ইউজার লগইন

রান্না রান্না

সম্ভবত ৩ বছরের বেশী সময় পরে আজকে রান্না করলাম, শেষ বার কোন এক ঈদে অনেক যত্ন করে মুরগীর হাড় রান্না করেছিলাম, যদিও এরপরে আর আম্মাকে জিজ্ঞাসা করা হয় নি, কেনো এত যত্ন করে মাংস কেটে হাড় সাজিয়ে রেখে দিয়েছিলো ফ্রিজে? প্রায় ১ ঘন্টা পরিশ্রম করে রান্না করা মুরগীর হাড় খেতে পারি নি, ঈদের দিন ডিনার করেছিলাম বিএফসির চিকেন আর বান দিয়ে।

আমার রান্না ঘরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় বাসার লোকজন চলে গেলে, একা বাসায় ফ্রিজে রাখা রান্না খেয়ে চমৎকার চলে যায়, কিন্তু বসে বসে খেলে রাজার ভান্ডারও শেষ হয়ে যায় একদিন, ফ্রিজের জমানো রান্নাও শেষ হয়, সব চিল ঘরে ফিরে আর আমি ঘর থেকে রান্না ঘরে যাই। আমার রান্না করতে খুব একটা খারাপ লাগে না, শুধু যদি কেউ কেটে-বেছে দেয় আমি আগ্রহের সাথে রান্না করতে রাজী- শুধু এই পিয়াজ মরিচ কাটা, সবজি কাটা- মাংসা কাটা কুটা আমার পছন্দ না।

১০ বছর আগে হলেও এইসব সময়ে রান্নার দায়িত্বটা বন্ধুর মায়ের উপরে ছেড়ে দেওয়া যেতো, সে রকম দিনগুলোতে দুপুরে এক বন্ধুর বাসা গিয়ে বললেই হতো আজকে দুপুরে তোর বাসায় খাবো- খাওয়া শেষ হলে বলতাম রাতের খাওয়ার সাথে দিতে হবে, বাসায় গিয়ে গরম করে খাবো, কিঞ্চিৎ গালি দিলেও সাথে এক থালা ভাতও দিয়ে দিতো বন্ধুরা। এখন বন্ধুদের নিজেদের পরিবার হয়েছে, সবার নিজস্ব চাকুরি, বৌবাচ্চা সব মিলিয়ে এখন ওরা ব্যস্ত থাকে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান থাকে, দুপুরে বন্ধুর বাসায় গিয়ে বন্ধুর বৌকে গিয়ে রান্না করে খাওয়ানোর আব্দার জানানোর মতো ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় নি তাদের সাথে। সুতরাং বাধ্য হয়েই নিজের ঘরে রান্নার আয়োজন করতে হলো।

আজকের মেন্যু রুই মাছের ডিম, অনেক সাধ করে বাজার থেকে বড় রুই মাছের ডিম কেনা হয়েছিলো, আশা ছিলো সেটা আম্মা রান্না করে দিবে, সে শখ পুরণ হলো না, ফ্রিজের রান্নার আকালে ফ্রিজ খুলে দেখলাম ট্যাংরা মাছ, দেখলাম গরুর মগজ, দেখলাম গরুর মাংস, মুরগীর টুকরাও দেখলাম কিছু কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় চুম্বকের মতো টানলো রুই মাছের ডিম।

অনেকে অনেক কথা বলবে, যারা সত্যি সত্যি ভালো রান্না করে তারা প্রতিটি মশলার অনুপাতও বলে দিবে, আমি অবশ্য বিশ্বাস করিঠিক মতো ঝাল, লবন হলে যেকোনো জিনিষই খাওয়া যায়। অন্য মশলাগুলোর আলাদা আলাদা প্রয়োজন আছে, তবে সেগুলো ব্যবহারের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

রান্নার মশলা প্রধানত তিনটা কাজ করে, প্রতিটা খাদ্যের নিজস্ব ঘ্রান আছে, সে ঘ্রান অন্য সব কিছুর চেয়ে আলাদা, পুঁই শাকের গন্ধের সাথে লাল শাকের গন্ধের মিল নেই, পটলের সাথে সজনের গন্ধের মিল নেই, মুগরী সাথে গরু খাসী কিংবা ডিমের গন্ধের মিল নেই, এমন কি প্রতিটা মাছেরও আলাদা আলাদা গন্ধ- এক প্রকারের মশলা- হলুদ, রসুণ- জিরা- গরম মশলা এই গন্ধ দুর করার কাজটা করে।
অন্য এক প্রকারের মশলা এতে বাড়তি ফ্লেভার যোগ করে, এ কাজে সবচেয়ে বেশী ব্যবহার হয় কাঁচা মরিচ, জিরা, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ
আর অন্য কাজটা হলো স্বাস্থ্যগত- আদা রসুন লবঙ্গ একই সাথে স্বাস্থ্যগত দিকটাও দেখে

বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি খিচুড়ীর গন্ধটা মূলত আদা, জিরা, তেজপাতা, কাঁচা মরিচ আর লবনের কোনো একটা মিশ্রণ, এই চারটা মশলা না দিলে কোনোভাবেই সে গন্ধ আসবে না।

আমার সবচেয়েপছন্দের খাওয়ার ভাত ভাজা, সেই শৈশবে যেটা রান্না করা শিখেছিলাম, পিয়াজ আর কাঁচা মরিচ গরম তেলে লবন দিয়ে ভাজলে যে গন্ধটা বের হয় সেটাই ভাজ ভাজা স্বাদু লাগার অন্যতম কারণ আমার কাছে, সেই ভাত ভাজার সাথে যদি গরুর মাংসের পোড়া পোড়া ভুনা পাওয়া যায় তাহলে অন্য কিছু লাগে না। অবশ্য এখন ফ্রিজের যুগে ভাত ভাজা খাওয়া হয় না, আর ভাত ভাজা মানেই এখন ফ্রায়েড রাইস, সেই ক্ল্যাসিকাল যুগ পেছনে ফেলে এখন ভাত ভাজার সাথে পিয়াজ ডাটা, গাজর, টেস্টিং সল্ট আর ডিম দিয়ে পুরা বিষয়টাকেই লেজেগোবরে করে ফেললো মানুষ।

আম্মা রান্না করতো স্ট্যু, যদিও বেশ কয়েক দিন আগে জানলাম যেকোনো ঝোল রান্নাই আসলে স্ট্যু- আম্মা শুধু খাসির মাংসের স্ট্যু রান্না করতো- খাসীর মাংসের বিশ্রী একটা গন্ধ আছে, অন্য যেকোনোভাবে রান্না করলে সেটা পাওয়া যেতো কিন্তু স্ট্যুতে কোনো দিনই সেটা পাই নি।
একদিন জিজ্ঞাসা করে জানলাম কিভাবে স্ট্যু রান্না করতে হয়-বললো স্ট্যুতে কোনো সময়ই হলুদ দেওয়া যাবে না, সব মশলাই গোটা দিতে হবে, আদার পেস্ট দেওয়া যাবে না, গুড়া দেওয়া যাবে না, কেটে দিতে হবে,
বড় বড় করে পিয়াজ কেটে দিতে হবে, জিরা ভেজে দিতে হবে গোল মরিচ গোটা দিতে হবে , শুকনো মরিচ ভেঙে দিতে হবে। যদি ধনিয়া পাওয়া যায় তাহলে ধনিয়াটাও ভেজে ফেলে দাও। বেশী করে লবন আর পানি দিয়ে সোজা চুলায় দিয়ে দাও, সাথে কয়েক কোয়া রসুন- তার পর আরাম করে নিজের কাজ করো, একটা সময় মাংস সিদ্ধ হয়ে যাবে, নামিয়ে খেয়ে ফেলবে-
সে পদ্ধতি মেনেও ঠিক স্বাদটা পাই নি। কোনো একটা পরিমাণগত ঝামেলা হয়েছিলো নিশ্চিত ভাবেই।

আজকেও রুই মাছের রান্নায় সেই চিরন্তন গন্ধ মারো, ফ্লেভার দাও পদ্ধতি নেওয়া হলো । গন্ধ মারার জন্য দিলাম হলুদ আর রসুন

সেই সাথে কাঁচা মরিচ আর পিয়াজ দিলাম ফ্লেভারের জন্য-
গুড়া মরিচ আর লবন দিলাম, শুধুমাত্র লবন নিয়েই চিন্তায় ছিলাম, বেশী হয়ে গেলে খাওয়া যাবে না। ব্যাক আপ প্লান হিসেবে রান্নার শেষে দিলাম টমেটো, টমেটো বাড়তি লবন শুষে নেয়-

রান্না শেষে খেয়ে দেখলাম খুব একটা খারাপ হয় নি জিনিষটা, কিন্তু ঠিক ফ্লেভারটা আসে নাই। আমার ধারণা ডিমের পরিমাণটা বেশী হয়ে গেছে, আমার পরিকল্পনা ছিলো অর্ধেক ডিম রান্না করবো কিন্তু ডিম অর্ধেক করা গেলো না, ডিমটা ফেটে গেলো, সব সাবধানতা বাদ দিয়ে পুরোটাই চুলায় দিয়ে দিলাম।

এই বাড়তি হয়ে যাওয়া ডিমটাই ফ্লেভারের জাত মেরে দিলো সম্ভবত, কিছুই করার নেই, হাঙ্গার ইজ দ্যা বেস্ট সস- প্রচন্ড ক্ষুধায় এই জিনিষই অমৃতের মতো লাগবে। আপাতত ইউরো দেখি, ক্ষিধাটা জমলে ঠিক মতো সাঁটিয়ে দিবো রুই মাছের ডিম- ভাত।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অনিমেষ রহমান's picture


সুন্দর লিখেছেন। রান্না নিয়ে এভাবে লেখা আসলেই শিল্প।
Smile Smile Smile Smile

জ্যোতি's picture


Smile ভাত ভাজা আমার এখনও পছন্দ। চান্স পাইলেই এটা করে ফেলি।
আমার রান্নাবান্নাও লেজেগোবরে অবস্থা। অনুমান করে , কিছু একটা ভেবে এককেটা জিনিস রান্না করি। কখনও ভালো লাগে, কখনও লাগে না।

তানবীরা's picture


খাসির মাংসের স্ট্যু খেতে ইচছে করছে। আগে জ্বর হলে মাংসের স্ট্যু খাওয়া মাষট ছিল। Smile

রাসেল's picture


খাসীর মাংস কেনা হয় না অনেক দিন, এরপরের বার বাজারে গেলে নিয়া আসতে হবে।

তানবীরা's picture


আপনার রেসিপির পর সেদিন করে খেলাম Big smile

রাসেল's picture


কেমন লাগলো? ভালো হইলে আমার ভাগেরটা আমি চাই

তানবীরা's picture


আমি আর আমার মেয়ে দুজনেই অত্যন্ত আনন্দ করে পুরোটাই খেয়ে ফেলেছি এবং আবারো অনুভব করেছি গরুর থেকে খাসীর স্ট্যুই বেটার

৬ টি তার's picture


আপনারে মাইনাস। আবার ক্ষিধা লাইগা গেলো।

বিষাক্ত মানুষ's picture


আরে জোস !! আপনে তো তাইলে হানিমুন পিরিয়ড কাটাইতাছেন Cool

গতকাল আপনার এলাকার আশে পাশে আড্ডা দিলাম সবাই কিন্তু আপনের নাম্বার না থাকার কারনে আপনারে খবর দেয়া গেল না। সবাই আপনারে মিস করছে।

১০

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


এইটা একটা সিরিজ কইরা ফেলেন, ভাই। সেরাম হপে।

আপ্নের লেখা পইড়া এখনি ক্ষিদা লাগতেছে!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.