ইউজার লগইন

আর কাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করা যাবে?

কাল উৎসবের আলো মলিন হবে না, সকালে থেকেই ব্যানারে-ফেস্টুনে-শোভাযাত্রামুখরিত ৪০তম বিজয় দিবসের উদযাপনে বিন্দুমাত্র মলিনতা থাকবে না। উৎসবের রং লাল-সবুজ, আর কাপড়ের সাথে সাথে হৃদয়ে লাল-সবুজ নিয়ে উৎসবের আমেজে বয়ে যাওয়া প্রাণে গতকাল সকালের সংবাদপত্রের বিষন্ন গল্পগুলো কোনো আদ্রতা আনবে না। বিভিন্ন মাপের-ছাটের ক্রোরপত্র, বিভিন্ন প্রবীন নবীন বুদ্ধিজীবীদের ভাবনার বুদ্বুদ আর বুদ্ধিজীবীয় আক্ষেপের ভার বহন করবে বাংলা বর্ণমালার ৫০টি অক্ষর।

আমাদের অর্জন এবং আমাদের ব্যর্থতা বিভিন্ন পরিসংখ্যানে যাচাই করে আমরা জানবো আমাদের অর্জনের পাল্লাটাই ভারী। আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হবে এমন আশংকার আগুণে জল ঢেলে আমরা দিব্যি উন্নয়নকামী উন্নয়নশীল দেশগুলোর ট্রেনের লাইনে চেপে বসেছি। আমাদের রপ্তানীমুখী গার্মেন্টস শিল্প, আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটানো চিংড়ি শিল্প, আমাদের চামড়া আর আমাদের সব্জী নতুন নতুন বাজার খুঁজে পাচ্ছে, আমাদের রপ্তানী আয় প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের শ্রমশক্তি রপ্তানীর বাজার আরও প্রাসারিত হচ্ছে, আমাদের রেমিটেন্স বাড়ছে, আমরা ভালো আছি, আমাদের জাতীয় আয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, সমাজে ধনবৈষম্য বেড়েছে নি:সন্দেহে, বঞ্চনা এবং প্রতারণাও বেড়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্র শতকরা ৮০ভাগ নাগরিকের কাছেই অগম্য, রাষ্ট্রীয় সুবিধাগুলোর অঞ্চলভিত্তিক প্রসার ঘটলেও কৃষিব্যতিত অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র অনেক বেশী জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে পারছে না।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের হাতে নিহত আনুমানিক ১২ হাজার বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের অবদান রাখতে পারেন নি কিন্তু চাটুকারব্যতিত অন্যান্য অবশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীগণ রাষ্ট্রের সচেতন উপেক্ষায় দেশগঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন নি , তাদেরও অনেক কিছুই করবার ছিলো, তারাও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রবাসে জনমত সংগঠিত করেছেন, স্বদেশে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন। তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভীস্পা হয়তো রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাধীন বাংলাদেশের কল্পনার সাথে সাংঘর্ষিক ছিলো, তারা যেমন স্বদেশ চেয়েছিলেন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তেমন স্বদেশ নির্মাণের পথে বিভিন্ন মাত্রার অন্তরায় তৈরি করে রেখেছিলেন, তারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, সমালোচনামুখর হয়েছেন, রাষ্ট্র সচেতনভাবেই তাদের এইসব সমালোচনাকে উপেক্ষা করেছেন, তাদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছেন কিংবা প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধ সমালোচনা দমন করেছেন।

আমাদের যা কিছু হয়ে উঠবার সম্ভবনা ছিলো তার সবটুকু আমরা করে উঠতে ব্যর্থ হয়েছি, এরপরও আমাদের অগ্রগতি যতটুকু সেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অতিনগন্য, বরং সিংহভাগ কৃতিত্বই সাধারণ মানুষের, যারা নিজেদের উদ্ভাবনকুশলতা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে দেশে গার্মেন্টস শিল্প প্রসারিত করেছেন, যারা চিংড়ি রপ্তানীর সুযোগ যাচাই করে সেটাকে কাজে লাগিয়ে দেশের বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি করেছেন এবং সেইসব নিম্নবিত্ত দেশত্যাগী তরুণ-যুবকেরা, যারা বসতবাটি বন্ধক রেখে হলেও প্রবাসে কর্মসন্ধানে গিয়েছেন এবং সেখান থেকে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহের রমরমা অবস্থাটা ধরে রেখেছেন। রাষ্ট্র পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়েছেন তাদের, কিন্তু রাষ্ট্রের বিকলাঙ্গ প্রশাসন নিজ উদ্যোগে আমাদের পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের তেমন সহজ কোনো অর্থনৈতিক উদ্যোগের সন্ধান দিতে পারেন নি।

আমাদের দুতাবাসগুলো আমাদের স্বদেশীপণ্যের প্রদর্শনী করছে না, আমাদের উৎপাদকদের ব্যক্তিগত নৈপূণ্যের স্মারক তারা সাজিয়ে রাখে না, যা দেখে সে দেশের মানুষ উৎসাহী হয়ে ভাববেএই দেশেই অনেক ধরণের কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব এবং আমাদের পেশাজীবীগণের দক্ষতার স্মারক দেখে তারা এখানে বিনিয়োগে কিংবা এখানকার পণ্য আমদানীতে আগ্রহী হয়ে উঠবে । বিদেশী দুতাবাসগুলো নিজেদের দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করে না বরং একই সাথে তারা সে দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং তাদের সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে, সেখানে তাদের স্বদেশী উদ্যোক্তাদের ব্রোশিওর সাজিয়ে রাখে, তাদের সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির প্রতিফলন ঘটায় তাদের দুতাবাসের সীমিত চৌহদ্দিতে। তারা নিছক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন বরং তারা দেশের ব্যবসায়ীদের মুখপত্র হিসেবেও অন্যান্য দেশে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন।

আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি, গত ৪০ বছরে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমেছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু আমাদের কৃষকেরা আমাদের খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও কৃষকেরা বঞ্চিত, তাদের কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ তুলে আনতেই তাদের নাজেহাল হতে হচ্ছে, ক্ষুব্ধ কৃষক উৎপাদিত শস্য-সব্জী বাধ্য হয়েই বিক্রী করছেন অল্পমূল্যে কিংবা ধ্বংস করছেন, রাষ্ট্র তাদের ক্ষতিপুরণ দিতে পারছে না। গ্রামপর্যায়ের বাজারের নিয়ন্ত্রন যাদের হাতে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাস কৃষকেরা, তাদের ভবিষ্যতভাবনা এইসব নিয়ন্ত্রকদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত।

অর্থনৈতিক বৈষম্য বঞ্চনা শ্রেণীকাঠামোর অবদান, শ্রেণীকাঠামোই নির্ধারণ করে দেয় কারা শুদ্র আর কারা অচ্ছুৎ হয়ে জীবনযাপন করবে। কারা ব্রাহ্মণ এবং কারা ক্ষত্রিয় হয়ে উঠবে এটা নির্ধারণ করে শ্রেণীকাঠামো, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রন এইসব ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-কায়স্থের হাতে, তারাই অধিকাংশ মানুষকে কোমল বানীতে এবং সহিংস আঘাতে নিয়ন্ত্রণ করেন।

তারাই নীতি-নৈতিকতার বানীপ্রসব করেন দিনে রাতে, তারাই একঘেয়ে একটানা রাজনৈতিক উদ্বেগ সম্প্রচার করেন। রাজনৈতিক উদ্বেগের সামষ্টিক সম্প্রচারের জোয়ার নিয়ে আসে বিভিন্ন জাতীয় দিবস।

সামগ্রীক উন্নয়নের ছবিগুলো ভ্রান্ত - ম্রিয়মান লাগে , প্রতিদিন সকালের রক্তমাখা নিউজপেপার দেখলে প্রশ্ন জাগে এমন নৃশংস স্বাধীন স্বদেশ কি আমাদের কাম্য ছিলো। রাষ্ট্রের নাগরিকদের সহনশীলতার মাত্রা নিম্নগামী, শুধুমাত্র গতকালই ঢাকা শহরে স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন দুইজন নারী, গেরোস্থালী বিবাদের জেরে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী, অন্যজনকে বিকলাঙ্গ করতে চেয়েছিলো কিন্তু ভুলে পা কাটতে গিয়ে উরু কেটে হত্যা করেছে। এক স্বামী তার শিক্ষাউৎসাহী স্ত্রীর হাতের কব্জি কেটে নিয়েছে, এক ভাই তার বোনকে খুন করেছে। সংবাদপত্রে এসেছে বলেই চোখে পড়লো এসব, সংবাদপত্রের অগোচরে কত নৃশংসতা ঘটে যাচ্ছে কে রাখে তার খবর?

প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ভবন রাষ্ট্রের খরচে আলোকসজ্জ্বায় সজ্জ্বিত হয়েছে, ছাদে দাঁড়ালেই দেখছি দুরে মিটিমিটি জ্বলছে আমাদের বিজয় দিবসের স্মরকগুলো কিন্তু বিজয়ের উৎসবকে ব্যঙ্গ করে ধলেশ্বরীতে ভাসছে ৮জন মানুষের লাশ, এরা সবাই গুপ্ত হত্যার শিকার, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বৈরিতায় নয় বরং হত্যাকান্ডগুলোর কোনো বৈধ্য ব্যাখ্যা দিতে পারছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কিংবা পুলিশের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগন। স্বাধীনতার আগে আগে গুপ্ত হত্যার শিকার হয়েছিলেন অসংখ্য পেশাজীবী মানুষ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করেছি আমরা, কোনো বৈরিতা না থাকা স্বত্ত্বেও গুম হওয়া ৩০ জনের সাম্ভাব্য মৃত্যুর দায়ে আমরা কাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের করবো? অসচেতন, জনবিরোধী রাষ্ট্র পরিচালকবৃন্দের বাইরে অন্য কোনো নামের তালিকা কি আছে?

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


বাংলাদেশ

রাসেল ভাই, নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসটা কপি পেস্টের লোভ সামলাতে পারলাম না
___
ক্ষমা করো প্রিয় বাংলাদেশ,
বিজয়ের চল্লিশ বছর পার হবার পরেও তোমার বুকে স্বাধীনতা বিরোধী অপচ্ছায়া গুলো আর তাদের আদর্শ ধরে থাকা পাপগুলোকে ঘুরে বেড়াতে দিচ্ছি আমরা...
ক্ষমা করো দুঃখিনী মা আমার,
বিজয়ের চল্লিশ বছরেও তোমার জীর্ণ শাড়িটা বদলে দিতে পারিনি বলে...
ক্ষমা করো প্রিয় জন্মভুমি,
বিজয়ের চল্লিশ বছরেও আমরা ব্যক্তিগত আর গোষ্ঠীগত কামড়া-কামড়িতে এতই ব্যাস্ত, যে তোমাকে নিয়ে ভাববার অবকাশ আমাদের হয় নি...
তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া এই অক্ষমের আর কোনোই ক্ষমতা নেই...
__

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


Star Star Star Star Star

লীনা দিলরুবা's picture


যা হবার কথা ছিলো কিছুই যে হয়নি তা হয়তো নয়, কিন্তু সর্বাংশে সত্য বাণী হলো, এই বাংলাদেশ আমরা চাইনি।

আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্ণধারেরা কী এই লেখাটা পড়ে দেখবেন? তাদের অন্ধ-বধির হয়ে যাওয়া ইন্দ্রিয় উপেক্ষা করে এই লেখাটি কী তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে?

টুটুল's picture


আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্ণধারেরা কী এই লেখাটা পড়ে দেখবেন? তাদের অন্ধ-বধির হয়ে যাওয়া ইন্দ্রিয় উপেক্ষা করে এই লেখাটি কী তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে?

এইটা কোন ভাবেই সম্ভব না

বিষাক্ত মানুষ's picture


কিচ্ছু বলার নাই ...

তানবীরা's picture


অসচেতন, জনবিরোধী রাষ্ট্র পরিচালকবৃন্দের বাইরে অন্য কোনো নামের তালিকা কি আছে?

অতিথি জালাল's picture


সত্য কথার ভাত নাই! অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ! আমাদের অতীত খারাপ ছিল, বর্তমান খারাপ যাচ্ছে, ভবিষ্যত নিয়ে আর কি বলব।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.