ইউজার লগইন

বিহারী জনগোষ্ঠী

মাত্র ৫ শত বছর আগেও মৈথিলী, বাংলা, ঊড়িয়া অসমীয়া ভাষার ভেতরে এতটা ব্যবধান ছিলো না। বিহার তারপরও কৌশলগত দিক থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধারণ করে ছিলো, উত্তর ভারত থেকে বাংলা মুল্লুকে আসবার গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে এখানেই মুসলমান শাসকেরা তাদের দুর্গ বানিয়েছেন।

উত্তর ভারতের ভাষা, মৈথিলী আর ফার্সী, তুর্কি বিভিন্ন ভাষা মিলে মিশে এক ধরণের মিশ্রভাষারীতির উৎপত্তি হলো এখানে। এখন যেটাকে হিন্দী হিসেবে দেখা হয়, এই মিশ্র ভাষা আদতে সে ভাষারই পূর্বপুরুষ। আরবি হরফে লিখিত সে ভাষার পোশাকী নাম হলো উর্দু, মৈথিলীর বিবর্তন এটাকে সম্পূর্ণ উর্দু কিংবা হিন্দীর আকার দেয় নি, বরং তাদের ভাষাটা একটু উর্দু-হিন্দীঘেঁষা এক ধরণের আলাদা উচ্চারণরীতি-

এ তফাত ক্রিয়াপদ ব্যবহারের, এ তফাত সুরের, কিন্তু বাঙালের অনভ্যস্ত কানে সবই উর্দুর অপভ্রংশ। এই উচ্চারণবিভিন্নতা বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের কালে অন্যতম বিদ্বেষের কারণ হয়ে ছিলো, একটি ভাষাগোষ্ঠীকে শুধুমাত্র ভাষার সম্মিলনে ঘৃণা করতে শিখেছিলো নজরুল, রবিন্দ্রনাথের চেতনায় উদ্ভাসিত বাঙালী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মোহাজের বিহারীদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিলো বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে, তাদের কেউ কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, তবে অধিকাংশই মূলত পাকিস্তান ভাগের বিরোধী ছিলেন।

বাঙালী ভোট দিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলো আবার ভোট দিয়েই তারা বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলো। কুট-কৌশলে পশ্চিমবঙ্গের সাথে আনুষ্ঠানিক বিচ্যুতি অনেকের মর্মযাতনার কারণ হলেও বাঙালী ৪৬ এর দাঙ্গায়ও ততটা আক্রান্ত হয় নি। তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তান পরবর্তী সময়ে বিভিন্নমুখী সমঝোতা ও আপোষ করলেও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দুটো পৃথক রাষ্ট্রের জন্মের মূল্য চুকাতে হয়েছে মূলত বিহারের মুসলমান এবং পাঞ্জাবের শিখদের।

বিহারের মুসলমানগণ অধিকাংশই দাঙ্গাআক্রান্ত উদ্বাস্তু, যাদের সামর্থ্য ছিলো, তারা চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে আর স্থানিক নৈকট্যে অধিকাংশই মুর্শিদাবাদ, পূর্ণিয়া, খুলনা, কুষ্টিয়া হয়ে প্রবেশ করেছিলেন পূর্ব বাংলায়। তাদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় ছিলো তারা উদ্বাস্তু।

এই উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী পেছনের দাঙ্গার রক্ত আর আগুণ বয়ে নিয়ে আসেছেন স্মৃতিতে। তারা পিতৃপুরুষের ভিটা হারিয়েছেন, স্বজন-সম্ভ্রম হারিয়েছেন, সব হারিয়ে তারা একটি প্রাপ্তিতেই আনন্দিত, তাদের জন্য নিরাপদ সম্মানজনক একটি রাষ্ট্রে এনে দিয়েছেন জিন্নাহ আর মুসলীম লীগ।

বঞ্চনার বোধটুকু বাঙালীর চেয়ে তাদেরও কম ছিলো না মোটেও, বিহারের ঊষর অঞ্চল থেকে অভিবাসী এসব ব্যক্তি-পরিবার কষ্টসহিষ্ণু এবংপরিশ্রমী, তাদের কাছে শ্রম উপার্জনের মাধ্যম, সেখানে বড়-ছোট- শ্রেনী বিভাগ নেই। নিপীড়িত হয়ে বিপুল পরিমান শীল পূর্ব বাংলা ত্যাগ করলে এরাই চুল কাটার পেশায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে, ক্ষৌরি করে, কামিয়ে, মুসলমানি করে এরা জীবনযাপনের ভেতরে কোনো রকম গ্লানিবোধ করে নি।

৭০ এর নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি এদের দ্বিতীয় বার উদ্বাস্তু হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। ভাষিক সম্মিলনজনিত ঘৃণা এবং সাম্ভাব্য উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার ভীতির সাথে সম্ভবত যুক্ত হয়েছিলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সামর্থ্যের প্রতি অগাধ আস্থাও। সে কারণে তারা পাকিস্তানী সেনা আগ্রাসনের সমর্থক হয়েছেন।

বিহারীবিদ্বেষের কারণে কিংবা বিহারীদের ভাষাকে উর্দু কল্পনা করে তাদের প্রতি ঘৃণাপোষণকারী অনেকেই বর্তমান ছিলেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো চট্টগ্রামের বিহারী কলোনীতে প্রথম আগুণটি জ্বালিয়েছিলেন, যে আগুণে জ্বলে গিয়েছিলো প্রায় ৪০টি বসতবাড়ি, একই সাথে ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক গোলোযোগ ছড়িয়ে পরে, সংঘর্ষে দুইপক্ষের সাথে যুক্ত হয় সেনাবাহিনী। অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থকদের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন অন্তত ৫০ জন।

ব্যপক আকারে দাঙ্গা ছড়িয়ে পরে চট্টগ্রাম শহরের বিহারী কলোনীগুলোতে। একই সাথে সে বার্তা ছড়িয়ে যায় সম্ভবত সেনাবাহিনীর কল্যানেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিচ্ছিন্ন ভাবে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও ৭ই মার্চের পর সেসব সহিংসতার পরিমাণ কমে আসে। যারা প্রাণভয়ে বিভিন্ন বাঙালী বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, ঢাকা শহরে যেসব উর্দুভাষী কবি-সাহিত্যিকদের অন্যান্য শিল্পবোদ্ধাগণ তাদের বাসায় স্থান দিয়েছিলেন, তারাও ধীরে ধীরে নিজগৃহে ফিরে যান।

২৫শে মার্চের গণহত্যা শুরু হওয়ার পর এইসব মানুষেরাই পুনরায় সেনাবাহিনীর সাথে তাল মিলিয়ে হত্যা করেছেন বাঙালীদের। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে এদের অনেককেই হত্যা করেছে মুক্তিবাহিনী। যুদ্ধকালীন এই হতাহতের ঘটনাগুলো স্বাভাবিক ছিলো।

১৬ই ডিসেম্বরের পর এদের একাংশ মিরপুর দখল করে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বিহারী গণহত্যাকে কোনোভাবেই প্রতিহিংসা কিংবা প্রতিশোধমূলক বলে অভিহিত করা যায় না। বরং দুর্বল একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শিকার করার উদাহরণ হতে পারে এটা।

তথ্যসূত্রঃ
বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত- মাহবুব-উল-আলম ( চট্টগ্রামে বিহারী-বাঙ্গালী দাঙ্গা বিষয়ে অংশটুকু) ,
অন্যান্য তথ্যগুলো অনেকেরই জানা,

উর্দু এন্ড হিন্দী এন আর্টিফিসিয়াল ডিভাইড( লেখকের নাম মনে নেই তবে বইটি চমৎকার)

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সবুজ পাহাড়ের রাজা's picture


বাঙালী ৪৬ এর দাঙ্গায়ও ততটা আক্রান্ত হয় নি

এই ধারণাটি ঠিক নয়। পশ্চিমবঙ্গ-নোয়াখালী-আসাম-মণিপুর-বরিশালে বাঙালী হিন্দু-মুসলিম ভয়াবহ দাঙ্গা ভুলে গেলে তো চলে না।

আরবি হরফে লিখিত সে ভাষার পোশাকী নাম হলো উর্দু।

উর্দু নাশতালিক অক্ষরে লিখা হয়।

বিহারীদের অনেকেই পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাঙালী নিপীড়ণ করেছে, ঠিক একই ভাবে, বাঙালীদের অনেকেই পরবর্তীতে বিহারী নিপীড়ণ করেছে।
বাংলাদেশে এই বিহারী নিপীড়ণ কোন ভাবেই সমর্থন করা যায় না। কারন, খারাপ সব সময়ই খারাপ, আর একটি খারাপ কাজ অন্য খারাপ কাজের অজুহাত হতে পারে না।

রাসেল's picture


পশ্চিম বঙ্গের দাঙ্গায় আক্রান্ত পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের সংখ্যা ঠিক কতটুকু? যে অংশটুকু এখন পশ্চিম বঙ্গ সে অংশগুলোতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা শতকরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ছিলো, দাঙ্গাটা ভয়াবহ ছিলো সন্দেহ নেই কিন্তু সেখানে পূর্ববঙ্গের মুসলীমগন তেমন আক্রান্ত হন নি।

নোয়াখালীর দাঙ্গা গুরুত্ব পেয়েছে করম চাঁদ গান্ধীর আগমনে, মাত্রা বিবেচনায় বিহারের দাঙ্গার আশেপাশে সেটা যেতে পারে না।

উর্দু বিষয়ে আপনার বক্তব্য অধিকতর যৌক্তিক মনে হয়, উর্দুতে সম্ভবত যের যবর পেশ জাতীয় বাহুল্য নেই, পার্সীও একই ধাঁচের হরফে লেখা হয়।

শওকত মাসুম's picture


খারাপ সব সময়ই খারাপ, আর একটি খারাপ কাজ অন্য খারাপ কাজের অজুহাত হতে পারে না।

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


বিহারীদের ছাড়াও, পার্বত্য চট্রগ্রামে নিজের দেশের পাহাড়িদের উপর আর অতিসাম্প্রতিক দুইদিনের বিডিআর বিদ্রোহে নিজেদের স্বজাতিদের উপর আমাদের যে পারর্ফম্যান্স তা বেশ ভাববার বিষয়।

~

তানবীরা's picture


খারাপ সব সময়ই খারাপ, আর একটি খারাপ কাজ অন্য খারাপ কাজের অজুহাত হতে পারে না।

তাছাড়া দুর্বল জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন কোন পৌরুষের লক্ষন নয়, দুর্বলতার লক্ষন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,