কখু
সৌরজগতের অন্য সকল গ্রহ বাদ দিয়ে পৃথিবীতেই কেনো জীবনের বিকাশ হলো এই প্রশ্নের উত্তর নেই। কিভাবে প্রাণের বিকাশ হলো সেটা নিশ্চিত বলা না গেলেও ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি বছর আগের কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের উপজাত হিসেবে সৌরজগত তৈরি হয়েছে, এ তথ্যটুকু নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়। আমাদের আকাশের পরিচিত সূর্যটা সুপারনোভা বিস্ফোরণের উপজাত না কি পৃথক একটি নক্ষত্র সেটা নিশ্চিত বলা যায় না।
পৃথিবীতে প্রাণ বিকাশের, আরও স্পষ্ট করে বললে কার্বনভিত্তিক জীবন উৎপত্তির অনুকুল পরিবেশ ছিলো, সেখান থেকে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানুষের মতো প্রাণীর উদ্ভব ঘটেছে আরও ২০ লক্ষ বছর আগে। যদি আমরা মেনেই নি আমরা সুপার নোভার ধ্বংসাবশেষ তাহলে আজ থেকে ৫০০ কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন প্রথম উদ্ভব ঘটলো সে সময়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা ছিলো ১০০ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস, সেখান থেকে এখনকার ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে পৌঁছাতে কিংবা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের জীবন সৃষ্টির পর্যায়ে পৌঁছাতেও পৃথিবীর তাপমাত্রা কমতে কমতে ১০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশে পাশে আসতে হয়েছে। এর বেশী তাপমাত্রায় পৃথিবীর অধিকাংশ জীবানুই মরে যায়।
প্রথম দিকে তাপমাত্রা কমার হার বেশী হলেও যত তাপমাত্রা কমেছে পৃথিবী শীতল হতে তত বেশী সময় লেগেছে। জীবাশ্ম ঘেঁটে পৃথিবীর প্রথম প্রাণ সৃষ্টির সময়কাল নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব, মোটামুটি ২ কোটি বছর আগে পৃথিবী প্রাণধারণের উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছে।
প্রথমত আমরা কিভাবে এত নিশ্চিত হয়ে বলছি আমাদের জন্ম কিংবা সৌরজগতের জন্ম হয়েছে সুপারনোভা বিস্ফোরণে?
মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে ১২০০ কোটি বছর আগে, সে সময় থেকেই মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, ক্রমেই শীতল হচ্ছে। তাপমাত্রা কমতে কমতে যখন ৩০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশেপাশে পৌঁছেছে সে সময় মহাবিশ্বে প্রথম হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম পরমাণু তৈরি হয়েছে। জন্মের প্রথম ৩ লক্ষ বছরেই মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম পরমাণু তৈরি হয়েছে। এরপর মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম জমে জমে গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে, সেসব গ্যালাক্সির ভেতরে নক্ষত্র তৈরি হয়েছে। এই নক্ষত্রের ভেতরে হাইড্রোজেন জ্বলে হিলিয়ামে পরিণত হয়, হিলিয়াম জ্বলে কার্বনে রূপান্তরিত হয়, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন হয়ে সোডিয়াম ক্যালসিয়াম হয়ে লোহা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই নক্ষত্রের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এটা সত্য শুধুমাত্র সূর্যের মতো খুব সাধারণ ছোটোখাটো নক্ষত্রের ক্ষেত্রে, কিন্ত মহাবিশ্বের সূর্যের চেয়ে অনেক ভারী নক্ষত্র আছে, যখন পারমানবিক ফিউশনে নক্ষত্রের ভেতরে লোহা তৈরি হয়, এরপর নক্ষত্রের তাপমাত্রা কমতে থাকে। নক্ষত্রের তাপমাত্রা কমলে নক্ষত্র আকারে বৃদ্ধি পায়, এই প্রক্রিয়াটা সূর্যের মতো ভরের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে খুব ধীরে ধীরে ঘটে, সূর্য বেঢপ হয়ে ফুলে বিশাল একটা জায়গা দখল করে ফেলে কিন্তু সুর্যের চেয়ে অনেক ভারী নক্ষত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টা কি রকম হয়?
ভারী মৌলগুলো, যেমন লোহা, নিকেল, টাংস্টেন, এরা নক্ষত্রের কেন্দ্রের দিক চলে যায়, নক্ষত্র আকারে বাড়ে, বাড়তে বাড়তে একটা সময় বিস্ফোরিত হয়, ফলে নক্ষত্রের বাইরের অংশটুকু দুরে সরে যায়, নক্ষত্রের ভর কমে, পুনরায় নতুন একটা নক্ষত্রের জন্ম হয়। আমাদের সূর্য এমন দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ পর্যায়ের নক্ষত্র হতে পারে কারণ নক্ষত্রের আকৃতি যত বড় সেটা নিভে যেতে তত কম সময় লাগে।
এই নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ সুপার নোভা বিস্ফোরণ মাত্র কয়েক মিনিটের একটা ঘটনা কিন্তু এই সামান্য কয়েক মিনিটেই নক্ষত্রের ভেতরে পারমাণবিক ফিউশন প্রক্রিয়ায় এমন কি ইউরেনিয়াম তৈরি হয়। ইউরেনিয়ামের ভর ২৩৪ অর্থ্যায় প্রায় ৪টা লোহার পরমাণু ফিউশনের ফলে ইউরেনিয়াম তৈরি হয়। হয়তো এর চেয়ে বড় ভরের কোনো মৌল তৈরি হওয়াও সম্ভব, আমাদের ল্যাবরেটরিতে ইউরেনিয়ামের চেয়ে ভারী মৌল তৈরি করা হয়।
যেহেতু ইউরেনিয়ামের মতো মৌলগুলো শুধুমাত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে তৈরি হতে পারে এবং যেহেতু পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম বিদ্যমান সুতরাং আমাদের পৃথিবীর আশেপাশে সুদুর অতীতে কখনও সুপার নোভা বিস্ফোরণ ঘটেছে। যদি কখনও সূর্যের মৃত্যু হয় তাহলে পৃথিবী নিশ্চিত ভাবেই ঢুকে যাবে সূর্যের বলয়ের ভেতরে।





মন্তব্য করুন