ইউজার লগইন

ক্ষ্যাপ ০২

উন্নত মানের শিক্ষা প্রদানের পারিবারিক চাপের কারণে ঢাকায় চলে না আসলে হয়তো দিনাজপুরের অলিতে গলিতে ক্রিকেট ফুটবল খেলে কোনোমতে জীবনটা আনন্দে কেটে যেতো- মহল্লার প্রথা মেনে প্রায় পারিবারিক হয়ে ওঠা রাজবাড়ী ক্রিকেট ক্লাবের হয়েও দিনাজপুরের লীগ ম্যাচও খেলা হতো- কিন্তু গুরুজনদের আগ্রহে ঢাকা চলে আসলাম। রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ এখন পর্যন্ত সার্বিক সুবিধা বিবেচনায় ঢাকা শহরের সেরা স্কুল আর কলেজ, ১৩টা ফুটলব মাঠ, একটা ক্রিকেট মাঠ, দুটো বাস্কেট বল কোর্ট, অডিটোরিয়াম সব মিলিয়ে বেশ চমৎকার জায়গা। হোস্টেলের নিয়ম কানুন এবং প্রায় অপরিচিত মানুষজনকে বাদ দিলে হয়তো খুব চমৎকার সময় কাটতো ওখানে।

স্বভাবে তেমন বহির্মুখী না হওয়ায় আমার আগ বাড়িয়ে কখনও বন্ধুত্ব করা হয়ে উঠে নি, টুকটাক আলাপচারিতায় সহপাঠীদের কার্যকলাপে অত্যাশ্চর্য হওয়ার বাইরে আমার তেমন বন্ধুত্বযোগ্যতা ছিলো না। হোস্টেলে উঠবার পরে একেবারে অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা ছিলো- যেহেতু একই রুমে ৭জন থাকতাম তাই সেই কয়েকজনের সাথে পরিচয় হলো, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে পরিচিতির পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু নির্ঝঞ্জাট থাকতে চাওয়া কিংবা অন্তর্মুখীতা কিংবা অন্য যেকোনো কারণে কখনও হোস্টেলের টিমে খেলা হয় নি। আমরা প্রতিদিন বিকেলে ফুটবল খেলতাম, ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খেলার সুযোগ ছিলো, ভোর ৬টায় উঠে পিটি-প্যারেড, নাস্তা-টিফিন-দুপুরের খাওয়া-বিকেলের নাস্তার পর বল নিয়ে মাঠে দৌড়াতে ভালো লাগতো। সে খেলায় এমন দক্ষতা ছিলো না যে হোস্টেলের দলের সেরা সেরা খেলোয়ারদের পাশ কাটিয়ে মূল একাদশে জায়গা করে নেওয়া যাবে- আর ক্রিকেট শুধুমাত্র শীতকালীন খেলা ছিলো বলে তেমন খেলা হয় নি সেখানে।

ছুটিতে বাড়ী আসলে ক্রিকেট খেলা হতো, ততদিনে সেই রোগা-পটকা-ছোট্টো ছেলেটা থেকে চিকন-চাকন হ্যাংলা ছেলেতে পরিনত হয়েছি- লম্বায় বেড়েছি অন্তত ১ ফুট, স্বাস্থ্য তেমন বাড়ে নি, কিন্তু নিয়মিত জীবনযাপনে এক ধরণের ব্যালেন্স তৈরি হয়েছিলো। সে সময় আমরা হুটহাট ছোটোখাটো দলের সাথে খেলে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতাম- প্রায় অবধারিত ভাবেই জিততাম। দুর্বল দলের সাথে খেলতে খেলতে আত্মবিশ্বাসও বেড়েছিলো-

আমার ঢাকায় পড়তে আসা আরছুটিতে ফেরত যাওয়ার মাঝখানে মহল্লায় বিশাল একটা পরিবর্তন এসেছিলো, আমরা যেখানে মার্বেল দিয়ে ক্রিকেট খেলতাম সেখান তৈরি হওয়া বাসায় নতুন ভাড়াটে এসেছে, বিশাল পরিবার, ৬মেয়ের এক ভাই, তারা বিভিন্ন সময়ে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের খেলা দেখে আর আমরাও পরম উৎসাহে আমাদের কসরত দেখাই। খেলোয়ারদের উদ্দীপনা বাড়ে , গলার আওয়াজ চড়া হয়, কৈশোরের দৃষ্টি আকর্ষণের নানাবিধ উদ্যোগ সেসব আচরণে থাকে।
তাদের চোখের সামনে দিয়েই স্ট্যাম্প-ব্যাট নিয়ে খেলতে যাই, হিপ হিপ হুররে হিপ হিপ হুররে করতে করতে ফিরে আসি।

সে আত্মবিশ্বাস নিয়েই একদিন ক্ষ্যাপ খেলতে গেলাম পার্বতীপুর, সেখানে সৈয়দপুরের সাথে খেলা, আমরা ১১জন গিয়েছি খেলতে, সবাই মোটামুটি কাছাকাছি বয়েসের এবং ততদিনে মহল্লার আশেপাশের দুর্বল দলগুলোকে নিয়মিত হারাতে হারাতে এক ধরণের ভাব চলে এসেছে নিজেদের আচরণে।
পার্বতীপুরে ট্রেনে করে পৌঁছালাম যখন তখন দুপুর, দুপুরে খেয়ে বিকেলে প্রাকটিস করতে যাবো- বিভিন্ন বাসার সামনে-পেছনে হেঁটে যে মাঠে পৌঁছালান সেটা ধানক্ষেত, কয়েকদিন আগেই ধান কাটা হয়েছে, ধানের নাড়া তখনও সেখানে আছে, পীচের এক পাশে ক্ষেতের আল অন্য পাশে ব্যাটিংয়ের স্ট্যাম্প লাগানো, শক্ত এবরেথেবরো মাটিতে খালি পায়ে বল করা রীতিমতো অসম্ভব। পায়ে ধানের নাড়া কিংবা শক্ত মাটর গুঁতো লাগে- আহা উঁহু করতে করতে প্রাকটিস শেষ করে সারারাত বিভিন্ন ধরণের ফাজলামি করে কাটলো।

পরদিন সকালে সত্যিকারের ক্ষ্যাপ খেলতে গেলাম- রেলওয়ে স্টেশনের পাশের মাঠ, বিশাল মাঠ, এক পাশে দেয়াল, দেয়ালের কিনার ধরে গাছ, অন্য পাশেও গাছ, সেটাই বাউন্ডারি। চৌহদ্দি হিসাব করলে আমাদের মহল্লার মাঠের চেয়ে অনেক বড়, বিপক্ষ দল ব্যাটিং করছে, আমরা বিভিন্ন ভাবে বল করছি- প্রায় নাজেহাল অবস্থা- সৈয়দপুরের টিমটা আমাদের চেয়ে অনেক অনেক ভালো টিম ছিলো, যখন ওদের ইনিংস শেষ হলো তখন আমাদের প্রতি ওভারে প্রায় ৯ রান করে লাগে- আমরা কোনো সময়ই ওভারে ৫ রানের বেশী চেজ করি নি।

সুখের সময় দ্রুত শেষ হয়ে যায়, আমাদেরও ব্যাটিং করতে নামতে হলো, আমরা যেখানে খেলতাম সেখানে অফ সাইডে খেলার কোনো সুযোগ ছিলো না, সোজা আর লেগ সাইডে তুলে মারার বাইরে অফ সাইডে খেলার কোনো অভ্যাস ছিলো না। সৈয়দপুরের বোলাররা সবাই অফ স্ট্যাম্পে বল করছে, কোনোভাবে এক রান হয়, দুই রান হয়, কিন্তু ওভারে ৯ রান হয় না কোনোভাবেই।

এর ভেতরেই ব্যাটসম্যান উড়িয়ে মারার চেষ্টা করছে, মহল্লার মাঠের সীমানায় যেসব অনায়াসে ছয় হওয়ার কথা সেসব সোজা জমা হচ্ছে ফিল্ডারের হাতে, টপাটপ উইকেট পড়ছে, এর ভেতরেই আসলো ম্যাজিক বোলার, পরবর্তীতেও এমন অদ্ভুত বোলিং একশন আমি খুব কম দেখেছি। পপিং ক্রীজের একেবারে কোণা থেকে সোজা বল ডেলিভারি দেয়, বলটা অফস্ট্যাম্পের ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুট বাইরে পরে তারপর সোজা চলে আসে, কিন্তু ডেলিভারি এঙ্গেলের জন্য সেই সোজা বের হয়ে যাওয়া বলটা গিয়ে লাগে অফস্ট্যাম|পে কিংবা মিডল স্ট্যাম্পে।

অফস্ট্যাম্পের এমন বাইরের বল সোজা ব্যাটেই খেলার নিয়ম কিন্তু এঙ্গেলটা দীর্ঘ পরিচর্যায় তৈরি বলে আর আমাদের ভেতরে কেউই এমন বোলিং খেলে অভ্যস্ত না বলে আউট হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাকে বাধ্য হয়েই ব্যাটিং এ নামতে হলো। ব্যাটিং এর সময় আমি নার্ভাস থাকি, প্রথম রানটা যদি প্রথম বলে হয়ে যায় তাহলে এক ধরণের আত্মবিশ্বাস পাই কিন্তু কোনোভাবে বল ব্যাটে না লাগলে সেটা দ্বিগুণ-তিনগুণ এভাবে বাড়তে থাকে।

এখন হয়তো দুইটা স্ট্যাম্প গার্ড নিয়ে দাঁড়াতাম, যখন উল্টাপাল্টা শট খেলতে হবে তখন লেগ স্ট্যামপে গার্ড না নিয়ে মিডল স্ট্যাম্পে গার্ড নিলে সুবিধা। কিন্তু তখন লেগ স্ট্যাম্প ছাড়া গার্ড নেওয়ার কথা ভাববার মতো পরিপক্কতা ছিলো না। যথারীতি সেই ম্যাজিক বোলার বল করতেছে, আমি বল খেলতে গিয়ে ব্যাটে লাগাতে পারছি না। চোখ-মুখ লাল হচ্ছে- উইকেট কীপারও গঞ্জনা দিচ্ছে- এক ধরণের অসস্তিকর অবস্থা- কত রান করেছিলাম মনে নাই, শেষ পর্যন্ত অফ স্ট্যাম্পের বাইরের একটা বল পয়েন্টের উপর দিয়ে মারলাম

ছুটির দিন, রেলওয়ে স্টেশনের পাশের মাঠে খেলা, মাঠ ভর্তি দর্শক, তাদের চোখের সামনে এমন হেনেস্তা বিব্রতকর, শট মেরে বেশ আনন্দিত- দুরে অনেকগুলো দর্শকের মাথা- সেখানেই সীমানা, বল ও দিকেই যাচ্ছে- সেখানে কোনো ফিল্ডার নাই, ছয় না হলেও চার হওয়া ঠেকায় কে- স্লো মোশান ছবির মতো সেই দর্শকের ভেতর থেকে একজন দু:স্বপ্নের মতো বের হয়ে আসলো, একটু হেঁটে সীমানার কাছ থেকে ক্যাচ ধরলো। আমি ফিরে আসলাম প্যাভিলিয়নে।

আমরা এর কিছুক্ষণ পর অল আউট হয়ে বিপুল ব্যাবধানে হেরে ফিরে আসলাম। আমাদের মেজবান বেশ দয়ালু মহিলা ছিলেন, মহল্লার মেয়ে, স্বামীর সাথে পার্বতিপুরে থাকেন, তার ছেলের উৎসাহেই আমাদের এখানে আসা, আমরা হেরে ভীষণ রকম লজ্জিত-বিব্রত-ক্ষুব্ধ হয়ে দুপুরে খেয়ে কোনোমতে পালানোর সুযোগ খুঁজছি- এত বড় বড় কথা বলে এত দুর এসে এমন ন্যাক্কারজনক পরাজয়ের পর মুখে হাসি থাকে না। পালানোর উপায়ও নেই, দিনাজপুরে যাওয়ার ট্রেন আসবে বিকেলে তখন পর্যন্ত এই শহরে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ট্রেন আসলো, আমরা বিভিন্ন ভাবে মুখ লুকিয়ে উঠলাম ট্রেনের কামরায়- স্টেশনের প্লাটফর্মে একজন এসে বললো আপনি আজকে খেললেন না ?
আমি অস্বীকার করতে পারতাম হয়তো কিন্তু প্রশ্নকর্তা তেমন যুদ্ধংদেহী না বলে মিনমিনে স্বরে বললাম হ্যা আমিই সেই হারু দলের একজন।
আপনার মারটা খুব সুন্দর ছিলো, আর একটু হলেই ছয় হতো।

এইসব সান্তনার কথায় মাথা আরও গরম হয়, বললাম ভাই হতে তো পারতো অনেক কিছু কিন্তু ছয় না হয়ে আউট হয়ে গেলাম আর খেলায়ও হারলাম। ছয় হতে পারতো আর ছয় হওয়ার ভেতরে অনেক পার্থক্য।

হতে পারে আমার উত্তরটা অনেক রুঢ় কিন্তু লজ্জাজনক পরাজয়ের পর কোনো সান্তনা কিংবা পাশ কাটানো অজুহাত চলে না। একেবারে অযোগ্য-অদক্ষ হিসেবেই হেরেছি খেলায়।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অনেক দিনের পর,
কিন্তু আবার হুট কইরা শেষ! Puzzled

তানবীরা's picture


বললাম ভাই হতে তো পারতো অনেক কিছু কিন্তু ছয় না হয়ে আউট হয়ে গেলাম আর খেলায়ও হারলাম। ছয় হতে পারতো আর ছয় হওয়ার ভেতরে অনেক পার্থক্য।

আমিও এ কথাটা খুব মানি

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কালকে কলকাতা নাইট রাইডারের অবস্থাটা দেখেন। লাস্ট বলে প্রতিপক্ষের দরকার ছিলো ৫ রান। বেটা বলার এমন বল করলো, আর ব্যাটসম্যান এমন মার মারলো যে বল উড়ে গিয়ে এক্কেবারে সীমানার বাইরে... ৬ Crazy
কী খারাপটাই না লেগেছে... Sad

মাহবুব সুমন's picture


কোন হাউসে ছিলেন?

রাসেল's picture


নজরুল ইসলাম

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.