ইউজার লগইন

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা শেষ পর্ব

তাদের ১০ জনের ৮ জন বিশ্বাস করে নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পুরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তারা বিশ্বাস করে সকল নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহন করার রাষ্ট্রের কর্তব্য। তারা মনে করে রাষ্ট্রের খাস জমি দরিদ্রদের সমবন্টন করতে হবে। তাদের ১০ জনের ৯জন বিশ্বাস করেন ভোট দেওয়া নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাদের ১০ জনের ৫ জন বিশ্বাস করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা বেশী যোগ্য, দক্ষ।
হঠাৎ জরিপের ফলাফল দেখলে মনে হতে পারে এরা পুরুষতান্ত্রিক প্রগতিশীল, তবে বাস্তবতা হলো এরা সবাই মাদ্রাসার ছাত্র। প্রগতিশীলতার সাথে বাহ্যিক আবরণের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। তবে গণমাধ্যমের কল্যানে এবং ইসলামী জঙ্গীবাদের বৈশ্বিক উত্থানের ফলে মুসলিম ধর্মচিহ্নধারীদের প্রতি সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এক ধরণের ভীতি-আশংকা ও ঋণাত্মক ধারণা তৈরি হয়েছে। অবশ্য হেফাজতে ইসলামীর ১৩ দফা এবং শাপলা চত্ত্বরে লাখো মাদ্রাসা ছাত্রের অবস্থানগ্রহন এবং তাদের সহিংসতায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের গোঁড়া, অপ্রগতিশীল চরিত্রটা আরও বেশী পোক্ত হয়েছে জনমানসে। যেকোনো বহুজাতিক মিলনস্থলে পাঞ্জাবী-জোব্বাপরিহিত মুসলিমদের শরীর হাতড়ে বোমা আর আগ্নেয়াস্ত্র খোঁজা হয়। বাংলা মাধ্যমে শিক্ষিত ব্যক্তিদের ভেতরে মাদ্রাসার ছাত্রদের সম্পর্কে এমন ঋণাত্মক ধারণা রয়েছে এ বিষয়টা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জানে। [ Creating Good Muslims: Qawmi madrasa Schooling in a Rural Town of Bangladesh , Md. Nurul Momen Bhuiyan ]

গণমাধ্যমের সম্প্রসারিত ধারণা এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের ধারণার ভেতরে আকাশ-পাতাল তফাত। শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজনীয়তা বিষয়েও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে ভাবনার পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব( সচ্ছলতা, চাকুরি, সামাজিক মর্যাদা) সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সাধারণ মানুষের ধারণা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রীক এবং স্বার্থপর করে ফেলে। তারা পরিবারের প্রতি তাদের কর্তব্য পালনে অনাগ্রহী হয় এবং বয়োজেষ্ঠ্যদের সম্মান করতে চায় না। একই ভাবে একজন সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। যে শিক্ষা একজন ব্যক্তিকে সচ্ছলতা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক নিয়মনীতি ও মূল্যবোধ অনুসরণ করে মৃত্যুবরণ করতে শেখাবে, সেটাই প্রকৃত শিক্ষা।

আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ভেতরে যা কিছু প্রশ্নাতীত স্বীকৃত সেইসব নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া কিংবা প্রশ্নাতীত আনুগত্য সাধারণ মানুষের কামনা। সুতরাং যারা এইসব মূল্যবোধ ও রীতিনীতিকে প্রশ্ন করে, অশ্রদ্ধা করে তাদের আদব লেহাজহীন কুশিক্ষিত হিশেবে দেখে সাধারণ মানুষ। দরিদ্র সাধারণ মানুষের ধারণা আমাদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত সন্তানেরা এমন ব্যক্তিকেন্দ্রীক স্বার্থপর বেয়াদপী শিখবে স্কুলে এবং তারা তাদের পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পালন করবে না। তাদের পছন্দের শিক্ষা মাধ্যম মাদ্রাসা কারণ তারা জানে মাদ্রাসা একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত মুসলিম হিসেব গড়ে তুলবে, সে বড় হয়ে আদর্শ সন্তান হবে।

শিক্ষার ঘোষিত উদ্দেশ্য নিয়ে রাষ্ট্র , মাদ্রাসা কতৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে খুব বেশী যে তফাত আছে এমনটা বলা যাবে না। সমাজ কাঠামো শিক্ষা নীতি নির্ধারণ করে এবং সামাজিক বাস্তবতা শিক্ষার উদ্দেশ্যকে নির্দিষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য
শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্ববোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। [প্রাথমিক শিক্ষাক্রম ২০১২, বাংলাদেশ]
১. আল্লা'হ তা’য়ালা/সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও শিশুরমধ্যে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা এবং সকল ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
৭. ভালো-মন্দের পার্থক্য অনুধাবনের মাধ্যমে সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করা।
৮. অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, পরমতসহিষ্ণুতা, ত্যাগের মনোভাব ও মিলেমিশে বাস করার মানসিকতা সৃষ্টি করা।

রাষ্ট্রের ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং সাধারণ মানুষের আদর্শ কল্পনার ভেতরে খুব বেশী প্রভেদ আসলে নেই, কিন্তু তারপরও শিক্ষা ব্যবস্থাভিত্তিক বৈরিতার সম্পর্ক বাংলাদেশে স্পষ্ট। সুতরাং নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা বিষয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিশেষত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিহীন ক্বাওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ততটা অসন্তুষ্ট নয়। সরকারী স্বীকৃতি থাকলে তাদের জীবন যাপনে কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে কিছুটা সুবিধা হয়তো আসতো কিন্তু যেহেতু সেই সরকার স্বীকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের " স্বার্থপর ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল" করে ফেলতে পারে তাই তারা এই অসুবিধা মেনে নিয়েই প্রকৃত মানুষ এবং ভালো মুসলমান হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা করছে। তাদের ধারণা তারা যদি " কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পায়", তারা যদি " আরও একটু ভালো ইংরেজী শেখার সুযোগ পায়" তারাও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতোই যোগ্যতা অর্জন করবে।

মাদ্রাসায় পড়াশোনা করলেও তারা যে সমাজবিচ্যুত এমন নয়, বিদ্যমান সমাজের সব আলোড়ন তাদের স্পর্শ্ব করে, তাই বর্তমানের বাজারে চাকুরিক্ষেত্রে কি ধরণের যোগ্যতা প্রয়োজন সেটা তারা যেমন জানে, ঠিক তেমন ভাবেই তারা জানে বিশ্ব বাস্তবতায় বর্তমানে তাদের প্রতি এক ধরণের অবমাননাকর মনোভাব বিদ্যমান সমাজে।

আমাদের অতিরাজনৈতিকৃত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে নয়। রাষ্ট্রের স্বীকৃতিবিহীন ক্বাওমী মাদ্রাসাও ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রিত হয়। দাতা এবং গৃহীতার সকল সম্পর্কের আড়ালে এখানে রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের লড়াই চলে এবং ক্বাওমী মাদ্রাসাকেন্দ্রীক জনগোষ্ঠীকে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই কোন না কোন পক্ষকে বেছে নিতে হয়।
সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা, ভালো মুসলিম তৈরির প্রতিষ্ঠান হিশেবে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্থানীয় গ্রহনযোগ্যতাকে পূঁজি করতে ব্যগ্র সকল রাজনৈতিক পক্ষই। স্থানীয় বিবাদ মীমাংসার পাশাপাশি "ইসলামী বিধি-বিধানে পারদর্শী" ক্বাওমী মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিরা দ" ধর্মীয় বিচারক"এর আসনে আসীন। আইনতঃ নিষিদ্ধ হলেও ক্বাওমী মাদ্রাসা শিক্ষিতদের " ফতোয়া দেওয়ার অধিকার আছে এবং এই ক্ষমতার চর্চা তারা করেন।
স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতাধর অংশের সাত্থেই সদ্ভাব বজায় রাখেন। ব্যক্তিগত বিশ্বাস যেমনই হোক না কেনো রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চার আগ্রহের কারণে তারা ধর্মীয় এবং সেক্যুলার সকল প্রতিষ্ঠানের সাথেই ক্ষমতাকেন্দ্রীক লেন-দেন করেন। কখনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করেন, কখনও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির লোভে এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেন। সুতরাং সরকারী খাস জমির অবৈধ দখল ধরে রাখতে সেখানে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, কখনও মাদ্রাসাকে দানপত্র করে দেন নিজের দখলে রাখা সরকারী খাস জমি। কখনও স্থানীয় ক্বাওমী মাদ্রাসা এবং মসজিদ কমিটিকে ব্যবহার করেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোয় কখনও নিজের গ্রহনযোগ্যতা বাড়াতে ধর্মকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করেন। তাই মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির অধিকাংশ সদস্যেরই স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় বিদ্যমান। তারা আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় কর্মী অথবা সমর্থক। ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ সদস্য বিএনপি সমর্থক, ২১ দশমিক ৯ শতাংশ আওয়ামী লীগ সমর্থক সদস্যের বাইরে ২৯ দশমিক ১ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সমর্থক ব্যক্তিরা পরিচালনা কমিটির সদস্য। এর বাইরে ১১ শতাংশ পরিচালনা কমিটির সদস্য অপরাপর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন।

যদিও তাদের ব্যক্তিগত ও প্রচারিত " ধর্ম বিশ্বাস" এবং " ধর্মীয় মূল্যবোধ" পরিপন্থী এসব আচরণ তারপরও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিচালনা কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিলাষ পুরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়ে যান। স্থানীয় এমপি বাৎসরিক উন্নয়ন ব্যয়ের একটা অংশ সরয়াসরি অনুদান হিশেবে মাদ্রাসায় দিচ্ছেন, রাষ্ট্র ধর্মভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের নজরদারিতে আনতে অতিদ্রুতই এইসব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করছে। এর বাইরে মাদ্রাসাগুলোর অনুদানের একটা বড় অংশ আসে প্রবাসী বাঙালীদের কাছ থেকে। স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অনুদান এবং প্রবাসী বাঙালীদের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় মাদ্রাসাগুলো নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে দীর্ঘদিন কিন্তু গত ২ দশকে মাদ্রাসার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অনুদান ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে, ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংখ্যা যেমন কমছে তেমনই বাড়ছে অনুদান সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকায় ক্বাওমী মাদ্রাসার একদল ছাত্র সরাসরি আলীয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল-কামিল- আলীম পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় আবার ক্বাওমী মাদ্রাসা থেকে মাশায়েখ সনদও অর্জন করে। তবে এতো কিছুর পরও মাদ্রাসা শিক্ষিত মানুষদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নেই। মাদ্রাসা শিক্ষকদের ৮০ ভাগই দরিদ্র এবং তাদের শতকরা ৬০ ভাগ প্রান্তিক দারিদ্রে জীবনযাপন করে।

গত ১ দশকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মনস্তত্ব এবং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বৈশ্বিক আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোর অনুদানে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর তত্ত্বাবধানে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মুসলমান দেশগুলোর মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যপক সামাজিক গবেষণা হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর সমাজে আত্তীকরণের সংকট এবং নানাবিধি বিষয়ে প্রতিবছরই গবেষণাপত্র লেখা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এমন একটি গবেষণা পত্র Holy Alliances: Public Subsidies, Islamic High Schools, and Female Schooling in Bangladesh, Mohammad Niaz Asadullah and Nazmul Chaudhury লিখেছেন মাদ্রাসাগুলোতে বর্তমানে সরকারী আত্তীকরণ নীতি অনুসৃত হওয়ায় নারী শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়েছে এবং একই সাথে নারী শিক্ষকের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসাগুলোর প্রায় ৭ শতাংশ শিক্ষক নারী এবং এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

দীর্ঘ আলোচনার উপসংহারে বলা যায়

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক এবং ইংরেজী আধিপত্যের কারণে আমাদের অনুকরণনির্ভর গণমাধ্যমে যেই ঋণাত্মক প্রচারণা বিদ্যমান সাধারণ মানুষ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে বরং প্রকৃত মানুষ নির্মাণের প্রতিষ্ঠান হিশেবে গণ্য করছে।

রাষ্ট্রের স্বীকৃতিহীন ক্বাওমী মাদ্রাসা কিংবা রাষ্ট্রস্বীকৃত আলীয়া মাদ্রাসা পাঠ্যক্রমে মূলত রাষ্ট্রের শিক্ষার উদ্দেশ্যই অনুসৃত হচ্ছে। রাষ্ট্র যেভাবে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অন্ধ আনুগত্যশীল এবং প্রশ্নবিহীন আদর্শ নাগরিক নির্মাণ করতে চায় মাদ্রাসাগুলো সেটার চর্চা করছে।

যদিও রাষ্ট্র চায় তার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিজ্ঞানের নীতি-পদ্ধতি ও প্র যুক্তির জ্ঞান অর্জন করবে এবং সমস্যা সমাধানে এসব অধীত জ্ঞান ব্যবহার করবে কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থ সংস্থানে অনাগ্রহী রাষ্ট বিজ্ঞানমনস্ক ও অনুসন্ধিৎসু নাগরিক নাগরিক তৈরি করতে পারছে না।

রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের ভেতরে রাষ্ট্রের কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট একটি ধারণা রয়েছে। তারা ধরেই নিচ্ছে নাগরিক মৌলিক অধিকার পুরণে আন্তরিক এবং অধিক মনোযোগী হওয়াটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র তার প্রচারণা মাধ্যমের যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে সারা দেশের জনমানসে "যৌতুকবিরোধী এবং শিশু বিবাহবিরোধী" মনোভাব নির্মাণ করতে পেরেছে।

অতীতের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে শিক্ষার্থীদের ভেতরে আত্মজ্ঞানের প্রত্যয় ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করতে পারতো , মাদ্রাসা শিক্ষা পাঠ্যক্রম সংশোধন এবং পরিমার্জনায় উপযুক্ত ব্যক্তি না থাকায়, বর্তমানের মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিরা খুব সংকীর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করছেন, তাদের ভেতরে বিশ্লেষণী ক্ষমতা জন্ম নিচ্ছে না।

শহরে সরকারী প্রাথমিক স্কুল এবং মাধ্যমিক স্কুল কলেজের পরিমাণ বেশী, শহুরে মানুষদের ভেতরে মাদ্রাসায় সন্তান পাঠানোর আগ্রহ কম। গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগের সুবিধা থাকলে সরকারী স্কুলগুলো পিতা মাতাদের প্রথম পছন্দ। যদি এইসব স্কুলে ভর্তি হওয়া ছেলেরা বেয়াদপ হয়ে যায় কিংবা বখে যায়, পিতা-মাতারা তাদের চরিত্র সংশোধনের জন্যে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। যেসব স্থানের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুরহ, সেসব স্থানে উপায়ান্তর না থাকায় পিতা মাতারা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন।

মাদ্রাসাগুলো বিশেষত ক্বাওমী মাদ্রাসাগুলো সমাজের হতদরিদ্র মানুষদের সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পুরণ করছে। রাষ্ট্র যদি তাদের মৌলিক চাহিদা পুরণ করে তবে এইসব পরিবারের সন্তানেরা ক্বাওমী মাদ্রাসার তুলনায় সরকারী স্কুলকেই অধিকতর গ্রহনযোগ্য মনে করবে।

পোশাকে ও বাহ্যিক অবয়বে ভিন্নতা থাকলেও সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে মূল্যবোধ এবং মানসিকতায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের তফাত সামান্য। প্রান্তিক দরিদ্র এবং দরিদ্র পরিবারের মানুষেরা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অসাম্য এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারে প্রধান ভূমিকা রাখছে। রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তিত না হলে এই বাস্তবতা বদলাবে না।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও চমৎকার সিরিজ!

তানবীরা's picture


গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও চমৎকার সিরিজ!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,