এবার দিনাজপুরে
অনেক অনেক দিন পর দিনাজপুর গেলাম এবার। প্রতিবারই শহরের চেহারা বদলায়, আশৈশবের পরিচিত শহরটাকে নতুন স্থাপত্যের চাকচিক্যে অচেনা লাগে, পরিচিত সকলের চেহারায় সময় তার আঁচড় রেখেছে, জানি আমার চেহারাতেও সময় তার ছাপ রাখছে তবু মনে মনে এখনও আমি সেই কৈশোরেই আটকে আছি। বন্ধুদের পরিবার বড় হয়েছে, বাচ্চাদের স্কুল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্পের ফাঁকে নিজেদের স্কুল কলেজের গল্পও উঠে আসে সময় সময়।
দিনাজপুরের চায়ের দোকানে চায়ের কাপ ৫ টাকা, বাংলাদেশে শুধু মোবাইল কল রেটের বাইরে একমাত্র চায়ের দামেই এক ধরণের সমতা এসেছে, অন্য কোথাও থেমে এখন আর ভাবতে হয় না চায়ের দামটা কত নিবে, মোটামুটি সমস্ত বাংলাদেশেই ৫ টাকা কাপ চা। ঢাকার কন্ডেন্সড মিল্কের চায়ের বদলে অন্য জেলায় গরুর দুধের চা'ই বেচে , আগে যা ছিলো ৩ টাকা, অর্থনৈতিক মন্দায় সেটা ৫টাকায় পৌঁছেছে। মোড়ের চায়ের দোকানে উঁকি দিয়ে পরিচিত মুখ খুঁজছিলাম, দেখলাম আমি কাউকেই চিনি না। একেবারে অপরিচিত একটা শহরে নিতান্তই অভিযাত্রীর মতো হাঁটছি, গত জন্মের শহরে ফিরে এসে মনে হচ্ছে পরিচিত স্মারকগুলোর উপরে এক একটা নতুন মুখোশ এঁটে দিয়েছে কেউ। স্টেশন রোডের এ মাথা ও মাথা সবখানেই শুধু নতুন মার্কেট, সেসব মার্কেটের পেছনে এখনও বসতভিটা।
শুধু ডাক্তার হতে চাওয়া এক বন্ধু পরে দাঁতের ডাক্তার হয়েছে, তার বাসার সামনের খোলা উঠানের একপাশে ওর দোকান আর অন্য পাশে অন্য দুটো দোকান দেখে বুঝলাম এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না এই বাণিজ্যিক শহরে। যাদের বাসার সামনের খোলা বাগান দেখে একটা সময় ইর্ষাকাতর হয়েছি তাদের খোলা বাগানে ৫ তলা বিপনিবিতান, এত এত দোকানের সারি কিন্তু কিনছে কারা?
দিনাজপুরের অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক, ধান-চাল-আখ-আলু- অন্যান্য সব্জীর দরদামে জীবনের উত্থানপতন, এ বছর ধানের দামে মন্দা, কোনো রকমে উৎপাদন খরচ উঠে এসেছে, দুই মন ধান বেচেও ১১০০ টাকা পাওয়া যাচ্ছে না, গত ৫ বছরে ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, সারের দামও দ্বিগুণ বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, বেড়েছে উফশী বীজের দাম, কিন্তু সেই অনুপাতে ধানের দাম বাড়ে নি, ২০০৬ এ যেই ধানের বস্তা বিক্রী হয়েছে হাজার টাকায়, ২০১২ তে সেই বস্তাই মেরে কেটে ১১০০, কিন্তু এরপরও কেউ ধানের উৎপাদন কমায় নি, কোনোমতে অন্য সকল বিলাসি খরচ বন্ধ রেখে মন্দাকালীন সময় কাটাচ্ছে।
ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না এই অভিযোগ প্রায় সবার কাছেই শুনলাম, তার উপরে দোকানের সংখ্যাও বেড়েছে, এখন এত সব বিনিয়োগ নিয়ে মাথা পাগল অবস্থা সবার। কিন্তু তারপরও তারুণ্যের উচ্ছ্বাস কমে নি।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অপেন এয়ার ড্যান্স ফ্লোরে ডিজে পার্টি হচ্ছে, তেমন আহামরি কিছুই নেই, ব্যাডমিন্টন কোর্টের মতো সমানএকটা জায়গায় আলোর ব্যবস্থা হয়েছে, ছেলে মেয়েরা যাচ্ছে, নাচছে, চড়া হিন্দি গান বাজছে, রিমিক্সের যুগে এই শীত শীত সন্ধ্যায় মাথার উপরে শার্ট ঘুরিয়ে উল্লাসের কোনো আবেদনই নেই আমার কাছে, আমি বড্ড বেশী প্রাচীনপন্থী।
সদ্য বিলেতফেরত এক বন্ধুর গল্প শুনলাম, ওর না কি লোকজনকে চিনতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে, যার-তার সাথে কথা বলছে না ও। ব্যক্তির ওজন মেপে কথা বলা অবশ্য ভালো, আমি নিতান্তই হালকা পাতলা, তাই ওর সাথে কথা বলে নিজের ওজন মাপার সাহস পেলাম না। চায়ের দোকানের পাশের ড্রেনে ভেসে থাকা ফেন্সিডিলের বোতল দেখে বুঝলাম এখনও পরিস্থিতি আগের মতোই আছে, পুরোনো খেলোয়ার চলে গেলেও মাঠ ফাঁকা থাকে না।
প্রতিটি চ্যানেলের সপ্তাহব্যাপী ঈদ আয়োজনের তেমন প্রভাব দেখলাম না জনজীবনে, বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে বাংলাদেশের চ্যানেলে ঘুরলেও হিন্দী এবং ভারতীয় বাংলা চ্যানেলের এদিক ওদিকের ঘুরছে মানুষ। একটা বাংলা নাটকের ৫৩৭তম পর্ব প্রচারিত হচ্ছে দেখলাম, সেটা সপ্তাহে প্রতিদিন দেখায় কি না জানি না কিন্তু টানা দুই বছর একই নাটক প্রতিদিন দেখেও নাটকের প্রতি আগ্রহ কমতে না দেখে বুঝলাম নাটকের ভেতরে তেমন আকর্ষণীয় কিছু নিশ্চিত আছে।
অবশ্য আমার অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর না, দুর্গা পূজার মৌসুম চলছে কোলকাতার নাটকে , মা-কে ভাসান দিয়েও এখনও সে জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারে নি তারা। আমার ধারণা টিভিতে কিংবা বাংলা সিনেমায় সবচেয়ে বিব্রতকর মুহূর্ত ধর্ষণের দৃশ্য দেখা। বেশ দীর্ঘ একটা সময় ধরে বস্ত্রহরণ পর্ব চলে, এর পরবর্তী পর্যায়ে চোখের পানি, কাকুতি মিনতি, আহাজারি একই সাথে দ্রুতলয়ের বাজনা, এক ধরণের অসহায় মুহূর্তে নায়কের আগমণের প্রত্যাশা করতে হয় কিংবা কোনো অলৌকিক দুর্ঘটনায় এই যন্ত্রনা সমাপ্ত হবে এমন প্রত্যাশা নিয়ে সময় কাটাতে হয়।
নাটকের পূজা পর্বে ফাঁকা বাসায় গৃহবধুর প্রায় ধর্ষিত হওয়ার সিকোয়েন্স চলছে, নাটকের দর্শক আমার বন্ধুর মেয়ে, এখনও স্কুলে যায় না। আমিও সপরিবারে সেখানে উপস্থিত, ঋক বেশ অবাক হয়েই দেখছে বস্ত্রহরণ পর্ব, আমি টিভি পর্দা থেকে ওর মনোযোগ অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা করছি, অবশ্য তেমনটা সমভব হচ্ছে না। বন্ধুর মেয়ে চিকন গলায় বলছে পালাও পালাও, ঐ তোমাকে ধরে ফেলবে তো ও। আমি ঘর ছেড়ে উঠানে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, মাঝের বিজ্ঞাপন বিরতির পর পুনরায় সেই ধর্ষণ দৃশ্যের অবশিষ্ঠাংশ সম্প্রচারিত হলো।
বাংলাদেশের নাটক দেখি না আমি, তবে আমার ধারণা এখনও এখানকার নাট্যনির্মাতার বেশ সচেতন ভাবেই এসব রদ্দিমার্কা সিন-সিনারি নাটকীয়তা জমানোর জন্যও নির্মাণ করেন না। যেকোনো মূল্যেই দর্শক ধরে রাখতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা তাদের নেই, যৌনতা বিক্রী হচ্ছে না বাংলাদেশে এমন না। তবে সপরিবারে এমন ধর্ষণ দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে একদিন বাংলাদেশেও বড়দের নাটক তৈরি হবে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের গোপন সঙ্গমদৃশ্য দেখার উত্তেজনা অনেকটাই মিটিয়ে দিচ্ছে মোবাইল ক্লিপিংস। স্থানীয় মেয়েদের সাথে স্থানীয় ছেলেদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের চিত্রায়ন ব্লু-টুথে শেয়ার হচ্ছে। সেসব আড়ালে নিজেদের ভেতরে দেখছে লোকজন, আলোচনা করছে। কিছু কিছু দৃশ্য অবশ্যই গোপননে ধারণ করা হয়েছে কিন্তু অধিকাংশ দৃশ্যই সচেতন সপ্রতিভতায় চিত্রায়িত হয়েছে। সচেতন ভাবেই সেসব চিত্রায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া সাহসী মেয়েদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে আমার, তবে তাদের সাথে হুট করে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে তার শরীরের গোপন বাঁকগুলোর স্মৃতি যে ভাবনায় আসবে না এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। যাদের মেয়ে বড় হচ্ছে তাদের ভেতরে এই এক মোবাইল ক্লিপিংস ভীতির বাইরে আধুনিক দিনাজপুরে তেমন কোনো সংকট দেখলাম না।
একটা সময়যার দাপটে সবাই অস্থির থাকতো তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করার পরও অভিযুক্তদের কেউই আটক হয় নি, রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতা বাংলাদেশের পুলিশের স্বাভাবিক কর্মকান্ডকে একদম স্থবির করে দেয় সময় সময়, সেই দাপুটে মানুষটার নাম দেখলাম ভুল বানানে ভর্তি একটা কালো ব্যানারে, এর বাইরে অন্য কোথাও কেউ তার নাম উচ্চারণ করে না। পুরোনো রংবাজদের অধিকাংশই এখন অবসরে, নিজেদের মান মর্যাদা সম্ভ্রম কোনো রকমে ধরে রেখে নিজেরাই নিজেদের এই জগত থেকে নির্বাসিত করেছে, এখনও মহল্লার বড় ভাই হিসেবে জুনিয়ারেরা তাদের সম্মান করে, হয়তো কোনো বিপদে সহযোগিতাও করতে পারে কিন্তু চাঁদাবাজির মার্কেটের প্রতিদন্ডী হিসেবে এদের মেনে নিবে না কেউই। অবসরপ্রাপ্ত কাউকে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের নাম আর নেপথ্য ঘটনার কার্যকরণ জিজ্ঞাসা করবো ভেবেছিলাম, পরে ভেবে দেখলাম আসলে কৌতুহল জিনিষটা সব সময় খুব বেশী স্বাস্থ্যকর না। তার চেয়ে আমার এই আপাত অপরিচিত সাদামাটা জীবনে তেমন বাড়তি ঝঞ্ঝাট টেনে আনা অর্থহীন।





বাহ !! আমিও আপনার সাথে ঘুরে এলাম দিনাজপুর।

এই লেট শৈশব আর আর্লি কৈশোরে আটকে থাকার ব্যাপারটা আমার ঘটে রংপুরে গেলে...
কথা ঠিক বলছেন উস্তাদ।
দারুণ, বরাবরের মতোই। আমি কখনো ব্যবসায়ীদের মুখে শুনি নাই যে, ব্যবসা ভাল যাচ্ছে
সবাই পর্যায়ক্রমে প্রাচীনপন্থী হয় আর তারপরে হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। আজ যারা রিমিক্সে মাথার উপরে শার্ট ঘুরায়, একদিন তারাও প্রাচীনপন্থী হয়ে হারিয়ে যাবে...আমাদের কিছুকাল পরে... এই যা...
~
খুব ভালো লাগলো।
মন্তব্য করুন