ইউজার লগইন

বিশ্বাস

হয়তো একটি মুহূর্তের স্কেচ এসব কিছুই, সে মুহূর্তে সবাই পরবাসী, গৃহের অন্তরালে, পলাতক জীবনযাপনে সবাই কোনো না কোনো পক্ষ বাছাইয়ের লড়াইয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন, প্রতেকের ভেতরেই বিভিন্ন রকমের সংশয় ছিলো, কিন্তু দেয়ালে ঠেকে যাওয়া পিঠ আর সামনে আগুণ, দেয়াল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া কিংবা আগুণে ঝাপিয়ে পড়ার এই ভাবনার দ্বৈরথে অনেকেই আগপাশ বিবেচনা না করেই আগুণে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। আমি সে সময়ের পরের প্রজন্ম, আমার যাবতীয় রসদ আত্মজীবনির পাতা থেকে খুঁজে নেওয়া, এর সাথে ১৪ আনা কল্পনা মিশিয়ে একটি সময়ের ভাবনা লিখছি সে সময় আমার অপরিচিত এবং আমার বেড়ে ওঠা শৈশবের সাথে যে সময়ের কোনো মিলমিশ নেই।

------------------------------------------------------------------------------------------------------
-------------------------------------------------------------------------------------------------------

এলুমুনিয়ামের কাণাউঁচু থালায় ভাত, এক হাতা ডাল, এক হাত সব্জির বাইরে আজকের আকর্ষণ ইলিশ মাছের ঝোল। বড় পাতিলের অনেক নীচে ইলিশের টুকরোর ডুব সাঁতার, সেখান থেকে একটুকরো ইলিশ পাতে পরতেই সবার মুখ উজ্জল হয়ে যাচ্ছে। সারি বেধে বিভিন্ন হাঁড়ির সামনে দাঁড়াচ্ছে, প্লেট ভর্তি করে নিয়ে এসে বসছে বিছিয়ে রাখা চটে।

থালায় নখের আঁচড় আর মাঝে মাঝে চামচের শব্দ শোনা যাচ্ছে এখানে। ম্লান হলদেটে আলো অন্ধকার কাটাতে পারছে না। চারপাশে আরও অন্ধকার জাঁকিয়ে বসেছে। শুধু কতগুলো মুখ আর চোখ উজ্জল হয়ে জ্বলছে এখানে, অভিব্যক্তিবিহীন, বিশেষত্বহীন মুখাবয়ব। কলসি থেকে পানি গিলে বিশাল একটা ঢেঁকুর তুললো রজব আলী। একটু দুরে গিয়ে হাত ধুয়ে লুঙ্গিতে মুছে রেশনের সিগারেট জ্বালিয়ে তৃপ্তি নিয়ে টানছে।

রাতের খাওয়া শেষ হওয়ার পর ক্যাম্পে তেমন কোনো কাজ নেই, পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠবার আগে কারো কিছু করার নেই, রজব আলী তখন হাত সাফাইয়ের খেলা দেখায়। একটা পয়সা থেকে কয়েকটা পয়সা, তামার আধুলি হাতের তালুতে ঘষে অন্য কারো পকেট থেকে বের করে আনে এক রুপি।

এখান থেকে সীমান্ত মাত্র কয়েক মাইল দুরে, খুব নিয়মিত মৃদু গুলির শব্দ পাওয়া যায়। রাতের অন্যান্য শব্দের সাথে মিলেমিশে সে আওয়াজও একান্ত পরিচিত হয়ে উঠেছে কানে, রাতপ্রহরীর মৃদু গুনগুন শোনা যায়। আজ বোধ হয় হাফিজ ভাইয়ের পালা। সারা রাত হাসন রাজার গান গেয়ে ঘুম ঠেলে সরিয়ে রাখেন হাফিজ ভাই।

প্রথম দিন যখন রিলিফের সিগারেটের টিন থেকে ১০টা সিগারেট দিলো আমাকে, বলেছিলাম আমি স্মোক করি না। লাগবে না আমার। মোস্তফা ভাই বললেন আরে ছোটো ভাই খান না তো কি হইছে রাখেন। সাথে রাখতে তো সমস্যা নাই। না খাইলে অন্য লোকরে বিলায়া দিবেন।

ভাই একটা সিগারেট দেন, আমার স্টক শেষ, আবার কাইল্কা সকালের আগে তো পামু না। এখন গা টা ম্যাজ ম্যাজ করে, মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। একটা জুঁইতের টান দিয়া ঘুম চুতমারানিরে যদি পদ্মার ঐপারে না ফেলাইছি আমার নাম রজবালী না।

রজব আলী সিগারেট জ্বালিয়ে দুরে সরে যায়, এক মনে হাত সাফাইয়ের খেলা দেখায়। মোস্তফা ভাই গলা খাঁকরি দিয়ে বললেন, রজব আলীর গল্পটা জানো? ও গঞ্জের বাজারে মলম বেচতো। সেই মলম বিক্রীর জন্য লোক জমাইতে হাত সাফাইয়ের খেলা শিখছিলো, যখন সুর করে ডাকতো বাজারের লোকজন হাত সাফাইয়ের খেলা দেখতে চারপাশে ভীর করে জমতো। রজব আলী তামার পয়সা, ব্রোঞ্জের পয়সা বাতাসে ছুড়ে দেওয়ার পর আর ফিরতো না ওর হাতে, তখন লোকজন অবাক হয়ে তাকাতো। তারপর অন্য কারো শার্টের হাতা টেনে বের করে নিয়ে আসতো হারানো পয়সা। লোকজন অবাক হয়ে তাকাতো।

প্রতিদিন, প্রতিটা মানুষ দেখতো এই হাত সাফাইয়ের খেলা, কিন্তু কেউ বুঝতো না। সবাই অবাক হতো প্রতিদিনই । প্রতিদিনই একই হাত সাফাই দেখে মুগ্ধ হইতো তারা। এইসব মানুষই আমাদের চারপাশে আছে, বুঝলা ছোটো ভাই।

রজব আলী যখন এক পাই থেকে ঘঁষে ঘঁষে ৫টা এক পাই বের করতো তখন ওরা ভাবতো রজব আলী শূণ্য থেকে পয়সা ধরে নিয়ে আসতে পারে, গোপনে নিজের পকেটে হাত দিয়ে বুঝতে চাইতো রজব বাতাস থেকে ওদের পকেটের পয়সা টেনে নিলো কি না, তুমি শিক্ষিত পোলা, জানো হাত সাফাইয়ের খেলায় তেমন কিছু নাই। রজবের পয়সা বাড়ানোর কোনো ক্ষমতা ছিলো না, ও শুধু ধোঁকা দিতো মানুষকে।

মানুষ ধোঁকা খেয়ে মুগ্ধ হয়, রজব আলীর দুই ফাইল মলম বিক্রী হয়, সেই মলম বিক্রীর টাকায় জীবন চলে রজবের। ওর যদি সেই ক্ষমতাই থাকতো তাহলে কি সাধ করে গঞ্জের বাজারে মলম বেচতো হাত সাফাইয়ের খেলা দেখায়?

করিমগঞ্জের বাজারে যেই দিন মিলিটারি আসলো সেই দিনও রজব গঞ্জের বাজারে ছিলো, ঘরঘর করে মিলিটারি জীপটা থামতেই লোকজন ছুটে পালাচ্ছিলো , কানের কাছে বোমা ফাটার মতো শব্দে বন্দুক ফুটলো, রজব আলী মাটি আঁকড়ে পরে ছিলো অনেকক্ষণ, মাথানীচু অবস্থায় দেখলো কচু শাক নিয়ে বসে থাকা ছেলেটা ছিটকে পরলো দুরে। হাতের কচুর পাতাগুলো ছড়িয়ে পরলো চারপাশে, কিছুক্ষণ দাঁপিয়ে স্থির হলো তার দেহটা। চারপাশে ছড়ানো কচু পাতার ভেতরে একটা রক্তের স্রোত এসে মিশে গেলো।

একটাকা দুই মিনিট গুলি করে মিলিটারি কেরোসিন ঢেলে আগুণ লাগিয়ে দেওয়ার আগে রজব আলী নড়ে নি। ভয়ে কাঠ হয়ে পরে ছিলো মাটিতেই। জনশূণ্য বাজারের দোকানগুলো ধীরে ধীরে পুড়ে গেলো। গনি ময়রার দোকানের হাঁড়ি ভেঙে পরে যাওয়া মিস্টির লোভে সারি সারি পিঁপড়া এসেছে।

রজব আলী ছেলেটার লাশ নিয়ে হেঁটেছে অনেক দুর, ওটা ওর ছোটো ভাই ছিলো।

তোমরা শিক্ষিত ছেলে, তোমাদের অনেক প্রশ্ন, অনেক সংশয়, অনেক কল্পনা, এই যে মানুষগুলারে দেখতিছো, এদের কোনো স্বপ্ন নাই, এরা প্রতিশোধও নিতে চায় না, শুধু শান্তিতে কাটাতে চায়।

এরা জানে এরা কেউ গ্রামের মেম্বার হবে না, গনি চাচা আর রহিম চাচাদের পেছনে শ্লোগান ধরে এদের দিন যাবে, কিন্তু এরা বিশ্বাস করে শ্যাখ সাহেব পাকিস্তান থেকে ফিরলে সব হবে। এই বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নাই। শ্যাখ সাহেবকে পাকিস্তান আটকায়া রাখছে মিলিটারি। শ্যাখ সাহেবকে ছাড়ায়া আনতে পারলেই সব হবে, এই বিশ্বাসের বাইরে এদের কিছু নাই।

এরা আপনাদের মতো ভাবে না, বুঝে না, এদের ভিতরে কোনো সংশয় নাই, আজকে রজব আলীর হাত সাফাই দেখে এরা যেমন মুগ্ধ, যুদ্ধ থামলেও রজব আলীকে গঞ্জের বাজারে দেখলেও একই রকম মুগ্ধতা নিয়ে তাকাবে, হয়তো পরিচয় দিয়ে বলবে আমারে চিনছো নাকি রজব আলী, ঐ যে ক্যাম্পে দেখা হইছিলো। একটা বিড়ি কিনে দিয়ে সেই স্মৃতি স্মরণ করবে এরা।

এখন যুদ্ধের ভিতরে এরা কেউ প্রতিশোধ চায় না। শুধু এই রকম পালায়া পালায়া থাকতে চায় না। এরা সবাই গ্রামে ফিরতে চায়, এরা বিশ্বাস করে কোনো রকমে মিলিটারি তাড়াতে পারলেই হবে, কি হবে এমন কোনো ধারণা নাই এদের, শুধু বিশ্বাসটুকু আছে।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------
-------------------------------------------------------------------------------------------------------

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


পুরোটা চোখের সামনে দেখতে পেলাম...

বিশেষ করে কচুশাক বিক্রি করতে থাকা ছেলেটার মৃত্যু। এইখানে আপনি যেই ছবিটা এঁকেছেন, অতুলনীয়...

রাসেল's picture


আমার কাছেও শুরুটা ভালো লাগতেছিলো কিন্তু শেষটা ভালো লাগে নাই। লেখার মাঝে ধুমপানের বিরতি নিলে কোনো একটা সময় তাল কেটে যায়। যে অংশটুকু আমি রাখতে চাই সেটা হাত সাফাইয়ের খেলার দৃশ্য, দুপরেও দৃশ্যটাতে অন্য কিছু সংলাপ ছিলো সেটা রাত ১২টায় ভীষণ রকম বদলে গেলো।

শওগাত আলী সাগর's picture


ভােলা লাগলো। লেখাটা

তানবীরা's picture


আগের পর্বের গুলোর মতোই দুর্দান্ত

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,