সামাজিক সংস্কার
মানস গঠন যেমনই হোক না কেনো, চুড়ান্ত বিবেচনায় শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়ে উঠবে কি না তা নির্ধারণ করে সামাজিক বাস্তবতা। উদারনৈতিক যৌক্তিক মানুষেরাও সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারে
প্যারিচাঁদ মিত্রের ''আলালের ঘরের দুলাল'' আমার উপন্যাস মনে হয় নি, যদিও উপন্যাসের কোনো নির্ধারিত কাঠামো নেই, বিষয়বস্তু নেই, কিন্তু তারপরও " আলালের ঘরের দুলালকে ঠিক উপন্যাস বলা যাচ্ছে না, বরং এই ধারাবাহিক লেখাটিতে এক ধরণের সামাজিক সংকটকে চিহ্নিত করে সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ শ্লেষ আছে।
উপন্যাস হিসেবে " আলালের ঘরের দুলাল" বিশ্লেষণ কিংবা ঔপন্যাসিক হিসেবে "প্যারিচাঁদ মিত্র''কে যাচাই করতে যাওয়ার মতো বোদ্ধা হয়ে উঠি নি, আমি বরং আমার অনুধাবনটুকুই বলি, ডি রোজারিও'র শিষ্যদের ভেতরে অনেকেই উত্তাল ত্রিশে( এ ক্ষেত্রে উনবিংশ শতাব্দীর তিন ও চার এর দশক) প্রচলিত সমাজকাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।
ডি রোজারিও র শিক্ষা কিংবা আলোচনা প্রক্রিয়া বর্তমানের স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কাঠামো ও শিক্ষণ প্রক্রিয়ার চেয়ে ভিন্ন ছিলো, সেখানে নিয়মিত আলোচনা ও পর্যালোচনা হতো, পাঠ্যপুস্তক পড়ে গুটিকয় প্রশ্ন আত্মস্থ করার বদলে পুস্তকের বক্তব্য অনুধাবনের দিকেই বেশী মনোযোগী ছিলেন তিনি, সুতরাং প্রচলিত শ্রেণীকক্ষের শিক্ষা নয় কিংবা এককভাবে শিক্ষকের একঘেঁয়ে উপস্থাপন নয় বরং ছাত্ররা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো আলোচনা করতো, নিজেদের ভেতরেই তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতো। শিক্ষকের একরৈখিক বিষয়বস্তু উপস্থাপনের চেয়ে সে পদ্ধতিতে বিষয়বস্তুকে অনেকভাবে যাচাই করার সুযোগ ও সম্ভবনা থাকতো।
বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজের সূচনায় রোজারিও'র শিষ্যদের যৌক্তিক মানসগঠনে ডি রোজারিও'র শিক্ষাপদ্ধতি বড় অবদান রেখেছিলো তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। যৌবনের উদ্দীপনায় ডি রোজারিও'র শিষ্যরা তৎকালীন হিন্দু সমাজের প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধাচারণ করলেও তাদের ভেতরের সংস্কার একেবারে বিলীন হয়ে যায় নি, তারা পরবর্তীতে পুনরায় ধর্মের শরণ নিয়েছিলেন, উদারনৈতিক থেকে একেবারে সাম্প্রদায়িক হয়ে গিয়েছিলেন।
প্যারিচাঁদ মিত্র যৌবনে অতিমাত্রায় ধর্ম সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেও পরবর্তীতে কর্মজীবনে ধীরে ধীরে হিন্দুয়ানীর দিকে ঝুঁকেছেন, সামাজিক সংকটের প্রতি তার তীব্র মনোযোগ হয়তো ছিলো, তিনি সমাজের সংকটি চিহ্নিত করেই দায়িত্ব সমাপ্ত হয়েছে এমনটা বোধ করেন নি, বরং তার সমাধানের কথাও তাকে ভাবতে হয়েছে এবং ঔপনিবেশিক কাঠামোতে অন্য কোনো গ্রহনযোগ্য সমাধান খুঁজে না পেয়ে তিনি ধর্মীয় অনুশাসঙ্কেই সমস্যা সমাধানের অন্যতম পন্থা হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
সামাজিক সংকটের কারণ সমাজের অর্থনৈতিক অব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক শোষণ তা তিনি হয়তো মেনে নিতে পারেন নি, সিপাহী বিদ্রোহের পরপর বিষয়টা সেভাবে পঠিত হয় নি আদতে। তা ছাড়া তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ঔপনিবেশিক শোষণের অবদান ছিলো সুতরাং এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো নির্বোধও হয়তো তিনি ছিলেন না।
সময় হিসেবে ডি রোজারিও'র শিষ্যদের হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শতবর্ষ পরে পূর্ব বাংলায় একই রকম সামাজিক বিদ্রোহের আগুণ জ্বালাতে চেয়েছিলো শিখা গোষ্ঠী। তাদের সময়ে মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের বীজটা কেবল বেড়ে উঠছে আর ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের চারা ধীরে ধীরে বর্ধিত হচ্ছে। এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে পরিমাণ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠবার সম্ভবনা ছিলো তার সবটুকু বৈরিতায় হয়তো শিখা গোষ্ঠীর আন্দোলনটি মুখ থুবড়ে পরে। ৫ বছরে ৫টি বার্ষিক সংকলনের পর এই শিখা গোষ্ঠীর সদস্যগণ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছেন।
ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার মাত্রা প্রবল ছিলো নিঃসন্দেহে, কাফির সন্দেহে শিখা গোষ্ঠীর একজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ঢাকা নবাবের দরবারে, সেখানে তিনি ' ভবিষ্যতে ধর্মবিরোধী আর কিছুই লিখবো না" মুচলেকা দিয়ে জীবন ফিরে পেয়েছিলেন। যদির ঊদার নৈতিক মতবাদের বাইরে তেমন তীব্র ধর্মবিরোধী কিছু ছিলো না সেসব প্রবন্ধে, নিবন্ধে, এবং অধিকাংশ লেখকের নামের সাথেই মৌলানা শব্দটি সংযুক্ত ছিলো, এরপরও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার আগুণ থেকে তারা মুক্ত থাকতে পারেন নি।
উনবিংশ শতাব্দীর উদারনৈতিক মানবতাবাদী মতবাদ এর প্রবক্তাগণ পরবর্তীতে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী মানসিকতা ধারণ করেছিলেন কিন্তু বিংশ শতাব্দীর উদারনৈতিক মানবতাবাদীগণ তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতায় সমাজ সংস্কার আন্দোলন থেকে পিছু সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাদের সমাজ সংস্কার ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিলো।
শিক্ষাপাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এনে সেক্যুলার মানসের মানুষ নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছেন সরকার, সমাজ কাঠামোর বর্তমানের বাস্তবতায় এখানে সেক্যুলার বিবেচক মানুষ তৈরি হওয়াটা কিছুটা অসম্ভব। কিছু সংখ্যক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদ দিলে এখানে সেক্যুলার মাত্রই অতিমাত্রায় ধর্মবিদ্বেষী এবং অধিকাংশই ধর্মীয় বিধানকেই নিজের জীবন যাপনে শুদ্ধতার মাত্রা নির্ধারণের মাণাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ধর্ম অনুসরণ করে আরও ভালো মানুষ হয়ে ওঠা যায় বিশ্বাসটুকু এখনও প্রবল কারণ আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এখানে স্বাধীন বিকাশের সম্ভবনা কিংবা অর্থনৈক ভাবে সচ্ছল হয়ে উঠবার পথে অনেক রকম অযাচিত বাধা আছে, সেসব সংকট নিরসনের দায়িত্ব ছিলো রাষ্ট্রের, তবে রাষ্ট্র মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলেই তাবিজ-কবজ-ঘুষ আর তোষামোদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ খুঁজছে মানুষ। এখানে দৈবের প্রতি বিশ্বাস প্রবল হওয়ার সকল সম্ভবনাই বিরাজ করছে সুতরাং শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সেক্যুলার মানুষ নির্মাণের স্বপ্ন সফল হওয়ার সম্ভবনা ক্ষীণ।
ভালো কাজের জন্যও মানুষ প্রতিদান চায়, স্বীকৃতি চায়, মৃত্যুপরবর্তী জীবনে প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশায় যারা ভালো কাজ করছেন পাশের বাসার মানুষটা না খেতে পেয়ে মরে গেলেও তাদের ভেতরে গ্লানিবোধ তৈরি হয় না, নিয়ম মেনে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করলে তিনি নিশ্চিত পরলৌকিক পুরস্কার পাবেন। আর যারা মানুষের মৃত্যুতে গ্লানিবোধ করেন তারা স্বার্থপর ধার্মিকের আচরণকেই ধর্ম ধরে নিয়ে ধর্মকে আক্রমণ করছেন। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে এই বোধটুকু যদি ধর্ম তৈরি করতে না পারে তাহলে ধর্মীয় শিক্ষাপদ্ধতিতে বিশাল গলদ আছে।
মানুষ ভাবছে না কারণ বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতায় মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দানের রেওয়াজ নেই। আমাদের সমাজ এখনও মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ। প্রাথমিক আন্দোলনটা বরং মানুষের সামাজিক স্বীকৃতির জন্যে হওয়া প্রয়োজন।
মানুষকে মানুষ না ভেবে ধর্মাশ্রয়ী, ধনাশ্রয়ী বিভাজনে বিভাজিত রাখবার সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন কিংবা সচেতনতা তৈরির রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করাটা এক ধরণের প্রয়োজনীয় আন্দোলন এখন।





আরো ক'বার পড়ে মন্তব্য করবো ।
একটা কনফিউশন রাসেল ভাই
প্যারিচাঁদ মিত্র যৌবনে অতিমাত্রায় ধর্ম সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেও পরবর্তীতে কর্মজীবনে ধীরে ধীরে হিন্দুয়ানীর দিকে ঝুঁকেছেন
বোল্ড করা অংশ দুইটা একই অর্থবাহী নয় কি?
ধর্ম সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটাই কি হিন্দুয়ানীর দিকে ঝুঁকে পড়া বোঝায় না?
আমি কনফিউজড...
আমিও কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত হইলাম বলা যায়, "ধর্মীয় সংস্কার" বললে আরও স্পষ্ট হতো বিষয়টা, তবে ডি রোজারিও'র শিষ্যদের লড়াইটা ছিলো হিন্দুয়ানী সমাজ সংস্কারের বিরুদ্ধে, তারা ব্রাহ্মাণ্যবাদের আচার-সংস্কার নিয়ে মশকরা করেছে, গরুর মাংসের হাড় ছুড়ে মেরেছে প্রতিবেশীর উঠানে, মধুসুধন দত্তের জীবনি, কিংবা সেই সময় পড়লে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হতো। সেই জায়গা থেকে একেবারে পিউরিটান ধার্মিক হয়ে উঠাটা একেবারে ইউ টার্ন মারার মতো। শেষ বয়েসে প্যারিচাঁদ মিত্র আচারনিষ্ঠ হিন্দু হয়ে উঠেছিলেন এবং অন্যদের এইসব আচরণকে গ্রহনযোগ্য ভাবতে পারেন নি।
ওহো! আমারই বুঝার ভুল হইছিলো। ধর্ম ও সংস্কার বা ধর্মীয় সংস্কার। আমারই বুঝার ভুল...
প্যারিচাঁদ মিত্র স্কুল জীবনে ডি রোজারিও'র শিষ্য ছিলেন। তাদের কীর্তিকলাপের বর্ণনা আছে সুনীলের সেই সময়ে। সেটা ছিলো হিন্দুয়ানী সমাজ সংস্কার ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ। কিছু ভ্রান্তিও ছিলো, যৌবনের উদ্দামতায় কিছু অপরাধও হয়তো হয়েছিলো কিন্তু শেষ বয়েসে আচারনিষ্ঠ হিন্দু ভদ্রলোক হয়ে ওঠা প্যারিচাঁদ মিত্র তখন হিন্দুয়ানী সমাজ সংস্কারের রক্ষকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
প্রথম যৌবনে তিনি হিন্দুয়ানী সমাজ সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন এবং শেষ জীবনে তিনি সে সংস্কার অক্ষুন্ন রাখতে প্রাণপাত করেছেন। একেবারে ইউটার্ন।
এরকম ইউটার্ন তো হরহামেশাই দেখা যায়।
দ্বৈতনীতি মানুষের সহজাত। বেশীরভাগই এর থেকে বেরুতে পারেনা। হজ্ব করেন, নামাজ-রোজা করেন আবার চুরিও করেন।
কঠিন সত্য কথা বললেন।
যেটা বুঝলাম- যৌবনের আদর্শ বুড়াকালে ধরিয়া রাখা কঠিন! বঙ্কিম সম্পর্কে কী উপসংহার আপনার?
আমার পাঠ কিঞ্চিৎ ভিন্ন ছিলো, বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতা মানুষের চৈতন্যের উপরে প্রভাব ফেলে আর সে প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের ভাবনা পরিবর্তিত হয়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিষয়ে বেশ অনেকেই মনে হয় আলোচনা করেছেন, তার উপন্যাস পড়ে আমার তাকে গোঁড়া হিন্দু মনে হয় নি, অবশ্য যে সময়ে পড়েছিলাম সে সময়ের সাথে এই সময়ের তফাত আছে।
বঙ্কিম নতুন করে পড়ে উপলব্ধি বুঝতে হবে এখন।
যৌবনের আদর্শ ধরে রাখা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। শিখা গোষ্ঠীর কাজী মোতাহার হোসেন, আব্দুল ওদুদ কিংবা অন্যান্যরা তাদের প্রগতিশীল ভাবনা ধরে রেখেছিলেন, তারা মনবতাবাদী ভাবনাবিচ্যুত হন নি। কিন্তু তাদের এই ধারণা রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় প্রচারণার বিরুদ্ধচারীতায় ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে। ওদুদ সম্ভবত সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং পাকিস্তান আন্দোলনের সাম্ভাব্য ভবিষ্যত বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থান এমন কিছু অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। সেটা ২৪ বছরের ভেতরেই বাস্তব হয়েছে।
এই সমাজের সংস্কার সুদূর পরাহত। সংস্কার মানেই প্রগতির পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। ধর্ম আর প্রগতিশীলতা বিপরীতার্থক চিন্তার ধারক। দুটো একসঙ্গে যায় না। এই সমাজকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে ধর্ম, সংস্কার হবে কিভাবে?
কামাল ভাই বাংলাদেশীদের কি ধার্মিক বলা যায়? "ধার্মিক" বাংলাদেশীদের বরং শ্রদ্ধার চোখে দেখা প্রয়োজন। আমাদের ধর্মাচ্ছন্নতা আমাদের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেয়েছি, ধর্ম উদাসীন ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের অসাম্প্রদায়িক মানস অনেকাংশেই বাঙালী সংস্কৃতির একটা শক্তিশালী অংশ।
গ্রামভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক সহাবস্থান এবং একই রকম প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈরিতায় গ্রাম পর্যায়ে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিলো পূর্ব বঙ্গে পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর সেটা কিঞ্চিৎ প্রতিরোধের মুখোমুখী হলেও দিব্যি সম্প্রীতি বজায় ছিলো।
ধর্মকে সামাজিক মানস বিভক্তির তরবারী করেছে আমাদের স্বার্থান্ধ রাজনীতি। সম্পদের লোভে সংখ্যালঘু নির্যাতনের উপলক্ষ্য হিসেবে এইসব বাড়তি যন্ত্রনা তৈরি হয়েছে। কমরুদ্দীন আহমেদ ১৯৭০ সালে যে বক্তব্য রেখেছিলেন আমার ধারণা সেটা এক ধরণের সত্য বিশ্লেষণ- শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত ভাবেই বাঙালীর ধর্ম উদাসীন সমাজ মানসটিকে বলিষ্ঠ করবে। আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্জনের পালকে অনেক গালভরা বুলি থাকলেও আমরা এখনও শিল্পোদ্যোগী রাষ্ট্র নই, আমাদের নগরায়ন পীচ ঢালা পথের সাথে প্রত্যন্ত গ্রামের গহীনে ঢুকে গেলেও সেখানে নাগরিক গড়ে উঠতে পারে নি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার অভাবে।
না, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে ধার্মিক বলা যায় না। আপনার সঙ্গে এ ব্যাপারে আমি একমত। আমি আমা 'রাজনীতির দর্শন ও কর্মসূচি' প্রবন্ধে ধর্মপন্থী দলগুলোর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা না থাকার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যা লিখেছিলাম, এখানে তার খানিক অংশ পুনরুল্লেখ করলে আশা করি বিরক্ত হবেন না -
দেখতেই পাচ্ছেন, জনগণ নিয়ে আমার কোনো দুঃশ্চিন্তা নেই। সমস্যা হলো, সমাজের সংস্কার-টা কিন্তু সাধারণত তারা করে না , ওটা সাধিত হয় শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত-সচেতন-প্রজ্ঞাবান কিছু মানুষের দ্বারা। দুঃশ্চিন্তার কারণ হলো এই, আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার ভেতরে এমনকিছু ব্যাপার আছে যে, 'শিক্ষিত' হওয়া মাত্র শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মানুষ। নিজের বাপ-দাদার নাম-পরিচয়ও অস্বীকার করতে চায়। এই শেকড়চ্যুত-উন্মুল 'শিক্ষিত'রা একসময় তাদের শেকড় খুঁজে ফেরে ধর্মের ভেতরে আর ক্রমশ প্রগতির পথ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এই হলো সাধারণ চিত্র। সংস্কারটা তাহলে করবে কে?
ভাল চিন্তা।
মন্তব্য করুন