প্রবাহমানতা
অনুভব ভীষণ রকম ব্যক্তিকেন্দ্রীক, যদিও সাড়ে ছয় শো কোটি মানুষের পৃথিবীতে একক, অনন্য, অসাধারণ, অভূতপূর্ব কোনো অনুভব গাণিতিক বিবেচনায় অসম্ভব এরপরও প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অনুভবটুকু তার কাছে এমনই অনন্যঅসাধারণ।
একটি সামষ্টিক ক্ষেত্রে নিশ্চিত বলা যায় প্রতিটি অনুভবই অসংখ্য মানুষ উপলব্ধি করেছে, একটি নির্দিষ্ট সমাজে ভাষিক সীমাবদ্ধতায় সেইসব অনুভুতি, উপলব্ধির একান্ত উচ্চারণগুলোও প্রায় ক্ষেত্রেই একই রকম শব্দগুচ্ছ দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে, একই রকমের সসীম বাক্য দিয়েই সেসব অনুভব সংজ্ঞায়িত হয়েছে কিন্তু এটুকু মেনে নেওয়ার কষ্টও ব্যক্তি স্বীকার করতে নারাজ।
যেসব অনুভব বাক্যে প্রকাশ অযোগ্য, শুধুমাত্র নিখাদ শাররীক , কিংবা ভাষিক সীমাবদ্ধতায় ব্যক্তি সেসব প্রকাশ করতে অক্ষম সেসব অনুভুতিও কেউ কেউ নিজের মতো বাক্যে প্রকাশ করেছে, পরিপার্শ্বিক থেকে এমন ভাবেই আমাদের অনুভব উপলব্ধিগুলোকে আমরা সংজ্ঞায়িত করতে শিখেছি।
সেখানে প্রতিটি পরিস্থিতিতে একই রকম ভাবেই বিভিন্ন মানুষ আটকা পরে আছে, প্রত্যেকেই ব্যক্তিকেন্দ্রীক অনুভব এর কারণে সেসবকে নিছিক ব্যক্তিগত সংকট কিংবা ব্যক্তিগত উপলব্ধি হিসেবে চিহ্নিত করছে, একটি নির্দিষ্ট সমাজে প্রতিটি একক ব্যক্তি একই রকম পরিস্থিতিতে প্রায় একই রকমের উপলব্ধি ধারণ করে, প্রয়োজন সেসব পূর্বেই চিহ্নিত করতে পারা। যদি সেসব অনুভব পূর্বেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয় তাহলে সেসব অনুভবের প্রেক্ষিতে কি করণীয় সেটাও পূর্বেই নির্ধারণ করা সম্ভব।
ব্যক্তিগত সংকট কিংবা উপলব্ধিগত অস্থিরতাগুলো একই রকম ভাবেই মানুষকে দীর্ণ করে, যদি পূর্বেই জানা থাকে সামনের কোনো বাঁকে এমন ধরণের সংকট অপেক্ষা করছে, অদূর ভবিষ্যতে এমন ধরণের সংকটের মুখোমুখি হতে হবে, কিংবা এখনও পর্যন্ত অব্যক্ত, অনির্বচনীয় যেসব সংকট কিংবা অনুভবের ভাষা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে সেসব অতীতের অন্য কারো অভিজ্ঞতা থেকে আঁচ করা যায়, সংকট মোকাবেলা অনেক বেশী সহজ হয়ে যায়।
সমাজবিচ্যুত কোনো ব্যক্তি হয়তো ভিন্ন রকমের অনুভুতি উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু সমাজের সাথে ব্যক্তির যোগাযোগের জায়গা থেকে সমাজ যেভাবে তার ভাবনা ও মূল্যবোধ ব্যক্তির ভাবনায় প্রবিষ্ট করে সেখানে অন্য রকম উপলব্ধির তেমন বড় পরিসর আদতে নেই। একই রকমের ঘটনাগুলো সমাজে পুনরাবৃত্তি হয় তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি প্রতিটি অনুভবই প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে , প্রথম প্রেমে পরা, প্রথম বিচ্ছেদ, প্রথম মাতৃত্ব, প্রথম মৃত্যু, প্রথম একাকীত্ব এবং প্রথম সংঘবদ্ধতার অনুভবগুলো চিরায়ত বর্তমান কিন্তু ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক হতে পারে।
যত রকমের অঘটনকল্পন সম্ভব সমাজে অন্য কোনো না কোনো ব্যক্তি সেসব অঘটনের কোন না কোনোটার মুখোমুখি হয়েছে এবং নিজের মতো করে সেসব সংকটের মোকাবেলা করেছে। পিতার কাঁধে সন্তানের দুর্বহ লাশের ভার বহন করেছে এমন অনেক পিতাই হয়তো পৃথিবীতে বর্তমান, একটি নির্দষ্ট সমাজেও এমন অনেক মানুষকেই পাওয়া যাবে যারা এই কষ্টকর অনুভুবটুকু নিজের ভেতরে ধারণ করেছেন। প্রথম প্রেমের মাদকতাময় প্রহরগুলো এলেমেলো কাটিয়ে দেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন অন্তত হাজার ছাড়ায়, কিন্তু এরপরও মানুষ ভাবে এইসব আমার মতো অন্য কেউ অনুভব করে নি কোনোদিনও। আমিই এর মর্মার্থ উপলব্ধি করলাম, আমারটার মতো অন্য কোনো কিছু কখনও ঘটে নি।
মানুষ আসলে খুব সাধারণ, জীবন আরও সাধারণ একটি আনন্দময় কিংবা বিষদগ্রস্ত দুর্ঘটনা। আমার শরীরের কয়েকশত কোটি অণু, কয়েকশত কোটি কোষ, এর যাবতীয় বিপাকীয় কার্যক্রম, যা আমাকে সচল রেখেছে, বিভিন্ন রকমের অনুভব উদ্দীপনা দিচ্ছে আদতে খুব সামান্য কয়েকটি রাসায়নিক বিক্রিয়া। এইসব রাসায়নিক বিক্রিয়ার সামষ্টিক প্রতিক্রিয়ায় আমরা বিভিন্ন রকম আচরণ করতে বাধ্য হই। আমাদের শরীক অনেক ধরণের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করে, আমরা সেসব প্রতিক্রিয়াকে এলার্জি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি, এই সাড়ে ছয়শ কোটি মানুষের ভেতরে সাড়ে ছয় হাজার মানুষ পাওয়া যাবে যাদের ফুলের গন্ধে ভীষণ রকম এলার্জি, এমন লাখখানেক মানুষ পাওয়া যাবে যাদের গায়ে স্বর্ণ স্পর্শ্ব করলে তারা মৃত্যুবত যন্ত্রনা পায়।
আমাদের শরীরের কয়েক কেজি অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, কার্বন, সালফার, নাইট্রোজেন, আর অন্যান্য পরমাণুগুলো বিভিন্নভাবে সংযুক্ত হয়ে আমাদের নির্মাণ করেছে। এদের গঠনগুলোতে তেমন বড় মাপের কোনো তফাত নেই, এদের নিজস্ব কোনো স্মৃতি নেই, আমার শরীর থেকে অন শরীরে প্রতিস্থাপিত হলেও এরা অতীত শরীরের অনুভব কিংবা স্মৃতি ধারণ করে না। রাসায়নিক উদ্দীপনায় তারা একই রকম আচরণ করে।
আমি যা কিছু গ্রহণ করছি তার সবটুকুই কোনো না কোনো সময় অন্য দেহে লীন ছিলো, অদুর ভবিষ্যতে সেসব আবারও অন্য কোথাও প্রবিষ্ট হবে, এই অবিরাম প্রবাহাণতাই জীবন। আমাদের শরীরের আণবিক কাঠামো প্রতিনিয়ত পাল্টাবে, মৃত্যুতে হয়তো কিছু মৌল পুনরাবৃত্ত আণবিক সজ্জ্বা বিনষ্ট হবে চিরতরে, সেই আণবিক সজ্জ্বা কিংবা ডিএনএপ্রোটোটাইপ অন্য কোথাও প্রতিষ্ঠাপনের লড়াইটুকু লড়ে যাচ্ছি আমরা সবাই।





মানুষ আসলে খুব সাধারণ, জীবন আরও সাধারণ একটি আনন্দময় কিংবা বিষদগ্রস্ত দুর্ঘটনা।
জীবন কেবলমাত্র থিওরী নয়। বুকিশ ধারণা নিয়ে মানুষের মাপকাঠি রচনা করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, মানুষ...জীবন... ব্যাপক-আরো বিশাল কিছু।
মানুষের সামগ্রীক জীবন নিয়ে কোনো ভবিষ্যতবানী দেওয়ার চেষ্টা করা হয় নি আসলে, আমাদের প্রতিক্রিয়া এবং অনুভবের সসীমতা বিষয়ে একটা বয়ান দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বলবার চেষ্টা করেছি আমাদের অনুভব উপলব্ধিগুলো সসীম। সেখানে অনন্য অনুভব গাণিতিক বিবেচনায় প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়।
ভালোবাসা একটা অনুভব,
মানুষ স্নেহ-ভালোবাসা-মোহ এবং শ্রদ্ধার ভেতরের তফাতটুকুও সব সময় সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা কিংবা উপলব্ধিগত সীমাবদ্ধতায় স্নেহ,ভালোবাসা, প্রেম, মোহ, শ্রদ্ধা একই রকম প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত হয় অধিকাংশ সময়ে। উপলব্ধি তৈরি করে আমাদের ভাষা, কিংবা অন্য কারো প্রকাশিত উপলব্ধি যখন আমরা নিজেদের ভেতরে প্রবিষ্ট করি, যেসব অনুভবের অনুরণন শুনতে পাই, সবই ভাষার কারসাজি, সেখানে শব্দের সীমাবদ্ধতা আছে, একই ভাবে সংজ্ঞা আর উপলব্ধির ক্ষেত্রেও এক ধরণের সসীমতা আছে।
প্রতিটা মানুষের মনস্তত্বতো একদমই আলাদা, নানান অবস্থায় প্রতিক্রিয়াও ভিন্নতর হয়। তাই যতই সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে করনীয় পন্থা পূর্বনির্ধারিত করা হোক না কেন, তা কি কার্যকরী হবে? মনে হয় না।
একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কি কি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে তার একটা তালিকা তৈরি করলে দেখা যাবে আমাদের প্রতিক্রিয়াগুলো সসীম। সেই প্রতিক্রিয়াগুলোর ভেতরে কোনগুলো কার্যকরী প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশিত হবে সেসবের সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি করা সম্ভব।
ব্যক্তি মানুষ এই সসীম সংখ্যক প্রতিক্রিয়াগুলোর যেকোনো একটি প্রকাশ করবে, কে কোনটি প্রকাশ করবে সেটা পূর্বেই নির্ধারণ করা সম্ভব না, এই বিচ্যুতিটুকু বাদ দিলে দেখা যাবে খুব নিশ্চিত ভাবে হয়তো খুব সল্পসংখ্যকপ্রতিক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি আমরা চারপাশে দেখি।
আমারো আজকাল প্রায় মনে হয় স্থান কাল ভেদে বেশির ভাগ মানুষই একই পরিস্থিতিতে একই রকম আচরন করে।
লেখাটা ভাল লেগেছে
জীবন সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক ব্যাপক কিছু বলতে হবে! আমি শুধু বলি আমার উপলব্ধির কথা------
হ্যাঁ! আমিও জন্মেছি। এই জন্ম দিয়েছে আমার অস্তিত্বকে খোঁজার সুযোগ। আমি স্বপ্ন দেখি, সে তো আমি জন্মেছি বলেই। আমার জন্ম আমাকে দিয়েছে অনুভূতি, তাইতো আমি কাঁদতে জানি...হাসতে জানি! আমি আমার খেয়ালে ভেসে বেড়াই, বৃষ্টির শব্দ শুনি। আমি আরো শুনি মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি! আমার জন্মই আমার জন্য নিয়ে আসবে মৃত্যুর কঠিন বারতা! সবার জন্যও তাই-----
কবিতার মতোন লাগলো তোমার এই সামাজিক কনফেশন নোটটারে...
মন্তব্য করুন