ইউজার লগইন

ভাবনার অবদমন

একা রিকশায় ফিরছি সন্ধ্যার পর, প্রায় অন্ধকার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কয়েকটা রিকশা যাচ্ছে, বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিলো তার ছাপ লেগে আছে গাছেদের গায়ে, সম্ভবত ছুটির দিন বলেই ফাঁকা রাস্তায় মাত্র কয়েকটা রিকশা আর অন্ধকার পাশাপাশি ছুটে যাচ্ছে।
আমার ননদ বুঝলেন চাচা আমাকে একদম পছন্দ করে না। আমার স্বামী ওর মা বোনের কথাই বিশ্বাস করে, .........
পাশের রিকশার দিকে তাকিয়ে দেখলাম এক যুবতি বসে আছে, রিকশাওয়ালার সাথে গল্প করছে। খুব অন্তরঙ্গ পারিবারিক গল্প, তার প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির গল্প।
অন্য আরেকদিন অন্য কোনো রাস্তায় এভাবেই কানে আসলো আমার ছেলে আর আমার কথা ভাবে না। বৌটা ওকে যাদু করে রাখছে........।
তাকিয়ে দেখলাম এক মাঝবয়েসী মহিলা রিকশাওয়ালার সাথে গল্প করছে

আমি জানি এই শহর, এই নাগরিক ব্যস্ততা খুব দ্রুত বন্ধুহীন নি:সঙ্গ করে ফেলে মানুষকে। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমাণ এবং অদৃশ্য দেয়াল আড়াল হয়ে উঠে দাঁড়ায়, আমরা পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, এটাই আধুনিকতা, এটাই আমাদের নাগরিক সভ্যতা হয়তো। জীবনের টান, জীবিকার ঝুঁকি, সার্বক্ষণিক অস্থিরতা আর আশঙ্কার ভেতরে আমরা ধীরে ধীরে মরে যাই, আমাদের কৌতুহল মরে যায়, আমাদের ঘরের জানালার অন্য পাশে দুরে-কাছের বাসাগুলোর জালানায় আলো জ্বলে, নিভে যায়, পর্দা কিংবা পর্দাবিহীন এইসব জানালার সামনে দাঁড়ানো মুখগুলো যেভাবে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যায়, পুরোনো ছবির মতো আমাদেরও জীবন মুছে যায় শহরের রাস্তায়।

কথাগুলো কাউকে বলা হয় না, মানুষ ইন্টারনেটে বন্ধু খুঁজে, নিজের অন্তরঙ্গ স্বীকারোক্তি লিখে রাখে ব্লগের পাতায়। এই বিশাল অন্তর্জালে কে কোথায় বিরহগাঁথা লিখে রেখেছে, কে কোথায় নিজের সন্তাপটুকু তুলে রাখলো কে রাখে তার খবর। আমাদের ব্যক্তিগত ডায়েরীতেও আমরা যা টুকে রাখতে ভয় পাই বিশাল ঠিকানাবিহীন অন্তর্জালে তাই টুকে রাখি, ডায়েরীর পাতায় রক্তের গ্রুপ আর দেনা পাওনার হিসেব টুকে রাখি, এভাবেই আধুনিক মানুষ অন্তত নিশ্চিত পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।

গত কয়েক মাসে জীবন চমকের পর চমক দেখাচ্ছে, যা কিছু কখনও অনুমাণ করি নি তার সবটুকুই ঘটে গেছে, এক ধরণের পলাতক জীবন, স্বেচ্ছানির্বাসন হয়তো নয় কিন্তু এক ধরণের অনিচ্ছুক কারাবাসের ভেতরে আরও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠা।

জীবনানন্দ বিবাহিত জীবনে সুখী ছিলেন না, তার স্ত্রীর চাওয়া আর তার কল্পনার ভেতরের ফারাকটুকু তিনি কখনও পুরণ করতে পারেন নি। অন্তর্মুখী জীবনানন্দ তার উপন্যাস আর গল্পে নিজের অস্থির জীবনের হতাশাগুলো ভিন্ন নামে টুকে রেখেছেন, যেখানে নিত্য অভাব আর চায়ের কাপে চিনির চামচে অভাবের গঞ্জনা শুনছে ভাবালু স্বামী। কখনও কোলকাতার মেসে আসছে চিঠি, সে চিঠির শরীর জুড়ে অভাবের বর্ণনা, আর শিশুর আগমণ সংবাদ। রাতে ঘরের কেরোসিনের বাতি নিভে যাচ্ছে, এমন জান্তব অভাবের ভেতরেও জীবনানন্দ উদাসীন কিংবা সম্ভবত ভব্যতাবশেই এইসব গঞ্জনা মেনে অন্যমনস্ক জীবনযাপন করেছেন, তার স্ত্রী তাকে ভালোবাসতেন না, তার কালো অসুন্দর চেহারা, তার অভাব এবং তার অন্তর্মুখিতা কখনও ভালো লাগে নি সে নারীর। বনলতা সেন ধীরে ধীরে কবিতার মেয়ে মানুষ হয়ে উঠেছে যার ঘামের গন্ধ ঘুমের ভেতরে হানা দেয়।

শোভন অবদমনের ভেতরে বয়ে যাওয়া জীবন আর কতটুকু উন্মুক্ত করা যায়? একজন পরিচিত বললো তার স্ত্রী তাকে কাছেই আসতে দেয় না, বিবাহিত স্ত্রী ঘরের দরজা বন্ধ করলেই অদ্ভুত উন্মত্ত আচরণ করে, অশোভন গালি দেয়, নইলে দেয়ালে মাথা ঠুকে নিজেকে রক্তাক্ত করে। অথচ বিবাহ বিচ্ছেদের পথ হাঁটতেও সামাজিক বাঁধা। কখনও এই বিবাহিত জীবন মেনে নিবে এমন প্রত্যাশা হয়তো তার আছে, কিন্তু সাদা চোখে আমি তেমন সম্ভবনা দেখি না। সম্পর্ক গড়ে তোলার অনাগ্রহ, বুঝতে চাওয়ার অনাগ্রহ কিংবা একজন নারী তার কন্যাকে বেশ কিছু টাকার প্রয়োজনে ব্যবহার করছে পরিস্থিতিতে সুন্দর শোভন বিবাহিত জীবন আশা করা যায় না।

আমি তাকে বলতে পারি না তুমি এমন প্রত্যাশা করো না, সম্ভবত বেশ বড় একটা ভুলের ভেতরে ঢুকে গেছো, এখানে তুমি একজন ব্যক্তি হিসেবে ততটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না বরং তোমার সাম্ভাব্য অর্থের পরিমাণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তুমি কিংবা তোমার সাম্ভাব্য যৌনকামনা এখানে বরশীর টোপ। তুমি নিজের ভদ্রতায় বিবাহিত বৌকে ধর্ষণ করতে পারবে না, তার উন্মত্ত আচরণ দেখতে দেখতে একদিন মানসিক অস্থিরতায় ভুল কিছু করে ফেলবে আর সেটার মাশুল তোমাকে নগদ অর্থে দিতে হবে। তার চেয়ে বরং কয়েকলক্ষ টাকা আক্কেল সেলামি দিয়ে নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নাও।

তার কথা শুনতে শুনতে ফুলবউ উপন্যাসের কথা মনে পড়েছিলো, মৃত্যুর আগ মুহুর্তে হাজী নেসারের " খালাস নাই। দিব না মুই। না রে না: দিব না। সেই রাতে যা দিলি নে মালকিন, সেই ভুখ নিয়ে মরলাম, আল্লাজী তোর কসুর যেন মাফ না দ্যান, এই মোনাজাত। পুরসেরাত তোকে কে পার করে, দেখব একবার। তুই খালাস পাবি না। " এই হুংকার আসলে তার অপূর্ণ যৌনবাসনার আক্ষেপ।

অপরিচয়ের আড়ালে যতটুকু খোলা মেলা বলা যায় তেমনটা সম্ভব না, অন্তত বাংলা অন্তর্জালের সামাজিক জগতে একধরণের পারস্পরিক পরিচয়ে নিজের ভেতরের আক্ষেপ হতাশা সম্পূর্ণ প্রকাশ করা সম্ভব না।

তোমার যখন খুব মন খারাপ হবে ঐ দুরের গাছগুলো দেখছো, সেগুলোর কোনো একটির কোটরে গিয়ে নিজের দু:খের কথা বলে আসবে, তোমার দু:খ গ্রহন করবে গাছ, আর যদি খুব কষ্টের কথা হয় তাহলে সে দু:খ গাছ নিজের ভেতরে নিয়ে মরে যাবে। গাছগুলো মরে যাচ্ছে, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত নগরায়নের একটা স্রোত আমাদের পরস্পরের কাছে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে।

অহেতুক অসস্তিকর কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে নারাজ, অহেতুক সহানুভুতি কিংবা উপদেশ শুনতে অনাগ্রহী আমি নিজের সামাজিক জীবনটাকে খুব ছোটো করে ফেলেছি। আমি শর্তবিহীন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি না। কৃতজ্ঞতায় নুয়ে নিজের থুতু নিজে চেটে গিলে ফেলার মতো মানসিক পরিস্থিতি আমার নেই। এমন কি যাদের সাথে যে ধরণের সামাজিক সম্পর্ক ছিলো, এই বিপদে তাদের সহযোগিতার জন্যে তাদের সাথে আলাদা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ভেতরে এক ধরণের স্বার্থজনিত সামাজিকতা আছে, সে সামাজিকতা ভেতরে কাঁটার মতো বিধবে। অথচ অনিচ্ছুক আমাকে অহেতুক বিগলিত কৃপাভাজন হয়ে থাকতে হবে তাদের কাছে। আমি সেটা চাই না। এই চাওয়া এবং না চাওয়ার ভেতরে হয়রানির দৈর্ঘ্যপ্রস্থ নির্ভরশীল।

আমি সোজাসাপটা মুখের উপরে বলতে চাই " আমার পাছায় বেতের বাড়ি মেরে রাষ্ট্র নিজেকে তুমুল ধার্মিক প্রমাণ করলো কিন্তু তাতে এক বিন্দু রাজনৈতিক ফায়দা হয় নি। বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্র আরও বেশী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে। "
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে চাই " আমরা এখন মরা ঘোড়া, আমাদের অহেতুক আদালতের দরজায় ঘুরিয়ে আওয়ামী লীগের ১০টা ভোটও যদি বাড়তো তাহলে সে হয়রানি মেনে নেওয়া যেতো দাঁতে দাঁত চেপে , কিন্তু আমি তেমন কোনো সম্ভবনা দেখছি না। "

এই অনর্থক হয়রানি আমাকে ক্ষুব্ধ করলেও আমি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতে পারবো না। বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, ধর্ম পালন এবং পালন না করার সাংবিধানিক নিশ্চয়তাগুলো সংবিধানের পাতা থেকে আদালতের বিচারকের মস্তিস্কে যখন প্রবেশ করবে, যখন আদালতের বিচারক উপলব্ধি করতে পারবে আদালত মূলত নাগরিক অধিকার রক্ষা করার নিমিত্তে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং তাদের মূল দায়িত্ব নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ। আদলত বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করে নাগরিক অধিকারগুলো সুস্পষ্ট করে তোলে।। তবে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এখনও এমন মৌলিক প্রশ্নগুলোকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে না। হয়তো ভবিষ্যতে কখনও তারা অন্য সব রাষ্ট্রের নিরিখে এসব মৌলিক অধিকার প্রশ্নে নিজস্ব অবস্থান ব্যক্ত করবেন।

সাম্ভাব্য আক্রমণ কিংবা আগ্রাসনে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ হিসেবে নিজের সবটুকু উপলব্ধি নিজেই ভাষায় উপস্থাপন করছি না, আমি নিজেকে দিয়েই উপলব্ধি করছি এই রাজনৈতিক পদক্ষেপ স্বনামে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমালোচনায় কতটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সম্ভবত অন্তর্জালের অবাধ বিস্তারে কোথাও কিংবা অন্য কোনো নিরাপদ পরিস্থিতিতে আমি খোলা মনে নিজের অনুভব লিখতে পারবো। শুধু উপলব্ধি করছি সে সময় এখন নেই।

চলতি পথে রিকশায় যেসব নারী অনায়াসে নিজেদের পারিবারিক গল্পগুলো করছেন তাদের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করছি, সে তরুনী কিংবা যুবতী রিকশাওয়ালাকে ননদ শ্বাশুড়ীর গল্প শোনাচ্ছে, এই বড় শহরে তার কোনো বন্ধু নেই, হয়তো শাড়ীর ভাঁজে কোথাও লুকোনো ডায়েরী নেই, তার ভেতরে অসংখ্য আক্ষেপ অভাববোধ আছে, সেই অভাববোধ তাকে পীড়িত করে। হয়তো ওড়না কিংবা ব্লাউজের লেস কিনে ফেরার পথে রিকশায় নিজের মনের অর্গল খুলে দেওয়া মুহূর্তটুকুই তার একমাত্র স্বাধীন সময়, যে সময়ে সে নিজের মতো বেঁচে আছে। যে মধ্যবয়সী মহিলা রিকশায় ছেলে আর ছেলের বৌয়ের গল্প করছে, এই শহরে তার আক্ষেপ শোনার কোনো মিতা নেই।

এই শহর, যান্ত্রিক নাগরিকতা, অন্তর্জালে শকুনের মতো ওত পেতে থাকা সরকারী চামচারা আসলে আমাদের প্রত্যেকেকেই একই রকম অসহায় অবদমনে বাধ্য করছে, আমরা নিজের নিরাপদ ঘর খুঁজছি। চলতি রাস্তায় অপরিচিত মানুষকে সব বলে মনের ভার লাঘব করছি। আমরা জানি এই শব্দগুলো তাদের সাথে দুরে কোথাও ভেসে যাবে, এই শব্দগুলোর প্রতিক্রিয়া কখনও আমাদের তাড়া করবে না আর। আমরা অবদমনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি চাই, আমাদের অস্থিরতাগুলো ছুড়ে ফেলতে চাই। রাস্তায় রিকশার চাকার সাথে অবদমনের কান্নার দাগ রেখে আমরা স্বস্তিতে ঘরে ফিরতে চাই নইলে শহরে মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আশংকাজনক বেড়ে যেতে পারে।

পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


অসাধারণ লাগলো ভাইয়া! আপনার পক্ষেই সম্ভব এমন লেখা লিখতে পারা।

টোকাই's picture


খুব ভাল লেগেছে সাহসী প্রতিবাদ এর কথা শুনে। এমন সাহস আর নির্ভিকতা যদি সব আম জনতার থাক্তো তাহলে কি আর কোন রাজা প্রজাদের সাথে এমন আচরন করার চিন্তা করতে পারতো? কিপ আপ দা গুড ওয়ার্ক।

রায়েহাত শুভ's picture


অসাধারণ লিখছেন রাসেল ভাই...

তানবীরা's picture


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে চাই " আমরা এখন মরা ঘোড়া, আমাদের অহেতুক আদালতের দরজায় ঘুরিয়ে আওয়ামী লীগের ১০টা ভোটও যদি বাড়তো তাহলে সে হয়রানি মেনে নেওয়া যেতো দাঁতে দাঁত চেপে , কিন্তু আমি তেমন কোনো সম্ভবনা দেখছি না। "

কিছুই কি করার নেই আমাদের Puzzled

শওকত মাসুম's picture


আমাদের চারপাশে এমনটা আজকাল অনেক বেশি দেখি, শুনি

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


টিপ সই

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


টিপ সই

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,