ইউজার লগইন

রাধে শ্যাম

একদিন টিএসসির সামনে দাঁড়িয়ে আছি- বিকেল বেলা- এক অন্ধ গায়ক গান ধরলো দোতারা বাজিয়ে- তাতে সঙ্গত দিলো তার ছোটো ছেলে-একটা মিউজিক্যাল ফ্যামিলি বলা যায় তাদের সম্মিলনকে। স্ত্রী, কন্যা পূত্র এবং তিনি। এ চারজনের ব্যান্ড-

তিনি দোতারা বাজিয়ে গান ধরলেন
ও জীবন জীবন রে এ জীবন ছাড়িয়া রে গেলে আদর করবে কে জীবন রে।

পরিবেশের গুণে, কিংবা ছোটো ছেলেটার অত্যাধিক চড়া গলার স্কেলের কারণে গানটা মন স্পর্শ্ব করেছিলো- আমি গীটারে গান তুলতে পারতাম না, এখনও পারি না, কিন্তু চেষ্টা করে এই গানটা তুলতে পেরেছিলাম।

পরবর্তীতে অবশ্য নিজেও একটা লোকগীতি ধাঁচের গান লিখে সুর করে ফেললাম। লোকগীতির একটা ধুন আছে, গানের মাঝে কোথাও না কোথাও গায়কের কিংবা গীতিকারের পরিচিতি থাকে- এটা ছাড়াও হয়তো গান হয় কিন্তু ঐ পরিচিতিটা অনেকটা গানের উপরে নিজের জলছাপ বসানো।

বাজে বাঁশি বাজে বাঁশী দিবা নিশি সর্বনাশী
থাকে না থাকে না ঘরে ঘরে মন থাকে না রে
নির্জন যমুনার কোণে বাজে যে মরণ বাঁশী
অপবাদের ভয়ে আমি একলা জাগি

প্রেম বুঝে না নিঠুর কানাই
বাঁশীতে মোর অঙ্গ পোড়ায়

এখানে এসে থেমে গেলো সুরটা, ভনিতা ঠিক না করে আগাতে পারছি না, ফোন দিলাম সোহেলকে। বললাম দোস্তো একটা গান লিখে সুর করছি, শুন,

তারপর ও কিছু কারেকশন নোট দিলো- শুরুটা এমন হলে চলবে না, ওটা শুরু হবে পোড়া বাঁশী দিয়ে
পোড়া বাঁশী রে ও পোড়া বাঁশী
সেখান থেকে ঘুরে গানটা শুরু হবে, ওর প্রস্তাবনা আর সুর শুনে মনে হলো কেমন আবালমার্কা একটা সুর করলাম।

এইসবের মাঝেই জিপসীর সাথে পরিচয় হলো, মহাজাগতিক দুর্ঘটনা বলা যায় কিংবা মধুর দুর্ঘটনা।

ইয়াহু চ্যাটরুম সম্পর্কে আমার ধারণা ছিলো সেখামে প্রায়ই গালাগালি হয় এবং সেটা কখনও কখনও হুমকি ধমকির পর্যায়ে চলে যায়। কোনো একদিন হুট করে চ্যাট রুমে ঢুকে পুরোনো কয়েকটা প্রিয় বাংলা গান শুনলাম, যে বাজাচ্ছে সে বেশ রসিক, দিব্যি ফাজলামি করছে- মাঝেমাঝে লাল নীল সবুজ রং এর লেখা লিখছে- এমনিতে কাউকে তেমনভাবে নক করার অভ্যাস ছিলো না। তবুও উৎসাহ দমাতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় থাকেন?
বললো মীরপুর
নামটা অবশ্য বেশী পছন্দ হয়েছিলো, জিপসীবাউল- পরিচিত হওয়ার তেমন সম্ভবনা ছিলো না, নিছক কাকতালীয় ভাবে একই সময়ে একই ইয়াহু চ্যাট রুমে ঢুকে যাওয়ায় হওয়া পরিচয় থেকে মাঝে মাঝে কথা- ও অনেক বাংলা গান শুনতো- মাঝেমাঝে নতুন নতুন বাংলা গানও পাঠাতো- ওর কাছেই প্রথম শুনলাম ভুমির গান। ক্রসউইন্ডজের বাইরে কোলকাতায় এত এত বাংলা ব্যান্ড তৈরি হয়েছে সে সংবাদ ওর কাছেই জানলাম।

পরে এক সময় জানালো আসলে ওর বাসা মীরপুর, থাকে জার্মানী- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো এক সময়- তারপর কিভাবে কিভাবে যেনো ওখানে পড়ছে। শখ গান শুনা, গোল্ডেন উইংস কিংবা এমন কোনো নামের ব্যান্ডও ছিলো ওদের, সেটার একটা এলবামও বের হয়েছিলো- ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত প্রচন্ড বাংলাগান শোনা হয়েছিলো, এরপর হুট করেই সে শখ কমে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ের এলবামগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিলো না। তাই ব্যান্ডের নামটা পরিচিত মনে হলো না। এপ্লাইড ফিজিক্সের চিপায় গান গাইতো কয়েকজন, ধরে নিলাম তাদেরই কেউ হবে- হয়তো নাম জানি না, চেহারাটা পরিচিত মনে হতে পারে-

এভাবেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে- প্রায় প্রতিদিনই কথা হয়, এই কামলা দিয়ে আসলাম- যাই কামলা দিয়ে আসি- শালার পরীক্ষা- এই রকম টুকরো টুকরো সংলাপ যেমন ছিলো তেমন দীর্ঘ লম্বা আড্ডাও ছিলো-

ও ছুটির দিনে কামলা দিতে যাওয়ার আগে মাঝে মাঝে গানের সুর করতে বসে- হুট করে একদিন বললো আপনি গান-টান লিখেন না?
বললাম আমি গান লিখতে পারি না।

আমার গান লেখার অভ্যাস নেই কিন্তু কবিতা পড়ার অভ্যাস আছে, এখান থেকে এক লাইন ওখান থেকে এক লাইন করে হয়তো একটা গানের ঢং তৈরি করা সম্ভব কিন্তু সে বিদ্যা পেটে নিয়ে গান লিখতে যাওয়াটা সময়ের অপচয়- তবু অনুরোধে ঢেঁকি গিলে ফেলার পুরোনো অভ্যাসে কয়েকটা লাইন লিখে ফেললাম

এমনই বর্ষা দিনে সজল মেঘের খামে এক ফালি রোদ পাঠালো বন্ধু আমার নামে
ভেজা ভেজা গাছের পাতা ভেজা ভেজা রোদ
ভেজা ভেজা চোখের আলো ভেজা ভেজা বোধ

চিলেকোঠায় বন্দী বিকেল আনমনা তুমি মেয়ে
অন্য মনে আকাশ দেখো বৃষ্টি মাখো গায়ে
আমি অবাক দেখি চেয়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার পাশে
মেঘের নূপুর পায়ে-

লিখে পাঠালাম অফলাইনে

পরে একদিন সে গান সুর হয়ে আসলো-- অদ্ভুত অনুভুতির বিষয় এটা। তারপর বললো বস এটা শেষ করবেন না?
আমি বললাম আমার বিদ্যায় যতটুকু হয়েছে সেটুকুই সম্ভব, এর বাইরে তেমন কোনো কিছু মাথায় আসতেছে না। এইটা এভাবেই থাকুক। ও অবশ্য একটা অন্তরা জুড়ে দিয়েছিলো- সেটা আমার তেমন পছন্দ হয় নি- পরে একদিন হুট করে শেষের অন্তরাটুকু পেয়ে গেলাম- আমার মনে নেই- হয়তো জিপসীর হার্ডড্রাইভে সেটা এখনও আছে

তখন গান করার নেশা পেয়ে বসলো বলা যায়- প্রতিদিনই বিভিন্ন ভাবে শব্দ সাজিয়ে সুর করার চেষ্টা করি, কোনো কিছু হয় না তেমন- একদিন রাতে হুট করে জিপসী নক করে বললো বস একটা গান একটু সাইজ করে দিতে হবে, আমি কামলা দিতে যাচ্ছি- দেখেন কিছু করা যায় কি না-

লিখে রাখলাম কিন্তু সেটাকে সাইজ করা সম্ভব হলো না- আমি গান লিখতে পারি না- গানের ভেতরে একটা গল্প থাকবে- সে গল্পটাকে যতটা লিরিক্যালি উপস্থাপন করা সম্ভব সেটা আমার কাছে গান। একটা সম্পূর্ণ গল্প- এই গানের ভেতরে সে গল্পটা ছিলো না। গানের বিষয় বস্তু একজন প্রবাসীর কাছে দেশ কিভাবে উপস্থিত হয় সেটা নিয়ে।

পরবর্তীতে যখন গানটার একটা অবয়ব দাঁড়ালো তখন অবশ্য ওর প্রাথমিক খসরা থেকে ওটা অনেক দুরে সরে গেলো- কিন্তু তারপরও গানটা সুর করে ভালো লেগেছিলো- অন্তত এই একটা সুর টেলিফোনে শুনানোর পর সোহেল বললো -ঠিক আছে- এই গানটার আসলে অন্য কোনো সুর হয় না।

ধুসর খরার বুকে ঝড়ে না শ্রাবন
মেঘলা আকাশ আজ একা জানালায়
পরাজিত স্বপ্নেরা খুঁজে নীলাকাশ
বাতাসের কড়ানাড়া শুন্য ভিটায়

আমি বুকের অন্তরালে স্বদেশ খুঁজে ফিরি
বাংলায় ফিরে আসি প্রতি কবিতায়

আবার আসবো ফিরে ধান শালিখের ভীড়ে
সুরের ভেলায়
আবার আসবো ফিরে রাখালি বাঁশির সুরে
ডাকবো তোমায়

আমার বুকের অন্ধকারে ভালোবাসা ঘাই মারে
বাংলা আমার চোখে স্বপ্ন সাজায়।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


চালায়া যান বস লেগে থাকলেই হবে!

আহমাদ মোস্তফা কামাল's picture


সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের একটা লেখা পড়লাম। আপনি যে লিরিক লেখেন জানা ছিলো না। লিরিকগুলো পড়ে ভালো লাগলো, কিন্তু সুরগুলো তো শোনার উপায় নেই!

রাসেল's picture


কামাল ভাই আমি গীতিকার না, মাঝে ২ বছর গীটার গুতায়া কিছু লেখার চেষ্টা করছি- তার বেশীরভাগ কৃতিত্ব অবশ্য অন্য মানুষের, অনুরোধে ঢেঁকি গেলার অভ্যাস বাদ দিলে গানগুলোর একটা দুটো নিজের তাগিদে লেখা- আর সুরও আসলে অন্য মানুষের করা- ওরা গানটা সম্পূর্ণ করে হার্ড ড্রাইভে রেখেছে কিংবা মাথায়। আমি জানি না।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


মাঝের লিরিকটা অসাধারণ ভাল লাগলো।
শোনানোর ব্যাবস্থা করা যায় না কোন ভাবে?

রাসেল's picture


জিপসী এখন মনে হয় নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, গত ৪ বছরে মনে হয় একবার কথা হয়েছে- কিংবা কথা হয় নি। সম্পর্কগুলো এমনই- সবাই নিজের জীবনে ব্যস্ত থাকে-

ওর সাথে কখনও যোগাযোগ হলে অনুরোধ করতে পারি- যদি ওর কাছে ওর সুর করা গানের এমপিথ্রি কপি থাকে তাহলে সেসব শুনানোর ব্যবস্থা করা যায় নইলে অসম্ভব-

তানবীরা's picture


এই গানটাও মন্দ না Smile

তানিয়া বখশ's picture


"এমনই বর্ষা দিনে সজল মেঘের খামে এক ফালি রোদ পাঠালো বন্ধু আমার নামে"---অসাধারন !!

দূরন্ত পথিক's picture


:smile:অনেক ভাল লাগল।:lol: ভাইয়া বেশ কিছুদিন হল গিটার বাজাতে চেষ্ঠা করছি।:wink: নিজে নিজেই ট্রাই করছি। কোন টিপস্?

রাসেল's picture


উপদেশ কিংবা টিপস দেওয়ার যোগ্যতা আমার নাই-

এক ধরণের উপলব্ধি আছে- কিংবা উল্টো করে বললে আমার ব্যর্থতার কারণটুকু খুঁজতে গিয়ে যা বুঝেছি সেটা বলতে পারি

সুরের কারবার একধরণের নেশা- এখানে ডুব দিতে হয়- ওটা নিয়েই বাঁচতে হয়- সুর নিজের আনন্দ-দু:খ-হতাশা-ক্ষোভ- উল্লাস প্রকাশের একটা উপায়।

দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ নিয়ে কিংবা চর্চা করে মানুষ সুর দিয়ে এইসব অনুভুতি প্রকাশ করতে শিখে- যে যতটা আত্মস্ত হয়ে ডুবে থাকে সুরের ভেতরে- সে ততটা সহজে এইসব অনুভুতি প্রকাশ করতে পারে- এভাবে গীটারের ভেতরে ডুবে যেতে পারলে- ওটাকেই সঙ্গী করে বাঁচতে পারলে সুর আসবে-

আমি ভালো গীটার বাজাবো, লোকজন হাততালি দিবে, এলব্যাম হবে- আমি জনপ্রিয় হবো এটা এক ধরণের বিলাসী কল্পনা- সেটা অন্যধরণের মার্কেটিং স্ট্রাটেজী- সেটা করেও হয়তো কেউ কেউ সফল হয়, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই এটা এক ধরণের ব্যর্থ উদ্যোগ।

মিউজিক উপভোগের জিনিষ, আপনাকে উপভোগ করতে হবে এর প্রতিটা মুহূর্ত। যদি আপনি এই বিষয়গুলো উপভোগ করেন এবং যদি মনে হয় এই গীটার আপনার শরীরের অংশ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে আপনি ভালো করবেন, তখন এইসব গীটার বাজানো টিপস কোনো কাজে লাগবে না। সুর অনুভবের জিনিষ, আপনি যা অনুভব করবেন সেটাই উঠে আসবে- এইসব স্কেল-টোন-টিউন একধরণের অভ্যস্ত প্যাটার্ন- অনেকেই এসব প্যাটার্ন না মেনেও চমৎকার সুর করতে পারছেন।

১০

শওকত মাসুম's picture


গিটার বাজাইয়া একদিন গানটা শুনাইয়েন তো

১১

নেয়ামত's picture


লিরিকস গুলা অনেক ভালো লেগেছে আমার কাছে।

১২

বিষাক্ত মানুষ's picture


রাসেল ভাই .... গিটার নিয়া একদিন বসি চলেন

১৩

রাসেল's picture


গীটার পামু কই? আমার কাছে শেষ যেই গীটারটা ছিলো ঐটা একজন বাজাইতে নিয়া ঐটা পিটায়া ফ্রাস্টেশন কমাইছে। ওর ফ্রাস্টেশনের লোড নিতে গীটারের ইন্নালিল্লাহে রাজেউন

১৪

বিষাক্ত মানুষ's picture


খুবই দুঃখজনক।

১৫

রাসেল's picture


দু:খের কিছু নাই, ঋক যেই সময় থেকে দাঁড়াইতে শিখছে এরপর ওর অতিআগ্রহে গীটার ধরা হয় নাই। গীটারের টুংটাং শুনলেই ও আইস্যা হাজির হইতো- গত ৫ বছরের অনভ্যাস একদিক দিয়া গানের সুর করার আগ্রহ কমায়া ফেলছে, এখন মাঝে মাঝে মনে হয় একটা দুইটা লাইন সুর করতে কিন্তু সেইসব নিয়া দীর্ঘ সময় কাটায়া দেওয়ার অভ্যাস চলে গেছে।

১৬

লাবণী's picture


মাশআল্লাহ!!!! Smile

১৭

উচ্ছল's picture


এমনই বর্ষা দিনে সজল মেঘের খামে এক ফালি রোদ পাঠালো বন্ধু আমার নামে
ভেজা ভেজা গাছের পাতা ভেজা ভেজা রোদ
ভেজা ভেজা চোখের আলো ভেজা ভেজা বোধ

--- গানের কথা গুলো দারুন।
গানটা শুনতে পেলে অনেক ভালো লাগতো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.