শৈশব
করোতোয়া থেকে আত্রাই হয়ে দিনাজপুরে ঢুকতে না ঢুকতেই নদীটাকে আদর করে সবাই ডাকে কাঞ্চন, পোশাকী নাম পূনর্ভবা নদ, সে নদীতে শৈশবে প্রচন্ড গরমে মাঝে মাঝে দাপাদাপি করতে যেতাম। তখনও কাঞ্চনের এ পার আর ওপারের মাঝের পুরো রেল ব্রীজের নীচেই বয়ে যেতো নদী। শীতে গতরে শীর্ণতা এলে হঠাৎ করেই যুবতী থেকে চঞ্চল কিশোরী হয়ে যেতো কাঞ্চন।
সেইসব শীতের জবুথুবু বিকেলের ম্লান আলোয় বিষন্ন হলে আমি একা সেই কিশোরীর সাথে একক প্রণয়ে মেতে হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম অনেকটা পথ। এক হাঁটু পানির ভেতরে প্যান্ট গুটিয়ে নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে দু চারটা গ্রাম, গ্রামের হাট ভাঙা আলো পেরিয়ে আরও দুরের কোনো ন্যাড়া মাঠের ধানের গোছায় বসে সিগারেটের ধোঁয়া আর কুয়াশার মাঝে লুকিয়ে থাকতাম কিছুক্ষণ।
সেইসব সন্ধ্যায় কুয়াশার আড়াল ভেঙে বরফের মতো ফিকে সাদাটে চাঁদ , তার ঠান্ডা আলোয় অপরিচিত গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসতাম। আমার কম্পাস ছিলো না, হাতে কোনো মানচিত্র ছিলো না, দূরে নদীর বুকের রেলব্রীজকে নিশানা করে মাইলের পর মাইল পারি দিয়ে ঠিকই ফিরে আসতাম।
যখন সেই নদীর পেটের মধ্যে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেললাম একদিন বুঝলাম নদীটার আনুষ্ঠানিক মৃত্যু হয়েছে, এখন নদীর বুকে জমে থাকা বালি সরিয়ে নীচের মাটিতে ধান চাষ হবে, এখানেও মহল্লা গড়ে উঠবে, মৃত নদীর বুকে বসতি বানিয়ে থাকবে নিরন্নের দল আর ভাড়া দেবে ইউপি চেয়্যারম্যানকে।
আত্রাই, ইছামতি, টাঙ্গন, ঘাঘটের বুকে দিব্যি ধান আর সরিষাক্ষেত হয়েছে। নদী কিংবা খাল কিংবা খাঁড়ি সব শুকিয়ে যাচ্ছে , ১৫ ফুট বহরের নদীর দুইপার বাঁধিয়ে সুন্দর উদ্যান বানিয়ে রেখেছে যারা তাদের কেউই হয়তো সে উদ্যানে বসে না, কখনও গ্রীষ্মের দুপুরে কোনো বহিরাগত এসে সে উদ্যানে বসে গ্রীল আর বারবিকিউ করে, যেমনই বহর হোক, নদী ঠিকই বেঁচে আছে মানুষের ভালোবাসায়। শুধু আমাদের নদীগুলো মরে যায়, আমাদের শৈশব আর কৈশোরের সব স্মৃতি নদীর পাশের শ্মশানে দাহ করে আমরা ফিরে এসেছি নগরে। আমাদের শৈশবে ফেরার তাড়া নেই।





বিষণ্ণতার সুরটা বড় বেশী বুকে লাগলো।
শুধু ফেলে আসা শৈশব বলে বা নদীর মৃত্যু বলেই না, কেমন একটা উদাসী বিষণ্ণতায় ভরা লেখাটা...
লেখাটা পড়তে পড়তে গানটা মনে পড়ল
নদীর কূল ছিল না জল ছিল না
ছিল শুধু ঢেউ
আমার একটা নদী ছিল জানলো
নাতো কেউ
এইখানে এক নদী আছে
জানলো নাতো কেউ
আহা! আমাদের নদীগুলো...
আপনার শব্দের গাঁথুনি চমৎকার। আমি সবসময় শহরে বড় হয়েছি। নদী সম্পর্কে জানাশোনা মূলত লেখা পড়ে পড়েই। তবে বিষয়টা আপনার মতো নাহলেও অনেকখানি অনুভব করতে পারি।
ধন্যবাদ সবাইকে।
আহা! আমাদের নদীগুলো...
আপনার ন্যারেটিভ এত্ত চমৎকার! অল্প কয়েকটা ডিটেইলে একটা মুড তৈরী হয়ে গেছে। শেষ বাক্যটা এত সোজাসাপ্টা! -এখানে লোভ সামলানো টাফ।
আগে লঞ্চে গ্রামে যাওয়া হতো। ইদানিং অনেক মিস করি লঞ্চ ভ্রমণ।
মন্তব্য করুন