ইউজার লগইন

আমার দেশ আমার পরিচয়

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো এ লেখা মূলত রূম্পার দেশকে জানো দেশকে জানাও ব্লগের মন্তব্যের সম্প্রসারণ।

আমরা যে পরিমাণ বিদেশ চর্চা করি সম্ভবত পৃথিবীর অন্য দেশগুলো সে পরিমাণ বিদেশ চর্চা করে না। ছোটোবেলা জ্ঞান,মেধা প্রমাণের জন্য আমরা ১৪০ দেশের নাম, ভাষা, রাজধানী মুখস্ত করে বসে থাকি। সেটা আমাদের অক্লান্ত জ্ঞানতৃষ্ণার প্রমাণ না বরং এইসব জানলে ভবিষ্যত উজ্জল হলে হতেও পারে এমন একটা অবচেতন ধারণা আছে।

সমস্যাটা আরও বেশী কারণ আমাদের দেশে প্রায় বিনামূল্যেই বিদেশী সব চ্যানেল দেখা যায়, ৩০০ টাকায় ৮০টা স্যাটেলাইট চ্যানেল, রাস্তায় হিন্দি,উর্দু, ইংরেজী, ফ্রেঞ্চ সিনেমা, গান, বিনোদনের জগত এবং একই সময়ে আমাদের বিনোদনের জগতে শূন্যতা কিংবা অপদার্থে পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় আমরা পার্থিব এবং মানসিক সকল প্রয়োজন পুরণে বিদেশমুখাপেক্ষী। । সুতরাং আমরা বিদেশীদের খরবাখবর বেশী রাখি।

যদি স্যাটেলাইট চ্যানেল, ভিসিডি,ডিভিডি,সিডিতে হিন্দি গান না থাকতো, যদি ভারত নিয়মিত বিরতিতে সীমান্তে গুলি করে মানুষ না মারতো, যদি উলঙ্গ করে এ দেশের নাগরিক না পেটাতো তাহলে আমাদের পাশের দেশ হিসেবে ভারতের নাম আমরা জানতাম কিন্তু সেখানে যে এত বিচিত্র সংস্কৃতি আছে সেটা জানতাম না।

আমাদের পাশের দেশ আরো একটা আছে, বার্মা, সেটা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কতটুকু, রাজধানী ইয়াঙ্গুন, নেত্রী অং সাং সুচি, সাম্প্রতিক অন্তর্জাল ও পত্রিকা বিতর্কে জানি ওরা রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। কিন্তু ওদের ভাষা আমরা জানি না। কারণ ওদের তেমন নামকরা অভিনেত্রী নেই, তেমন বিশ্বকাঁপানো ক্লিপিংস নেই, ওদের দুর্ভাগ্য ওরা তেমন কোনো সানি লিওনের জন্ম দিতে পারে নি।

আমরা হলিউড চিনি, আমাদের প্রয়োজনে, সিনেমা না দেখলে আমেরিকা সম্পর্কে একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হতো না, কিন্তু সেই হলিউডের নায়ক নায়িকাদের খবর নিয়মিত পত্রিকায় আসে , সেসবের সংবাদমূল্য আমাদের পাঠকদের কাছে আছে।

আমরা সে তুলনায় নেপাল সম্পর্কে জানি না, ভুটান সম্পর্কে জানি না, আশেপাশে আরও অনেক দেশ আছে যাদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত, মানে যারা দেশ আর রাজধানীর নাম জানাটাকে বড় জানা বলছে সেই জানাটুকু বাদ দিলে।

আমাদের জানা, আগ্রহের জগতটা প্রথমত তৈরি হয় গণমাধ্যমের কল্যানে, সেখানে নিয়মিত যেসব সংবাদ আসে সেসব পড়ে আমরা কিছু জানি, কিছু জ্ঞান পাঠ্যক্রমবাহিত, ভূগোল, অর্থনীতি এইসব জায়গায় দেশের নাম থাকে, সেসব দেশের নাম আমরা জানি, কিন্তু সবচেয়ে বেশী জানি বিনোদনের জগত থেকে। ইতালীর লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির চেয়ে বাংলাদেশে জনপ্রিয় মনিকা বেলুচ্চি, সেটা সংগত কারণেই, লিওনার্দো ততটা আবেদন তৈরি করতে পারে নি।

ভারতের লোকজন মনে করে আমাদের ভাষা উর্দু, আমরা পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য, সে জানাটা সার্বিক ভাবে ভারতীয় পাঠ্যক্রমের জানা। সেখানে ভারতের ইতিহাসে ভারত ভাগ পড়ানো হবে, সেই ভারত ভাগে বলা হবে উর্দু ভাষাভাষি মুসলমানেরা ভারতমাতাকে কেটে দুইভাগ করেছে, আর পাকিস্তান নিয়মিত সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে কিংবা মুসলীম সন্ত্রাসবাদীদের উস্কানি দিচ্ছে খবরের সাথে এইসব যুক্ত হবে। আমরা যে ১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি সেটা ভারতের পাঠ্যক্রমে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? পশ্চিম সীমান্তে তারা পাক-ভারত যুদ্ধ করেছে এ সংবাদটা অনেক বেশি জরুরী তাদের কাছে।

আমাদের বিনোদনের জগতটাও ততটা সমৃদ্ধ না, একই সাথে ভারতের আকাশ উন্মুক্ত হলেও সেখানে আমাদের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো উপেক্ষিত কিংবা ভারতের নিজস্ব কয়েক শত চ্যানেলের সাথে আমাদের চ্যানেলগুলো লড়াই করে বিনোদন দিতে পারছে না। সুতরাং ভারতে আমাদের পরিচিতি থাকবে নগন্য। আমরা ওদের সম্পর্কে যতটুকু জানি, সেই হ্যাংলামি জানাটা ওদেরও জানতে হবে এমন আশা করাটা বোকামি।

তেমন যুযুদ্ধ্যমান অবস্থা না থাকলে, সার্বক্ষণিক প্রচারমাধ্যমে উপস্থিতি না থাকলে কোনো দেশ সম্পর্কে বাড়তি কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হয় না। এটা সামষ্টিক চিত্র, ব্যক্তিগত আগ্রহে অনেকেই অনেক কিছু নিয়ে চর্চা করেন, কিন্তু আমজনতার কাছে যেকোনো দেশের তথ্য প্রথমত প্রচারমাধ্যম এবং দ্বিতীয়ত পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে আসে।
আমাদের নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে এইসব নাম দেশ ফুল ফল, তারিখ ভাষা মুদ্রা নিয়া বাড়াবাড়ি না থাকলে কেউ এইসব পড়তে বলতো না। আমরাও অনেক দেশের নাম জানি এই সংকটে ভুগতাম না।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বাংলাদেশকে চিনে শ্রমিকদের মাধ্যমে কিংবা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে- সেই জানাটুকু একেবারে সীমিত পর্যায়ে, বন্যার দেশ, দুর্ভিক্ষের দেশ হিসেবে আমাদের একটা পরিচিতি আছে, ত্রাণদাতা দেশগুলোর জনগণ এটা জানে।

ভারতের ক্রিকেট পাগল মানুষদের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতি আছে। সেইসব দর্শক যারা ক্রিকেট দেখে তাদের বাইরে আসলে ভারতে বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে যেমন বার্মার অস্তিত্ব সীমিত তেমনই ভারতে আমাদের অস্তিত্ব সীমিত।

আমরা ব্রাডপিটের আন্ডারওয়্যারের রঙ বদলের সংবাদ জানি, কিন্তু আমাদের পাছার প্যান্ট খুলে পরলো না কি আমি ল্যাঙ্গোট পরে আছি সে খবর তো ব্রাড পিটের রাখার কথা না। তারপরও আমার দেশকে ভারত চিনবে না কেনো এইসব বলার ভেতরে একধরণের দেশপ্রেম আর আত্মমর্যাদার প্রশ্ন আছে। সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আর ১০ বছর পরে আমার ধারণা শাহরুখ, অক্ষয় এরা এত বেশি পরিচিত হবে, হিন্দি এত বেশী প্রচলিত হবে, দিল্লী কোলকাতা যেতে যে আমাদের ভিসা লাগে এটাই ভুলে যাবে মানুষ, তারা সীমান্তে কাঁটাতারে ধাক্কা খেয়ে বরং অবাক বিস্ময়ে বিএসএফ দেখবে। বিএসএফ তাদের কোলকাতা , দিল্লী যাওয়ার ভিসা চাইলে তারা তখন উপলব্ধি করবে এই ভাষা এবং এই লোকগুলো তাদের দেশের না।
ভারত যে বিদেশ এটা সম্ভবত বাংলাদেশের নাগরিক মানসে এখনও ততটা প্রতিষ্ঠিত না। ওরা আমাদের পাশের মহল্লার দাদা এমনটাই আমাদের ধারণা, সে ধারণাটা বিনোদনজগতজাত।

আমাদের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো অপরাপর বিদেশী চ্যানেলের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারছে না, তবে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকবার আগ্রহও তাদের কম, অনুষ্ঠান করে দর্শক তৈরির চেয়ে তারা বিজ্ঞাপনের টাকা উপার্জনে অধিকতর আগ্রহী। সুতরাং অনুষ্ঠানের মান কিংবা উপস্থাপন ততটা ভালো হচ্ছে না। একই সাথে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে স্যাটেলাইট চ্যানেল বুস্টের জন্য যেনতেনপ্রকারে অনুষ্ঠান নির্মাণের হিরিকও বেড়েছে। সেসব কারণে বিনোদনের জগতে আমাদের তেমন প্রভাব নেই। আর সেই জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে ভারতীয় চ্যানেল এবং খুব সামান্য পরিমাণে হলেও ইংরেজী চ্যানেল। পরিস্থিতি পালটাতে আমাদের আকাশঘরে পর্দা লাগাতে হবে, সেটা যে বৈশ্বিক গমনাগমন পথ না, সেখানে আমাদের সংস্কৃতির অধিকতর উপস্থিতি কাম্য, সেটুকু কতৃপক্ষ এবং ব্যক্তিকে উপলব্ধি করতে হবে। একই সাথে মাণ উন্নয়নের লড়াইটাও করতে হবে।

যে লড়াইটা সীমিত সামর্থে হলেও করছে কোলকাতা। কোলকাতার নতুন নির্মাতাদের হিন্দি ছবির সাথে লড়াই করতে হচ্ছে। তারা পেছনে না লুকিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করে নতুন ধাঁচের ছবি তৈরি করছে, নতুন ধরণের গান করছে।

অপরাপর ভাষার কি অবস্থা। গত ১০ বছরে অসমীয়া কোনো ছবির নাম মনে করতে পারবে কেউ? ভোজপুরি, নাগপুরি কোনো ছবি? সেসবও ভারতেরই ছবি কিন্তু তা আমাদের দেশে আসে না , ভারতের মূল ভাষা হিন্দিও না, প্রতিটি প্রদেশের নিজস্ব প্রাদেশিক ভাষা আছে তবে হিন্দীর পাশাপাশি অফিস আদালতের ভাষা ইংরেজি।সুতরাং ভারতে হিন্দির চেয়ে বেশী মানুষ ইংরেজী বলে, বলিউডের ছবি দেখে সেটা উপলব্ধি করা কঠিন যদিও। যেহেতু আমরা বিনোদনের মাধ্যমে দেশটাকে চিনি সুতরাং এইসব বিষয় আমাদের মাথায় থাকে না।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

প্রিয়'s picture


সহমত। এখনকার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েরা যেমন বাংলাতে কথা বলাটাকে আন্ডারএস্টিমেট করে, তেমনি বাবা- মাদেরও দেখি ছেলেমেয়েদেরকে বাংলা শেখানোটাকে আনস্মার্টনেস মনে করে।

রায়েহাত শুভ's picture


দেশের স্যাটেলাইট চ্যানেল গুলা নিয়া আপনার বিশ্লেষণ খুবই মনে ধরছে।
আর পুরা লেখাটা পড়তে গিয়া বারেবার মনে হইছে, আসলেই এই মুভি সিরিয়াল দেইখা একটা দেশের কতটাই বা চেনা যায়?

রুম্পা's picture


একদমই চেনা যায় না। একবার ভাবেন, যদি কোন দেশ আমাদের বর্তমান নাটক-সিনেমা দিয়ে আমাদের সম্বন্ধে ধারনা নেয় কি হবে!! Tongue
খালি আমরাই সিরিয়াল দেখে নিজেকে গুলায় ফেলি..তাও সই, যদি নিজের দেশ সম্বন্ধে সঠিক ধারনা থাকে.. Smile

রায়েহাত শুভ's picture


হু Sad আমাদের মেগাসিরিয়াল গুলা দেখলে আমি নিজেই কনফিউজড হইয়া যাই। আমার খালি মনে হয় আমার দেশটা ভর্তি ভাঁড়ে। যারা অনবরত কাতুকুতু দিয়া লোক হাসানো আর প্রেম করা ছাড়া আর কিছুই করে না Sad

তানবীরা's picture


পুরো লেখাটাতেই সহমত পোষন করছি।

ভারত যে বিদেশ এটা সম্ভবত বাংলাদেশের নাগরিক মানসে এখনও ততটা প্রতিষ্ঠিত না। ওরা আমাদের পাশের মহল্লার দাদা এমনটাই আমাদের ধারণা, সে ধারণাটা বিনোদনজগতজাত।

এ কথাটা অনেকবার শুনেছি। ভারত কি বিদেশ?

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


টিপ সই

অনিমেষ রহমান's picture


টিপ সই

রন's picture


আমাদের দেশীও টিভি প্রোগ্রাম তো আমার মনে হয় অনেক ভাল মানের হয়! নাটক থেকে শুরু করে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান গুলো চমৎকার! এইখানেও আসলে আমরাই সমস্যা তৈরি করছি, আমরাই যদি আমাদের প্রোগ্রাম গুলোকে দেখার উৎসাহ না দেখাই বা মান নিয়ে নেগেটিভ মন্তব্য করি তাহলে প্রোগ্রামের মান আসলেই উন্নত হবেনা!

দেশের তুলনামুলক খারাপ জিনিসটাকেও ভালবাসুন দেখবেন, সব কিছু ঠিক যায়গায় চলে আসছে! পাশের দেশের প্রোগ্রাম দেখতে হবেনা!

কিছুদিন আগে এটিএন নিউজে একটি সেলিব্রেটি সাক্ষাতকার অনুষ্ঠান দেখছিলাম(আলী যাকের-এর মেয়ে ও তার সহকর্মী একজন), যেখানে এফ এম রেডীও'র প্রোগ্রাম নিয়ে একজন ফোন করে কিছু কথা বলেছিলেন, এফ এম গুলোতে কেনো শুধু ভালবাসার কথা নিয়েই প্রোগ্রাম হয়? কেনো দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গঠনমুলক আলোচনা হচ্ছেনা, এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন কলার! তো উত্তর টা এমন এসেছিল যে, এফ এম গুলো মূল শ্রোতারা আসলেই এই ক্যাটাগরীর-ই যার কারনেই এমন অনুষ্ঠান করতে বাধ্য হচ্ছেন, যদি শ্রোতারা বিভিন্ন গঠনমূলক আলোচনার অনুষ্ঠান শুনতে চান/আগ্রহ দেখান তাহলে অমন প্রোগ্রাম গুলোই হবে!

আমাদের সংস্কৃতি কে আসলে আমাদেরকেই ধরে রাখতে হবে! নায়ক অনন্ত্য যখন বিশ্ব মানের ছবি তৈরি করার চেষ্টা করে সেই ছবিকে হাসি ঠাট্টায় পরিনত না করে বাহবা দেয়াই উচিৎ! তাহলেই নেক্সট ছবিতে আরো ভাল কিছু করে দেখাতে চেষ্টা করবে!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.