ইউজার লগইন

স্মৃতি লুকানোর ব্যক্তিগত প্রয়োজন

তারেক মাসুদের সম্পাদিত মুক্তির গানে আমরা যে দলটিতে বিভিন্ন শরনার্থী শিবির আর মুক্তাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে দেখেছি তারা সবাই বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সদস্য। ১৪৪ লেনিন সরণিতে বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির আনুকূল্যে সেখানে এই সংস্থাটি গঠিত হয়। সে দলটির দায়িত্বে ছিলেন ওয়াহিদুল হক, সানজীদা খাতুন। মাহমুদুর রহমান বেনু, জিয়াউদ্দিন তারেক আলি,স্বপন বসু শাহীন সামাদ সহ আরও অনেকে।

বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচিত্র নির্মাতাদের বিভিন্ন ধরণের ভংচং থাকলেও তারা আদতে তেমন পরিশ্রম করতে অনাগ্রহী। এই যে মুক্তির গানের শিল্পীরা, তারা সবাই বিভিন্ন পথে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এদের মুক্তির পথযাত্রা নিয়ে চমৎকার, হৃদয়ছোঁয়া চিত্রনাট্য হতে পারে।

আগুনের পরশমনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় নিয়ে নির্মিত সেরা চলচিত্র মনে হয় আমার কাছে। চিত্রনাট্য, উপস্থাপন, প্রত্যেকের অভিনয়, সংলাপের পরিমিতিবোধ আমাকে প্রথমবার যেমন নাড়া দিয়েছিলো অনেক দিন পর দেখে পুনরায় মনে হলো এমন ছিমছাম ছবি আসলেই খুব কম নির্মিত হয়েছে।

নাসিরুদ্দিন ইউসুফ গেরিলা নির্মাণ করলেন, চিত্রনাট্য, উপস্থাপন, ভয়াবহ আবহ সংগীত সব মিলিয়ে ছবিটা আমার কাছে এক ধরণের পন্ডশ্রম মনে হয়েছে। অবশ্য তার লক্ষ্যই ছিলো সহিংসতা উপস্থাপন, সে লক্ষ্যে তিনি সফল, গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির যথার্থতাটুকু নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের দায়িত্ব স্বার্থকভাবে সম্পন্ন করেছে। ভয়াবহ ভিজ্যুয়াল সহিংসতার সামান্যটুকুও অবশ্য সংলাপ কিংবা অভিব্যক্তিতে আসে নি অভিনেতাদের। আমি যেহেতু দ্বিতীয় বার আবহরর সংগীতের পীড়নের শিকার হতে অনাগ্রহী তাই ছবিটা পুনরায় দেখবার আগ্রহ নেই।

যারা মুক্তির গান দেখেছেন তারা শাহীন সামাদ কিংবা মাহমুদুর রহমান বেনুকে মনে করতে পারবেন অনায়াসে, মাহমুদুর রহমান বেনু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহন করবেন বলে তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগ দেন ১৯৭১ এর মে মাসে

অসহযোগ আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্যায়ে যখন ঢাকা কার্যত সমস্ত বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন সে সময়ে সানজীদা খাতুন রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করছেন, ঢাকা থেকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, উদ্বিগ্ন ওয়াহিদুল হক সেই অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ঢাকা থেকে রংপুর রওনা হলেন মাহমুদুর রহমান বেনু, আলী যাকেরকে নিয়ে। ৫ জনের এই দল ঢাকা থেকে আরিচা ঘাট হয়ে রংপুর পৌঁছান এবং সেখান থেকে রাম সাগর,কান্তজীর মন্দির ঘুরে ফিরে আসেন ঢাকায়।

শাহীন সামাদের সাথে মাহমুদুর রহমান বেনুর পরিচয় যুদ্ধেরও আগে, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে বেনু ক্যাম্প থেকে ঢাকায় আসেন শাহীন সামাদকে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা যখন সীমান্তের ওপারে পৌঁছান পরিচিতজনের মাঝখানে সেটা নিয়ে অমৃতবাজার একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিলো, সংবাদটির শিরোণাম ছিলো "বেনু দৈত্যপুরী থেকে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলো", অবশ্য সে সময়েই মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।

তারা গান শিখছেন, গাইছেন,একটা ভাঙা ট্রাকে চড়ে সীমান্ত শহরগুলোতে শরনার্থীদের উদ্বুদ্ধ করছেন।
এই যে যাত্রা এবং এই বিক্ষুব্ধ সময়ের প্রেম নিয়ে কোনো চিত্রনাট্য কেনো লেখা হলো না এ প্রশ্নটা মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো, কিন্তু দেখা গেলো শাহীন সামাদ নিজেই এই বিষয়টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছেন। তার সাক্ষাৎকার পড়লে মনেই হয় না একজন যুদ্ধবিক্ষত বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে একেবারে ঢাকা শহরে এসে প্রেমিকাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার এই দু:সাহসিক রোমান্টিক ঘটনাটা তার জীবনে ঘটেছে।

শাহীন সামাদ বলেন, ঘৃণ্য এই হত্যাযজ্ঞের পর থেকেই ভাবতে শুরু করি, ঘরে বসে মরলে চলবে না। কিছু একটা করতে হবে। এই চিন্তা থেকেই ১৬ এপ্রিল একটি কালো বোরখা পড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। উদ্দেশ্য ছিল কুমিল্লা হয়ে ভারতের আগরতলা পৌঁছানো। কারণ আমাদের সংগ্রামী শিল্পী সমাজের অনেকেই তখন সেখানে অবস্থান করছিলেন।

ভারত সীমান্তের কাছাকাছি পৌছে কুমিল্লার চান্দিনার কাছে শাহীন সামাদ ও তার সঙ্গীদের গতিরোধ করে পাকসেনারা। সেই ভয়াল ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বাস থেকে নেমে রিক্সা করে যখন সীমান্তের দিক যাচ্ছি। ঠিক তখনই একটি কালো ট্রাক দ্রুতগতিতে এসে আমাদের রিক্সার সামনে এসে দাঁড়ালো। ট্রাক থেকে অস্ত্র উঁচিয়ে লাফিয়ে নেমে এলো তিনজন মিলিটারি। আমরা তো ভয়ে আধমরা। আর বুঁঝি বাঁচার কোনো উপায় নেই। উর্দুতে তারা জানতে চাইলো, তোমরা এদিকে কেন? কোথায় যাচ্ছ? তোমরা কারা? আগেই মুখস্ত করে রাখা ভাঙা ভাঙা উর্দুতে বললাম, শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু মিলিটারিরা বোধহয় বিশ্বাস করলো না আমার কথা। যে রিক্সায় করে যাচ্ছিলাম সেই রিক্সাওয়ালা বুদ্ধি করে সঙ্গে সঙ্গে বললো, ওই তো বিলের অপর পাশে উনার শ্বশুরবাড়ি। ইনি আমাদের গ্রামেরই বউ। একথা শোনার পর মিলিটারি অফিসারটি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েক মুহুর্ত। তারপর বললো, ছোড় দো৷ প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা আমি এখনও ভুলতে পারি নি। তাছাড়া আরেকটা বড় দুঃখের ঘটনা আছে এখানে। যে রিক্সাওয়ালার উপস্থিত বুদ্ধিতে সেদিন আমরা প্রাণে বেঁচেছিলাম, তাকে পরে প্রাণ দিতে হয়েছিল দেশের জন্য। কারণ তিনি শুধু আমাদেরই নয়, ঐ পথে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতা করেছেন। রাজাকারদের মাধ্যমে এই খবর জানতে পেরে পাকসেনারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

প্রথমে আগরতলা, তারপর সেখান থেকে কলকাতা যান শাহীন সামাদ। কলকাতায় পৌছে যুক্ত হন বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সঙ্গে। মাত্র ১৭ জন শিল্পীকে নিয়ে এই সংস্থা কাজ শুরু করলেও পরে এর সদস্য বেড়ে দাঁড়ায় ১১৭ জন। সংস্থার শিল্পীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ঘুরে ঘুরে শরনার্থী শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করে সবার মনে শক্তি ও সাহস সঞ্চার করেন।

মেনে নিচ্ছি মাহমুদুর রহমান বেনু ১৯৭৩ এ যুক্তরাজ্যে গিয়ে তার পিএইচডি গবেষণা সমাপ্ত করতে পারেন নি, গান নিয়েই মেতে ছিলেন বেশী, এ কারণে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও সেই ৭১ পূর্ববর্তী প্রেম তো আর মিথ্যা ছিলো না। শাহীন সামাদ বেনুকে সেখানে রেখে ঢাকায় এসেছেন, নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, এবং আমাদের সুশীল-শোভন শিল্পী সমাজ সম্ভবত শাহীন সামাদের প্রতি সম্মান দেখিয়েই এই চমৎকার ঘটনাটি নিয়ে কোনো চিত্রনাট্য তৈরি করেন নি।

হলিউডে এরচেয়েও সামান্য বিষয়ে অতি চমৎকার ছবি হয়েছে, সেখানে এইসব মানবিক সম্পর্ককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তা দেখে আবেগাক্রান্ত হয়েছি অনেক বার, আমাদের দেশের ছবিগুলোর ভেতরে পরিচ্ছন্নতা ও পরিমিতিবোধের অভাব, অতি অভিনয় প্রবনতা আমাকে পীড়া দিয়েছে । বাংলাদেশের নামি-দামি চিত্রনির্মাতারা সিনেমার আদর্শ হিসেবে মেনেছেন যাত্রাপালার উঁচু গলার অভিনয়কে, সুতরাং অভিব্যক্তিময় অভিনেতা এখানে খুব কম। এবং তাদের এক্সপ্রেশন দেখে সময় সময় বুঝার উপায় নেই এটা কি আনন্দ না কি ক্ষোভ, না কি বিদ্রোহ না কি কোষ্ঠকাঠিন্যের অভিব্যক্তি- এই অদ্ভুত জগতে তারেক মাসুদের সিনেমা একেবারেই ভিন্ন মাত্রার।

তার আত্মজৈবনিক উপলব্ধির পালা শেষ হলে আমি মোটামুটি নিশ্চিত তিনি বেনুর ঘটনাটা নিয়ে ছবি বানাতেন। আশেপাশে এমন কাউকে চিনি না যাকে উদ্বুদ্ধ করে এমন একটা চলচিত্র বানানো যাবে।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


টিপ সই

রুম্পা's picture


বাহ...

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


আপনি নিজেই নেমে পড়েন..

~

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


পুনশ্চঃ এই ব্যাপারে ক্যাথেরিনের সাথেও করতে পারেন...

~

আরাফাত শান্ত's picture


খুজতে থাকেন পেয়ে যাবেন!

রন's picture


অনেক কিছু জানা হইল!
আপনার ইচ্ছা পূরণ হউক!

অনিমেষ রহমান's picture


আবার পড়বো।
ভালো লেগেছে।

তানবীরা's picture


মেনে নিচ্ছি মাহমুদুর রহমান বেনু ১৯৭৩ এ যুক্তরাজ্যে গিয়ে তার পিএইচডি গবেষণা সমাপ্ত করতে পারেন নি, গান নিয়েই মেতে ছিলেন বেশী, এ কারণে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও সেই ৭১ পূর্ববর্তী প্রেম তো আর মিথ্যা ছিলো না। শাহীন সামাদ বেনুকে সেখানে রেখে ঢাকায় এসেছেন, নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন,

অবাক ঘটনাতো। প্রেম বিয়ের কি পিএইচডি পুরবো শরতো ছিল নাকি Shock

রাসেল's picture


সম্ভবত এমন পূর্ব শর্ত দিয়ে প্রেম হয় না। কিন্তু শাহীদ সামাদের সাথে বেনুর বিচ্ছেদের একটা কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তার এই পিএইচডি সমাপ্ত করতে না পারা। সেটা কতটা বেনু কিংবা শাহীন সামাদের বিচ্ছেদের যৌক্তিক কারণ সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই। সম্পর্ক অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলে কিংবা চাহিদা পুরণ না করতে পারলে এমনিতেই ভেঙে যায়, বেনু শাহীনের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে।

পিএইচডি করলে যদি সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভবনা থাকতো তাহলে সেটা করা ঠিক হতো এটা নিয়ে আমার একটা দ্বিমত থাকছেই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.