ইউজার লগইন

আমার কিছুই মনে নাই, মনে থাকে না

মফস্বলের নিস্তব্ধ দুপুরে যখন মহল্লার মাঠে গাছের ছায়াগুলোও অলস ভাতঘুমে আচ্ছন্ন সে সময়ে দুপুরের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে শোনা যেতো মাইকের শব্দ

"ভাইসব ভাইসব"

আমরা জানতাম এই শব্দ দু:সংবাদ বয়ে নিয়ে আসে।
এভাবেই মফ:স্বলের নিস্তরঙ্গ একটানা জীবনে কারো না কারো মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হয়, বড়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো বড় ভালো মানুষ ছিলেন, পরিবারের মহিলারা শাড়ী ঢাকা রিকশা চেপে মাইয়াত বাড়ী যেতেন সান্তনা দিতে, অনেক দিন পর একটা উপলক্ষ্য পেয়ে পুরোনো দিনের গল্পে মেতে উঠতে পারতেন তারা।

সে শহরে নতুন মানুষেরা আসতো না এমন না, প্রয়শ:ই নতুন কোনো সরকারী কর্মকর্তা আসতেন, তবে শহরের জীবনে তাদের উপস্থিতি ততটা দৃশ্যমান ছিলো না, সরকারী স্কুলের ছাত্ররা জানতো নতুন সহপাঠী এসেছে ,তাদের সাথে সামান্য বন্ধুতাও হয়ে যেতো কারো কারো, পুরোনো ছাত্রদের র‌্যাগিং এবং ক্ষমতার দাপট সামলে তারা কাটিয়ে দিতো আরও কয়েক বছর, তাদের বাবারা বদলি হয়ে গেলে তারাও হারিয়ে যেতো, কিন্তু মোটের উপরে শহরের গোটাকয় সরকারী যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত মানুষের বাইরে এদের উপস্থিতি ছিলোই না কোথাও

কখনও সন্ধ্যার পর পর চিরচারিত "আসিতেছে আসিতেছে রুপালী পর্দা কাঁপাতে চকলেট হিরো একশন হিরো" এইসব পরিচিত শব্দের বদলে যখন শোনা যেতো " ভাইসব ভাইসব" আমরা জানতাম সেই পরিচিত কণ্ঠই কোনো না কোনো দু:সংবাদ বয়ে নিয়ে এসেছে।

প্রায় অধিকাংশ সময়ই এইসব দু:সংবাদ মূলত হারানো বিজ্ঞপ্তি, আজ দুপুরে একটি ছেলে হারিয়ে গিয়েছে, তার পরনে ছিলো চেক শার্ট আর হাফপ্যান্ট। যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি তাহার সংবাদ জানেন তাহলে ......... নিবাসী ............ কে জানাবেন।

এই শহরে মাইক ভাড়া নিয়ে যারা এই হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতো তাদের ছেলে মেয়েদের কেউ কেউ রাত করে বাড়ী ফিরে আসতো। হয়তো বাবা-মা-ভাই-বোনের শাসনের অভিমানে ঘর পালিয়েছিলো সেই ছেলে, ফিরে আসবার পর বাবা মায়ের উদ্বেগ আর ভাইবোনদের উৎকণ্ঠা শেষ হয়ে যেতো, চড়-লাঠি- আদরের চুম্বনে সেইসব ঘটনার সমাপ্তি ঘটতো।

কেউ কেউ আবার ফিরে আসতো না, দিন, রাত, মাস তার অপেক্ষায় বসে থাকতো সবাই, সবারই নিজের জীবন ছিলো, সে জীবনে কোন শোক দীর্ঘস্থায়ী নয়, তবে প্রত্যাশা অপরিসীম। প্রত্যাশা বুকে নিয়ে সেইসব পরিবার শোক ভুলে নিজের জীবন যাপন করতো আর উৎসব আর জন্মদিনে একপ্রস্ত অশ্রুজলে স্মরণ করতো হারিয়ে যাওয়া জনকে।

সেইসব ছেলে মেয়েদের বন্ধুরা নিয়ম করে উৎসবের দিনে অশ্রুপাতের উপলক্ষ্য হতো, সেটাই সামাজিক ভদ্রতার নীতি ছিলো। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের বন্ধুরা প্রত্যাশা কিংবা অপরাধবোধ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সামনে উপস্থিত হবে এই সামাজিকতার ব্ত্যায় ঘটতো না।

আমাদের হারিয়ে যাওয়ার গল্পগুলোর কোনোটা কোনোটা শিশুতোষ এডভেঞ্চার ছিলো, দুপুরের নির্জনতায় রেলসড়ক ধরে হেঁটে হেঁটে অন্য কোনো স্টেশনে ক্লান্ত মেইল ট্রেনের অপেক্ষা ছিলো সেইসব সন্ধ্যায়। আপ আর ডাউন ট্রেনের সময়সূচি দেখে ডুবন্ত সূর্য্যে নিজের ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে আমরা অপেক্ষায় থাকতাম, নিজেদের ভেতরেও অনুশোচনা আর উৎকণ্ঠা থাকতো, সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়ার পর বিকেলের প্রত্যাশিত ট্রেন সিটি বাজিয়ে স্টেশনে থামতো, সেইসব মানুষদের ভীড় ঠেলে উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কত রকমের মিথ্যে সাজানো আর সীমাহীন ভয়ের ভেতর দিয়ে প্রত্যাবর্তনের স্মৃতি ছিলো, আর একটু হলেই হয়তো অগোচরে মৃত্যু ঘটে যেতো, দুরের কোনো গভীর দীঘিতে পা নামানো কিংবা হরকে যাওয়ার পর বেড়ে যাওয়া হৃদস্পন্দনে কখনও মনে উঁকি দিতো না হয়তো শহরে এখন কেউ মাইক নিয়ে বলছে

ভাইসব ভাইসব একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি

যারা চিরতরে হারিয়ে গেলো , সেইসব শিশু কিশোর, এখন মনে হয় তাদের কেউ কেউ এমন শিশুতোষ এডভেঞ্চারে গিয়ে দুরে অপরিচিত কোথাও দীঘিতে ডুবে গেছে, এমনটা প্রায়শ:ই ঘটতো, শহরের দীঘি পুকুরগুলোতে সন্ধ্যায় লাশ ভেসে উঠতো, সে খবর লোকমুখে ছড়িয়ে পরলে সবাই গিয়ে লাশের চেহারা দেখে নিজেদের উৎকণ্ঠা কমাতো, কিংবা তারা খুন হয়েছে।

কোথাও কোনো নির্জন মাঠে হয়তো যৌননির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে তাদের। মফ:স্বলের পোড়ে বাড়ীর আড়ালে এইসব যৌথ অপরাধ লুকিয়ে রাখা খুব সম্ভব ছিলো। কেউ ভয়ে পা মারায় না এমন সব অপরাধীর ডেরায় হয়তো তাদের সন্ধান মিলে যেতেও পারে কিন্তু কেউ কখনও খুঁজে নি তাদের।

কিংবা হয়তো খুঁজেছে, কিন্তু তার সন্ধান পাওয়া যায় নি।

শহর থেকে মাইক হারিয়ে যায় নি, এখনও ঈদের আগের রাতে শহরের সবকটা ময়দানে ঈদের জামাতের সংবাদ দিতে দিতে শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায় এইসব মাইক আর রিকশা, খুব মনোযোগ দিয়ে আর শোনা হয় না এসব।

বাসার কারো দু:সংবাদ পাওয়ার উৎকণ্ঠাও থাকে না, মোবাইল যুগে এখন দিনে রাতে যেকোনো সময়ে মোবাইলে দু:সংবাদ ভেসে আসতে পারে, আর শহরে এত মানুষ চাইলেও হারানোর সম্ভবনা নেই, তবু মেলার ভীড়ে হারিয়ে যায় মানুষের শিশু, যেমনটা হঠাৎ ঋককে হারিয়ে ফেললাম একদিন শিশুপার্কে, বাবা হওয়ার পর বুঝলাম যতটা গাম্ভীর্যের মুখোশ এঁটে রাখা যাক না কেনো এই হঠাৎ হাত ফস্কে চলে যাওয়া সন্তানের অমঙ্গল আশংকা আর আক্ষেপ এ অনুভুতি অনন্য, পার্কের এ মাথা ও মাথা ছুটে অহেতুক চিৎকার চেঁচামেচিতে নিজেদের ভয় তাড়ানোর চেষ্টাটা খুব বেশী কাজে আসে না।

এবার খুঁজে পেলে আর কখনও হাত ছাড়বো না শপথ আর অসহায় অপেক্ষা, আমার কখনও কারো পোশাক মনে থাকে না, আমি ভুলে যাই চেক শার্ট না সবুজ গেঞ্জী, ফুল প্যান্ট না হাফ প্যান্ট। আমার চোখের সামনে শৈশবের ছেলের মুখ আর সেই চেক শার্টটাই শুধু জীবন্ত থাকে, মগজের আনাচে কানাচে খুঁজি ঠিক দুপুর বেলায় কি পোশাকে ঘর থেকে বের হয়েছিলো ও

হঠাৎ শপিং মলের আইলের এ পাশ ওপাশে হারিয়ে গেলেও এখনও একই আশংকা জেগে উঠে ঠিক কি পোশাকে এসেছিলো ও কিংবা সে, আমার তো চেহারা ছাড়া অন্য কোনো ডিটেইল কখনও মনে থাকে না। আমি ভীড়ে হারিয়ে গেলে ঠিক কি আবরণের বর্ননা দিবো, পরিচিত কারোই নাম আর চেহারার বাইরে অন্য কিছু স্মরণে থাকে না আমার। হয়তো কেউ হাত ছেড়ে লুকিয়ে গেলে আমি নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলবো

আমার ফেরার পথ মনে থাকে, নাম মনে থাকে চেহারা মনে থাকে শুধু মনে থাকে না মানুষটা কি পোশাকে একটু আগেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। এরপর কোথাও গেলে খুব সচেতনে পোশাকটা মনে রাখবো, ভীড়ের ভেতরে গেলে শুধু এ শপথটুকু মনে থাকে।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


Star Star Star Star Star

এই লেখা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করাটাও বোকামি। অনুভূতি টুকু শেয়ারের জন্য ধন্যবাদ।
পুরোটা লেখাই চমৎকার। আপনার লেখা আমার সবচাইতে প্রিয় ব্লগ। ভাল থাকুন।

ননসেন্স's picture


ভাই অসাধারন লিখেছেন । পড়ার সময় এতটাই ধুকে গিয়েছিলাম যে মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি

শর্মি's picture


রাসেল ভাই, খুব ভাল লাগলো পিতার একান্ত ব্যাক্তিগত অনুভূতির আবেগী প্রকাশ। দুইবার পড়লাম। সকল সন্তান দুধে ভাতে আদরে নিরাপদে থাকুক। ঋকের জন্য ভালবাসা!

রায়েহাত শুভ's picture


কিছু কিছু লেখা পড়লে ভালোলাগা জানাবার মত কথা খুঁজে পাইনা...

জ্যোতি's picture


অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম। সব সন্তানেরাই বাবা-মায়ের বুক জুড়ে থাকুক।

নরাধম's picture


চমৎকার!

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


অন্যরকম লেখা।
পড়ে মনে হলো কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম।
ভালো লেগেছে ভীষণ।

আরাফাত শান্ত's picture


এই নিয়ে পাচবার পড়লাম।
দারুন!

মীর's picture


লেখাটা নিয়ে তো অনেকেই অনেক কিছু বলে ফেলসে। তাই সে দিকে আর গেলাম না। আমার কথা বলি। এই লেখাটা পড়ে আমার ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেলো। আম্মু যেসব দিনে দুপুরে ভাত খাবার পর ঘুমুতেন, সেসব দিনে আমাদের বাসার মূল দরজার উপরের ছিটকিনিটা লাগানো থাকতো এবং আমাকে সারা দুপুর ঘরেই বসে থাকতে হতো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম আমার বন্ধু-বান্ধবীরা খেলছে। দুপুরের খেলাগুলো আসলে ছোটবেলার খুব মজার একটা অনুষঙ্গ। বিকালের খেলা ছিলো একরকম আর দুপুরের খেলা ছিলো আরেক রকম। তো যাই হোক, আম্মু মূলত নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জন্যই ছিটকিনিটা লাগিয়ে শুতেন। সে সময় তার মুখে প্রচুর শুনতাম ছেলেধরার কথা। ছেলেধরারা নাকি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে বস্তায় পুরে ধরে নিয়ে যায়- এরকম জুজু।

মজার ব্যপার হলো, আমি কখনো আম্মুকে বিশ্বাস করাতে পারতাম না যে আমি বাইরের কারো ডাকে সাড়া দিই না বা কারো কাছ থেকে কখনো কিছু খাই না। তা যত লোভনীয় জিনিসই হোক না কেন। এই অন্তর্মুখীতা আমার ভেতর একদম বোঝার বয়স থেকেই কাজ করছে। এখনও পুরোদমে কাজ করে। নিজের অন্তর্মুখী সোউল'টাকে আমি সেই পিচ্চিকাল থেকেই চিনি। কিন্তু তখন আমার কথা কেউ বিশ্বাস করতো না। আম্মুতো করতোই না।

এখন যখন নিজে নিজে এসব বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করি তখন বুঝি, সে সময় আমার কথা বিশ্বাস না করাটাই তাদের কর্তব্য ছিলো। কারণ তখন আমি এত ছোট যে, সবকিছু আমার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতাই ছিলো না। আমার সেসব দিনগুলোর স্মৃতি যে অনেক পরিস্কার, সুন্দর মনে আছে তা টের পেলাম রাসেল ভাই, আপনার এই লেখাটা পড়তে গিয়ে।

১০

তানবীরা's picture


বাবা মা ছেলে মেয়ে সবাই সুখে থাকুক এটাই কামনা

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.