেক্টিভিটি থাকবেই। জাহানারা ইমামের "একাত্তরের দিনলিপি" কেবল যুদ্ধকালীন স্মৃতিকথা নয় বরং রস সাহিত্যের আরেক মাত্রা। সে অর্থে দিনলিপি না হলেও কোন ক্ষতি নেই।
যুদ্ধকালীন কৈশোরের কথা জানতে চাইলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা বই পড়ুন। এই বইমেলাতেই পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থহীন যুক্তি দেখাবেন না।
৩।
এইখানে অকর্তব্য হবে না, কর্তব্য হবে। না হলে বাক্যটি অর্থহীন।
৪।
এখানে প্রেমের প্রসঙ্গে মেহেরজানের তৈলাক্ত গন্ধ পেলাম।
৫।
একটু গুগলে গুঁতা দিয়ে পরিবেশকের একটা সাক্ষাৎকার পেলাম।
ছবিটির পরিবেশক আর্শীবাদ চলচ্চিত্রের কর্ণধার হাবিবুর রহমান খানকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, তার উপরে কোনো ধরনের চাপই ছিল না।
‘তাহলে কেন ছবিটি হঠাৎ করেই সাময়িক বন্ধ করা হলো?’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার অনেক কাছের মানুষেরাই ছবিটির বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ছবির প্রিমিয়ার শো’র দিনই তারা বলেছেন, এটি তুলে নিতে। অনেকেই বলেছেন এটি আইএসআইয়ের টাকায় বানানো ফিল্ম। ৪০ বছর আগে যেখানে মুক্তিযুদ্ধ করেছি সেখানে কেন এখন এই ছবির জন্য রাজাকার হবো। অনেকেই পরোক্ষভাবে রাজাকার বলেছে।’
ওনার আদর্শ ওনার কাছে। কিন্তু অন্য অনেকে আদর্শিক কারণে প্রতিবাদ করেছেন। কেউ ব্লগে, কেউ খবরের কাগজে, কেউ ফেইসবুকে, কেউ বন্ধুদের আড্ডায়। তাদের আদর্শকে খাটো করার কোন কারণ দেখি না।
কথাটা নিজের কাছেই রূঢ় শোনাচ্ছে। দুঃখিত। বরং পড়ুন -
আপনি সূক্ষ্মভাবে মনগড়া কথাকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে চাচ্ছেন।
মুক্তির গান, মুক্তির কথা কেনো দিনলিপির পর্যায়ভুক্ত হবে।
যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা বিষয় নিয়া কিছু বলতে চাইতাছি না, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে লেখা যুদ্ধের অভিজ্ঞতাজাতীয় বইগুলাতে তথ্যগত অসংগতি থাকে, ব্যক্তিগত অনুভব কিংবা উপলব্ধি সময়ের সাথে বদলে যায়, মানুষ স্মৃতিচারণেও নিজের খন্ডিত জীবন উপস্থাপন করে, সেটা লুকানোর জন্য করে এমন না, বরং প্রতিটি স্মৃতি সময়ের সাথে রূপ বদলে ফেলে।
বিষয়টা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য, আমাদের স্মৃতিচারণ কিংবা আমাদের ঘটনার বর্ণনা সব সময়ই কিছুটা ফ্যাব্রিকেটেড, এইটুকু মেনে নিয়ে আলোচনা করলে ভালো হয়
রুৎকার অনুভুতির সাথে মেহেরজানের প্রেমের অনুভুতির গন্ধ পাওয়া ভালো, তবে ফরিদা হকের মাই জার্নি থ্রু সেভেন্টি ওয়ান পড়েন, সেইখানে শাইনপুকুরে তাদের এপ্রিল মাস কাটানোর একটা বর্ণনা আছে, প্রলম্বিত বনভোজন, প্রেম এইসব উপাদান সেখানে আছে, মানুষ মানিয়ে নেয়, অভ্যস্ত হয়ে যায়, আমার নিজের ধারণা ৭২ এর মার্চ, এপ্রিল, মে মাসেও বাংলাদেশে সন্তান জন্মেছে, রমন, রসনাস্বাদ, স্বার্থপরতা, লোভ, জিঘাংসা, কোনো কিছুই যুদ্ধের কারণে স্থগিত ছিলো না, প্রেম ভালোবাসার মতো মানসিক অনুভুতিগুলো কেনো স্থগিত থাকবে, যুদ্ধ চলছে এ কারণে স্ত্রীর সাথে সঙ্গম বাতিল করে রাইফেল হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সবাই এমন বাস্তবতা সবার না
মেহেরজানের পরিচালকের কথাবার্তা বিডি আর্টসে আছে, সেখানে সে স্পষ্ট করে বলছে সব কথা ।
মুক্তির গান কেনো দিনলিপির পর্যায়ভুক্ত হবে না ভাই? খন্ডিত সময়কাল, স্রেফ এজন্যই? নাকি এটা কারো একার দিনলিপি না, এজন্য? আত্মজীবনীতে খালি নিজের কথা আসতে হবে - এমনটা ভাবা ভুল।
আপনার যুক্তি ঠিক আছে।
ঠিক আছে। দেখছি।
পরিচালক না পরিবেশক হওয়ার কথা, হাবিব খানের ভুমিকা নিয়া আলোচনা হচ্ছিলো
ওটা কি মন্তব্যে টাইপো ছিল? ব্যাপার না।
মোরশেদুল ভাইয়ের বিশ্লেষণ ভালো লাগতেসে ...বাকিটা দেখে আপনারে উত্তর দিব।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণায় " উপমহাদেশের হিন্দু এবং মুসলমানেরা পৃথক জাতী, তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের প্রয়োজন" এই বাক্যের বাইরে নতুন কোনো বিষয় উত্থাপিত হয় নি , সেটুকু প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য একটা লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, সে প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা দুটো রাষ্ট্র নির্মানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেটা বাস্তবায়িত হয় নি এবং আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনের মূল সুর ছিলো লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন। ১৯৭১ এ এসে লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়েছে, আমরা ভারতের দুই পার্শ্বে দুটো মুসলিম জনবহুল রাষ্ট্র পেয়েছি।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখন্ডতা বজায় রাখতে এর শাসক সম্প্রদায় বিভিন্ন পন্থা গ্রহন করেছেন, জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা উর্দু রেখে জাতিয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও ইন্দোনেশিয়ায় সফল হয়েছে। তার মৃত্যুর পর পরবর্তী শাসকেরা ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ধর্মকে জাতীয়তাবাদের শেকড় বানানোর চেষ্টা করেছে, সেই রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে কিংবা সংস্কৃতিকে হিন্দুঘেঁষা বলা হয়েছে।
স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধের জায়গাটাতে নিজেদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টাই প্রধান বিবেচ্য ছিলো, আমাদের যুব শিবিরে তেমনভাবে রাজনৈতিক সবক দেওয়া হয় নি, আমাদের বাঙালী জাতিয়তাবাদের চেতনা পরবর্তী সময়েও নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র। সেখানে একটা ডানপন্থী সরণ ছিলো, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, মাদ্রাসা শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে সেসব সরণে চাকা লাগানো হয়েছে, সেটার অবধারিত পরিণতি সংবিধানের বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম
কিছু জিনিস না ঘাঁটলে এই মন্তব্যের উত্তর দিতে পারছি না। একটু সময় লাগবে।
"শাসক শ্রেণীর চরিত্র ও মানসিকতাকে প্রতিরোধ না করে সবার জন্য মানবিক একটি রাষ্ট্র নির্মান করা সম্ভব হবে না, এবং চাই বা না চাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপনের সাথে সাথে এইসব পদক্ষেপ গ্রহনও একদিন নাগরিক কর্তব্য বিবেচিত হবে। এবং একদিন আশা করবো সেইসব মানুষেরাও এটা উপলব্ধি করবে, আমাদের লড়াই আমাদের লড়ে যেতে হবে।"
লেখা ভালো লেগেছে।
প্রায়োগিক ও আভেধানিক অর্থে দিনলিপি যাকে বলে সেটা জাহানারা ইমাম ছাড়া অন্য কারোটা মনে হয়নি। আপনি বলছেন সেটা পরে অন্যদের সাক্ষাতকার নিয়ে পরে লেখা, এটার পেছনে কোনো রেফারেন্স আছে?
রুৎকার নোটবই- সংগ্রহ করেছি, পড়বো। অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরী পড়ে অসাধারণ লেগেছিল। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি নিয়ে তিনি তার ক্যান্সারের সাথে বসবাস বইতে লিখেছিলেন ওটি ডায়েরীর সাথে মিলিয়ে অনেক গবেষণা করে লেখা হয়েছিল। এটি ডায়েরী অবলম্বনে রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গুরুত্তপূর্ণ দলিল। হুবহু ডায়েরী তুলে দেয়া হয়নি। বই বের করবার সময় অনেক তথ্যাদি সংযোজন করা হয়েছিল।
এর ৪২ পৃ: লেখা আছে,
অশেষ ধন্যবাদ লীনাজি
ধন্যবাদ!
মাহবুব ভাই
৪৫ পৃষ্ঠায় আছে:
দারুন। ফেবুতে শেয়ার দিলাম।
রুৎকার নোটবই,বইটি কিনলাম আজ। কাল পোষ্ট পড়ে আগ্রহ জাগলো। রাসেল ভাইকে ধন্যবাদ।
জনাব রাসেল, আপনাকে ধন্যবাদ। I do not agree with what you have to say, but I'll defend to the death your right to say it.-Voltaire (1694-1778) ভালো থাকবেন। আপনার সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ রইলো।
আপনার প্রতিক্রিয়া পড়ে মনে হলো আমার অনুবাদ বিষয়ক বক্তব্য আপনার মনঃপুত হয় নি এবং আপনি এরপরো ভলতেয়ারের বানী শুনিয়ে আমাকে বাকস্বাধীনতা দিলেন। লেখক লিখবেন, পাঠক পড়বে এবং পাঠকের প্রত্যাশা এবং প্রত্যাশাভঙ্গের গল্প লিখবে নিজের ডায়েরীতে, সেটা অনলাইনে বলে আপনি পাঠক প্রতিক্রিয়া পেলেন, তাতে ক্ষুব্ধ হলে সেটা অন্যায় হয়ে যাবে ।
আপনার উদাহরণসমেত অনুবাদগত ত্রুটি ধরিয়ে দিতে পারতাম, কিংবা বলতে পারতাম আমরা যখন বাংলা লিখি কিংবা বাংলায় ভাবি তখন আমরা যেভাবে বাক্য গঠন করি, যৌগিক বাক্য অনুবাদের সময় আপনি সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, আপনার অনুবাদটা ইংরেজী বাক্যের বাংলা রুপান্তর হয়েছে, অনুবাদ হতে হলে দেশী ভাষায় সেটাকে আত্মস্থ করতে হয়, উপমা, উপস্থাপন এবং বক্তব্যের ধরণে একটা স্বদেশীয়ানা নিয়ে আসতে হয়, তাহলে অনুবাদ পৃথক একটি সাহিত্যমূল্য পায়। আপনি নিজের লেখায় সেই সাহিত্যমূল্য নির্মানে ব্যর্থ হয়েছেন অথচ ঘটনার কারণেই বিষয়টার সাহিত্যমূল্য নির্মাণ সহজতর ছিলো।
আপনার সাথে সাক্ষাত হওয়া এবং আলাপন যদি জরুরী মনে হয় তাহলে আমি গিয়ে আমার ব্লগের স্টলের সামনে থেকে আপনাকে ডেকে আলাপ আলোচনা করবো,
মন্তব্য করুন