ইউজার লগইন

রমজানের নিয়মিত উৎপাত

সদাপরিবর্তনশীল পলিবিধৌত এই ব-দ্বীপাঞ্চল কখনও আর্যাবর্তের অংশভুক্ত ছিলো না। শাস্ত্রার্থে এই ব-দ্বীপাঞ্চল ছিলো নাস্তিক অধ্যুষিত, এ অঞ্চলের অধিবাসীরা বেদে বিশ্বাসী ছিলো না। আর্যের রথ নদীর পরিবর্তনশীল তীরে এসে থেমে গিয়েছিলো, প্রকৃতি ধর্মানুসারী এই অঞ্চলের মানুষকে গৌরবর্ণ আর্যেরা কখনও বিশ্বাস করতে পারে নি, এদের ভাষাকে শ্রদ্ধা করতে শিখে নি। বেদ উপনিষদ বর্ণাশ্রম এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্কের ভেতরে বাধা হয়ে উঠতে পারে নি।

প্রকৃতি ধর্মে নারীর মর্যাদা এ স্থানের সমাজ কাঠামোর ভেতরে , লোকাচার, জীবনাচার, সংস্কৃতি আর কৃষ্টিতে প্রবিষ্ট। বেদ বর্ণিত কিংবা সেমিটিক ধর্মের নারীর সাথে প্রকৃতি ধর্মের নারীর মর্যাদাগত তফাত আছে, বেদের নারীর যোনীর পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে হয়, তাকে অপরাপর পুরুষের কামনার আঁচড় থেকে রক্ষা করতে শাস্ত্রে বিধান লাগে, বেদের আর সেমিটিক ধর্মের নারী স্বৈরিনী, চরিত্রহীনা, কুলটা। তাকে গৃহবন্দী রাখতে হয় নইলে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে সম্পদের উত্তরাধিকার রক্তসম্পর্কিত উত্তরাধিকারীর কাছে পৌঁছায় না। রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষায় এইসব তরলমতি পাপিষ্ঠা নারীদের যোনী সার্বক্ষণিক পুরুষপাহারায় রেখে দেওয়ার শাস্ত্রীয় বিধান প্রকৃতি ধর্ম কখনও মেনে নেয় নি।

এই ব-দ্বীপ অঞ্চলের মানুষ রিচুয়ালিস্টিক নয় বরং স্পিরিচ্যুয়াল, প্রকৃতি ধর্মে বিশ্বাসী তন্ত্রাচারী মানুষেরা ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার বদলে ধর্মের আধ্যাত্মিক সৈন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়েছে।তাদের কাছে ধর্মের কঠোর নিয়মানুবর্তীতার চেয়ে প্রিয় ধর্মের ভাববাদী উপাখ্যান। কল্পনাপ্রবনতা এবং ভক্তি মিশিয়ে তারা লোকগীতি বেধেছে, চৈতন্যপ্রেমে মাতোয়ারা হয়েছে, সংস্কৃতে লেখা বেদ-বেদান্ত-সাংখ্যসূত্রের বদলে তাদের নিয়মিত উপাসনার আশ্রয় হয়েছে গাঁয়ের কবির পালা গান, যে গানে লোক দেবতা তার মানবিক প্রেমময়তা নিয়ে তাদের হৃদয় স্পর্শ্ব করেছে।

মুসলিম শাসনাধীন বঙ্গে ধর্মনির্বিশেষে সকল মানুষই আধ্যাত্মবাদী ধর্মপুরুষের স্বাত্ত্বিকতায় মুগ্ধ , সে মানুষ ভয়ে-ভক্তিতে মন্দিরে আর মসজিদে মাথা নুইয়ে নিজের ভালোবাসা জানান দেয় নি বরং কীর্তনে আর মারেফতি গানে নিজের ভক্তি নিবেদন করেছে, বিশ্বাস করেছে জঙ্গলে কালু শেখ, সত্যপীর আর বনবিবি পাশাপাশি বসে সবার মঙ্গলের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।

এই ভক্তিবাদী ব-দ্বীপবাসী শাস্ত্রের বিধানে নয় তন্ত্রে নিজের মুক্তি খুঁজেছে, তাই বৈষ্ণব আর বাউল এক পাতে খেয়ে একতারায় আধ্যাত্মবাদী গান বাজিয়ে মুগ্ধ করেছে গ্রামের মানুষকে

ধর্ম সংস্কারের ভিন্নতায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ধর্ম নেতারা যখন বর্ণাশ্রম উচ্ছেদ করে, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করে একেশ্বরবাদী ধর্মকে আঁকড়ে ধরছেন, সমবেত প্রার্থনায় সংগীত আর বাদ্যের সংমিশ্রনে ঘটাচ্ছেন সে সময়ে সংগীত, বাদ্য বাজনাকে কুফরি ঘোষণা করে কট্টর ধর্মবাদী হয়ে ওঠার হুকুম জারি করছে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতারা।

প্রকৃতি ধর্ম আসলে প্রকৃতির উৎপাদনশীলতার উপাসনা, নারী আপন গর্ভে পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম দেয়, তাকে প্রতিপালন করে এবং আশ্রয় দেয়। প্রকৃতি ধর্মে মাতৃরূপে প্রকৃতি উপাসিত হয়। নারীর প্রজননশীলতা, উৎপাদনসহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্রিয়ার উপাসনাকে যৌনতার আরাধনা হিসেবে দেখেছে আর্য ধর্ম, দেখেছে সেমেটিক ঐতিহ্যে বেড়ে ওঠা ধর্মগুলো, যে কারণে কট্টর হিন্দু সেন রাজাদের শাসনামলে নাথধর্মানুসারীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে সেই একই প্রক্রিয়ায় মধ্যযুগে ডাইনী সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হয়েছে সেখানকার প্যাগানদের।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরণের পর্যায়ে ধর্ম এবং ইশ্বরভাবনার পরিবর্তনটুকু নারী অবমাননায় সমাপ্ত হয়েছে। প্রকৃতি ধর্মের নারীর সম্মান সেমেটিক ধর্মে নেই, সেখানে ঋতুবতী নারী অপবিত্র চিহ্নিত হয়েছে, নারীর যোনী হয়েছে সকল পাপের জন্মস্থান । প্রবল মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভ্যস্ততা থেকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ করতে হলে কোনো না কোনো ভাবে কলংকিত, কলুষিত করতে হতো মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে। ধর্মপুরোহিত, সেবায়েত শাস্ত্রে নারীর গম্যতা নিষিদ্ধ করেছেন, ধর্মপুস্তকে বাক্যে-বানীতে নারীকে হীনবল প্রমাণ করে ছেড়েছেন। নারীকে পুরুষতন্ত্রের অধীনতা মেনে নিতে বাধ্য করেছেন, এভাবেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তবে আর্য ধর্মের গম্যতা নির্ধারণ করেছিলো নদীর নাব্যতা, তাই নদীতীরবর্তী বাণিজ্যস্থলে আর নিরাপদ নগরে পুরুষতন্ত্রের বিজয়নিশান উড়লেও বঙ্গের দুর্গম অঞ্চলে তখনও পুরুষতান্ত্রিকতা হানা দিতে পারে নি।ময়মনসিংহের জঙ্গালাকীর্ণ সমাজের লোকগাঁথায় আমরা তাই স্বাধীনচেতা নারীদের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। সামাজিক আধিপত্য নিশ্চিত করতেই দুর্গা, কালী, মনসা আর অপরাপর নারী শক্তির অস্তিত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে আর্যাবর্ত। তাদের স্বীয় পুরাণে স্থান দিয়েছে।

আমাদের সামাজিক কাঠামোতে আধ্যাত্মিকতার স্থান দখল করছে আনুষ্ঠানিকতা, ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি অধিকতর সহানুভুতি দেখাতে গিয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছি, নারীবিদ্বেষী ধর্মপুরোহিতদের প্রশ্রয় দিয়ে আমরা এমন একটা অবস্থানে নিয়ে এসেছি তারা এমন একটা সমাজব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে যেখানে নারীকে নিছক জন্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, নারীর সতীত্ব রক্ষার তাবত উদ্যোগ দেখে মনে হতে পারে নারীর যৌনানুভুতির বাইরে অন্য কোনো অনুভুতি নেই এবং নারীর ভাবনা ও আচরণ নিয়ন্ত্রন করে তার যৌনানুভুতি। বিষয়টা সম্ভবত নারীদের জন্যেও অবমাননাকর, যদিও পুরুষতন্ত্রের বশ্যতা মেনে নেওয়া নারীরা এমন শরীরি নিরাপত্তার পক্ষে ওকালতি করেন।

বাংলাদেশে ধর্মের নামে ষন্ডামী করে পার পাওয়া যায় এবং প্রতি বছর রোজায় মাসেই একটু একটু করে ষন্ডামির বৈধ্যতা তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিবার আরও একটু বেশী সহনশীলতা দেখিয়ে আমরা তাদের সুযোগ দিচ্ছি।

গতকাল পুরোনো ঢাকার হোটেলগুলোতে রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় হামলা চালিয়েছে লোকজন, তারা পুরোনো ঢাকার হোটেলের কর্মচারীদের হুমকি দিয়ে বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছে।

ঢাকা বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে, পুরোনো ঢাকার ধর্মভীরু মানুষেরা এই উৎপাত ধর্মের নামে মেনে নিবে, এবং সেটার পর আরও এক পা সামনে আগাবে এরা। খুব পরিকল্পিত ভাবে মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিকে ব্যবহার করে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে এরা যেখানে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বিরোধিতা সম্ভব না।

আমাদের শৈশবেও সমাজে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে ধর্মের আধ্যাত্মিকতা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, আমরাই আমাদের সমাজভাবনার এমন পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করলাম। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখনও ঢাকার রাস্তা দেখে কখনও বুঝতে পারি নি রমজান সমাগত। আমাদের আড্ডার চায়ের কাপের হিসাবে আমরা বুঝতাম আমাদের কোন কোন বন্ধু আজ রোজা রেখেছে। অথচ ১৯৯৯ এর শেষ সময়ে এসে ঢাকার দোকানগুলো রমজানে বোরখাচ্ছাদিত হতে শুরু করলো, ২০০১ এ মোটামুটি সেটাই প্রতিষ্ঠিত রীতি হয়ে দাঁড়ালো।

যদি শ্রমজীবী মানুষ, শিশু এবং ধর্ম উদাসীন মানুষের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় ঢাকার ২ কোটি মানুষের ৭০% রোজা রাখে না, দেড় যুগ আগেও এই ৭০% মানুষ নিজের মতো জীবনযাপন করেছে এই শহরে। তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় রমজান মাস তেমন ব্যাঘাত তৈরি করে নি। কিন্ত গত শতাব্দীর শেষ দশকের শেষার্ধে হঠাৎ করেই ধর্মপ্রাণ মানুষদের একাংশ অনুভব করলো তারা যখন ধর্ম বাঁচাতে কঠোর সংযমের সাথে সারা দিন অভুক্ত থাকছে, তাদের সামনে খোলা হোটেলে আর চায়ের দোকানে মানুষ দিব্যি খাওয়া দাওয়া করছে। তারা ধর্মানুভুতি সামনে এনে সহানুভুতি চাইলো, তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে দোকানগুলো পর্দা করা শুরু করলো। ইশ্বরের অনুগ্রহ কামনা করা মানুষেরা খোলা দোকানের খাওয়া দেখে নিজের নফস নিয়ন্ত্রন করতে পারে না, সেটা ইশ্বরের না কি ঈমানের দুর্বলতা এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বারণ।

যদিও তাদের সামনে সারা দিন দোকানগুলোতে মনোলোভা সুস্বাদু ইফতার তৈরী হচ্ছে কিন্তু তারা কেউ এসব পিঁয়াজু, বেগুনী, আলুর চপ, কিংবা অন্যান্য ইফতার উপকরণের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করছে না। তাদের ক্ষোভের কারণ খাদ্য নয় বরং তাদের ধর্মপালনের উচ্চমন্যতা। তারা ধর্মপালন করছে ব্যক্তিস্বার্থে, কিন্তু সেটার দায় বহন করতে হবে সবাইকেই, তারা এখন আর সহানুভুতি চাইছে না বরং এটাই দাবী করছে, প্রয়োজনে লাঠি দিয়ে এমন ব্যবস্থাই তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


এরকম উত্‍পাতের মানে কি?

লীনা দিলরুবা's picture


যে কোনো গোঁড়ামিই খারাপ। ধর্মটা ব্যক্তিগত আচার হিসেবে থাকলেই ভালো হতো। কিন্তু তা আর হল কই!

শওকত মাসুম's picture


উৎপাত তো বাড়ছেই

পরাজিত মধ্যবিত্তের একজন's picture


ভালো বলেছেন।
গত রমজানে আমি একটি গদ্য রচনা করেছিলাম। পড়ার আহবান জানাই
হ্যাপি মাহে রমজান, ক্ষুধা ও খাদ্য বিলাস শুভ হোক

তানবীরা's picture


চলছে এখন অন্যধরন সবকিছু ইসলামীকরন Puzzled

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.