অনৈতিক অবচয়ী অর্থনীতি
"অনৈতিক অবচয়ী অর্থনীতি" হয়তো কোথাও না কোথাও বৈধ ও অবৈধ উপার্জনের অর্থনৈতিক চক্রকে উপস্থাপনের জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে, কিংবা হতে পারে এই শব্দগুচ্ছ একান্তই আমার উদ্ভাবন( সেটা হওয়ার সম্ভবনা খুবই কম)।
পণ্য উৎপাদন এবং বিপণনে রাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহন এবং নিস্ক্রিয় অংশগ্রহনের মাত্রাভেদে বাজারে পণ্যের ক্রয়মূল্যের উত্থানপতন অনেকাংশেই নির্ভরশীল। রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকা ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাকে সব সময়ই সীমিত করছে, সীমিত পর্যায়ের মূল্যস্ফ্রীতি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শর্ত হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও " অনৈতিক অবচয়ী অর্থনীতি" চর্চা আসলে ভোক্তা এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতে কোনো ভুমিকা রাখে না।
"অনৈতিক" কারণ এভাবে উপার্জিত কালো টাকা সরাসরি বাজারে প্রবেশ করলেও রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ে সেটা কোনো ভুমিকা রাখে না। চাঁদাবাজী এবং মজুতদারী ধাঁচের পণ্যমুল্য স্ফ্রীতি ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাকে ধারাবাহিক শোষণ করতে করতে ভোক্তাকে নিঃস্ব করে ফেলে। ভোক্তা অধিকার পরিপন্থী এই প্রক্রিয়া বেআইনী বিবেচনায় অনৈতিক।
"অবচয়ী" কেন না উৎপাদকের সরাসরি কোনো উপকারে আসে না, উৎপাদক সঠিক মূল্য পেলে যেভাবে পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হতে পারতো কিন্তু যেহেতু তারা উৎপাদনের সঠিক মূল্য পায় না, শ্রমের সঠিক পারিশ্রমিক পায় না সে কারণে উৎপাদনের জন্যে নিযুক্ত শ্রম এবং বিনিয়োগ ভোক্তা প্রদান করলেও সঠিক ন্যায্য লভ্যাংশ পৌঁছায় না উৎপাদকের হাতে।
রাষ্ট্র কেনো এই অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করছে? রাষ্ট্র কিংবা যারা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করছে তাদের স্বার্থ এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিভাবে রক্ষা করছে?
রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্টপোষকতা দিচ্ছে, স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে যখন শিল্পমালিকদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ মূলধনের সীমা নির্ধারণ করে রাষ্ট্র বিশেষত পাকিস্তানী শিল্পপতিদের মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ব করলো তখন রাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমালোচিত হয়েছিলো। পরবর্তীতে রাষ্ট্র ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের সর্বোচ্চ সীমা পুনঃমূল্যায়ন করে এবং ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ের সামরিক শাসকেরা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্টপোষকতার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।
রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া কিংবা ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনায় ক্রমাগত অলাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো যা রাষ্ট্রের দেনা বিভিন্ন ভাবে বাড়িয়ে তুলছিলো সেসব দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরবর্তী স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে।
৯০ পরবর্তী সরকার এই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে সমর্থ হয়
সামষ্টিক অর্জন কিংবা ব্যক্তিগত অর্জন। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান না কি ব্যক্তির ব্যবস্থাপনায় লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে- এই প্রশ্ন সামনে রাখলে বাংলাদেশে সরকারী দুর্নীতির কারণে লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো খুব দ্রুতই অলাভজনক রাষ্ট্রীয় দায়ে রূপান্তরিত হয়েছিলো। ১৯৭২ সালেই স্বাধীনতাযুদ্ধ পূর্ববর্তী উৎপাদন ক্ষমতার ৮০ থেকে ৮৫% উৎপাদন করতে সমর্থ হলেও পাটকলগুলো, চিনিকলগুলো কখনও লাভজনক সরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিলো না।
জিয়াউর রহমান আড়াল ছেড়ে ১৯৭৭ এ যখন সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রন গ্রহন করলেন তখন সেনাবাহিনীর অবাধ্যতাকে কঠোর হস্তে দমন করেছেন, প্রশাসক হিসেবে তার দক্ষতার সুনাম হয়েছে, একই সাথে এই কঠোরতায় মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহনকারী সেনা কর্মকর্তাদের একাংশকে মোটা দাগে দুর্বল বিচারিক প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হয়েছিলো।
তার উপদেষ্টা পরিষদে নামকরা অনেক অর্থনীতিবিদ( বর্তমানের অর্থমন্ত্রীও তাদের একজন) ও শিক্ষাবিদ ছিলেন, যারা মূলত ঋণনির্ভর পূঁজিবাদী অর্থনৈতিক বিকাশের পন্থা গ্রহন করেছিলেন। বৈদেশিক অনুদানের মাত্রাতিরিক্ত লুটপাট দেশে সরকারী খরচে শিল্পপতি উৎপাদন করতে পেরেছিলো। এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো পরবর্তী স্বৈরশাসক এরশাদের সময়কালেও।
সামরিক শাসকেরা রাষ্ট্রের খরচে এক ধরণের ক্ষমতাধর লুম্পেন শ্রেণী তৈরি করতে আগ্রহী, সেটা আইয়ুবের উন্নয়নের দশকের সত্য ছিলো, পরবর্তী দুইজন সামরিক শাসকও একই পন্থায় নিজেদের অনুগত গ্রামীণ এলিট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
৬৯ এর গণুভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে নৈতিক ও আদর্শিক সমর্থন দিয়েছিলো বাঙালী ক্ষুদ্র শিল্পপতিগণ, তারাই প্রান্তিক বুর্জোয়া( ক্ষুদ্র স্বাধীন ব্যবসায়ী, যাদের নিজস্ব কারখানায় শ্রমিক নিয়োজিত অর্থে । পাকিস্তানের পারিবারিক পূঁজিবাদী মডেলে লাইসেন্স আর পারমিটের ব্যবসা করা বাঙালী এলিটদের ভেতরে কোনো রকমে টিকে থাকা এই প্রান্তিক বুর্জোয়া গোষ্ঠী পাকিস্তানী শাসনের অবসান চেয়েছিলো নিজ শ্রেণীর বিকাশের স্বার্থ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এরাই আওয়ামী লীগের সমর্থনে সবচেয়ে বেশী কালোবাজারী ও পারমিট কেনাবেচার ব্যবসা করেছে। অধিকাংশ সময়ই এই প্রান্তিক বুর্জোয়ারা আওয়ামী লীগের নেতাদের পরিবারের সদস্য ছিলো। স্থানীয় কর্মী এবং নেতাদের সরাসরি প্রশ্রয়ে এদের উত্থান, এদের দুর্নীতিগ্রস্ততা নিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় সম্মেলনে প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি এবং বড় নেতাদের সাথে দ্বন্দ্বের একটা প্রধান কারণ এই প্রান্তিক বুর্জোয়াদের মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতিগ্রস্ততা।
৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও অতীত সরকারের ধারাবাহিকতা মেনেই মূলত স্থানীয় পাওয়ার এলিট তৈরির উদ্যোগ গ্রহন করেছে। সম্পদশালী অনুগত ব্যবসায়ী শ্রেণী নির্বাচনে অর্থ জোগান দিবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভুমিকা রাখবে। নানাবিধ সুযোগ সুবিধা এদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে- পণ্য বিপণন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ৭৫ পরবর্তী রাষ্ট্র এক ধরণের তত্ত্বাবধানকারী ভূমিকা গ্রহন করেছিলো ৯০ পরবর্তী সময়ে সেটার ব্যপ্তি অনেক বেড়ে যায়। আদর্শিক দ্বন্দ্ব কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতার বদলে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক লোভের দ্বন্দ্ব অনেক বেশী প্রকট হয়ে উঠে। এভাবে ক্রমাগত "অনৈতিক অবচয়ী অর্থনীতি" বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশে।
রাষ্ট্র যদি সরাসরি নিজেকে বিপণনে যুক্ত করতো তাহলে উৎপাদক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন গদিতে যেভাবে পণ্যমূল্য বাড়তে থাকে সেটার পরিমাণ অনেকাংশে কমে যেতো। কৃষক ক্ষেতের আলু বিক্রি করেছে ৪০ টাকা মন দরে, গ্রামের হাট থেকে গঞ্জের পাইকারের কাছে সেই ৪০ টাকা মন আলু বিক্রী হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা মন দরে, সেখান থেকে শহরে আসতে আসতে সেই আলুর দাম হয়ে যাচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মন। ট্রাকে ভরে ঢাকার বাজারে যখন আলু আসছে সেটার দাম তখন ৪০০ টাকা মন আর আমরা ভোক্তারা বাজারে কিনছি ১৮টাকা কেজি দরে একই আলু,
ভোক্তা কেজি প্রতি ১৮ টাকা দিলেও মফস্বলের একজন ক্রেতা দিচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা আর সেই ১০ টাকার ১ টাকা যাচ্ছে উৎপাদকের পকেটে।
রাষ্ট্র নিজে বিপণনে জড়িয়ে যদি এই দফায় দফায় মধ্যস্বত্ত্বভোগী লোকগুলোকে সরিয়ে দিতে পারতো তাহলে ১০ টাকার আলুর ৫টাকা যেতো উৎপাদকের পকেটে। তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়তো ৫ গুণ। এবং দেশের ৪৫% থেকে ৫০ % কৃষিশ্রমিক তথ্যটা মাথায় রাখলে নিশ্চিত বলা যায় রাষ্ট্র বিপণন থেকে নিজেকে বিচ্যুত রেখে মাত্র ১% মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে যা সমান ভাবে বন্টিত হলে দেশে ৫০% মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও বাড়তো। এমন কি সাধারণ ভোক্তাও উপকৃত হতো।
পণ্য পরিবহনের সাথে সাথে শুধু মধ্যসত্ত্বভোগী নয় বরং প্রশাসনের একাংশও ভোক্তার পকেট কাটছে। প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজী পণ্যমূল্যের ১০০০% কিংবা ১৫০০% বৃদ্ধির হয়তো পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রন করে। সেই প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজীর কুফল ভোগ করছি আমরা নগরে।





অনেক বিষয় আনছেন। সরকার যখন যে ব্যবস্থা বা নীতি নিয়েছে, তাকেই ব্যবহার করে অনৈতিক অর্থনীতি তৈরি করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ব থাকতে এর সুযোগ নেওয়া হয়েছে, আবার ব্যক্তি খাতে যাওয়ার পর তাকেও ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো চোরাচালানি, কখনো লাইসেন্স-পারমিট-কখনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মেরে দেওয়া-কখনো বৈদেশিক সাহায্যের কমিশন পাওয়া-কখনো শেয়ারবাজার-এভাবেই তো চলছে।
আর এখনকার অর্থমন্ত্রী ছিলেন এরশাদের সঙ্গে, জিয়া নয়।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১৯৭৭ সালে এক্সটার্নাল রিসোর্স অফ ফাইন্যান্স এন্ড প্লানিং মিনিস্ট্রির সচিব ছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
এরশাদের অর্থমন্ত্রী থাকার বিষয়টা অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার উপস্থিতি কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা উদ্ভাবনে কিছুটা অংশগ্রহন ছিলো।
লেখাটা পড়তে পড়তে আমিও এটা ভাবছিলাম। আমার বাবা একথাটা ভুকতভোগী হিসেবে বলে থাকেন অনেকসময়
আর কোন বিকল্প নাই?
অসাধারণ!
মন্তব্য করুন