ইদানিং জীবনযাপন
খুব ঘন ঘন মৃত্যু সংবাদ পেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার বয়েসে পৌঁছেছি এখন, এতদিন শুধু জন্মদিবস উদযাপন করেছি, এখন সময় এসেছে মৃত্যুদিন উদযাপনের, নতুন জন্মসংবাদ এখনও আহ্লাদিত করে কিন্তু একই সাথে মৃত্যু সংবাদ শুনবার ভীতিও সমান ভাবে প্রবল। গত এক মাসে চারজন পরিচিত মানুষের মৃত্যু সংবাদ শুনলাম, যাদের সাথে গত দুই দশক বেশ আনন্দে, আড্ডায় কেটেছে সেসব বন্ধুদের বাসায় আমাদের নিয়মিত আড্ডা বসতো, সেইসব পরিচিত মানুষের মৃত্যুর সংবাদ হুট করে পেলে খানিকটা বিষন্ন লাগে কিন্তু এ বয়েসে হারানোর শোক ততটা তীব্র নয়, এই ব্যাথ্যা ততটা তীব্র হয়ে অবশ করে ফেলে না, বরং পরবর্তী মৃত্যু সংবাদ শুনবার প্রস্তুতি নিয়ে রাখি, জানি না কখন কার মৃত্যু সংবাদ ভেসে আসবে মুঠোফোনে।
কয়েক বছর আগেও আমাদের প্রিয় সংবাদগুলো ছিলো বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের সম্ভবনার, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে যেযার মতো জীবিকার লড়াইয়ে লিপ্ত বন্ধুরা একজন একজন করে বিয়ের কার্ড হাতে উপস্থিত হতো আড্ডায়, আমরা হাসি ঠাট্টায় রাত জেগে গান গেয়ে সেসব উদযাপন করতাম, পরবর্তী বছরেই একটা সন্তান জন্মানোর সংবাদ শুনে বলতাম হারামজাদা একদম সময় নেয় নাই,
প্রায় সকল বন্ধুর বিয়ে শেষ, সবার ছেলে মেয়ে স্কুলগামী, সুতরাং বছরে বেশ কয়েকবারই একত্রিত হওয়ার সুযোগ হয়, সবাই যে যার পেশাগত জীবনে ব্যস্ত, সেই ব্যস্ততা থেকে একটা নির্ভেজাল আড্ডার দিন খুঁজে পায় না অনেকেই, সুতরাং সন্তানের জন্মদিনে একবার দেখা হয়ে যায় তাদের সাথে, এইসব জন্মদিবস আমাদের বন্ধুত্বের সুতো এখনও টানটান রেখেছে। আর যারা প্রবাসী তারাও এখন ঘোর সংসারী, দেশে ফিরলে একটা বিকেল কোনো মতে পাওয়া এখন অনেক কঠিন, এইসব আক্ষেপ থাকে, আমাদের আড্ডার সদস্য সংখ্যা কমতে কমতে এখন এক ডিজিটে নেমেছে,
বন্ধুর মা বাবারাও বন্ধু ছিলো কিংবা অনেকটা বন্ধুর মতোই ছিলো বলা যায়, একই মহল্লায় কয়েক দশক পার করে, ছেলে মেয়ের বন্ধুত্বের খাতিরে সে পরিচয় হৃদ্যতা হয়ে যায়, বাজারে কিংবা সেলুনে দেখা হলে দু দশটা কথা বিনিময় হতো যাদের সাথে, যাদের সাথে পাশাপাশি রিকশায় যেতে যেতে ভাই কেমন আছেন অনেক দিন আপনাকে দেখি না সংলাপ চলে, তাদের অ্নুপস্থিতি বিষন্ন করে অগ্রজ প্রজন্মকে। তারাও ম্লান চোখে তাকায় চারপাশে, অবশেষে আমাদেরও যাওয়ার সময় হলো।
এক বন্ধুর বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে যখন এসেছি তার সাথে দেখা করবো বলে, তখন জানলাম তাদের প্রতিবেশী আরেক বন্ধুর মা মারা গিয়েছেন, রাতেই দাফন হবে, আজিমপুরে,
আজিমপুরে অনেক দিন যাওয়া হয় নি, প্রথম যেবার গিয়েছিলাম বিকেলের আলো ছিলো, সেখানেই দেখলাম শহীদ বরকতের কবর, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কবরের জায়গাটা নষ্ট করে নি কেউই। কবরের ফাঁকে ফাঁকে ছোটো ছোট গলি, আর দরজায় বড় করে লেখা রাত এগারোটার পরে কাউকে দাফন করা যাবে না এখানে, সকাল ছয়টা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত দাফন করা যাবে ,
কোথাও পড়েছিলাম মুসলিমদের কবরের শণাক্তচিহ্ন রাখার নিয়ম নেই, কবরের পিঠ উচু করার সংস্কৃতি নেহায়েত কৃষিভিত্তিক সভ্যতার অবদান, মরুভুমিতে এমন কবরের পিঠ উচু করবার সুযোগ নেই, সে কারণেই মদীনায় রওয়া সম্ভব হয়েছে হয়তো। কবরপূজা কিংবা মাজার সংস্কৃতি নিন্দনীয় , কুফরী এমন ফারায়েজী বিধান কিংবা আহলেহাদিস বিধানের সাথে বাংলাদেশের ভক্তিপ্রবন মানুষের মানসিকতা মিলে না, এখানে কবরের পিঠ উঁচু , আর মৃতের নিজপরিচয়ের প্রয়োজন থাকে না যদিও এরপরও কবরের চারপাশের অলংকরণে মৃতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধের চেয়ে আমাদের অহমিকার চিহ্ন থাকে বেশী।
আমাদের পরিচয় হয়ে যায় কবরের সাইনবোর্ড, সেখানে মৃতের পরিচয় পদবী এসব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, কোনো ফেরেশতা এসে সাইনবোর্ড দেখে কবরের আশেপাশে টহল দিবে না, ভুতপূর্ব বিচারপতি কিংবা দাপুটে সচিব কিংবা আল্লাওয়ালা পীর, সবাই সময়ের সাথে পচে মিশে যাবে মাটিতে, হয়তো পনেরো বছর পর নতুন করে খুঁড়লে তারা দুইশত ছয়টা হাড় পাওয়া যাবে, আর পাওয়া যাবে চুল, শরীরের কোনো চুলই পচে যায় না, বরং লাঙলের ফলার সাথে উঠে আসে এখনও
কবি আল মাহমুদের স্ত্রীর কবর দেখলাম, সৈয়দা বেগমের সাইনবোর্ডে লেখা আছে স্বামী কবি আল মাহমুদ, নিজের কবি পরিচয়ের এমন অপচয় কেনো জানি না, মৃতদের সৎকার কিংবা আমাদের শ্রদ্ধা এবং বিনয়ে মৃতের কোন কিছুই যায় আসে না বোধটুকু উপলব্ধ হলো পরবর্তী সময়ে, দিব্যি অন্য কবরের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে গোরখোদক, তাদের মুখে কোনো দরুদ নেই, এটা তাদের অন্য যেকোনো দিনের মতো সাধারণ কাজ,কবরের হিসেব যে রাখে তারও মৃত্যের সাথে আবেগের সম্পর্ক নেই তাই দাফনের মাঝখানে বেরসিকের মত বলতে পারে এখনই হিসাব মিলাব, আপনার টাকাটা দেন জলদি, রশিদ লিখছেন এখনও টাকা দেন নাই, হিসাব টানতে দেরী করা যাবে না।
আর থাকে সামাজিকতা, সামাজিকতার যন্ত্রনায় ঠিকমতো শোকগ্রস্থ হতে পারে না মানুষ, মাতম করতে পারে না প্রাণখুলে , তার আগেই কান্না গিলে নিয়ে বলতে হয় এসেছেন, বসেন, কি আর বলব বলেন, এরপর যথারীতি যে যার মতো মৌন এবং শোকগ্রস্ত হয়ে থাকে,
আর কুলখানী আর চেহলামে কাকে কাকে দাওয়াত দিতে হবে, কি হবে মেন্যু আর কোথায় পাওয়া যাবে সেটা, কিভাবে নিজের সামাজিক মর্যাদায় মৃতের কুলখানী করা সম্ভব এইসব ইহজাগতিক ফ্যাসাদ মনে করিয়ে দেয় আমাদের কাছে মৃতের অস্তিত্ব নেই, জীবিত যতক্ষণ ততক্ষণই তার সাথে আমাদের অন্তরঙ্গ যোগাযোগ, স্নেহ আর স্মৃতির সম্পর্ক, মৃত মানুষের সাথে আমাদের যোগাযোগ ক্ষীণ।
সুতরাং আমরা জীবিতদের দুঃখ কষ্টের আঁচ থেকে বাচাতে চাই, ঘরে রেখে আসা মায়ের কল্যান চিন্তায় উদ্বিগ্ন বন্ধু বলে বুঝলি আমার মা ও ওর মা তো বন্ধুর মতো ছিলো, আমাদের পাশাপাশা ফ্ল্যাট, দুইটা পাশাপাশি দরজায় থাকতাম আমরা, কে কার ভাই কেউ বলতে পারতো না। মা তো খালাম্মার মৃত্যুর সংবাদ শুনে একেবারে চুপচাপ হোয়ে গেছে, এখন তার কিছু না হলেই হয়। আমি তো আসার আগে ধমক দিয়ে আসছি, এইসব নিয়ে ভাববা না তুমি, তোমার কিছু হবে না। কিন্তু তারপরও আম্মা বড় একটা ধাক্কা খাইছে, এখন দূরে থাকে তাই আসতে পারে নাই, কাছাকাছি থাকলে হয়তো চলে আসতো এখানেই।
একটা প্রজন্ম মৃত্যুর প্রতীক্ষায় ব্যকুল, আহা মৃত্যুটা যেনো শুক্রবারে হয়, জুমাবারে ভাগ্যবানেই মারা যায়, জানাযায় অনেক লোক আসে, আর অন্য এক প্রজন্ম নিজের মায়ার বাধন খুলছে ধীরে ধীরে, তাদেরও প্রস্তুতি নিতে হবে,





আজকাল খারাপ সংবাদই বেশি শুনি। মনে আছে আবার বাবা তাঁর ঘনিষ্টতম বন্ধুর লাশ দেখে এসে প্রথম স্ট্রোকের শিকার হয়েছিলেন।
খারাপ খবর পেতে পেতে এখন আর খারাপ লাগে না
খারাপ লাগে, কেন জানি না। গতবছর ফেব্রুয়ারীতে অফিসে গিয়ে শুনলাম, গত বিকেলে সামনের ব্রাঞ্চের যে সাব ম্যানেজারকে দেখেছি উনি সেদিন অফিসে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তারপর হসপিটালে নিতে নিতে ৪২ বয়সের ভদ্রলোক নেই। অফিসের সামনে জানাযা হবে। আমার ফ্লোরে সাকুল্যে মেয়ে আমি, ৮তলা থেকে দেখলাম সব আয়োজন, সেদিন লাঞ্চ হয়নি আমার, কোন কাজ করতে পারিনি- ছেলেরা এক অন্যকে বলছে "এক পাড়া থেকে জানাযায় একজন গেলেই হয়, পুরা ফ্লোর খালি করে কাজ ফেলে যাবার দরকার নেই"। মুখ দিয়ে কিভাবে যেন বের হয়ে গেল "আপনাদের কান্ধা দিতেও দেখবেন কেউ আসবে না, জালিমের দল!"
আমরা এমন হয়ে যাচ্ছি। এক প্রজন্ম চলে যাচ্ছে, আরকে প্রজন্ম মানবিকতার বাঁধন খুলছে আসলে, অমানুষ হয়ে মানুষের ভেক ধরে বেঁচে আছে।
মনটা খুব খারাপ করে দিলেন
আপনার মুঠোফোন চালু হইছে?
মৃত্যু
আতিকুল হক চৌধুরীর একটি নাটক দেখেছিলাম "উৎসব উৎসব"। এখনো মনে আছে। মৃত্যু একরকম উৎসবতো বটেই
মন্তব্য করুন