ইউজার লগইন

জীবনযাপন

মাঝে মাঝে বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করে না, কোনো কারণ ছাড়াই মনটা উদাস হয়ে থাকে, বিশেষ করে একটু রাতে যখন রাস্তায় একা, বিস্তর জ্যাম ঠেলে,বিভিন্ন মানুষের ধাক্কা খেয়ে বাসায় ফিরতে হয়, মনে হয় কি প্রয়োজন এই হুজ্জতি করে বাসা ফেরার, এরচেয়ে বরং কোনো অজানা বাসে চড়ে কোথাও চলে যাই,একটু নির্জন একটু কম ঝঞ্ঝাট যেখানে- কয়েকটা দিন কোলাহলবিহীন কাটিয়ে আসতে পারলে মন্দ হয় না।

বাসা যাওয়ার সিএনজি খুঁজছি, হাতে সিগারেট, বাসটা দেখেই সিগারেট ছুড়ে হুট করেই চলন্ত বাসের হাতল ধরে ঝুলে পরলাম, পাদানিতে একপা আর হাতলে এক হাত, বাকী শরীরটা শূণ্যে ভাসছে, বাসের ড্রাইভার কড়া চোখে তাকিয়ে আছে,কন্ডাকটরও দাঁড়িয়ে আছে, নিজেকে সামলে দুটো পা'ই পাদানিতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ড্রাইভার বললো কই যাইবেন আপনে?

আমি বাসের পাশে লেখা গন্তব্যের নাম দেখে বললাম ধানমন্ডি-
এইটা ধানমন্ডি যাইবো না, যাইবো রায়েরবাগ, না জিগায়া এমন উঠলেন ক্যান?
আমার কাছে অবশ্য ধানমন্ডি রায়েরবাগ কোনোটারই কোনো গুরুত্ব নাই, কিছু একটা ভাবছিলাম লাফ দেওয়ার আগে, পা পিছল সে ভাবনাটাও পেছনে ফেলে এসেছি, সেই হারিয়ে যাওয়া ভাবনার খেঁই খুঁজে পাচ্ছি না, হতভম্ভ দুজনের চোখের সামনে দিয়ে একেবারে বাসের পেছনের সীটে গিয়ে বসলাম। অবশ্য বেশী দুর আগানো গেলো না, মোড়টা ঘুরতেই বিশাল জ্যাম- রিকশা-বাস-ট্রাক-সিএনজি-মানুষ আর কাভার্ড ভ্যানের জনসভায় আটকা পরে ভাবছি এখন কিভাবে নেমে যাবো বাস থেকে- আমার অন্তত রায়েরবাগের দিকে কোনো কাজ নেই, কোনো পরিচিত মানুষও নেই- কন্ডাক্টর আসলো, বললাম আমি তো যাত্রাবাড়ী যাবো না, এখানেই নেমে যাই

প্রায় উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটা, শুধু জিজ্ঞাসা করতে হয় বলেই খালি রিকশা থামিয়ে বলছি যাবে?
রিকশা থামছে, ভাবছি আসলে আমি কোথায় যাবো? এই রাত দশটায় আসলেই আমার কোথাও যাওয়ার নেই, বাসায় ফিরে যেতে কোনো আগ্রহ পাচ্ছি না, মাঝে মাঝেই আমার এমন অনুভুতি হয়, বিশেষ করে একলা ফিরতে হলে-

রিকশাওয়ালা ভাড়া বলে, আমি মোটামুটি অর্ধেক একটা ভাড়া বলে অপেক্ষায় থাকি সে আমাকে নিয়ে যাবে, রিকশাওয়ালা দাঁড়ায় না, আমি হাঁটতে থাকি- বাস থামে, নিতান্ত আলস্যে বাসের দিকে ছুটে যাই না, কি প্রয়োজন এত দৌড়ঝাঁপের এমনও না যে রাত ১টায় বাসায় পৌঁছালে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে-

আমার ভেতরে হয়তো কিঞ্চিৎ ভবঘুরে ভাব আছে, কলেজের সম্পূর্ণ সময়টাই প্রায় রাতেই রাস্তায় হেঁটে হেঁটে কাটিয়েছি- একেবারে নির্জন শহরে শুধু স্টেশনের চায়ের দোকানীরা জেগে থাকে, আর জেগে থাকে হাসপাতালের আশেপাশের কয়েকটা দোকান, সেখানে সব সময়ই কিছু না কিছু মানুষ থাকে- বাসা বদল করে নতুন বাসায় যাওয়ার পরও কোনো কোনো দিন এমন হলে বাসার চাবি পকেটে নিয়ে আম্মাকে বলে বের হয়েছি দরজা লাগানোর দরকার নেই, আবাসিক এলাকার নির্জন শুনসান পথ থেকে রেলঘুমটি পেরিয়ে হাসপাটালের গেটে এসে চা সিগারেট শেষ করে, রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে- আরও একটু সামনে ঘুমন্ত প্রেমিকার বাসার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চলে আসা, সেও জানে না আমি তাকে তাকে পছন্দ করি।

এখন সেই সময় নেই, জীবনও অনেক বদলে গেছে, এই সব সময়ে অসময়ে মন বিষন্ন হয় না, বরং এখন জীবন নির্জনতা চায়, কয়েক দিনের জন্য এই নিত্যদিনের জীবনযাপন থেকে আলাদা রকম কিছু ,কোনো ভাবনাবিহীন এক ধরণের অবসর চায়। আমার এক বন্ধুর নেশা বেশী হলে ও গভীর রাতে অন্য বন্ধুদের ফোন করতো- ফোন দিয়েই ব্যস্ত হয়ে বলতো এই হাতের কাছে কাগজ কলম আছে? খুব জরুরী কথা আছে তোর সাথে
বন্ধু ঘুম থেকে উঠে কাগজ কলম খুঁজে এসে বলতো হ্যাঁ আছে বল কি লিখতে হবে?
ও বলতো বন্ধু সময় তো চলে যাচ্ছে, জীবনে কি পাইলাম আর কি পাইলাম না সেই হিসাবটাতো মিলাতে হবে দোস্তো-
অধিকাংশ সময়েই তাকে গালি দিয়ে ফোন নামিয়ে রাখতো বন্ধুরা , এখন মনে হয় আসলেই জীবনে কি পাইলাম আর কি পাইলাম না হিসাবটা মেলানো প্রয়োজন।

দার্জিলিং থেকে ফিরছি, ঈদের আগের দিন, বন্ধুরা সবাই ঢাকায় যাবে, আমি মাঝপথে নেমে দিনাজপুর যাবো- রংপুরের মর্ডান মোড়ে নামছি, একজন বললো তুই বাসায় না গিয়ে দিনাজপুর যাচ্ছিস কেনো? তুই ঢাকায় যাবি না?
আমি হেসে ফেললাম, ও বললো তোর কাছে টাকা পয়সা আছে তো ? দেখ লাগলে নিয়ে যা, আমরা তো বাসায় যাচ্ছি আমাদের সমস্যা হবে না।

রাট ৩টায় মর্ডান মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি- পরবর্তী বাসটা কখন আসবে জানা নেই, বন্ধুদের বাসটা চলে যাওয়ার পর শুধু অন্ধকার- একটু দুরে টং এর দোকানে আলো জ্বলছে- সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম- একটা রিকশা আসলো, বললো ভাই কই যাইবেন?
বললাম দিনাজপুর যাবো
উঠেন, আপনাকে বাসে উঠায়া দিয়া আসি
সেই টেনে নিয়ে মাঝরাস্তায় বাস থামিয়ে আমাকে তুলে দিলো, রিকশা ভাড়ার চেয়ে সামান্য বেশীই হয়তো পেয়েছে কিন্তু যাওয়ার আগে কন্ডাক্টরকে বলে গেছে ভাইকে ঠিক মতো নামায়া দিও

বাসের ইঞ্জিন কভারে বসে আছে, পেছন থেকে একজন বললো কি রে তুইও দিনাজপুরে যাচ্ছিস।
তাকিয়ে দেখি ফার্মেসীর এক বন্ধু, ওর বাসাও যে দিনাজপুরের ও দিকে জানা ছিলো না। ওর সাথে সিট শেয়ার করে বাকি পথটা দিব্যি চলে আসলাম।

প্রেমিকারবিয়ে ঠিক হয়েছে, শেষ বার দেখা , আর কখনও দেখা হবে না,ভুলে যেও ভালো থেকো , আমি আর্তনাদ করছি, সে চিৎকারের কোনো অর্থ নেই, ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম ভেঙেছে, দেখি ঘরে আলো জ্বলছে, পাশে খোলা বই, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কোনোমতে সকালে উঠে সোজা শাহজাহানপুর বাজার, সেখানে ১৫ টাকায় ১৫ মিনিট কথা বলা যেতো- শুধু গলার স্বর শুনতে চাওয়ার ব্যকুলতাও পরবর্তীতে স্থিমিত হয়ে গেছে, আমি ততদিনে জেনে গেছি মূলত ভালোবাসা নিজের নির্মাণ- নিজের কল্পনারর বিস্তার- এমনটা হলে ভালো হতো- এমন সময় তুমি পাশে থাকলে ভালো লাগতো কথাগুলো নিছকই বাক্যবিস্তার-

আমার ভেতরের কথাগুলো কাউকে তেমন করে বলা হয় না, এই ভবঘুরেবাসনা কিংবা কিছুটা একা থাকতে চাওয়া যতটুকু সত্য-তারচেয়ে অনেক কম আমি মানুষের সঙ্গ চাই- আমার নিজের কল্পনার সাথে আমার বাস্তবের জীবনযাপনের মিল থাকতেই হবে এমনও কোনো কথা নেই- নিজের ভেতরে একটা আলাদা জগত তৈরি করে আমি সেখানেই বসবাস করি-

এর বাইরেও আমার একটা সামাজিক জীবন আছে- সে জীবনে অনেকের সাথে দেখা হয়, কথা হয় কিন্তু সবার সাথে মন খুলে কথা বলা হয় না। আমার না বিয়ে ঠিক হয়েছে- ছেলে দেখছে- আমাকে দেখতে এসেছিলো এইসব গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম কিন্তু নিজের ভেতরের কল্পনার মেয়েটাকে এতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলাম, তার কোনো প্রয়োজন ছিলো না।

আমাদের জীবনের পথ দুই দিকে চলে গেছে, কখনও দেখা করবো না, কখনও কথা হবে না প্রতিশ্রুতি এখনও আছে- সে ভালো আছে কিংবা কষ্টে আছে জেনেই বা আমার কি? তার আনন্দ কিংবা কষ্টের সাথে আমার লেনদেন নেই কোনো। ভালো আছে জানলে ভালো লাগবে কিন্তু যদি জানি কষ্টে আছে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। নিজেকেও এড়িয়ে যাই- যদি হঠাৎ কোনো রাস্তায় দেখা হয়ে যায় হয়তো উল্টো পথে হেঁটে যাবো, তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব অস্বীকার করেই ফিরে যাবো, যদিও জানি বুকের ভেতরে দ্রিম দ্রিম মাদল বাজবে, জানি প্রতি মুহূর্তে উৎকর্ণ অপেক্ষা করবো তার ডাকের, কিন্তু ফিরে যেতে হবে

যদি এমন অসস্তিকর কোনো মুহূর্তে দেখা হয়ে যায়, শুধু একটা কথাই তাকে বলবার আছে
তোমার প্রত্যাশা মেটানোর মতো তেমন উচ্চতায় নিজেকে উঠাতে পারি নি। দায়টুকু শুধুই আমার- যদি সম্ভব হয় ভালো থাকো, আমি তো নিজের মধ্যে ভালো আছি- দিব্যি সংসার গুছিয়ে বসে আছি- বাসা ফিরলে ছেলে ছুটে এসে বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পরে, মেয়েটাও প্যান্টের কোনা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, হাসে- এই হাসিটুকুই জীবনের সব

আমাদের বেঁচে থাকতে হয়, বেঁচে থাকবার পথে অনেক রকম দুর্ঘটনা ঘটে যায়- সেসব দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণের বিষন্ন দিন মাঝে মাঝে ফিরে আসে- আর ফিরে আসে ভবঘুরে ভাবনা ,

মাঝে মাঝে অকারণেই ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না, তারপরও ফিরে আসি, ফিরে আসি নিজের সন্তানের কাছে- সন্তানের হাসিমুখ দেখে মনে হয় বেঁচে থাকা এখনও আনন্দের।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অনিমেষ রহমান's picture


অনেকদিন এতো সুন্দর লেখা পড়িনি; এতো ভালো লাগলো কেনো?
মানবজীবন বড়ই আজিব-আজব।
সাথে আছি।

রাসেল's picture


ধন্যবাদ

আরাফাত শান্ত's picture


আমাদের বেঁচে থাকতে হয়, বেঁচে থাকবার পথে অনেক রকম দুর্ঘটনা ঘটে যায়- সেসব দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণের বিষন্ন দিন মাঝে মাঝে ফিরে আসে- আর ফিরে আসে ভবঘুরে ভাবনা

চমৎকার বলছেন!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


প্রচন্ড ঘোর লাগা একটা লেখা।

সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা,
আপনার মনে আরও কিছু শান্তি জমা পড়ুক। ভাল থাকুন।

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


আমার ভেতরের কথাগুলো কাউকে তেমন করে বলা হয় না, এই ভবঘুরেবাসনা কিংবা কিছুটা একা থাকতে চাওয়া যতটুকু সত্য-তারচেয়ে অনেক কম আমি মানুষের সঙ্গ চাই- আমার নিজের কল্পনার সাথে আমার বাস্তবের জীবনযাপনের মিল থাকতেই হবে এমনও কোনো কথা নেই- নিজের ভেতরে একটা আলাদা জগত তৈরি করে আমি সেখানেই বসবাস করি-

আমি ততদিনে জেনে গেছি মূলত ভালোবাসা নিজের নির্মাণ- নিজের কল্পনারর বিস্তার- এমনটা হলে ভালো হতো- এমন সময় তুমি পাশে থাকলে ভালো লাগতো কথাগুলো নিছকই বাক্যবিস্তার-

টিপ সই

~

রায়েহাত শুভ's picture


অদ্ভুত ঘোরজাগানিয়া লেখা...

শিমুল's picture


বরই বিচিত্র জিবন

তানবীরা's picture


অসাধারণ লেখা

মাঝে মাঝে অকারণেই ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না, তারপরও ফিরে আসি, ফিরে আসি নিজের সন্তানের কাছে- সন্তানের হাসিমুখ দেখে মনে হয় বেঁচে থাকা এখনও আনন্দের।

এটাই জীবনের সারসত্য। যা করতে ইচছে করে না, তাও করিয়ে নেয়ার টান

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.