নিজের ঢোল নিজেই বাজানো।
এটা শেষ পর্যন্ত লেখা উচিত হয় নি মোটেও।
আমার কোনো জন্মগত প্রতিভা ছিলো না, এখনও নেই।
আমি বেড়ে উঠেছিলাম মফস্বলে, শান্ত-নি:স্তরঙ্গ মফস্বলে, যেখানে জীবনের গতি ছিলো অনেক স্থিমিত। মফস্বলে তখনও মহল্লাসংঘ বিদ্যমান ছিলো। মহল্লার মানুষের প্রতি আলাদা এক ধরণের অন্ধ সমর্পন তখনও মফস্বলে ছিলো। আশেপাশের মহল্লার ছেলেরা দল বেঁধে মারামারি করলেও সীমিত জনবলের আমাদের পকেট মহল্লার তেমন ঐতিহ্য ছিলো না। মাত্র ১২ পরিবারের একটি মহল্লায় অবশ্য তেমন দক্ষ লড়াকু সৈনিকও পাওয়া সম্ভব ছিলো না, আন্ত:মহল্লা কোন্দলের সুযোগ ছিলো না।
দুই চৌধুরী বাড়ীর পেছনে লুকিয়ে থাকা মহল্লায় আমাদের বসবাসের ভেতরে তেমন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে নি, তবে শৈশব কখনও উদযাপনবিহীন কাটে না। চৌধুরী পরিবারের দুর সম্পর্কের আত্মীয়ের জমিতে তখনও যেহেতু কোনো বাসা গড়ে উঠে নি, সেই সীমিত ভুখন্ডই আমাদের অনুদঘাটিত আফ্রিকা। নোনা আতা, বুনো নিম, কাঁঠাল আর চাঁপা গাছের নীচের এবরোথেবরো জমিনে আমরা প্রতি দিনই নিত্যনতুন এডভেঞ্চারে যেতাম। আমাদের প্রায়সমবয়সী সকলের কোমড়ে বাঁশের তরবারি। আমরা কিভাবে এ খেলা আবিস্কার করেছিলাম জানি না
টারজান দেখে আতা গাছে রশি বেঁধে দোল খেয়ে বিকট টারজানীয় চিৎকার দেওয়ার প্রচেষ্টাগুলো এখনও স্মরণে আছে। উঁচু ডাল থেকে শরীরে ভারসাম্য রেখে নীচে দাঁড়িয়েই ছুটে যাওয়া, কে কতটুকু দুর পর্যন্ত লাফ দিয়ে পৌঁছাতে পারলো- এইসব ছোটোখাটো বিজয় অভিযানে আমার অংশগ্রহন নিতান্তই দুধভাত পর্যায়ে ছিলো। আমি হ্যাংলা-পাতলা-রোগা-ভোগা-ছোটো-মোটো একটা বাচ্চা ছেলে ছিলাম। আমাকে সবাই খেলায় নিতো কোনো কিছুর প্রত্যাশা না রেখেই, শাররীক ক্ষমতায় দামড়াদের হারিয়ে দিবো এমন অলীক প্রত্যাশা কেউ করে নি, বরং অধিকাংশ সময়ই দলের সবার অর্জনে হাততালি দেওয়ার মানুষ হিসেবেই আমাকে দলভুক্ত করা হতো।
যখন মহল্লায় একটা ক্লাব করা হলো, তখনও আমি সেটার উৎসাহী সদস্য, যখন সিদ্ধান্ত হলো আমরাই সামনের এবরোথেবরো জায়গা সমান করে সেখানে ব্যাডমিন্টন কোর্ট কাটবো, সেখানেও আমি উৎসাহি সদস্য, কোদাল হাতে মাটি আর পানি মেখে আমরা যে কোর্ট বানালাম সেখানে রাতে বড়রা ব্যাডমিন্টন খেলতো, আমরা বাতর আশেপাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতাম।
শুধু যেভাবে চাঁদের হাটের ব্যাডমিন্টর টুর্নামেন্ট হলো আর তোতা-আতাকে হায়ার করে নিয়ে আসা হলো, সে সময়ে তারাই আমাদের হিরো। একটু মোটা তোতা আর তার সঙ্গী আতা, সাংঘাতিকভারসাম্য রেখে, কোর্টের এমাথা ওমাথায় ছুটে ছুটে ফেদার অন্য কোর্টে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আমরা ছোটোরা তোতা-আতা হওয়ার স্বপ্ন দেখছি।
বগুড়া আর ঢাকা থেকে যখন নিয়মিত খেলোয়ার হায়ারে খেলতে আসলো দিনাজপুরে তখন দিনজপুরের ক্রীড়াঙ্গনে এক ধরণের জীবন ফিরে আসলো। আমরাও তখন শিল্ড খেলা শুরু করলাম। ৫ ইঞ্চি শিল্ডে ফুটবল টুর্নামেন্ট, অন্য একটি মহল্লার সাথে বড়মাঠে ফুটবল খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। আমার কোনো প্রতিভা ছিলো না, সুতরাং আমি ফুটবল দলে সুযোগ পেলাম না। এমনিতেই গোলপোস্টের সামনে হুদাই দাঁড়া করিয়ে রাখতো আমাকে, এমন কি গোলকীপার করে ঝুঁকি নিতে চাইতো না দল।
তবে প্রতিযোগিতামূলক দলে আমার অংশগ্রহনের কোনো সম্ভবনাই ছিলো না। মহল্লায় যখন প্রথম ক্রিকেট খেলা শুরু হলো, তখন আমি হয়তো ৯ বছরের বালক, তেমনই দুবলা-পাতলা, ফুটবলে কিছু করতে পারি নি, কিন্তু ছোট্টো একটা বলও কি ঠিকমতো ছুড়তে পারবো না। দুধভাত আমি ব্যাটিং করতে নামতাম শেষ বোলারের পরে, আর বোলিংএর সুযোগ পেতাম না। বাউন্ডারী লাইনে দাঁড়িয়ে সীমানা ছাড়ানো বলগুলো কুড়িয়ে আনার বাইরে তেমন পরিশ্রম করতে হতো না আমাকে।
সম্ভবত কেঁদে কেঁদে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি জীবনে প্রথমবার এক ওভার বল করেছিলাম। খুব বেশী ভালো করেছিলাম এমনটা বলা যায় না, কারণ পরবর্তীতেও ক্যাপ্টেনের আমাকে বোলিং দেওয়ার আগ্রহ চোখে পরে নি । খেলোয়ারী প্রতিভা না থাকলেও আমার এক ধরণের অধ্যবসয় ছিলো সম্ভবত, কিংবা নিজেকে প্রমাণের জেদ- আমি জানি না ঠিক কোনটা কার্যকরী ছিলো, মহল্লার ১৬ জন ছেলের ভেতরে থেকে ১১জনের দলে জায়গা করতে না পারার এক ধরণের ক্ষোভ নিশ্চিত ছিলো।
আমি পরবর্তী ৩ বছর, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ- হেমন্ত-বসন্ত ভুলে প্রতিদিন দুপুরে ১০ ওভার টানা বোলিং করেছি একা একা। দুপুরে যখন সবাই ঘুমাতো, সেই ৩টার সময়ে দেয়ালের সামনে একটা স্ট্যাম্প লাগিয়ে আমি এক টানা বোলিং করতাম। একা একা বোলিং করতে করতে নিশানা ভালো হয়ে গেলো। পরবর্তীতে যখন এইটে উঠলাম, তখন একটা টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেললাম, দলের ১১জনের একজন হয়ে এবং ওপেনিং বোলার হিসেবে। ততদিনে আমি স্পীনার থেকে সামান্য জোরে বল করতে পারা একজন হয়ে উঠেছি।
আমার কোনো প্রতিভা ছিলো না, তেমন প্রথাগত কোচিং করার সৌভাগ্য হয় নি, ছুটে এসে স্ট্যাম্প বরাবর বল করো, ব্যাটসম্যান ঠেকাবে না তো আউট হবে এই ছিলো আমার বোলিংমন্ত্র। টেনিসবলে পেসবোলিং এর অনেক ধরণের ঝামেলা আছে। তবে স্কুল বদলে ঢাকায় আসবার পর ৪ফুট ১০ ইঞ্চি আমি দুই বছরে লম্বায় বাড়লাম ১ ফুট, যদিও শরীরের কাঠামোতে তেমন পরিবর্তন আসলো না , কিন্তু নিয়মিত প্রাকটিসের ফলে আমার দক্ষতা সামান্য বেড়েছিলো।
আমি পুরোদস্তর দলের হয়ে ক্রিকেট খেলেছি এইচএসসির সম্পূর্ণ দুই বছর। একেবারে দুধভাত বোলার থেকে ওপেনিং বোলার হওয়ার এক ধরণের আনন্দ ছিলো, তবে তার চেয়ে বড় আনন্দ ছিলো দলের হয়ে খেলার। একটু অহংকারী মনে হতে পারে, তবে আমরা টানা ৮টা টুর্নামেন্ট জিতেছিলাম দল হিসেবে। তখন অবশ্য মহল্লার মাঠে নতুন নতুন বাসা উঠেছে আর আমিও ক্রিকেট খেলছি কলেজের অন্যসব ছেলেদের সাথে। ঐসব বন্ধুদের নিয়েই আলাদা দল ছিলো আমাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে খেলেছি, এবং প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করেছি। এই সংক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতায় আমি একটা জিনিষ স্পষ্ট জানি বলের উপরে নিয়ন্ত্রন একদিনের বিষয় না, এটা প্রতিনিয়ত চর্চার বিষয়, যদি তেমন আন্তরিক অধ্যাবসয় থাকে তাহলে একদিন বল তোমার হাতে কথা বলবেই।
প্রতিটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে হয়। একজন সাকলায়েন মুশতাক তার প্রথম দুসরাটা করার আগে নেটে ৫ বছর পরিশ্রম করে সেটাতে দক্ষতা অর্জন করে ম্যাচে প্রথম দুসরা বল করেছে। এবং তার দুসরা বোলিং অন্য কেউ এখনও রপ্ত করতে পারে নি।
একটা সময় পর্যন্ত পেস বোলাররা কেউই স্লোয়ার দিতে অভ্যস্ত ছিলো না, আকিব জাভেদ মার্ক গ্রেটব্যাচকে এলেমেলো করে দেওয়ার আগে কেউ স্লোয়ার ব্যবহার করে নি তেমনভাবে। অফ কাটার, লেট কাটার, ইয়র্কার, সুইং এর বাইরে গিয়ে বলের গতির ভিন্নতা যে অন্য ধরণের ক্ষমতা দেয় বোলারদের, এটা উদঘাটিত হওয়ার পর প্রচুর পেসবোলার নিয়মিত স্লোয়ার দিয়েছে।
একজন বোলার হিসেবে বলতে পারি এই প্রতিটা বলের দক্ষতা অর্জনের পেছনে অন্তত ১০০০ ঘন্টার ঘাম লুকিয়ে আছে। নেটে একের পর এক, একই একশনে একই বল করতে চাওয়ার চেষ্টার পর সেটা নিয়মিতই ঘটতে থাকে। প্রতিটা নতুন বোলিং একশন নতুন ধরণের ক্ষমতা তৈরি করে, তবে সব কিছু একবারে রপ্ত করার প্রয়োজন নেই, একটা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে সেটাকে সাফল্যের সাথে ব্যবহার করার যোগ্যতা অর্জন করাটাই বড় বিষয়।
খুব কম বোলারেরই ৪ থেকে ৫টার বেশী স্টক ডেলিভারি নেই, কেউই আসলে ৪ থেকে ৫টা অস্ত্রের বেশী ব্যবহার করে না। উইকেট টেকিং বল হিসেবে সবার তুণেই গুটিকয় অস্ত্রই আছে। সময়ের সাথে প্রাকটিস করতে করতে এমন ৩-৪টা অস্ত্র তুণে রেখে দেওয়াটাই এক ধরণের অর্জন।
সবাই অসম্ভব প্রতিভা নিয়ে জন্মায় না, সবার শরীর আর হাতের মাপজোখে সেই বিশেষ কোণ নেই যে কারণে একজন অসাধারণ বোলার হয়ে উঠতে পারে, তবে প্রতিভাবান না হয়েও দীর্ঘসময় লড়াই করা যায়,দলের জয়ে অবদান রাখা যায়। শুধু বোলিং একশন না, বরং বলের ডেলিভারি এঙ্গেলও এক ধরণের অস্ত্র, যখন পরিচিত সব অস্ত্র ব্যর্থ তখন ডেলিভারি এঙ্গেল বদলেও উইকেট পাওয়া সম্ভব।
জীবনে অনেক কিছুই করার চেষ্টা করে দেখেছি, আমার গলায় সুর নেই, আমার কান সুরে বাধা না, গীটার বাজানো, ছবি আঁকা, ছবি তোলা, এমন কি গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত লেখালেখি, সব চেষ্টা করে দেখলাম আমি আসলে একটা কাজেই দক্ষ, সেটাকে আমার গোপন প্রতিভা বলা যায়, আমি ছোটোবেলা থেকেই অল্পবয়সী ছেলে মেয়েদের কাছে বেশ জনপ্রিয়, তারা আমার সঙ্গ উপভোগ করে, এবং আমিও সম্ভবত তাদের সঙ্গ উপভোগ করি। এটা তেমন বড়াই করে বলবার মতো কোনো প্রতিভা না, কিন্তু যখন রাতে পাশ ফিরে শুয়ে ছেলে হাতড়ে দেখে আমি আশেপাশে আছি কি না তখন ভালো লাগে।





কোথাও বলেননি কথাটা, কিন্তু আজকের খেলার পর শাহাদাত-নিন্দার ঝড় দেখে যে বিরক্ত হয়েছেন - লেখা পড়ে বুঝে নেয়া যায়।... আবেগপ্রবণ দর্শকরা বিরক্ত হয়ে এসব বলবেই, এটাও তো স্বাভাবিক। সব কালের সব খেলার অধিকাংশ দর্শকই তো প্রবল আবেগে ভেসে যায়, মারামারি-রক্তারক্তিও হয়, সেখানে এটুকু প্রতিক্রিয়া দেখানো অস্বাভাবিক নয়!
যাহোক, বারবার প্রতিভা ছিলো না/নাই বলে বিনয়ী না সাজলেও চলতো! শিশুরা আপনার সঙ্গ পছন্দ করে - জগতের বৃহত্তম অর্জন তো এটাই। শিশুরা তাকেই পছন্দ যার ভেতরে তারা নিজেদের সরলতা খুঁজে পায়! আপনি বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ, অথচ সরলতার মতো বিরল সম্পদ আছে আপনার - সত্যিই ভালো লাগার মতো ব্যাপার।
ভালো বাজাইছেন!
লেখাটা খুব ভালো লেগেছে।
হেরে গেলে সবাই শান্তনা খোঁজে। সবাই শাহাদতকে দোষারোপ করে সেটাই খুঁজছে। ভাগ্যকে বিশ্বাস করতোই হচ্ছে। আমাদের দলটার অধ্যাবসায়, প্রতিভা কিছুরই কমতি ছিল না। আসলে ভাগ্যে নেই।
ভালো লাগলো...
শেষের অংশটা খুব খুব খুব ভাল লাগলো।
শেষের অংশটা খুব খুব খুব ভাল লাগলো।
Awesome song. My favorite. The apostille.
মন্তব্য করুন