ঋকের প্রশ্নগুলো
১.
যে বয়েসে আমি একা একা স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি ,মফ:স্বলে সে বয়েসে সম্ভবত সবাই বাসায়ই থাকতো, আমি গোঁ ধরেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম ৪ পূর্ণ হওয়ার আগে, সে বয়েস থেকেই মহল্লার সব ছেলেদের সাথে হেলতে দুলতে স্কুলে চলে যেতাম, আমার বই প্রথম ভাগ, ইংরেজী প্রথম ভাগ আর গণিত ক্লাশের বাইরে তেমন কোনো ক্লাশ ছিলো না। সকাল ৮টায় ক্লাশ শুরু হওয়ার পর ১০টায় ছুটি, আবার হাঁটতে হাঁটতে দলবেধে বাসায় চলে আসা।
মফ:স্বলে সবকিছুই ছিলো ধীরগতির, মোটা আপা, শুকনা আপার ক্লাশের পর বাইরের তেঁতুলের চাটনি কিংবা চালতার আঁচার কাগজে নিয়ে চাটতে চাটতেই বাসার গেটে চলে আসতাম। রাস্তায় কয়েকটা রিকশা আর সাইকেল, স্কুলের পাশেই মসজিদ, মসজিদের সামনে লাইব্রেরী, সে জায়গাটুকু পার হলে পুলিশ সুপারের বাসভবন, সে বাসভবনের সামনে কয়েকটা কামারশালা আর ডাস্টবীন।
সে জায়গাটুকুতে একটা ট্রাফিক সিগন্যাল, অধিকাংশ দিনই কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকতো না, সিনেমা হলের সামনে কয়েকটা ঘড়ির দোকাল, ফুলকুঁড়িদের আসর, তারপরই চৌধুরী বাড়ীর পাশে গলি। তখন অনেকটা দীর্ঘ মনে হতো, বড় হয়ে দেখলাম সেটুকু হাঁটতে খুব বেশী হলে ৫ মিনিট লাগে।
সে স্কুলে পড়েছিলাম ৬ বছর, এই ছয় বছরে কয়েকবার হয়তো অন্য কেউ পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু একবার পায়ের উপরে রিকশা উঠে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটে নি। ঋকের স্কুল অবশ্য মফ:স্বলের মাপের চেয়েও বেশী দুরে, আর কয়েকটা রাস্তা পার হয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়। ঋককে যদি বলা হয় ও হয়তো এখন স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা বাতলে দিতে পারবে কিন্তু আমরা যেভাবে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম, সম্ভব হলেও ও সেভাবে স্কুলে যেতে পারবে না, তারচেয়ে বড় কথা হলো এই উন্মাদ ট্রাফিকের ভেতরে ওকে একা স্কুলে যেতে দিবো না আমি। ও বাসার গলি থেকে বের হয়ে সামনের দোকানে গেলেও আমি উদ্বিগ্ন থাকি, ওর চার বছর বয়েসে ওর সবচেয়ে বড় এডভেঞ্চার ছিলো আমাকে পেছনে রেখে গলির সামনের দোকানে গিয়ে একটা চকলেট মিল্কের দাবি জানানো। সব মিলিয়ে হয়তো দুরত্বটা ৫০ গজ, কিন্তু সেটুকু দুরত্ব ও একা একা অতিক্রম করলেও আমার বিভিন্ন রকম শঙ্কা তৈরি হয়।
যেহেতু ওকে স্কুল থেকে ফেরত আনবার লোক ছিলো না, আজ ও স্কুলে যায় নি। বাসায় বসে কার্টুন নেটওয়ার্ক কিংবা ইন্টারনেটে মিস্টার মেকারের বিভিন্ন ভিডিও দেখে হয়তো আনন্দেই কাটিয়েছে ও দিনটা কিন্তু বাসায় ফেরার পর বুঝলাম আজকে স্কুলে যেতে না পারার দু:খটা ওর প্রবল।
ওর প্রিয় আর্ট ক্লাশ হয়ে গেছে, ওখানে নতুন কিছু শিখিয়েছে, সেটুকু কেনো ও আজ করতে পারলো না, সে দু:খ ভুলতে না পেরে ৯টায় ঘুমিয়ে গেলো কিছু না খেয়েই। এই বয়েসে স্কুলে যাওয়ার আনন্দটুকু অন্য রকম- কার্যকারণ নেই কোনো, তবুও নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলের পোশাক পরে স্কুলের পথে যাওয়াটাই আনন্দের।
বাসার সবচেয়ে দুরন্ত ছেলেটাও স্কুলে নিতান্ত শান্ত-সুবোধ হয়ে বসে থাকে, শিক্ষককে মাণ্য করে , এমন কি বাসার মানুষের চেয়ে শিক্ষকের কথার গ্রহনযোগ্যতা ওদের কাছে অনেক বেশী। অদ্ভুত মন:স্তত্ব কিন্তু আমার ধারণা এই শৃঙ্খলাবোধটুকু তৈরি করে স্কুলের পরিবেশ। সমবয়স্ক অন্য সবাই একজনকে মাণ্য করছে, তার কথা মতো নিজের আচরণ সংশোধন করছে, এই চর্চাটুকুর কারণে শিক্ষক শিশুর কাছে অপরাপর বাসার মানুষের চেয়ে বেশী বলিষ্ট একটি চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়। সে মানুষটির কথার গুরুত্ব এ কারণে অনেক অনেক বেশী। নিয়মানুবর্তীতা- শৃঙ্খলাবোধ এবং পরিমিতিবোধের বাইরে অন্য যেকোনো শিক্ষাই ঘরে দেওয়া সম্ভব। সামষ্টিক সামাজিক আচরণগুলোতে অভ্যস্ত হতে প্রথাগত স্কুলের কোনো বিকল্প নেই।
২. ঋক এখন যে বয়েসে সে বয়েসের ছেলেদের অভিমাণ বেশী, তারা অনেক ধরণের কল্পনায় বসবাস করে, বিভিন্ন ধরণের খেয়ালে পরিচালিত হয়। তারা এ সময়টাতে ভাষার ব্যবহার রপ্ত করতে শুরু করে। এর আগে থেকেই তারা ভাষার ব্যবহার শিখছে, শব্দগুলোকে বিভিন্ন ভাবে সাজিয়ে তারা পরীক্ষা করছে কোন ধরণের বাক্যসজ্জ্বা বেশী অর্থবহ হয়ে উঠে।
এই সময়ের সামান্য আগে থেকেই তারা শব্দকে বিকৃত করতে শুরু করে। কোনো কারণ ছাড়াই তারা কোনো কোনো শব্দের পরিচিত উচ্চারণকে অস্বীকার করে নতুন ধরণের উচ্চারণরীতি আবিস্কার করে ফেলে। নিজের খেয়ালেই হয়তো কোনো এক দিন ওরা কোনো শব্দেরই আ-কার উচ্চারণ করবে না, হয়তো পরবর্তীতে কোনো এক দিন ই-কার উচ্চারণ না করে শব্দ তৈরি করবে। একটা বাক্যের কোথাও কোনো আ-কার, কিংবা ই-কার উচ্চারণ না করলে তেমন কোনো সমস্যা নেই, এটাই স্বাভাবিক, এভাবেই নতুন নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হয় তারা।
শৈশব থেকেই তারা শব্দ শুনে অভ্যস্ত হয়, বাবা-মা-পরিচিত মানুষের উচ্চারণ রীতি তাদের উচ্চারণ রীতিকে প্রভাবিত করে। ঋকের চেয়ে ছোটো আমার মামাতো ভাই চ-বর্গীয় কোনো শব্দই সঠিক উচ্চারণ করতে পারে না, সে কাঁচ- ছাদ, কাজ, ঝাঁঝ কোনো শব্দই উচ্চারণ করতে পারে না, অহেতুক এসব শব্দের শেষে তার শ- উচ্চারণের ঝোঁক দেখা যায়। কাঁশ, শাদ, কাস,ঝাঁস, এইসব শব্দ শুনে একদিন সবাই মিলে তার সামনে বিভিন্ন ধরণের শব্দ উপস্থাপন করে দেখলাম ছ উচ্চারণ করতে তার সমস্যা প্রকট কিন্তু এর বাইরে অন্য উচ্চারণগুলো যদি শব্দের শেষে একক ভাবে থাকে তাহলে ও উচ্চারণ করতে পারে না। সে কারণে কাজ এবং কাঁচের উচ্চারণ তার কাছে একই, এগুলো যে আলাদা আলাদা বস্তু এ সম্পর্কে সচেতন হয়েও ও আলাদা করতে পারছে না।
হালের ডি-জুস ছেলেপেলে সচেতন কিংবা অসচেতন ভাবে ছ-বর্জন করছে। ওদের উচ্চারণে ছেলে-পেলে হয়ে যাচ্ছে সেলে-পেলে, করছি হচ্ছে করসি, গেসি, খাইসি- এইসব উচ্চারণের কতটুকু বর্জনের আর কতটুকু পরিবারের উচ্চারণগত ত্রুটি এটা নিয়ে বিশাল একটা ধন্দ তৈরি হলো। আমরা বাসায় র-ড় আর স-শ-ষ বাদ দিলে সকল অক্ষরই আলাদা করে উচ্চারণ করি। কিন্তু তার ভেতরে এই অক্ষরগুলোর উচ্চারণের তফাত স্পষ্ট না। পরে দেখলাম তার মায়ের উচ্চারণেও একই ধরণের ত্রুটি- সেও একটু দ্রুত কথা বলবার সময় চ-ছ-জ- স-শ-ষ গুলিয়ে ফেলে। সে উচ্চারণরীতিকেই প্রামান্য মেনে নিজস্ব কান থেকে ও এইসব অক্ষরের উচ্চারণজনিত তফাত মুছে ফেলেছে।
শৈশব খুব প্রতিহিংসাপরায়ন এবং উপহাসপরায়ন, ঋক আমাদের দেখাদেখি তার উচ্চারণ নিয়ে মজা করা শুরু করলো। আমাদের কাছে যা প্রাথমিক পর্যায়ে হাস্যকর ছিলো, ঋকের প্রতিক্রিয়ায় বুঝলাম আমাদের আচরণগত ত্রুটিটা তার কাছে প্রকট হয়ে উঠেছে, ও বিষয়টিকে উপহাসের উপকরণ হিসেবে গ্রহন করছে।
ঋক যখন কোনো শব্দের পরিচিত উচ্চারণ বাদ দিয়ে আলাদা কোনো শব্দ উচ্চারণ করে, তার বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হই না। এ বয়েসে এমনটাই স্বাভাবিক।
৩. ঋক পেপার পড়া শুরু করেছে, প্রতিদিন দুপুরে একবার সময় করে পেপারের হেডলাইন পরে, পেপারে কোনো সংঘর্ষের ছবি থাকলে আর পেপার উল্টে দেখে না, সেদিনের সংবাদ সবই খারাপ। এই পেপারের হেডলাইন ধরে পড়া, রাস্তায় ব্যানার আর পোস্টার পড়ার বিভিন্ন ধরণের সমস্যা তৈরি হয়। কয়েক দিন আগে ১২ই মার্চ চলো চলো ঢাকা চলো পোস্টারে ভর্তি হয়ে গেলো শহরের রাস্তাগুলো- ঋক স্কুলে যাওয়ার পথে জিজ্ঞাসা করলো বাবা ১২ই মার্চ কি দিবস?
কোনো দিবস নেই, কেনো?
না এই ঢাকা চলো দিবসে কি হবে?
বললাম সবাই এই দিন মিছিল করবে
মিছিল কি?
লোকজন একসাথে শ্লোগান দিতে দিতে যাবে,
তাহলে কি হয়?
ভয়ংকর প্রশ্ব-এটার আসলে কোনো উত্তর হয় না।
তারপর রাস্তায় ব্যানার দেখিয়ে বললো বাবা এখনও কেনো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস লিখে রাখছে ওরা, ওরা কেনো এখনও মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা দিচ্ছে?
ওসব খুলে ফেলবে সামনেই-
আচ্ছা বাবা জাতীয় শোক দিবস কি?
২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ার পর থেকে শহীদ দিবস, শোক দিবসের আবহ হারিয়ে গিয়েছে, দুরে কালো ব্যানারে দেখা যাচ্ছে ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের ব্যানার
এই শোকদিবসের কারণ ওকে এ সময়ে ব্যাখ্যা করে বলা সম্ভব না।
বাবা এইটা কোন মাস?
মার্চ-
ওরা তাহলে কেনো বোকার মতো লিখে রাখছে ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস।
এটারও আসলে কোনো উত্তর হয় না, বললাম ওরা খুলে রাখতে ভুলে গেছে, কয়েকদিন পরই খুলে ফেলবে।
তাহলে কি তখন স্বাধীনতা দিবসের পোস্টার লাগাবে
কবে লাগাবে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।
বললাম সমনেই লাগাবে পোস্টার,
তবে যে প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না
বাবা জাতীয় পতাকা দিবস কি? ঐদিন কি হয়?
আমি কোনো কিছু তাৎক্ষণিক স্মরণ করতে পারলাম না। পরে মনে পরলো ২রা মার্চ ১৯৭১ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিলো- সেটা যে জাতীয় দিবসে পরিণত হয়েছে সে সংবাদ জানা ছিলো না।





ভাল লাগছে লেখা।
কিন্তু বেশকিছু বিষয় একসাথে না দিয়ে আরেকটু বিস্তারিত কিন্তু আলাদা আলাদা ভাবে পোষ্ট করলে পাঠকের জন্য আরো ভাল হতো।
ঋক বাবার কথাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগে
ভাল লেগেছে লেখা।
ঋক তো দেখি বেশ বড় হয়ে গেছে !
মন্তব্য করুন