আমার না লেখা গল্পগুলো
আমি বিভিন্ন সময়ে গল্প লিখতে চেয়েছি, সুযোগ পেলে উপন্যাসও লিখতে চেয়েছি কিন্তু দীর্ঘ সময় কোনো নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে লেখার ধৈর্য্য না থাকায় কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হয় নি, দুইটা উপন্যাস ভুলে শুরু করে এত দিন পর উপলব্ধি করেছি সেসব উপন্যাস শেষ করবার মতো ধৈর্য্য আমার হবে না। লেখালেখি করবার মতো নিমগ্নতা আমার নেই। উপন্যাস লেখার মতো কষ্টকর কোনো প্রয়াসে যাওয়া আমার জন্য নয়।
আন্দালিফ আর জয়নালের উপন্যাসটা মাঝপথে আটকে আছে, প্রতিটা বড় বন্ধের আগে আগে মনে হয় একটু পড়ে লেকা শুরু করে দিবো, কিন্তু আমাদের আর্কাইভিং ফ্যাসিলিটির বেহাল অবস্থা আর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল আর্কাইভে গিয়ে পুরোনো পত্রিকা পড়ে লেখা আমার জন্য কষ্টকর। আমি পেশাদার লেখক না, আর শখের তোলা আশি টাকা হলেও এই কষ্টের পরে আমার নিজের আনন্দটা ফিকে হয়ে যাবে। লেখালেখিকে যদি পেশা হিসেবে নিতে পারতাম তাহলে হয়তো জোরাতালি দিয়ে লিখে ফেলতাম কোনো উপন্যাস, এমনিতে ব্লগের খুপড়ির বাইরে লেখার অভ্যাস না থাকায় কাগজে কলমে লেখা হয় না, মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে প্রকাশিতব্য উপন্যাস লেখা আমার ধারণার বাইরের কাজ।
সুতরাং আমার ধারণা ছিলো আমি নিশ্চিতভাবেই গল্প লিখতে পারি, অন্তত গল্প লেখার পরিশ্রমটকু করতে পারবো আমি। ইদানিং বুঝলাম আসলে গল্প লিখবার মতো পরিশ্রমসাধ্যকাজেও আমার অনীহা আছে।
একটা গল্পের ভাবনা মাথায় ঘুরছে কিংবা বলা যায় এই মূহুর্তে তিনটা গল্পের ভাবনা ঘুরছে মাথায়, তিনটা গল্পের চরিত্ররা ভিন্ন ভিন্ন, তাদের ভাববার ধরণটাও আলাদা। তাদের এক্সপ্রেশনগুলোও আলাদা, তাদের ভাবনাগুলোর সামান্য অংশ আমার সামনে উন্মুক্ত, বাকিগুলো ক্রমশ: উন্মোচিত হতে পারে এমন একটা ক্ষীণ সম্ভবনাও আছে। আপাতত সেইসব ভাবনাগুলো লিখে রাখি, উন্মুক্ত অন্তর্জালে যেহেতু যেকেউ যেকোনো সময় ভাবনাআত্মস্যাৎ করে ফেলতে পারে সুতরাং পরবর্তী বই মেলায় অন্য কেউ যদি এই থিমের উপরে লিখে ফেলে তাহলে নিজের অলসতার বাইরে অন্য কোনো বিষয়কে দায়ি করা উচিত হবে না।
প্রথম গল্পের ভাবনাটা মাথায় এসেছিলো মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে কোনো একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মরণসভায় আলোচনা শুনে, ২৫শে মার্চ রাজশাহীর পুলিশ একাডেমিতে কিংবা সেনাডিভিশনের বাঙ্গালী সৈন্যদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেছিলো একজন অবাঙ্গালী মেজর। তার ইউনিটের সৈন্যদের কতৃপক্ষের নির্দেশে নিরস্ত্র করে পশুর মতো হত্যা করতে আগ্রহী হয় নি সে মেজর তবে পরবর্তীতে ২৮শে মার্চ যখন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান হলো সেই মেজর মৃত্যু বরণ করে বিদ্রোহী বাঙ্গালী সৈন্যদের হাতে।
সে মানুষটাকে আদর্শ ধরে একটা গল্প লিখবো ভেবেছিলাম, ভেবেছিলাম একজন সেনাকর্মকর্তা তার অনুগত সৈন্যদের কাছে আদর্শপুরুষ হয়ে উঠতে পারেন নিজের চরিত্রগুণে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় ৭০ হাজার নিয়মিত সৈন্যবাহিনী এখানে যুদ্ধরত ছিলো তাদের ভেতরে কেউ কেউ দীর্ঘ দিন বাঙ্গালী সৈন্যদের সাথে ট্রেনিং নিয়েছে, পাকিস্তানে আটক সৈন্য ও সেনাকর্মকর্তাদের বাইরে বাংলাদেশেও সেনাসদস্য এবং সেনাকর্মকর্তাদের ভেতরে হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিলো, তাদের অনেকের কাছেই এই যুদ্ধ একটা আদর্শিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাদের উর্ধতন কতৃপক্ষের আদেশ, নিজের মানবিকতা এবং নিজের বন্ধুত্বের ভেতরে যেকোনো একটা অবস্থান বাছাই করতে হয়েছে, সে বাছাই খুব বেশী সহজ ছিলো না।
খর্বকায় বাঙ্গালীরা যোদ্ধার জাত না এই বিশ্বাসটা প্রচারিত হলেও ৬৫ সালের যুদ্ধের পর বাঙ্গালীর সমরপারদর্শীতা সম্পর্কে পাকিস্তানের সেনাকর্মকর্তাদের অবজ্ঞার ভঙ্গিটা বদলে গিয়েছিলো, যদিও বড় পদে গুটিকয়েক সেনাকর্মকর্তা ছিলেন কিন্তু মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনেক বাঙ্গালী সেনাকর্মকর্তার সাথেই পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তাদের দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণসুত্রে একটা স্থায়ী বন্ধুতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো, একটা নির্দেশে সেইসব বন্ধুতা ভুলে তার পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে কিন্তু তাদের ভেতরে কি পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার বোধটুকু একেবারে উবে গিয়েছিলো?
আমার ধারণা প্রতিরোধ যুদ্ধে যেখানে একপক্ষে ছিলো সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী এবং সেনাসদস্যগন, এবং অন্য পক্ষে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং সেই যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বেশ বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছিলো এবং সেই যুদ্ধে যখন পাকিস্তানী মেজর নিহত হলেন তিনি অন্যায্য যুদ্ধের শিকার হলেও হয়তো কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হয়েছেন, এবং পরবর্তীতে গর্বিত হয়েছেন, তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন তার প্রশিক্ষণ ব্যর্থ হয় নি।
পরবর্তী গল্পের ভাবনাটা এসেছিলো কোন একদিন পুরান ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, ঢাকার কোনো স্থাপত্য ঐতিহ্য তৈরি হয় নি, এবং ঢাকার কোনো অংশেই স্থাপত্যসামঞ্জস্যতা নেই, যেযার মতো নিজের পরিপার্শ্বের সাথে বেমানান ভবন বানিয়ে রেখেছে, সেসব ভবনের বিদঘুটে ভঙ্গি নিজের সৈন্দর্য্যবোধকে ভেঙচি কাটে। একটা ভবন নিছক একটা বাসস্থান না, একটা ভবন নিছক কোনো কর্মক্ষেত্র না, তার সাথে এর পরিপার্শ্ব মিললে প্রতিটা নির্মিত ও নির্মীয়মান ভবন এক একটা শিল্পকর্ম, এখানে ঢাকার স্থাপত্যঐতিহ্য বিবেচনা করলে বলা যাবে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহ্য তৈরি না হওয়ায় আমাদের প্রতিটা ভবন পার্শ্ববর্তী ভবনের চেয়ে ভিন্ন, পুরোনো ঢাকা যখন প্রাদেশিক রাজধানী হলো তার আগে থেকেই ঢাকা বস্তির শহর, এখানের অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিলো দরিদ্র প্রজা, জায়গীর হয়তোবা, তাদের খড়ের ঘর আর টিনের চালে মাথাগুঁজে পড়ে থাকা দিনগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে, এখন শহরে জমির দাম আকাশছোঁয়া, কিন্তু যখন ঢাকা শহর তৈরি হচ্ছিলো কিংবা প্রাদেশিক রাজধানী হয়ে উঠবার আগে ঢাকার ঐতিহ্য ছিলো সুরম্য অট্টালিকার পাশে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বস্তি, ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের মানসিক চরিত্র এই ভবনগুলো নির্ধারণ করেছে কোনো না কোনো ভাবে, এখানে সুযোগসন্ধানী মানুষ, স্বার্থপর মানুষ প্রতিবেশীদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় আমি তোমাদের চেয়ে আলাদা, অন্যদের বঞ্চিত করে কিংবা অন্যদের সুযোগ সুবিধা বিবেচনা না করবার ঐতিহ্যটা ঢাকা শহরের স্থাপত্য দেখলেই উপলব্ধি করা যায়। এখানে প্রতিবেশীর উঠানে বর্ষার সবটুকু জল ঢেলে নিজের উঠার শুকনো রাখবার প্রয়াসেই সীমানাপ্রাচীর ডিঙিয়ে যায় ঘরের চাল।
বিন্দুমাত্র ফাঁকা জায়গা নেই, এখনও কোনো গলিতে ঢুকলে চারকোনা বাক্সগুলোর তীক্ষ্ণতা চোখে গুঁতো দেয়, কোথাও রিলিফ নেই, খুব তীক্ষ্ণ ভবনগুলোর বাহিরের অংশের পরে বিচ্ছিন্ন আকাশ, সেই আকাশের নীচে কোনো কোমলতা নেই, শহরটা ক্রমশ এমন কঠোর হয়ে উঠছে, এখানের বাসিন্দারা সেইসব ধারালো কোণার দখল নিতে পরস্পরের সাথে সেইসব কোণা নিয়েই যুদ্ধলিপ্ত হয়।
একটা নগর শুধুমাত্র নগর নয়, সেটা শাসকদের মানসিকতাও নির্ধারণ করে, একটা সাম্রাজ্যের প্রতিরূপ তার নির্মিত নগরগুলো, কেউ কেউ বলে সেইসব নগর শাসকের মানসিক চরিত্র প্রকাশ করে, ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় এখন প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা এবং নতুন ব্যবসা করতে আসা নির্মাতাদের ভবন দেখলে এই তফাতটা স্পষ্ট উলপব্ধ হবে, ঢাকা শহরের স্থাপত্যঐতিহ্য নিয়ে তেমন কাজ নেই সুতরাং এই সম্পূর্ণ বিষয়টাকে উপস্থাপন করতে হলে নিজেকেই গড়েপিটে নিতে হবে সবটুকুই,
ঢাকার প্রেমে পড়া একজন স্থাপত্যবিদের নিরন্তর মানসিক সংঘাত এবং এই শহর থেকে তার নিজেকে ক্রমশ: প্রত্যাহার করে নেওয়ার দ্বন্দ্ব নিয়ে যে গল্পটা লিখতে চাচ্ছি সেটার জন্য কোনো সহায়ক ম্যাটেরিয়াল নেই আমার কাছে, সুতরাং এই গল্পটা লেখা হবে না, আর যদি জোরাতালি দিয়ে লিখতে চাই তাহলে সেটা নিজের পছন্দ হবে না।
মেহেরজানের বিতর্কের সুবাদে একটা চিত্রনা্ট্য লিখবো ভাবছিলাম, ধারাবাহিক সে চিত্রনাট্য লেখা শুরুর আগেই অন্য একজনের অনুরোধে অন্য একটা চিত্রনাট্যের ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আমার চিত্রনাট্য লেখা হয় নি, মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকে ধারাবাহিক ভাবে লিখবো ভাবা সে চিত্রনাট্যে কাঠামোতে যেসব মালমশলা লাগবে সেটার জন্য আমার ঢাকা মিউনিসিপ্যালটির মানচিত্র আর বিভিন্ন ডকুমেন্ট প্রয়োজন, সেটা কোথায় পাবো আমি জানি না, এইসব বিষয়ে যারা জানেন তারা যদি সহযোগিতা করতেন তাহলে আমি নিজে উপকৃত হতাম।





খুব সুন্দর একেঁছেনতো ঢাকাবাসীর চরিত্র। ঢাকা আসলেই তাই এখন।
আপনার পরিকল্পনার সাফল্য কামনা করছি। আশাকরছি কারো না কারো কাছ থেকে মাল মসলা পেয়ে যাবেন।
ছিঁড়ে - খুড়ে লেখার যে হাত সেটি পুরোটাই আপনার আছে।
উপরের কোন একটি গল্প নিয়ে অথবা প্লট ঠিক না করেই শুরু করে দিন - গল্পপাঠের অপেক্ষায় থাকলাম।
মন্তব্য করুন