ইউজার লগইন

ভ্রান্ত নায়ক

"আমি তো আসল হিরো চিনি, আমি তো জানি কার শরীরে রক্ত ভাঙা ঘামের গন্ধ, কার চেহারায় ত্যাগ লেখা আছে, আমাকে ধুন-ফুন বুঝায়া তো লাভ নাই।"

বন্ধু আবু মুস্তাফিজ( সবুজ বাঘ) এর কথাটা ভালো লেগেছে। ওর সাথে হঠাৎ হঠাৎ হুটহাট আড্ডা হয়ে যায়। আড্ডাগুলো একটা পর্যায়ে রাজনৈতিক বিতর্কে দাঁড়ায়, বিদ্যমান রাজনীতিতে পেশীশক্তির অতিব্যবহার কিংবা সন্ত্রাসীদের ক্রমশ: জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে যাওয়ার আক্ষেপ আমারও আছে, কিন্তু আমি ওর মতো বলতে পারি না, চুদানির পুলাদের থুতনার উপরে ঘুষি মারে ফাটায়া ফেলায় দেওনা লাগবে। এইসব পুতুপুতু আলোচনা করে লাভ নাই। ভদ্র রাজনীতিতে শক্তি না দেখাইলে বাঙালীর আস্থা পাওয়া যাবে না। তুমি আদর্শের কথা বলবা, আদর্শের কারণে প্রতিবাদ করবা, পুলিশ তোমাকে পিটাবে, তুমি হরতাল দিবা, এমন কি সিএনজিওয়ালাও তোমারে বাল দিয়া পুছবে না, হরতালে ড্যাং ড্যাং করে গাড়ী চালাবে -এইটা দেখলে জনগন ভাববে তোমার ভিতরে শক্তি নাই। বাঙালী শক্তিকে ভয় করে, শক্তকে সমঝে চলে। তুমি ১০টা গাড়ী ভাঙো, দুইটা সিএনজি পুড়ায় দাও, তারপর দেখবা তুমি হরতাল ডাকলে রাস্তাঘাট ফাঁকা, জনগণ যদি বুঝে তোমাকে মাইর দিলে তুমি পাল্টা থুতনির উপরে দুইটা ঘুষি বসাইবার পারো তাইলে না জনগণ তোমার পিছনে দাঁড়াবে। তুমি তাদের প্রটেকশন না দিলে তোমার পিছনে কি ফেলাইতে দাঁড়াবে ওরা?

আমি সব সময়ই এই শক্তি প্রদর্শণের বিরোধীতা করি, গত পরশুও করলাম। যদি আদর্শিক ও নৈতিক কোনো তফাত না থাকে, যদি শক্তি দেখিয়েই রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে হয় তাহলে বিএনপি, লীগের সাথে রাজনৈতিক আদর্শে বামপন্থীদের তফাত কোথায় থাকলো? শেষ পর্যন্ত সচেতন জনগণই রাজনৈতিক দলের মুল শক্তি, এরাই মাঠে লড়াইটা করে, এরাই যেকোনো অঘটন প্রতিরোধ করে। এদের সংঘবদ্ধ সচেতনতার শক্তিটা ব্যবহার করা এবং সরাসরি শক্তি প্রদর্শন করে এদের ভেতরে অবস্থান তৈরি করে নেওয়ার বিতর্কটা অমীমাংসিত থাকবে আমি জানি।

দেশের রাজনীতিতে এক ধরণের সুশীল বুদ্ধিজীবীদের আগমন হয়েছে। যেমন ধরা যাক সৈয়দ আবুল মকসুদ, তারআত্মজীবনি কিংবা স্মৃতিচারণের একটা অংশে দেখলাম আবুল মকসুদ ১৯৪৮-৫০এর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তবে ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত বিষয়ে তার উপস্থিতি তেমন নেই। ৩৭ জনের স্টিয়ারিং কমিটিতে তিনি নেই, মোটামুটি পরিচিত অপরিচিত সবাই থাকলেও আবুল মকসুদের মতো সুশীল ভালো কথা বলা মানুষের স্মৃতিচারণের বাইরে মূলত আন্দোলনে তার অনুপস্থিতি অন্য সব আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সত্য।
ভালো ভালো কথা বলা মানুষদের ভেতরে এক ধরণের আদর্শিক রাজনীতি বিষয়ক বক্তব্য থাকলেও সে আদর্শ রাজনীতিতে উত্তরণের পথটা অস্পষ্ট। রাজনীতিতে গুণগণ পরিবর্তন আসা প্রয়োজন এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই, কিন্তু এইসব আদর্শিক বিতন্ডা কিংবা সুশীলীয় রাজনীতিপাঠ তরুণদের রাজনীতিবিমুখ করছে কি না বিষয়টা ভেবে দেখবার মতোই।

মুস্তাফিজের সাথে বিতর্কটা হচ্ছিলো জাফর ইকবালকে নিয়ে, তিনি জনপ্রিয় লেখক, বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, সামাজিক কর্মকান্ডে তার যথেষ্ট অংশগ্রহন আছে কিন্তু তিনি কি অনুকরণীয় আদর্শ? তিনি কিংবা তার রাজনৈতিক / অরাজনৈতিক অবস্থান কি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে গ্রহনযোগ্য। জাফর ইকবাল অনুকরণীয় নায়ক হয়ে উঠেছেন কিন্তু তিনি কি সত্যি নায়ক নাকি নায়কের প্রতিচ্ছায়া?

জন্ম কিংবা বংশকৈলিন্য কিংবা বংশ ও জন্মস্থানের কারণে কিছু কিছু মানুষ কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায়, এটা যেকোনো সময়ের প্রেক্ষাপটেই সত্য । অপরাপর অনেককে যেটা অনেক পরিশ্রমে অর্জন করতে হয় কেউ কেউ সেটা খুব সহজেই পেয়ে যায়। আমাদের বাংলাদেশে বর্তমানের সুশীল যারা কিংবা যারা সুশীলীয় রাজনীতিপাঠ শেখাচ্ছেন তাদের প্রত্যেকেই অন্তত ৩ প্রজন্ম ধরে শিক্ষিত।একেবারে মাঠ থেকে উঠে আসা মানুষেরা এই রাজনীতিপাঠের ভেতরে অনুপস্থিত। পাটের দরদাম বেড়ে যাওয়ায় এক প্রজন্ম মুসলিম শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হয়ে উঠতে পেরেছিলো। ইংরেজ আমলে এরাই বিলেতের সেবা করে খানবাহাদুর উপাধি পেয়েছে, এইসব খানবাহাদুরদের অনেকেই ইংরেজ সরকারের কেরানিগিরি করেছেন। কেউ কেউ স্বদেশী আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে খানবাহাদুর হয়েছেন। যারা সাম্প্রদায়িক উপমহাদেশে স্কুল কলেজ শেষ করেছেন তারা পাকিস্তান শাসকদের অনুগত থেকেছেন।

জাফর ইকবালের বাবা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিলেন। তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কিংবা রেজাকার বাহিনী হত্যা করেছিলো, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হুমায়ুন আহমেদ কিংবা জাফর ইকবাল সে সময়ে প্রাণভয়ে দেশের ভেতরে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, দেশের ভেতরে পালিয়ে বেড়ানো অসংখ্য তরুনদের ভেতরে তারা একজন। তারা স্বাধীনতার মহাকাব্যে ততটা গৌরবের আসন পান নি যেমনটা পেয়েছে রুমি যুক্তরাষ্ট্রের বৃত্তি ত্যাগ করে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুবরণ করে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সীমিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহনে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কম ছিলো। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টগুলো ন্যুনতম কিছু যোগ্যতা বিবেচনা করে ছাত্র গ্রহন করতো, ১৯৮২ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইলেও ভর্তি হওয়া যেতো ৬৩ জনের বিপরীতে একজন এমন বাস্তবতা ছিলো না। সে সময়ে যারা অন্যসব জীবিকামুখী চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহন করতো তাদের শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং পারিবারিক সামর্থ্য দুটোর যেকোনো একটা থাকতে হতো।

এক ধরণের আর্থিক স্বচ্ছলতা কিংবা পারিবারিক শিক্ষাপটভূমি না থাকলে সে সময়ে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহনে আগ্রহী হতো না কথাটা সত্য এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত হওয়াটা ভবিষ্যত জীবনের জন্যে এক ধরণের বিনিয়োগও ছিলো। আমাদের প্রায় সার|বজনীন দারিদ্রতার ভেতরেও শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা শুধু আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করেছেন এমন না, তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব গাড়ী ছিলো। মোটামুটি স্বচ্ছল একজন মধ্যবিত্তের ঢাকা শহরে নিজস্ব বাড়ী এবং নিজস্ব গাড়ী ছিলো, এইসব মধ্যবিত্তদের অনেকেই ১৯৭১ এর যুদ্ধে শরনার্থী হিসেবে কোলকাতার উপস্থিত হয়ে উপলব্ধি করেছেন তারা দেশে কি পরিমাণ স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতেন, তারা অনুযোগ করেছেন, হা-হুতাশ করেছেন, আশা করেছেন কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে তারা দেশে নিজেদের স্বচ্ছল জীবনে ফেরত যাবেন। এই ট্রামে বাসে ঘামে ভিজে হেঁটে কোনো রকমে ন্যুনতম মাসোহারায় সপরিবারে জীবনযাপনের চেয়ে অবরুদ্ধ ঢাকায় স্বচ্ছল জীবনযাপনের স্বপ্ন তাদের প্রিয় ছিলো কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় তারা তা পুরণ করতে পারেন নি।

এদের উত্থান কিংবা স্বচ্ছলতা কিংবা সম্মান এক ধরণের ছদ্ম অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত যুবকেরা এদের অনুসরণ করেছে। সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই অর্থ বিত্ত এবং দাপটের প্রতি বাঙালী পরিবারের সীমাহীন লোভ। এরা ডেপুটি কালেকটরের থেকে থানার দারোগাকে বেশী শক্তিধর মনে করতো যার দাপট তারা উপলব্ধি করতে পারে।

এদের একটা প্রজন্মের কাছে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য বৈদেশে পরবাসী জীবনযাপন, নইলে দেশে সরকারী প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা হয়ে বেশ দাপটের জীবনযাপন। যারা প্রবাসপ্রত্যাগত তাদের প্রতি এক ধরণের অহংমিশ্রিত শ্রদ্ধাবনত মানসিকতা এদের আছে। বিদেশের জীবন মানেই শান্তিপূর্ণ নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, যেখানে ঘরের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস, বাইরে গাড়ী, বিশুদ্ধ বাতাস আর বিষমুক্তি খাওয়ার, রাজনৈতিক অঘটন হরতাল মুক্ত শান্তিপ্রিয় জীবন ছেড়ে দেশে ফেরত আসা জাফর ইকবাল এদের কাছে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করে আসা একজন নায়ক। মুস্তাফিজের আপত্তির জায়গাটা এখানেই ছিলো আসলে, জাফর ইকবাল নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে এখানে ফেরত এসেছেন, এখানে থাকতে তার ভালো লাগে, সেই ভালো লাগার জীবনযাপনের সাহসটুকুকে ত্যাগ বলা যায় কি না?

যেহেতু তিনি লেখক, যেহেতু তার এক ধরণের ব্রান্ড ভ্যালু আছে, কর্পোরেট মিডিয়া তাকে ব্যবহার করছে, তিনিও এইসব সমাজসেবামূলক কাজের সাথে জড়িয়ে আছেন, জড়িয়ে পড়েছেন, সেসব কর্মকান্ডের সুবাদে তার এক ধরণের সামাজিক গ্রহনযোগ্যতাও তৈরি হয়েছে। তিনি এক ধরণের লোকদেখানো নায়ক হয়ে উঠেছেন, যিনি সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আবেগপুর্ন বক্তৃতা দেন, সপ্তাহে এককানা কলাম লিখে ত্যাগী মহাপুরুষ হয়ে উঠেছেন। এর ভেতরে পরিশ্রম, ত্যাগ, কোনোটাই নেই, সে একজন ভ্রান্ত হিরো। তাকে অনুকরণীয় মেনে নেওয়াটা এক ধরণের বোকামী।

আমাদের সমাজে অনুকরণীয় ব্যক্তির প্রচন্ড অভাব। হেঁটে হেঁটে এভারেস্টে উঠে পড়া মুসা ইব্রাহিম মোটিভেশনাল লেকচার দিয়ে টাকা উপার্জন করে, সেটা এক ধরণের অর্জন কিন্তু সেটা কি মহানায়কোচিত কিছু?

কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতি বদলাতে হবে, রাজনীতিবিমুখ ব্যক্তিগত উত্থান দিয়ে সামাজিক প্রগতি বাস্তবায়ন কোনো গ্রহনযোগ্য পন্থা না কি সামগ্রীক লড়াইয়ে এইসব ভ্রান্ত নায়কদের থুতনিতে ঘুষা মেরে এক ধরণের পরিবর্তন বয়ে আনাটা গ্রহনযোগ্য পন্থা এ বিষয়ে কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে না পারা আমরা যে যার বাসার পথে ফিরে আসি।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


রিসেন্টলি একটা হিন্দি মুভিতে দেখলাম এই নায়ক বিষয়টা নিয়ে একটা ফিলসোফি। মানুষের মাথায় সবসময় ঘুরতে থাকে যে, সে একটা নায়ক এবং তার জীবনটা একটা সিনেমা। মানুষটা নিজে তার নিজের সিনেমার নায়ক। এই জিনিস মাথা থেকে সরায় দেয়া গেলে বরং সাফল্য সহজে আসে।

আমার তো যেটা মনে হয়, নায়ক খোঁজার দরকার খুব কম। নাই ইনফ্যাক্ট।

মানুষ's picture


আমাদের কি করতে হবে সেইটা বলেন।

রাসেল's picture


আপনার ভিতরে কয়জন আছে আলাদা আলাদা?

তানবীরা's picture


লোম বাছতে কম্বল উজারের দুনিয়ায় জাফর ইকবালকে তবু ছাড় দেয়া যায়

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


সহমত।

আসমা খান's picture


ভালো লাগলো লেখা। Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.